ক্যাটেগরিঃ প্রকৃতি-পরিবেশ

 

 

 

 

muktagachanaglinggom

 

ছবি ক্যাপশন: মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) :জলটঙ্গীর পুকুর ঘাটের পাশে নাগ লিঙ্গম গাছে ফোটা ফুল

 

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় দুর্লভ বৃক্ষ নাগ লিঙ্গম।কান্ডে ফুল ফোটে । শাখা-প্রশাখায় কোন ফুল ফোটে না। গোলাকার বলের মত এর ফল।ফলের গায়ের রং সফেদার মতো।বাংলাদেশের অনেকেই গাছটির ফল সংগ্রহ করে এর বীজ থেকে চারা উৎপাদনের চেষ্টা করেছেন।কিন্তু কোন চারা গজায়নি। ফলের ওজন প্রায় ২ কেজি। দেখতে সুন্দর হলেও ফলের স্বাদ খুবই তিক্ত। পশু-পাখিও এই ফল খায় না। বৃক্ষের পাতার রং গাঢ় সবুজ । বহুদুর থেকে ফুলের সুবাস পাওয়া যায়। কিন্তু ফুলের সুবাস তীব্র নয়। এই অঞ্চলের বিয়ের কনে সাজানোর সময় এই ফুরের ব্যাপক কদর রয়েছে। গাছের আকৃতি আকারে বড়। ২০ বছর আগে এক বৃক্ষ জরিপে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীগণ হিসেব করেছেন বাংলাদেশে ৫২ টি নাগেশ্বর বৃক্ষ আছে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় নাগ লিঙ্গম (স্থানীয় ভাবে নারায়ণ গাছ বা নাগেশ্বর নামে পরিচিত) বৃক্ষের সংখ্যা ছিল ৪টি। ২০০২ সালে টর্নেডোর ছোবলে একটি গাছ উপড়ে পড়ে । অপর ৩টি বৃক্ষ অক্ষত অবস্থায় আছে। জলটঙ্গী পুকুর ঘাটের পূর্বপাশে । অনেকেরই ধারণা বৃক্ষগুলির বয়স প্রায় আড়াইশ” বছর। মুক্তাগাছার জমিদাররা শখ করে অথবা নিতান্তই ভেষজ গুণাবলির কথা বিবেচনা করে বিদেশ থেকে এই বৃক্ষ এনে তাদের বাড়ির সামনে রোপন করেন। এদেশের দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষগুলি সংরক্ষণ করে থাকে সরকারের বন বিভাগ। এলাকাবাসী চায় বৃক্ষগুলি সংরক্ষণ করা হোক এবং নতুন বৃক্ষ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হোক। নিরবে সৌরভ ছড়াচ্ছে দেড়শ’ বছরের পুরাতন দুর্লভ নাগ লিঙ্গম গাছ। ব্যাপক ওষুধি গুণ সমৃদ্ধ এ গাছটিতে এবারও ফুল ফুটেছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার পুরাতন জমিদার বাড়ির এ গাছটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সমাদৃত। তবে নেই কোনো যত্ন। নেই সরকারের পক্ষ থেকে চিহ্নিত করার কোনো উদ্যোগ।
গৌরীপুর থানা বাউন্ডারি দেয়ালের ভিতর রান্না ঘরের এক পাশে ময়লা আবর্জনাপূর্ণ স্থানে গাছটির বয়স সম্পর্কে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী এর বয়স দেড় শতাধিক বলে ধারণা স্থানীয়দের। এলাকার প্রবীণরা জানান, কালীপুরের তৎকালীন জমিদার উপেন্দ্র কিশোর রায় প্রায় দেড়শ’ বছর আগে অনেকগুলো রয়েল পামগাছের সাথে ভারত থেকে ওই নাগ লিঙ্গম গাছের চারা এনে তার বাসভবনে রোপন করেছিলেন। জনশ্র“তি আছে, হাতির পেটের অসুখের প্রতিশেধক হিসেবে ওই গাছের কচি পাতা কার্যকর ভূমিকা রাখত বলে জমিদার এ গাছ রোপন করেছিলেন।
