ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

paper.mym

পত্রিকার নাম, সম্পাদক , প্রকাশের স্থানকাল যাই হোক না কেন তাঁদের ব্রত একটাই- কল্যাণকর আগামি । পত্রিকা প্রকাশের কত শত বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু প্রকাশ যন্ত্রণার মৌল প্রেরণা এখন অবিনাশি আনন্দময় সুখের উপমা । পত্রিকার নামটা বদলে যায়, তরুণদের চেহারাটা হয়তো ভিন্ন হয় কিন্তু থাকে হুবহু এক । হাজার বছর আগে অথবা পরে । ১৮৬৫ সালে ময়মনসিংহ থেকে (শেরপুর) ‘বিদ্যোন্নতি সাধিনী’ নামে মাসিক পত্রিকা বেরুত । শ্রীনাথ চন্দ্রের সম্পাদনায় ‘বাঙ্গালি’ নামে মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো ময়মনসিংহ শহর থেকে । এই শ্রীনাথ চন্দ্র ময়মনসিংহের সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রাণের জোয়ার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । বর্তমান সময়ের সার্বক্ষণিক সাহিত্য কর্মীদের মতো ধূসর দূর অতীতে ছিলেন শ্রীনাথ চন্দ ।

টাঙ্গাইলের ফুলবাড়ীতে জন্মগ্রহনকারী শ্রীনাথ চন্দ (১৮৫১- ১৯৩৮) ময়মনসিংহ ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম সংগঠক ছিলেন । বিদ্যাময়ী স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শ্রীনাথ চন্দ আনন্দ মোহন কলেজ স্থাপনেও প্রভূত সহায়তা করেছিলেন । ১৮৭৫ সালে প্রকাশিত হতো ‘প্রমোদী’ ‘সুহৃদ’ ‘ভারত মিহির ’ ইত্যাদি পত্রিকা । মুক্তাগাছায় প্রকাশিত হতো ‘প্রমোদী’ মাসিক পত্রিকা । । বাংলা ১২৮২ সালের আশ্বিন মাসে এই পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল । সুহৃদ সাপ্তাহিক পত্রিকাও মুক্তাগাছায় প্রকাশিত হতো । ১২৮২ সালের ১লা বৈশাখ পত্রিকাটির ১ম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলো । প্রথম প্রকাশের ১২৩ বছর পর ঐতিহ্যের স্মারক চিহ্ন বুকে ধারণ করে ‘সুহৃদ ’ দ্বিতীয়বার প্রকাশিত হয় ১৪০৫ বঙ্গাব্দের ২রা পৌষ মুক্তাগাছা পৌর সাধারণ পাঠাগার থেকে । অনাথবন্ধু গুহের সম্পাদনায় ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রকাশিত হতো ‘ভারত মিহির’ । জানকীনাথ ঘটক, শ্রীনাথ চন্দ, আনন্দ চন্দ্র মিত্র , কবি দীনেশচরণ বসু, অমরচন্দ্র দত্ত প্রমুখ এই পত্রিকার নিয়মিত লেখকই শুধু ছিলেন না , নানা জনহিতকর কাজের সাথেও এই লেখকগোষ্ঠি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন ।

১৮৭৬ সালে আমরা সাপ্তাহিক ‘বিশ্ব সুহৃদ’ পত্রিকার খোঁজ পাই । এটি ময়মনসিংহ শহর থেকেই প্রকাশিত হতো । ময়মনসিংহের সুসঙ্গ দুর্গাপুর থেকে প্রকাশিত হতো ‘ কৌমুদী’ পত্রিকা । ১৮৭৮ সালে এই পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন রুক্সিনীকান্ত ঠাকুর । রুক্সিনীকান্ত ঠাকুর ছিলেন পত্রিকা- পাগল মানুষ । তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত ছিল পত্রিকা সংগঠন, পত্রিকা প্রকাশনা ইত্যাদি । দুর্গাপুরের মহারাজা শিবকৃষ্ণ সিংহ এর মালিকানায় ‘আর্যপ্রভা’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৮৮০ ইং সালে । এই পত্রিকারও সম্পাদক ছিলেন রুক্সিনীকান্ত ঠাকুর । ১৮৮১ সালের উল্লেখযোগ্য দু’টি সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ সুধারকর ’এবং চারুবার্তা’ । প্রথমটি ময়মনসিংহ শহর ও দ্বিতীয়টি শেরপুর শহর থেকে প্রকাশিত হতো ।

চারুবার্তার অন্যমত প্রধান লেখক কবি দীনেশ চরণ বসু ময়মনসিংহ সভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন । তাঁর উল্লেখযোগ্য কব্য গ্রন্থ : মানস বিকাশ , কবি কামিনী , মহা প্রস্থান ইত্যাদি । ‘ বাসন্তী ’ ছিল মাসিক পত্রিকা । ময়মনসিংহ শহর এর সূতিকাগার । সম্পাদনা করতেন ব্রজনাথ গঙ্গোপাধ্যায় । ‘উদ্দেশ্য মহৎ’ ১৮৮৮ সালে ময়মনসিংহ শহরের পত্রিকা । ময়মনসিংহ সাহিত্য সভার মুখপাত্র হিসাবে প্রকাশিত হতো মাসিক ‘আরতি’ । এটি ১৯০১ সালের পত্রিকা । ১৯০৩ সালে এম. এস নূরুল হোসেন কাশিমপুরী সম্পাদনা করতেন ময়মনসিংহ শহরের মাসিক ‘হানিফি’ । বিশ শতকের শুরুও দশকে কেদারনাথ মজুমদার লেখালেখি , গবেষণা , পত্রিকা প্রকাশ, পুস্তক প্রকানা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ময়মনসিংহবাসীর সামনে যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন সেটি আজো আলোকবর্তিকা হিসাবে কাজ করছে ।

