ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

নাগরিক সুনাগরিক সাংবাদিক সাংবাদিকতা। সিটিজেন জার্নালিস্ট জার্নালিজম । একটি সভ্য রাজনৈতিক সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষ যে মর্যাদা উপভোগ করে তাকে নাগরিকতা বলে । অনেকে নাগরিকতা ও নাগরিক শব্দ দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করেছেন । কিন্তু নাগরিকতা হল ব্যক্তির মর্যাদা ও গুণ আর নাগরিক হল সমাজের সদস্য বা ব্যক্তির পরিচয় । কেলসনের মতে, নাগরিকতা হল রাষ্ট্রের সদস্য হিসাবে কোন ব্যক্তির স্ট্যাটাজ বা পদমর্যাদা । কোন ব্যক্তি কোন রাষ্ট্রে মর্যাদা ভোগ করে , তার উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয় সে নাগরিক কিনা । সুতরাং নাগরিকতা হল ব্যক্তির রাজনৈতিক মর্যাদা । অধ্যাপক লাস্কির মতে, নাগরিকতা হল সার্বজনীন কল্যাণের জন্য ব্যক্তির লব্ধ বিচার বুদ্ধির প্রয়োগ । যে ব্যক্তি রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করে না তাকে নাগরিকের পরিচয় হতে বঞ্চিত করা যায় না , কিন্তু নাগরিকতা হতে সে বঞ্চিত হয় । বস্তুত নাগরিকতা হল নাগরিকের গুণ ও মর্যাদার উপলব্ধি ও বাস্তব প্রয়োগ ।
শব্দগত অর্থ নগরের অধিবাসীকে নাগরিক বলা হয় । যেমন- ময়মনসিংহের নাগরিক, ইটালীর নাগরিক ,নিউইয়র্কের নাগরিক ইত্যাদি । কিন্তু জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভবের ফলে নাগরিক পরিচয় কোন একটি বিশেষ স্থানকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয় না বরং জাতীয় রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয় । যেমন বাংলাদেশের নাগরিক , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক , রাশিয়ার নাগরিক ইত্যাদি। এ্যারিস্টটলের মতে, আমরা সেইা সব ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের নাগরিক বলে অভিহিত করব যাদের উক্ত রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নমূলক এবং বিচার বিষয়ক কার্যাবলীতে অংশগ্রহনের ক্ষমতা রয়েছে । সেই ব্যক্তি নাগরিক যে নগররাষ্ট্রের শাসনকার্যে সক্রিয়বাবে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম । কিন্তু বর্তমানে বিপুল জনসংখ্যা ও বিশাল আয়তন বিশিষ্ট জাতীয় রাষ্ট্রে সকলের পক্ষে রাষ্ট্রে সকলের পক্ষে রাষ্ট্রের শাসনকার্যে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয় , সমীচীনও নয় । তাই আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, সেই ব্যক্তি নাগরিক যে কোন রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করে , রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রক্শা করে , রাষ্ট্রপ্রদত্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য পালন করে ।

সুনাগরিক জাতীয় সম্পদ । সমাজ রাষ্ট্রের সুনাম , প্রগতি ও মর্যাদা সুনাগরিকতার উপর নির্ভরশীল । লর্ড ব্রাইসের মতে, সেই ব্যক্তি সুনাগরিক , যে বুদ্ধি , আতœসংযম ও বিবেক এ তিনটি গুণের অধিকারী । এ তিনটি মৌলিক গুণ ছাড়াও সুনাগরিকের কতকগুলো বিষয়ে মনোযোগী হওয়া আবশ্যক । যেমন, সকলকে শ্রদ্ধা করা, কাউকে ছোট মনে না করা, শিক্ষিত ও সংস্কৃতিবান হওয়া, রাষ্ট্রের শাসন- ব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা , ব্যক্তি স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সজাগ ও সচেতন থাকা, শৃংখলাবোধ ও সময়ানুবর্তিতার প্রতি অনুরাগী হওয়া , বলিষ্ঠ ও স্বাধীন মনোভাব পোষণ করা , সংবেদনশীল হওয়া এবং সাধারণ জ্ঞান , প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠার অধিকারী হওয়া আবশ্যক।