তারা জানান, আমাজান অঞ্চলের এ গাছটি এ দেশের প্রতিকুল আবহাওয়ায় বাঁচিয়ে রাখতে জমিদার নিজে মালির সাথে গাছটির পরিচর্যা করতেন। তবে স্থানীয়রা সব সময় মনে করতেন এ গাছের ফুল নাগ-নাগিনী পাহারা দেয়। এ কুসংস্কারের কারণে প্রতি বছর নাগ পঞ্চমিতে এ গাছের গোড়ায় পূজা করে নাগকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হতো। বর্তমানে পূজা বন্ধ থাকলেও ওই গাছে নাগ-নাগিনী বসবাস করে এ ভয়ে এখনও কেউ এ গাছের আশে পাশে যায় না।
দেশ ভাগের পর জমিদাররা ভারতে চলে গেলে পরিত্যাক্ত এ বাড়িতে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। সে সময় থেকে পুলিশ ফাঁড়ির (যা বর্তমানে গৌরীপুর থানা) বাউন্ডারি দেয়ালের ভিতর রান্না ঘরের এক পাশে ময়লা আবর্জনাপূর্ণ স্থানে অযত্ম-অবহেলায় এখনো টিকে আছে গাছটি। গাছটি প্রতি বছর শরৎকালে ফুল ফুটিয়ে সৌরভ ছড়াচ্ছে চারদিকে।
বাংলাদেশে নাগ লিঙ্গম গাছের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন জার্নালে ঢাকা শেরে বাংলা নগর কৃষি বিশ্ববিদ্যারয়ে একটি, বলদা গার্ডেনে একটি, সিলেট ও হবিগঞ্জে একটি করে নাগ লিঙ্গম গাছ থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে সর্বাধিক প্রাচীন ও বৃহদাকার এ গাছাটির কথা কোথাও উল্লেখ নেই।
এ গাছটির গোড়ার ব্যস প্রায় ১৮ ফুট এবং কাণ্ড ৩০ ফুট লম্বা। এর ফুল উজ্জল গোলাপী, পাপড়ি গোলাকার কুণ্ডলী পাকানো। ফুটন্ত ফুলের পরাগ কেশর সাপের ফনার মত। আর এ কারণেই গাছটি নাম নাগ লিঙ্গম হয়েছে বলে ধারনা করা হয়। কড়া গন্ধ যুক্ত এ ফুল শুকলে তাৎণিক মাথা ব্যথা শুরু হয়। কু-সংস্কারের কারণে স্থানীয়রা এ ফুল না ছিড়লেও কবিরাজরা দূর-দূড়ান্ত থেকে এ ফুল সংগ্রহ করতে এখানে আসেন।
গৌরীপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক আজহারুল হক বলেন, দূর্লভ নাগ লিঙ্গম গাছের ব্যাপক ওষুধি গুণ রয়েছে। এর ফুলের কলি দিয়ে রস তৈরি করে খাওয়ালে প্রসূতির সন্তান প্রসব সহজ হয়। এর মাঝবয়সী পাতা দিয়ে তৈরি পেস্ট দাতের পাইরিয়া ও য় রোগ নিরাময়ে ব্যাপক কার্যকর। এ গাছের বাকল দিয়ে বহু মূত্র রোগের ওষুধ তৈরি করা হয়। পাশাপাশি এ গাছের কাঠ অত্যন্ত মজবুত। লালচে বাদামি রঙের এ কাঠ রেলের স্লিপারসহ ভারি কাজে লোহার পরিবর্তে ব্যবহার করা যায়।

