ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

nandi

ছবি : মুক্তাগাছার বিশ্বজিৎ নন্দী

বঙ্গবন্ধু হত্যার একবছর পর প্রতিবাদ ও প্রতিরোধকারীদের খবর কেউ রাখে না । জানা যায় ,১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর ১৯৭৬ সালের ১৮ আগস্ট প্রতিবাদ ও প্রতিরোধকারী মুক্তাগাছার ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন । ১৯৭৬ সালের ১৮ আগস্ট মুক্তাগাছার মুক্তিযোদ্ধা জবেদ আলী , নিখিল দত্ত, সুবোধ ধর, দিপাল দাস, মফিজ উদ্দিন এবং বিশ্বজিৎ নন্দীর নেতৃত্বে ময়মনসিংহ- উত্তরবঙ্গ সড়কের মুক্তাগাছার ঘোগা ইউনিয়নের বানার নদীতে প্রতিষ্ঠিত সেতু ভেঙ্গে ফেলা হয় । উদ্দেশ্য , এপথে সেনাবাহিনী প্রবেশ করতে না পারে ।

এরপর তারা আশ্রয় নেন কাশিমপুর ইউনিয়নের মহিষতারা গ্রামের মকবুল চেয়ারম্যানের বাড়িতে। সেখানে স্থানীয় এক বিডিআর সদস্যে দেখিয়ে দেয়া পথে সেনা বাহিনী অভিযান চালায়।এতে মুক্তিযোদ্ধকালীন কোম্পানি কমান্ডার জয়দা গ্রামের জবেদ আলী ও অপর ৪ মুক্তিযোদ্ধা নিখিল দত্ত, সুবোধ ধর, দিপাল দাস ও মফিজ উদ্দিন নির্মমভাবে নিহত হন। গুরুতর আহত অবস্থায় আটক করা হয় আরেক মুক্তিযোদ্ধা বিশ্বজিৎ নন্দীকে। পরে তৎকালীন সরকার বিশ্বজিৎ নন্দীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। তখন বিশ্বজিৎ নন্দীর মুক্তির আন্দোলন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধিসহ বিশ্ব নেতাদের চাপের মুখে সেনা সরকার তখন বিশ্বজিতের মৃত্যুদন্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

বেঁচে যাওয়া বিশ্বজিৎ নন্দী ফাঁসির মঞ্চে যান । পুলিশ, বিডিআর ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামেন এ দুঃসাহসী যোদ্ধা। কিন্তু বড় রকমের একটি অভিযান চালানোর প্রস্তুতিকালে পাঁচ সহযোদ্ধাসহ বিশ্বজিৎকে ঘিরে ফেলে সেনাবাহিনী। শুরু হয় বন্দুকযুদ্ধ।

টানা আট ঘণ্টার সশস্ত্র যুদ্ধে সহযোদ্ধা জুবেদ আলী, সুবোধ ধর, দীপাল দাস, মফিজ উদ্দিন ও নিখিল নিহত হন, গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় গ্রেফতার হন বিশ্বজিৎ। এরপর প্রায় পাঁচ মাস একটানা সেনা হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের নামে অন্ধকার কুঠুরিতে রেখে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তার উপর নানা বর্বরতা চালায়। সত্তর দশকের উত্তাল রাজনীতিতে আকৃষ্ট বিশ্বজিৎ নন্দী স্কুল জীবনেই বঙ্গবন্ধুর কঠিন ভক্ত হয়ে উঠেন।

তিনি অংশ নেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীন দেশে যখন আবার নিশ্চিন্ত মনে লেখাপড়ায় মনোযোগী হয়েছেন, ঠিক তখনই সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড তাকে বিচলিত করে তোলে। বিশ্বজিৎ বলেন, ‘আমরা মুজিবভক্তরা কোনোভাবেই এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারছিলাম না। সন্তানের সামনে বাবার রক্তাক্ত লাশ…আমার জীবনের সবকিছু যেন উল্টেপাল্টে দিল।’

তিনি জানান, ওই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে মুজিবভক্তরা অস্ত্র হাতে তুলে নেন- গঠন করেন জাতীয় মুক্তিবাহিনী নামের সংগঠন। ময়মনসিংহের সীমান্ত এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে শুরু হয় সশস্ত্র আন্দোলন। সেখানে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর তত্ত্বাবধানে সক্রিয় যুদ্ধে অংশ নেন বিশ্বজিৎ নন্দী।

বিশ্বজিৎ নন্দী বলেন, ‘বন্দিত্বের দিনগুলো ছিল দুর্বিষহ। ময়মনসিংহ হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে নেওয়া হয় সেনাক্যাম্পে। সেখানে ধারাবাহিক নির্যাতনের পর তুলে দেওয়া হয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে। ১১৫ দিন নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চলে।

১৯৭৬ সালের ১৪ আগস্ট মুক্তাগাছা এলাকায় সশস্ত্র অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটকের পর ১৯৭৭ সালের ১৮ মে সামরিক আদালতে মাত্র ১৯ বছরের কিশোর গেরিলা যোদ্ধা বিশ্বজিতের ফাঁসির দণ্ড ঘোষণা হয়। তাঁকে রাখা হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে। এই ফাঁসির সেলের বিভিন্ন কক্ষে বিশ্বজিৎ নন্দীর কাটে সাত বছরের দুর্বিষহ জীবন। সামরিক আদালতের রায়ের ব্যাপারে তখন আপিল অথবা রিভিউর সুযোগ ছিল না।

বিশ্বজিৎ নন্দীর বাবা রাষ্ট্রপতির কাছে ছেলের প্রাণভিক্ষা চাইলেও তা ঝুলে থাকে। এ কারণে নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতীক্ষা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না এই কিশোর যোদ্ধার। চার দফা তার ফাঁসি কার্যকরের চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েও তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জোরালো প্রতিবাদের কারণে বেঁচে থাকেন বিশ্বজিৎ।

১৯৮৪ সালেই বিশ্বজিৎ নন্দীর ফাঁসির রায় মওকুফ করে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। কনডেম সেল থেকে তখন তাঁকে স্থানান্তর করা হয় অন্য সেলে। এরপর সব আইনি প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে ১৯৮৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্ত হন।