ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

মুক্তাগাছায় সাপের কামড়ে ছাত্রীর মৃত্যু

সাপের কামড়ে মত্যৃুর ঘটনা নতুন কিছু নয় । কিন্তু যখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কারো মৃত্যু হয় সেটা কিছুটা হলেও অস্বাভাবিক ।

জানা যায়, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় সাপের কামড়ে শাম্মী আক্তার (১৩) নামের এক স্কুল ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে । আজ রবিবার সকালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যু হয় ।

শাম্মী আক্তার মুক্তাগাছার নগেন্দ্র নারায়ণ (এনএন) পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছাত্রী ছিলেন। তিনি মুক্তাগাছার কাঁচ ব্যবসায়ী উপজেলার বাঁশাটি ইউনিয়নের জয়দা গ্রামের সোহেলের মেয়ে ।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গতকাল শনিবার রাত ৮ টার দিকে নিজ বাড়ি থেকে পাশ্ববর্তী প্রতিবেশীর বাড়িতে টেলিভিশন দেখতে যাওয়ার সময় বিষধর একটি সাপ তাকে কামড় দেয় ।পরে তাকে প্রথমে মুক্তাগাছা উপজেলা হাসপাতাল ও পরে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় ।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ রবিবার সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন শাম্মী আক্তার।

বিশেষঞ্জ চিকিৎসক সূত্রে জানা যায়, সাপে কাটা রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমেই যেটা করতে হবে সেটা হল রোগীকে সাহস যোগানো, সাহস জোগিয়ে রাখতে পারলে ৫০% বলে দেওয়া সম্বভ এই রোগী খুভ তাড়া তাড়ি মরতে পারেনা এবং ৯৭% নিশ্চয়তা দেওয়া সম্বভ যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করেন। যে হাতে বা পায়ে কামড় দিয়েছে তা স্থির করে রাখা। যদি পায়ে কামড় দেয় তাহলে হাটা নিষেধ। আর যদি হাতে কামড় দেয় তাহলে রোগীর ওই হাত নাড়ানো যাবে না। কামড়ের বুঝে বাঁধন দিন ( প্রেশার ইমোবিলাইযেশন মেথড অনুসরণ করে ক্রেপ ব্যান্ডেজও ব্যবহার করতে পারেন ) কামড়ের স্হান বুঝে বাঁধন দিন,তবে মনে রখতে হবে,ক্ষতস্থান থেকে কিছুটা উপরে বাঁধন দিতে হবে। ( আক্রমনের সময় রোগীর আসে পাশে যদি কেউ না থাকেন এবং রোগীর হুশ থাকে তা হলে তিনি নিজে নিজেই যদি হাতের কাছে গামছা পাওয়া যায় তাহলে গামছা দিয়ে জায়গাটা বেঁধে ফেলবেন তবে অজগর কামড় দিলে এ কাজ করা যাবে না )। আর বাঁধন এমন ভাবে দিতে হবে,যাতে বাঁধনের মাঝখান দিয়ে একটি আঙুল ঢুকানো যায়।

খেয়াল রাখতে হবে কোনভাবেই যেন রক্ত চলাচল সম্পূর্ন বন্ধ না হয়ে যায় এবং ২০ মিনিট অন্তর ২/৩ মিনিটের জন্য বাধন খুলে দিতে হবে অথবা চাপ দিয়ে ব্যান্ডেজ করুণ এমনভাবে যাতে শিরার রক্ত চলাচলকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় , চেস্টা করবেন যাতে বিষ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, আবার রক্ত চলাচলও বন্ধ না হয়। প্রয়োজনবোধে প্রথম ব্যান্ডেজের উপর দ্বিতীয় আরেকটি ব্যান্ডেজ করা যেতে পারে। ব্যান্ডেজের উপরে দংশন স্থানটিকে চিহ্নিত করতে ভুলে যাবেন না। । যে পায়ে বা হাতে সাপ দংশন করেছে, সেই পা বা হাতে, নিকটে যা কিছু পাওয়া যায়, সেটাকেই স্প্লিন্ট বানিয়ে এমনভাবে লাগাতে হবে যাতে নড়াচড়া করতে না পারে। । খেয়াল রাখবেন রোগী যেন বেশী নড়াচড়া না করে অন্তত কামড়ানোর স্হানটি যেন স্হির থাকে,এতে বিষ রক্তে মিশবে কম । রোগী বমি করলে শ্বাসকার্যে ব্যাঘাতের দিকে লক্ষ রেখে উপুড় করে শোয়াতে হবে এবং যত তাড়া তাড়ি সম্বভ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যাবস্থা করতে হবে যতক্ষন চিকিৎসার পূর্ণ ব্যাবস্থা না হচ্ছে ততক্ষণ যা করা দরকার, তা হল:সাবান জল দিয়ে ক্ষতস্থানটা ধুয়ে ফেলা–শরীরের যে অংশে সাপ কমড়েছে সেটা যতটা সম্ভব স্থির করে রাখা।–ক্ষতস্থানটা পরিস্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। বা সাপ টিকে চিনে রাখতে পারলে আর ও ভাল সুবিধা হবে চিকিৎসকের জন্য বা নিশ্চিত হয়ে এন্টিভেমন ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করতে পারবেন ।

