ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

১৭৯৩ সনের মার্চ মাসে কর্ণওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘোষণা করেন । এর অর্থ এই যে, এখন থেকে জমির একচেটিয়া জমির মালিক হবে জমিদার । রাইয়তগণ হবেন তাদের প্রজা । মালিক হিসাবে জমিদার জমি বিক্রি করতে , দান করতে যে কোন কাজে ব্যবহার করতে পারবে ; এজন্য সরকারে সন্মতি নিতে হবে না । প্রজার সঙ্গে তাদের দায় অধিকার নির্ধারণেও সরকারের কোন সন্মতি নিতে হবে না । সর্বোপরি দশসনা বন্দোবস্তকালে যে রাজস্ব ধার্য হয়েছে ভবিস্যতে তার আর পরিবর্তন হবে না , চিরস্থায়ী , চিরকালের জন্য তা স্থির বলে গৃহীত হবে । তবে শর্ত হলো এই যে, এখন থেকে জমিদারদের রাজস্ব কিস্তি নিয়মিত শোধ করতে হবে , নচেৎ জমি নিলামে বিক্রি করে বকেয়া রাজস্ব আদায় করতে হবে ।

পাঁচসনা ইজারাদারী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার অধিকাংশ জমিদার তাদের জমিদারী ব্যবস্থাপনা হতে বঞ্চিত হয় এবং তাদের স্থান দখল করে নতুন পূঁজিপতি, যাদের ইতিপূর্বে ভূমির সাথে সম্পর্ক ছিলো না । কোম্পানীর কর্মচারী ,মুৎসদ্দী , বানিয়ারা তাদের প্রভাব প্রয়োগ করে ইজারা লাভ করে । উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা তাদের ব্যক্তিগত বানিয়াদের নামে বেনামী ইজারা লাভ করে । এমনকি গভর্ণর জেনারেল হেন্টিংস পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত বানিয়াদের নামে লাখ লাখ টাকার ইজারা গ্রহণ করে । প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিতে বানিয়া- মুৎসদ্দীর অনুপ্রবেশ বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূত্রপাত করে । এই বানিয়া -মুৎসদ্দী শ্রেণীই ধীরে ধীরে স্থায়ী ভূম্যধিকারী শ্রেণীতে পরিণত হয় এবং আধুনিক বাংলার প্রথম কাতারের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সন্মান ও শক্তি লাভ করে ।

ইতিহাস পর্যালোচনায় পাওয়া যায়,চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর ভূম্যধিকারী সমাজে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে । চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কোন জরীপের উপর ভিত্তি করে সম্পন্ন হয়নি । ফলে অনেক জমিদারীতে সম্পদতিরিক্ত রাজস্ব ধার্য করা হয় , আবার অনেক জমিদারীতে সম্পদের চেয়ে অনেক কম রাজস্ব ধার্য করা হয় । ফলে অধিক রাজস্ব জর্জরিত জমিদারিগুলি অল্পকালের মধ্যেই সূর্যস্ত আইনে নিলামে বিক্রি হয়ে যায় । (ইংরেজ শাসনের প্রারম্ভকালে কর বা খাজনা সংগ্রহে ইংরেজগণ সূর্যস্ত আইন প্রবর্তন করেন। এক্ষেত্রে জমিদারকে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বিশেষ দিনে খাজনা পরিশোধ করে নতুন করে জমি পত্তন নিতে হন। ব্যর্থ হলে ইংরেজরা তা অন্য ইজারাদারদের দিত। লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ১৭৭৩ ইং এর পর এই প্রথার বিলোপ ঘটে)। বাংলার বড় বড় জমিদারীগুলিই সাধারণত: সূর্যস্ত আইনের শিকার হয়। । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকালে দেশের গোটা রাজস্বের প্রায় অর্ধেক রাজস্ব দিত ছয়টি বড় জমিদারী । এগুলি হচ্ছে , বর্ধমানের জমিদারী , নাটোরের জমিদারী, দিনাজপুরের জমিদারী , নদীয়ার জমিদারী , বীরভূমের জমিদারী ও বিষ্ণুপুরের জমিদারী । এসব বিশালাকার জমিদারদের মুগল সরকার রাজা, মহারাজা উপাধি দেন । এসব রাজাদের মধ্যে একমাত্র বর্ধমানের রাজা ছাড়া বাসী সবকটি রাজাই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রথম সাত বছরের মধ্যেই সম্পূর্নভাবে ধবংস হয়ে যান । পরবর্তীকালে জমিদার হিসাবে তাদের যে সত্বা থাকে তা পূর্ব আয়তনের ছায়া মাত্র । এসব জমিদারীগুলি যাদের কাছে হস্তান্তরিত হয় তাদের বেশীর ভাগই ছিল সরকার ও জমিদারদের কর্মচারী , বানিয়া –মুৎসদ্দি , ব্যবসায়ী , মহাজন ইত্যাদি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরে যে সব বড় বড় নতুন জমিদার পরিবারের আবির্ভাব হয় তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাশিমবাজার জমিদারী । এর প্রতিষ্ঠাতা কান্তবাবু ছিলেন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের ব্যক্তিগত বানিয়া । মুর্শিদাবাদের কান্দির জমিদারী এর প্রতিষ্ঠাতা গঙ্গা-গবিন্দ সিং ছিলেন হেস্টিংসের মুৎসদ্দি । যশোরের নড়াইলের জমিদারীর প্রতিষ্টাতা রামকৃষ্ণ রায় ছিলেন নাটোর জমিদারীর প্রধান গোমস্তা । ঢাকার খাজা পরিবার এর প্রতিষ্ঠাতা খাজা আলিমূল্লা (নবাব আব্দুল গনির পিতা) ছিলেন ব্যবসায়ী । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বদৌলতে আবির্ভূত এসব প্রকান্ড নতুন জমিদারেররা প্রত্যেকেই রাজা, মহারাজা বা নবাব উপাধি প্রাপ্ত হন ।