কতকগুলো প্রতিবন্ধকতা একজন সুনাগরিক হওয়ার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে । লর্ড ব্রাইসের মতে, নির্লিপ্ততা, ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা এবং দলীয় মনোভাব । এছাড়াও অজ্ঞতা, আতœম্ভারতা, দাম্ভিকতা, ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, অর্থনৈতিক অসাম্য।

সুনাগরিকতার অন্তরায় দূর করার উপায় হচ্ছে, শাসনতান্ত্রিক প্রতিকার, নৈতিক প্রতিকার ও অর্থনৈতিক প্রতিকার । বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র । দীর্ঘ নয় মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙ্গালী জাতি পরিপূর্ণ বিজয় লাভ করে । স্বাধীনতা সংগ্রামের তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের নাগরিক চেতনাকে সংহত ও উদ্দীপ্ত করেছে সন্দেহ নেই । কিন্তু জাগতিক কারণে এবং ব্যক্তি স্বার্থের অমোঘ বিধানে বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে উদাসীনতা , স্বার্তপরতা ও দলীয় মনোভাব অত্যন্ত প্রবল । শিক্ষার অভাবে অজ্ঞতা ও আতœম্ভরিতা আমাদের নিত্য সাথী । এ সকল অন্তরায়ের হাত হতে বাংলাদেশের নাগরিকদের মুক্ত করে সুনাগরিক করে গড়ে তুলতে হলে সার্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে । যুব ও ছাত্র সমাজকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে কেউ যাতে ব্যবহার করতে না পারে এবং লোভ- লালসার ও অন্যায় আর্থিক সুবিধা দিয়ে যুব সমাজের নৈতিক মান ও মনোবল যাতে কেউ বা কোন শ্রেণী ধবংস করতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের সকলকে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে ।
সাংবাদিকতা

সর্বজন স্বীকৃত একটি মহান পেশা । সৃষ্টির সেই আদিকাল থেকেই । এ পেশাকে সন্মানজনক ও মর্যদাকর পেশা হিসাবে চিহ্নিত করা হয় । পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের সাথে জড়িত যে কোন মানুষকেই সন্মানের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করা হয় । সমাজ , রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব ও মানব কল্যানে ভূমিকার কারণেই এ পেশায় নিয়োজিতরা জাতির বিবেক হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন ।

সময়ের বিবর্তনে ক্রমেই সংবাদ ও সাংবাদিকতার গুরুত্ব বেড়েছে । এখন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের কবরও আধুনিক সাংবাদিকতার পরশে জাতীয় সংবাদপত্রে স্থান করে নিচ্ছে । গ্রামেরে মানুষ চায়ের কাপের সাথে সংবাদপত্রে ও মোবাইলে চোখ বোলাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে । ফলে সাংবাদিকতার পরিথি বেড়েছে । দেশের প্রায় সব জেলা ও উপজেলা থেকে এখন প্রকাশিত হচ্ছে প্রিন্ট ও অনলাইন একাধিক সংবাদপত্র । শহর বন্দর গ্রামের যুবক তরুণরা আকৃষ্ট হচ্ছে এ পেশায় । সমাজ, দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তারা জড়িয়ে পড়ছেন এর সাথে । সংবাদ ও সাংবাদিকতার পরিথি বাড়ার পেছনে আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ বূমিকা পালন করছে ।

স্মরণাতীত কাল থেকে মানুষের তীব্র আকাঙ্খা তার চতুস্পার্শের বিভিন্ন বিষয়বস্তু এবং ঘটনাকে জানার । মানুষ স্বভাবত:ই কৌতুহলী । তার এ কৌতুহল প্রতিবেশীকে জানার; প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে জানার ; বিশ্বের বিভিন্ন রাষেট্রর সামাজিক , রাজনৈতিক , ধমীয় , অর্থনৈতিক অবস্থা , সমস্যা, সম্ভাবনা, নতুন আবিস্কার, পুরাতন আবিস্কারের ইতিহাস ইত্যাদি জানার।মানুষ যখন এ সকল বিষয় জানতে সক্ষম হয় তখনই কেবল কৌতুহল নিবৃত্ত হয় এবং নতুন কৌতুহলের জন্ম দেয় ।

