ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

প্রতিদিনের মত সেদিনও স্কুলে ইতিহাসের ক্লাস নিচ্ছিলেন চিত্ত রঞ্জন দে। হঠাৎ গুলির শব্দে ক্লাসের ছাত্ররা ভোদৌড় । ছাত্ররাই যখন ক্লাসে নেই আমি বসে থেকে কি করব এই ভেবে চিত্তবাবু ফিরে আসলেন নিজ বাড়িতে । বাড়িতে এসে দেখেন স্কুলের ছাত্রদের মত অপরাপর সরিকরাও যে যার মতো দৌড়া-দৌড়ি শুরু করেছেন । এসময় বাড়ির বাইরে অবস্থিত কিছু লোকের চিৎকারে চিত্তবাবু ও পরিবারের অপরাপর সদস্যরা আতংকিত হয়ে উঠলেন। চিৎকারকারীরা বলছে , সালা মালুর বাচ্চা বাইরে আয় । আজ তগরে জব করাম। ঘটনাটি ঘটেছিলো ১৯৭১ সালে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দাপুনিয়া গ্রামে । পাকিস্তানের দোষর আলবদর ও রাজাকারের ঐ হুমকীতে ভীত সন্তস্ত্র হয়ে চিত্ত রঞ্জন তার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ির পেছনের জঙ্গল দিয়ে পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে সেই যে পলায়ন করলেন আর ফিরলেন না । আশ্রয় নিলেন ভারতে । ভারতের একটি জেলায় সরকারী স্কুলের শিক্ষক হিসাবে যোগ দিলেন । তিলে তিলে জীবনযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে প্রতিষ্টিত হলেন ভারতে। বাড়ি হলো ,ঘড় হলো , ছেলে- মেয়েরা শিক্ষিত হলো । তাদের বিয়ে হলো । একমাত্র পুত্র হলো চা বাগানের ম্যানেজার । এতো কিছুর পরও সুখ নেই চিত্ত বাবুর মনে । দিন রাত কানে বাজে মৃত্যুকালে বাবার কথা । বাবা বলেছিলেন, চিত্ত আমার মৃত্যুর পর বাপ দাদুর ভিটা জমিজমাগুলি বুক দিয়ে আগলে রাখিস । আমি তোর দাদু সারাজীবন যেভাবে আগলে রেখেছি । বাবা এও বলেছিলো , মনে রাখিস বাপ দাদার ভিটা ধরে রাখতে না পারলে পূর্বপুরুষদের আত্না কষ্ট পায়। চিত্তবাবু আগের মতো চলতে ফিরতে পারেন না । ৭৩ বছর বয়সের ভাড়ে ন্যূজ পড়েছে দেহে । আজ সব আছে তারপরও নেই মনে সুখ । মরার আগে বাবার কথা খুব মনে পড়ে । বাংলাদেশে ফেলে আসা জমি-জমাগুলির যদি একটা ব্যবস্থা হতো । কিন্তু দেশে গেলে তো ঐ হুমকিদাতারা মেরে ফেলবে। আজো কাটেনি সেই আতংক। ২০১১ সালে চিত্তবাবুর এক নিকট আত্নীয় বাংলাদেশ থেকে বেড়াতে ভারতে গিয়েছিলেন । ভারতে ঐ আত্নীয়র সাথে দেখা হয় চিত্তবাবুর । দেশের মানুষ পেয়ে মনের ব্যাথা দু:খের কথা ভাগ করেন । বিস্তারিত শুনে আত্নীয়র নিকট থেকে পান আশার বাণী । বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশে ফেলে রাখা হিন্দুদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। শুধু তাই নয় হাসিনা সরকারের আমলে হিন্দুরা বীরদর্পে চলাফেরা করতে পারছেন । একথা শুনে তড়িঘড়ি পাসপোর্ট ভিসা করে কয়েক মাসের মধ্যেই সস্ত্রীক বাংলাদেশে আসলেন চিত্তবাবু । নিকট এক আত্নীয়কে নিয়ে নিজের জমি জমাগুলি ঘুরে দেখলেন । সব জমিই তো আগের মতো আছে । পরিবর্তন এই, নিজ ভিটায় অবস্থান করছে অন্যলোক । এদৃশ্য দেখে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন চিত্তবাবু । চিত্তবাবুর জমির পরিমাণনেহায়েৎ কম নয় । প্রায় ১০ একর । বর্তমান বাজারে যার দাম কম করে হলেও ২০ কোটি টাকা । চিত্তবাবু আত্নীয়কে বললেন , ২/৪ লাখ টাকা যাই পাওয়া যায় এজমি বিক্রির ব্যবস্থা কর। বাপ দাদার আত্নার শান্তি চাই । আত্নীয়কে সাথে নিয়ে নিকটবর্তী ভূমি অফিসে গিয়ে তহসিলদারের মাধ্যমে দেখতে পান – আর,ও,আর খতিয়ানে জমির মালিক এখনও চিত্তবাবু । কিন্তু তৎপরবর্তীতে জমিগুলি অর্পিত ((Vested and non-Resident Property)তালিকাভূক্ত হয়েছে । তহসিলদার বললেন, ভিপি তালিকায় আপনার নাম থাকলেও জমিগুলি কে বা কারা মিউটেশন করে নিয়ে গেছে । অনেক খোজাখোজি করেও পাওয়া গেলো না মিউটেশনকারীদের হোল্ডিং নং । পাতাগুলি কে বা কারা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে । চিত্তবাবু মনে আরও ব্যথা নিয়ে ফিরে গেলেন পরবাস যা আজ তার নিজ দেশ । এখনও প্রতিক্ষা করেন ঐ আত্নীয়র ফোনের । ফোনে কবে শুনবেন, আসুন আপনার জমি বিক্রি হবে ………..