তাঁর সম্পাদিত ‘সৌরভ’ পত্রিকা , চন্দ্রকুমার দে প্রসঙ্গ , দীনেশ চন্দ্র সেন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় , দুশন জবাভিতেল এইসব মহত্তম ঘটনার স্মারক গৌরবে ‘মৈমনসিংহ – গীতিকা ’ আজ বিশ্ববাসীর গৌরব মহিমায় অভিষিক্ত । চিরকালে মানব মহিমার এই যে চির ভাষ্কর মনোভূমির যুগোত্তীর্ণ রতœ সম্পদ ‘মৈমনসিংহ- গীতিকা’ – তার পেছনে পত্রিকার ভূমিকা ছিল অনুপম জননীর মতো । মমতার আদরে , দায়িত্বেও শৃঙ্খলে পত্রিকাগুলো মানুষ তৈরীতে, মূল্যবোধে সৃজনে পালন করেছে যথার্থ অভিভাবকের ভূমিকা । এসব মানুষগুলোই যুগে যুগে সুনীতির পক্ষে দাঁড়িয়েছে । সমাজে শুভবোধের প্রতিষ্ঠা করেছে ।

১৯১৩ সালে ‘সৌরভ’ পত্রিকায় চন্দ্রকুমার দে প্রাচীন মহিলা কবি চন্দ্রাবতীকে নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছিলেন । সৌরভ সম্পাদক কেদার নাথ মজুমদার ছিলেন দীনেশ চন্দ্র সেনের পুরনো বন্ধু । দীনেশ চন্দ্র সেনের গভীর আগ্রহে চন্দ্র কুমার দে স্ত্রীর সঞ্চিত সামান্য রুপায় গয়না বিক্রি করে পাথেয় জোগাড় করে ১৯১৯ সালের দুর্গাপূজার আগে দীনেশ চন্দ্র সেনের সাথে দেখা করলেন । লিখেছেন দীনেশ চন্দ্র- “রোগে – দুঃখে জীর্ণ , মুখ পান্ডুরবর্ণ , অর্দ্ধাশনে -অনশনে বিশীর্ণ , ত্রিশ বছর বয়স্ক যুবক, অতি অল্পভাষী , তিনি পল্লী জীবনের যে কাহিনী শুনাইলেন ও মৈমনসিংহের অনাবিস্কৃত পল্লীগাথার যে সন্ধান আমাকে দিলেণ, তাহাতে কখনই তাঁহাকে আমার প্রিয় থেকে প্রিয়তর বলিয়া মনে হইল । ’

অতঃপর অনেক ত্যাগ কষ্ট সর্বোপরি জীবন বিপন্ন করে মৈমনসিংহ গীতিকার গাথাগুলি কিভাবে সংগৃহিত হয়েছিল সে কাহিনী কম বেশী সবারই জানা । যেটি আমরা অনেকেই জানিনা , তা হলো মৈমনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ পরবর্তী সময়ে প্রকাশের জন্য কি দুঃসহ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হয়েছিল । ময়মনসিংহবাসীরা সে সময়ে কোলকাতায় একটি সভা আহবান কওে । সভায় তাঁরা জানতে চান গাথাগুলি ব্যাপাওে তাদেও করণীয় কি ? শ্রী দীনেশ চন্দ্র সেন , রায় বাহাদুর , বিএ,ডি.লিট . দীর্ঘ বক্তৃতা করেন এবং কাজ চালাবার মতো মাত্র দশ হাজার টাকা সভার কাছে চান । সভার সভাপি ছিলেন সন্তোষের রাজা শ্রীযুক্ত মন্মথনাথ রায় চৌধুরী । সভায় আশ্বাস দেয়া হয়েছিল শ্রীঘ্রই টাকার ব্যবস্থা করা হবে । বাস্তবে কিছুই করা হয়নি ।

ঐতিহ্য – বিস্মৃত জাতি হিসাবে আমাদের সুনাম বহুকালের । রোগে , শোকে , বিদীর্ণ মৃত্যুপথযাত্রী দীনেশ সেন লিখেছিলেন, ‘ ঝুলি কাঁধে করিয়া দুয়ারে দুয়ারে বাহির না হইলে ভিক্ষা জোটে না । আমি রোগের দরুণ বিছানায় পড়িয়া আছি , আমি ভিক্ষুক সাজিয়া বড় মানুষের বাড়ীতে যাইয়া হাত পাতিতে অক্ষম । বিশেষতঃ আমি মৈমনসিংবাসীগণের নিকট ভিক্ষা চাহিতে লজ্জা বোধ করি , সেখানে কি আমার কোন দাবীই নাই ? ’ সাহিত্য পত্রিকা আমাদের ঐতিহ্যের গহন গভীরে নিয়ে যাক যেখানে সভ্যতার শেকড় প্রোথিত । ঐতিহ্যের দায়ভার কাউকে না কাউকে গ্রহণ করতেই হয় । সময় মহিমার অশ্র“- ঘামে সাহিত্য সাধক কিংবা পত্রিকা সম্পাদক জীবন পুড়িয়ে লেখা সংগ্রহ করেন , পৌঁছে দেন উত্তর প্রজন্মের হাতে ।

town,mym