ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

উলিয়াম হান্টারের অনুসরণে অনেকে মনে করেন যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে মুসলমান জমিদার সব ধবংস হয়ে যায় এবং তাদের স্থান দখল করেন নব্য পুঁজিপতি । এই ধারণার ঐতিহাসিক যৌক্তিকতা নেই । মুগল আমল হতে ভূমি প্রশাসনে হিন্দুদের ছিল একচেটিয়া আধিপত্য , আর মুসলমানদের ছিল বিচার বিভাগে । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকালে ছয়টি বৃহৎ জমিদারীর মধ্যে একমাত্র বীরভূমের রাজা ছিলেন মুসলমান , বাকী সবাই হিন্দু । ক্ষুদ্র জমিদারদের মধ্যেও বেশীরভাগ ছিলেন হিন্দু । যে যৎসান্য জমিদার ছিলেন মুসলমান তাদের বেশীর ভাগই ছিলেন অতি ক্ষুদ্র এবং ক্ষুদ্র জমিদারগণ সূর্যাস্ত আইনে খুব কমই ক্ষতিগ্রস্থ হন । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ভূম্যধিকারী সমাজের গঠন ও মানসিকতায় যে পরিবর্তন আসে তার একটি বড় বৈশিষ্ট হচ্ছে জমিদারদের অনুপস্থিতি ও পর্যায়ক্রমে মধ্যস্বত্ব সৃষ্টি । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রথম ১০ বছরের মধ্যেই বাংলায় প্রায় অর্ধেক রাজস্বভূমি নতুন জমিদারদের হস্তগত হয় । এই নতুন জমিদারদের অনেকেই শহরে বসবাস করে পুরাতন ব্যবসায় লিপ্ত থাকে । জমিদারী কার্য পরিচালিত হয় স্থানীয় নায়েব গোমস্তা কর্তৃক । জমিদারী পরিচালনার ঝামেলা এড়ানোর জন্য অধিকাংশ অনুপস্থিত নব্য জমিদার নানা রকমের মধ্যস্বত্বা প্রথা সৃষ্টি করে । মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণীর উদ্ভব বাংলার গ্রামীন সমাজের এক নতুন সমস্যা ।কৃষকের সঙ্গে জমিদারের সরাসরি সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় । শুধু জমিদারদের সঙ্গেই সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি । মধ্যস্বত্বভোগীদের অনেকে পাতি মধ্যস্বত্ব সৃষ্টি করে নিজে অনুপস্থিত হয়ে যায় । এমনিভাবে কৃষক ও জমিদারদের মধ্যে মধ্যস্বত্ব শ্রেণীর কয়েকটি স্তর সৃষ্টি হয় ।
সমাজ বিন্যাসে সৃষ্টি হয় নতুন স্তর , নতুন সমস্যা । এককথায় বৃটিশ শাসনের ভুমি ব্যবস্থার ফলে প্রচলিত ভূম্যধিকারী সমাজে যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন দেখা দেয় তার প্রতিক্রিয়া শুধু ভূ-পতিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি । উৎপাদনের ক্ষেত্রে , সমাজ বিন্যাসে , আচার উৎসব ও চিন্তাধারায় সর্বত্র অনূভূত হয় বৃটিশ ব্যবস্থার সুদূর প্রসারী প্রভাব ।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে রায়ত ভূমিতে তাদের স্বত্ব হারায় । মুগল আমলে যারা ছিল স্থায়ী আবাসিক রায়ত , ভূমিতে তাদের স্থায়ী অধিকার ছিল । কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আইনে জমিদার হয় জমির একমাত্র মালিক এবং রায়ত পরিণত হয় জমিদারের ইচ্ছাধীন প্রজায় । মুগল শাসনতন্ত্রে জমিদারের পক্ষে খাজনা বৃদ্ধি করা বা রায়তকে তার জমি হতে উৎখাত করা ছিল প্রায় অসম্ভব ।প্রত্যেক পরগনার জন্য ভূমির গুণ অনুয়ায়ী খাজনার হার নির্দিষ্ট করা ছিল । সেই নির্দিষ্ট হার ছিল পরগনা নিরিখ নামে পরিচিত । পরগনা নিরিখের অতিরিক্ত খাজনা ধার্য করা জমিদারদের কাছে ছিল কঠিন । কিন্তু চিরস্থাযী বন্দোবস্ত জমিদারকে জমির একমাত্র মালিক বলে ঘোষনা করে এবং ইচ্ছেমতো খাজনা বৃদ্ধি করার ক্ষমতা জমিদার লাভ করে । জমি এখন জমিদারদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি । পূর্বেকার স্বত্বাধীকারী রায়ত এখন জমিদারদের ইচ্ছাধীন প্রজা । উনবিংশ শতকের শুরু হতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে । ফলে জমির উপরে জনসংখ্যার চাপ বৃদ্ধি পায় । এই সুযোগে জমিদারগণ ইচ্ছেমতো খাজনা বৃদ্ধি করতে থাকে । মাটিতে প্রজাদের অধিকার না থাকায় জমিদারদের বর্ধিত খাজনা দিতে আপত্তি করে তাদের উপর চলে নির্মম নির্যাতন ও নিষ্পেষণ । উনবিংশ শতকের তিন দশক পরে যে দেশময় কৃষক অসন্তোষ দেখা দেয় তা জমিদার শ্রেণী কর্তৃক অত্যাচার ও শোষণ প্রক্রিয়ারই ফল । অনেকে মনে করেন যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষির সম্প্রসারণ ঘটে । তাদের মতে জমিদার কর্তৃক দেয় সরকারী রাজস্ব যেহেতু ছিল চিরস্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় , আর যেহেতু সরকারী রাজস্বের উপরে সমস্ত আয়ের অধিকারী ছিল জমিদার একা, সেহেতু জমিদারগণ অর্থনৈতিক কারণেই কৃষির সম্প্রসারণ করে আয় বৃদ্ধি কারার চেষ্টা করে । পতিত ও পারিপার্শ্বিক অরন্য আবাদ করার চেষ্টা করে । এ কথা ঠিক যে উনবিংশ শতকে কৃষির সম্প্রসারণ ঘটে । চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় বাংলার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জমি জংঙ্গলাকীর্ন ছিল বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে । কিন্তু উনবিংশ শতকের তৃতীয় দশক নাগাদ এই অনাবাল জঙ্গল পরিবেশ আমরা লক্ষ করিনা । এর কারণ কৃষির ব্যাপক সম্প্রসারণ । এসময়ে নানা রকম অর্থকরী ফসল ( রেশম, নীল, পাট, আখ, তামাক, চা প্রর্ভতি) ব্যাপক বৃদ্ধি পায় । এই সম্প্রসারণের জন্য দায়ী বাড়তি লোকসংখ্যা , জমিদারের সক্রীয় প্রচেষ্টা নয় । ১৮৭৩ সনে যে কৃষকের কল্যাণের জন্য চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু হয়েছিলো পরবর্তীকালে সে কৃষকরাই জমিদারদের দয়ার উপর সম্পূর্নভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে । কৃষকরা খাজনাদাতা প্রজা হওয়ায় তারা ভূমি হতে যে কোন সময় উচ্ছেদযোগ্য ছিলো। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের ৭ম অনুচ্ছেদে রায়ত ও চাষীদের স্বার্থ রক্ষা , নিরাপত্তা ও কল্যাণের জন্য সরকার যখনই মনে করবেন তখনই অনুরূপ আইন বা বিধি প্রণয়ন করতে পারবেন বলে উল্লেখ থাকা সত্বেও ৫৬ বছরের মধ্যে সরকার চাষীদের কল্যাণে এরূপ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই । এই গুরুতর পরিস্থিতিতে ১৮৫৯ সালে বেঙ্গল ল্যান্ড আ্যাক্ট দ্বারা কৃষকগণের সামান্য স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গৃহীত হয় এবং পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৮৮৫ সালে বিখ্যাত বেঙ্গল টেন্যান্সি আ্যাক্ট পাশ করা হয় এবং এর দ্বারা কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ আরও সুদৃঢ় করা হয় ।

পরবর্তীকালে বৃটিশ সরকার এদেশ হতে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করা যুক্তসঙ্গত হবে কি-না পরীক্ষা করে রিপোর্ট প্রদানের জন্য ১৯৩৮ সালে স্যার ফ্রান্সীস ফ্লাউডকে চেয়ারম্যান করে একটি কমিশন নিয়োগ করেন । ফ্লাউড কমিশন বহু পরীক্ষা -নিরিক্ষার পর রিপোর্ট দেন যে , ১৭৯৩ সনে যে উদ্দেশ্যেই জমিদারী প্রথা চালু করা হউক না কেন এখন সেটা সম্পূর্নভাবে অচল এবং এই ব্যবস্থা জাতীয় স্বার্থের সম্পূর্ন পরিপন্থী । এটি অবিলম্বে উচ্ছেদ করা একান্ত আবশ্যক । ১৯৪৫ সনের বেঙ্গল এডমিনিস্ট্রিশন এনকোয়ারী কমিটিও অনুরূপ অভিমত প্রকাশ করেন । দীর্ঘকাল অপেক্ষা করার পর ১৯৪৭ সনে তৎকালীন বাংলার সরকার উক্ত সুপারিশ গ্রহণ করে ঐ বৎসরের ১০ই এপ্রিল তারিখে বেঙ্গল স্টেট একুইজিশন এন্ড টেন্যান্সী বিল, ১৯৪৭ , সিলেক্ট কমিটিতে প্রেরণ করেন । কিন্তু ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের স্বাধীনতা প্রদানের জন্য ক্ষমতা হস্তান্তরের ফলে এটি তখন বাস্তবায়িত হতে পারে নাই । অত:পর জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের জন্য সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সরকার ১৯৫০ সনে ১৬:ফেব্র“য়ারী তারিখে জমিদারী দখল ও প্রজাস্বত্ব আইন ( ইস্ট বেঙ্গল স্টেট একুইজিশন এন্ড আ্যাক্ট , ১৯৫০ ) পাশ করেন এবং ১৬ই মে , ১৯৫১ ইং তারিখে গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে আ্যাক্ট নং ২৮/১৯৫১ জারী করে। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন । প্রথম দিকে সরকার কয়েকটি বড় বড় জমিদারী দখল নেন এবং ১৪ই এপ্রিল ১৯৫৬ তারিখ মোতাবেক ১লা বৈশাখ ১৩৬৩ বাংলা হতে উক্ত আ্যাক্টের ৩ ধারা বলে দেশের সকল জমিদারী অধিগ্রহনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ।