ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ভগবান এক ও নিরাকার, কিন্তু তার অনন্ত বিভূতি ও শক্তি । ভগবানের বিভূতির পরিচয় জানতে হলে দেবতাকে স্বীকার করতে হয় । দেবতারা হলেন অদ্বৈত ঈশ্বরের এক একটা অঙ্গ, যেমন কোন দেহের অংশ হলো হাত, পা, চোখ, কান প্রভৃতি । ঈম্বরের শক্তির কোন ধারণাই আমরা সাধারণ ভাবে করতে পারি না ! কিন্তু এক একজন দেবতার মধ্যে ঈম্বরের শক্তিকে ধারণা করা যায় । যেমন, ঈম্বরের বিদ্যা শক্তি আছে সরস্বতী দেবীর মধ্যে , দাহিকা শক্তি আছে অগ্নির মধ্যে প্রকৃত পক্ষে সকল দেবতার আধার হলেন ঈশ্বর ।

বেদে ও পূরাণে, বিভিন্ন ধর্ম গ্রন্থে ও লোকের চিন্তা – ধারায় বহু দেবতার কথা বলা হয়েছে ।
কোন তত্বে চিত্ত স্থির না হলে আতœবোধ জন্মে না । নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসনায় মন স্থির করার জন্য প্রতীক উপাসনা আর্থাৎ যা ব্রহ্ম নয় তাকে ব্রহ্ম বলে ভাবনা করার ব্যবস্থা আছে । যথা আদিত্যো ব্রহ্ম ইত্যুপাসীত । আদিত্যকে ব্রহ্ম রূপে উপাসনা কর । সগুণ ব্রহ্ম ভিন্ন ভক্তিমূলক উপাসনা সম্ভব নয় । তাই ক্রমে রুদ্র , বিষ্ণু প্রভৃতি বৈদিক দেবগণও ব্রহ্মের প্রতীকরূপে কথিত হন । এবং কোন কোন উপনিষদে রুদ্র বিষ্ণু প্রভৃতি দেবগণ পরমাতœার রূপ- একথা স্পষ্ট উল্লেখিত ।

দেবতাদের সৃষ্টি হলো কিভাবে? পূরাণে আছে , পরমেশ্বরের ইচ্ছায় ও তার লীলা প্রকাশের বাসনায় দেবতাদের সৃষ্টি হয়েছে । পরমেশ্বর মহা বিষ্ণুই লীলার জন্য তিন ভাগে ভাগ হয়েছেন -ব্রহ্মা , বিষ্ণু ও মহেশ্বর । বিষ্ণু পূরাণে আছে – পর ব্রহ্মের প্রথম অংশ ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা রূপে সকল কিছু সৃষ্টি করে তৃতীয় বারে দেবতাদের সৃষ্টি করলেন । দেবতারা জ্যোতিষ্মান , দীপ্তিমন্ত । দেবতারা প্রদানত: স্বর্গবাসী , পৃথিবীতেও তাদের অবস্থান আছে । দেবতারা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী । মানুষ যা করতে পারে না দেবতারা তা করতে পারেন ।

শাস্ত্রে আছে – ন চ দৈবাৎ পরং বলম্ – দৈবশক্তির কাছে অন্য কিছু শক্তি শক্তিই নয় । তবে দেবতাদের জ্যোতি: ভগবানেরই জ্যোতি: তাদের শক্তি পরমেশ্বরের শক্তি । শাস্ত্রে বলে- তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বম্ । তোমার আলোকে সবাই আলোকিত । এক এক দেবতার বিশেষ বিশেষ গুণ রয়েছে – আরোগ্য ভাস্করাদিচ্ছেৎ ধনমিচ্ছেৎ হুতাশনাৎ । জ্ঞানঞ্চ শঙ্করাদিচ্ছেৎ মুক্তিমিচ্ছেৎ জনার্দ্দনাৎ । এর সরলার্থ হল- সূর্য ইচ্ছা করলে রোগ সারাতে পারেন, অগ্নি পারেন ধন দিতে । মহাদেব কৃপা করলে জ্ঞান লাভ হয় আর নারায়ণ কৃপা করলে মুক্তি প্রদান করতে পারেন । বেদেই প্রথম দেবতাদের কথা বলা হয়েছে । বেদের ঋষিরা মনে করতেন ভগবানের শক্তিগুলি প্রকৃতির মধ্যে রূপ লাভ করেছে । তাই ঋষিরা সুন্দর , ভয়ানক , অদ্ভূত ও শক্তিমান প্রকৃতির রূপকে দেব বা দেবী রূপে কল্পনা করতেন । সাধারণভাবে মরুৎ – ঝড়ের দেবতা বাদে দেবতাদের সংখ্যা হলো তেত্রিশ । কিন্তু যাস্ক প্রভৃতি নিরুক্তকারদের মতে বৈদিক দেবতা মাত্র তিনজন -অগ্নি , ইন্দ্র ও সূর্য । তবে পুরাণে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর কথা বলা হয়েছে । বেদের দেবতাদের জন্ম আছে , পৌর্বাপর্য আছে । এক দেবতার থেকে আরেক দেবতার জন্ম আছে । হয়ত তাদের দোন্তরও ছিল কিন্তু অমৃত অথবা সোমরস পান করে তারা অমর হন । অনেক বিষয়ে মানুষের সাথে দেবতাদের মিল দেখা যায় । কারণ অনেক দেবতা আবার মানুষ থেকে জন্মেছেন । তাই আহার- বিহার , যান-বাহন বসন- ভূষণ প্রভৃতি ব্যাপারে অনেক দেবতা মানুষের কাছাকাছি । পার্থক্য এই যে দেবতারা বিশেষ বিশেষ শক্তির অধিকারী । তারা জগৎ জীবন ও প্রকৃতির অনেকাংশের মালিক বা হর্তা- কর্তা । দেবতারা সত্যাশ্রিত , আবার ছলনাময় । তারা অকল্যাণকে জয় ও কল্যাণকে হরণ করতে পারেন । মানুষের কামনা বাসনা , স্বর্গ প্রভৃতি অনেকটা দেবতাদের অনুগ্রহ বা ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল । মোটকথা , দেবতাদের বৈশিষ্ট্য হল- তারা উজ্জ্বল , ক্রীড়ামগ্ন , জ্ঞানময় ও মঙ্গলময় । প্রধান প্রধান দেব- যথা ইন্দ্র , বিষ্ণু , রুদ্র, যম, চন্দ্র, বরুণ, অগ্নি, অশ্বিনীকুমার দ্বয়, বিবস্বান্ , মরুৎ, প্রভৃতি । ঋগে¦দে স্ত্রী দেবতার প্রাধান্য নেই তবু প্রধান দেবীর নাম উষা, সরস্বতী , পৃথিবী , রাত্রি, অরণ্যানী প্রভৃতি নারী দেবতার কথা ছাড়াও দিতি, ইলা, লক্ষী, ভারতী , ইদ্রানী , সূর্য , রাকা, সিনীবালী, গুঙ্গু , নিষ্ঠিগ্রী , সীতা, সরণ্যু , যমী, সরমা, বরুণানী, পৃশ্নি , আগ্নেয়ী, আদিতি প্রভৃতির উল্লেখ আছে ।

***

ভগবান ঈশ্বর দেবদেবী হিন্দু (২)