সভ্যতার প্রারম্ভে মানুষের কাছে জগৎ ছিল খুব ছোট ও সীমাবদ্ধ । তখন সে শুধু তার নিজ গ্রাম বা নিজ এলাকার খবর জেনেই সন্তুষ্ট থাকত । এছাড়া তার বেশী জানার আগ্রহ ছিলনা , ছিল না উপায়ও । কালক্রমে সভ্যতার উন্নতির সাথে সাথে মানুষের আগ্রহ বেড়ে যায় এবং সংবাদ আদান- প্রদানে ঘটে উন্নতি । যুগে যুগে নতুনকে জানার জন্যে , অপরের খোঁজ নেবার জন্যে মানুষ বিভিন্ন রকম কৌশল অবলম্বন করছে । প্রথমে পরিচিত লোকমুখে শুনে মানুষ একটি সীমাবদ্ধ এলাকার খবরাবর জ্ঞাত হতো । পরবর্তীতে ড্রাম বা ঢোল পিটিয়ে এক জায়গার সংবাদ অন্য জায়গায় প্রচার করা হতো । পরবর্তীতে আরেকটু উন্নতি ঘটল । এল পায়রা । ড্রাম পেটার চেয়ে জরুরী সংবাদ পায়রা মারফৎ খুব কম সময়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে দেয়া যেত । এখন টেলিফোন, ফ্যাস্ক, মোবাইল , ইমেইল সুবিধা সৃষ্টি হয়েছে । ডক্টর পার্থ চট্রোপাধ্যায়ের মতে, সাংবাদিকতা চলমান জীবনের প্রতিচ্ছবি । যা কখনো তন্ময় , কখনো বস্তুনিষ্ঠ । এই প্রতিচ্ছবিকে আপন হৃদয়ে ধারণ করে তাকে আবার জনসাধারণের কাছে ফিরিয়ে দেবার এক জটিল পদ্ধতি ।সাংবাদিকতা বস্তুনিষ্ঠ সাহিত্য ও দ্রুতলয়ের ইতিহাসের সংমিশ্রণ । সাংবাদিকতা জীবন , সমাজ ও গতি প্রকৃতি বর্ণনার এক প্রকৌশল । সাংবাদিকতা হল একটি গুণ বা কাজের নাম । অধ্যাপক কারটিস ডি ম্যাকডোগাল এর মতে, ২০টি গুণের অধিকারী হলে একজন সাংবাদিক যোগ্য সাংবাদিক হিসাবে স্বীকার করা যাবে । বুদ্ধিমান, বন্ধুভাবাপন্ন, কল্পনা শক্তিবান,উদ্ভাবনী শক্তি, শক্তিশালী স্নায়ু, যথেষ্ট গতি,সাহস, সহনশীলতা, সাংগঠনিক শক্তি, ধৈর্যশক্তি, মানসিক সতর্কতা, নিজ কর্তব্যে একনিষ্ঠ, সততা, নিয়মানুবর্তী,হাস্যোজ্জল, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী । রোল্যান্ড ই উলসলের মতে সংবাদপত্র একটি দেশের চতুর্থ স্তম্ভ । শফিকুর রহমান নেওয়াজের মতে, দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি , সমাজব্যবস্থা, ধর্ম, গণচেতনা, নতুন আবিস্কার , ত্যাগ-তীতিক্ষা , স্বপ্ন- সাধ , আর্তি- আকুলতা, আলাপ- আলোচনা , প্রতিশ্র“তি ইত্যাদি সকল কর্মকান্ডই সংবাদ । রফিকুল ইসলাম খন্দকারের মতে, সুন্দর ও আকর্ষণীয় খবর লেখা শুরু করাটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ । কোনও রিপোর্ট ও ফিচার লিখতে গিয়ে সাংবাদিকরা এ সমস্যার মুখোমুখি হন একটি খবর অথবা ফিচারের শিরোনাম জুতসই হলে পাঠক আগ্রহভরে পড়তে চান ।