তিনি জানান, এত সব গুণ থাকা স্বত্বেও শুধু প্রতিকুল আবহাওয়ার কারণে এ দেশে নাগ লিঙ্গম গাছের বিস্তার করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বাভাবিক নিয়মে বীজ থেকে চারা উৎপন্ন হওয়ার কথা থাকলেও প্রচণ্ড উঞ্চ অঞ্চলের গাছ বলে এ গাছের বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম এ দেশে হয় না। তবে গুটি কলাম করে গাছের বংশ বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে তিনি জানান।

বিষ্ণু দাশ সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণ আমেরিকায় স্থানীয় নাম : কুরুপেটা বৈজ্ঞানিক নাম : Couroupita guianensis নাগলিঙ্গম দীর্ঘ চিরসবুজ বৃক্ষ এবং এ বৃক্ষ রাজ্যে আভিজাত্যের প্রতীক । এর আদি নিবাস উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং দক্ষিণ ক্যারাবিয়ান। পৃথিবীর সর্বত্র এটি কম বেশি বিস্তৃত। দুই তিন হাজার বছর ধরে ভারতে জন্মানোর কারণে অনেকে এ বৃক্ষটির উত্পত্তিস্থল ভারতকেও বিবেচনা করে থাকেন। সমস্ত পৃথিবীতে এই উদ্ভিদটি বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশে ১০-১৫ টি নাগলিঙ্গম উদ্ভিদ বিদ্যমান। নাগলিঙ্গমের বর্ণনা : ক্যানন বলের মত ফল ধারণকারী এই এ বৃক্ষ ৩৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, । এ বৃক্ষের কান্ড সরল, উন্নত এবং উপরের দিকে শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত। বৃক্ষের বাকল বাদামী ধুসর, অমসৃণ, রুক্ষ; পাতা গুচ্ছাকৃতির এবং ৮ থেকে ৩১ সে.মি পর্যন্ত দীর্ঘ। পাতা লম্বায় ৫৭ সে.মি পর্যন্ত হতে পারে। পাতার রং সবুজ, প্রায় কালো, কিন্তু অত্যন্ত উজ্জ্বল। গ্রীষ্মকালে এদের পত্র মোচন হয়। এ বৃক্ষ বহু শাখা প্রশাখা বিশিষ্ট এবং বড় বড় ডালে ফুলের মঞ্জুরি ধরে। কখনো কখনো সরা বৃক্ষের কান্ড থেকেই ফুল বের হয়। ফুলগুলো কমলা,উজ্জ্বল লাল গোলাপি রঙের, ঊর্ধ্বমুখী, ছয়টি পাপড়িযুক্ত এবং তিন মিটার দীর্ঘ মঞ্জুরিতে ফুটে থাকে। একটি বৃক্ষে প্রায় এক হাজারটি ফুল ধরতে পারে। ফুল দৈর্ঘে ৬ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর পাপড়ি গোলাকৃতি, বাঁকানো, মাংসল এবং ভেতর ও বাইরে যথাক্রমে গাঢ় গোলাপী ও পান্ডুর হলুদ। নাগলিঙ্গমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর পরাগচক্র সাপের ফণারমত বাঁকানো এবং উদ্যত ভঙ্গি। রাতের বেলায় ফুল থেকে তীব্র সুগন্ধ বের হয় যা সকাল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। সারা গ্রীষ্মকাল ধরেই নাগলিঙ্গম ফুল ফোটে।ফল ক্যানন বলের মত অর্থাত্ দীর্ঘ, গোলাকার, ভারি এবং ২৫ সে.মি. পর্যন্ত লম্বা হয়। নয় মাসের মধ্যে ফল পরিপক্ক হয়। ফল মাটিতে পড়লে মৃদু শব্দে ফল ফেটে যায়, এবং বাতাসে ঝাঁঝালো গন্ধের সৃষ্টি করে। ফলগুলো কখনো কখনো পরিপক্ক হতে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলগুলো গাছের মত শক্ত। প্রতিটি ফল থেকে প্রায় ৬৫টি বীজ পাওয়া যায়। বীজগুলোতে আলাদা আলাদা ফুলের মত আস্তরণ থাকে যা এদেরকে প্রতিকূল অবস্থা থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। পঁচা ফলের গন্ধ অত্যন্ত উগ্র, কুিসত্। বীজ থেকে সহজেই এ বৃক্ষেও চারা জন্মে। প্রাণীদের খাবার হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়। আমাজান বনের সামান জনগোষ্ঠীর এ বৃক্ষের ফল প্রিয় খাবার। শক্ত খোলস অলংকার বা বিভিন্ন দ্রব্য বহনে ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত এই উদ্ভিদটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্যাপক। এই গাছগুলোর দ্রুত বৃৃদ্ধি এবং আকর্ষণীয় ফুলের জন্য রোপণ করা হয়। অর্থনৈতিক গুরুত্ব : এ বৃক্ষের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কম। দক্ষিণ আমেরিকায় এ বৃক্ষেও কাঠ দিয়ে আসবাবপত্র তৈরি করা হয় । তবে সুগন্ধী ফুলের গাছ হিসেবে বাগানে বা বাড়ীর আঙ্গিণায় রোপন করা হয়। ওষুধ হিসেবে এ বৃক্ষের ফুল, পাতা এবং বাকলের নির্যাস এনটিবায়েটিক, এনটিফাঙ্গাল এবং এনিটসেপটিক হিসেবে ব্যবহূত হয়। পেটের পীড়া দূরীকরণে এর জুঁড়ি নেই। পাতা থেকে উত্পন্ন জুস ত্বকের সমস্যা দূরীকরণে খুবই কার্যকর। দক্ষিণ আমেরিকার সামানরা এর পাতা ম্যালেরিয়া রোগ নিরাময়ে

ব্যবহার করে থাকে। ফলের শক্ত খোলস অলংকার বা বিভিন্ন দ্রব্য বহনে ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত এই উদ্ভিদটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব ব্যাপক।