ক্ষতস্থানে বরফ চাপা দেয়া ঠিক না,কারন অনেকক্ষন বরফ চাপা দিয়ে রাখলে টিস্যুর ক্ষতি হয় এবং পরবর্তীতে এন্টিভেনম দিলে তা ক্ষতস্থানে ঠিকমত ঢুকতে পারে না ফলে আক্রান্ত জায়গা পচার সম্বাভনা থাকবেই । সর্বশেষ আবিষ্কৃত নাকের স্প্রে neostigmine নাকের মধ্যে প্রয়োগ করলে সাপের বিষ সারা শরীরে যেতে ৮/১০ ঘণ্টা দেরি হয় বিধায় গ্রামে গঞ্জের রোগিদের জন্য অত্তান্ত ভাল একটি খবর বলা যায় এবং তার ভিতরেই হাসপাতালে এন্টিভেনমের জন্য পৌঁছানো সম্বভ ।

এখানে আরেক টি বিষয় করলে সময় অনেক টা রোগীকে তাড়া তাড়ি বাঁচানো সম্বভ, যেমন যে হাসপাতালে যাবেন সেই হাসপাতালে এন্টি ভ্যাক্সিন , এন্টিভেনমের মজুত আছে কি না ( সাপে কাটার সবচেয়ে গুরুত্ব পূর্ণ ঔষধ, জানার জন্য নিচে বিস্থারিত দেওয়া আছে ) যদি থানা হাসপাতালে এর মজুত না থাকে তা হলে বিভাগীয় হাসপাতালে মজুত থাকা নিয়ম নতুবা অনেক সময় আকাকঙ্কিত প্রত্যাশা পূর্ণ না ও হতে পারে । কারন বিষাক্ত সাপে ধংশনের প্রধান ঔষধ ই হচ্ছে এই এন্টিভেনম ইঞ্জেকশন ।

গ্রামিন জনপদে কিছু ভুল ধারনা জাতীয় চিকিৎসা করার ব্যাবস্থা করেন, তা থেকে বিরত থাকা উচিৎ যেমন -আক্রান্ত স্থানের ওপর এবং আশে পাশে ব্লেড দিয়ে কেটে দেয়া-মুখে করে বিষাক্ত রক্ত বের করার চেষ্টা করা– আক্রান্ত স্থান কার্বলিক এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া বা গরম রড দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার চেস্টা করা ( এতে বিষাক্ত বিষ সারা শরীরে পচনের সৃষ্টি করতে পারে ) -কামড়ের জায়গায় থুথু, ঘাসের রস বা কামড়ের জায়গায় গোবর বা মাটি দেয়া আক্রান্ত জায়গায় কাঁচা ডিম, চুন, কিছুই লাগাবেন না। এতে সেল্যুলাইটিস বা ইনফেকশন হয়ে রোগীর জীবনহানি ঘটতে পারে ।
যা করা উচিত : প্রথমেই সাপে কামড়ানো রোগীকে আশ্বস্ত করতে হবে যে তার কোনো বিপদ হবে না। উত্তেজনায় রোগীর হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। এতে বিষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রোগীকে এমনভাবে শোয়াতে হবে যেন কামড়ের স্থান হৃদযন্ত্র বরাবর কিছুটা নিচের দিকে থাকে। দেহের আঁটোসাঁটো পোশাক, অলংকার ইত্যাদি খুলে ফেলুন। কামড়ের ওপর দিকে একটি ফিতা বা রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলুন। বিষক্রিয়ায় রোগীর হৃদস্পন্দন অনেক সময় বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। সে ক্ষেত্রে সিপিআর দিন। অর্থাৎ, কেউ পানিতে ডুবে গেলে বা অন্য কোনো শকে আক্রান্তকে শুইয়ে বুকে দুই হাত দিয়ে চাপ দিতে থাকুন। এভাবে হার হৃদযন্ত্র সচল করে ফেলুন। হাসপাতাল দূরের পথ হলে ফোন দিয়ে বিষ নিস্ক্রিয়করণের কোনো ওষুধের নাম শুনে তা প্রয়োগের চেষ্টা করুন।

সাপের কামড় বিষয়ে ভারতের বিজে মেডিক্যাল কলেজের সর্প বিশেষজ্ঞ ড. ভিজে মুরালিধরযার পরামর্শ হচ্ছে ,
কামড়ের স্থান সাবান দিয়ে ধোবেন না। আক্রান্ত স্থানের আশপাশে কেটে রক্ত বের করবেন না। ইলেকট্রিক শক দেবেন না। ঠাণ্ডা পানি বা বরফ কামড়ের স্থানে ধরবেন না। বড় বিষয়টি হলো, সে সাপ কামড়েছে তাকে ধরে মারার পেছনে সময় নষ্ট করবেন না। আক্রান্তকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ুন। রোগীকে পানি বা কোনো ধরনের পানীয় পান করাবেন না। সাপের বিষক্রিয়া দূর করতে এভিএস অ্যান্টডোট ব্যবহার করা হয়। এভিএস এর আবার মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। এতে মধ্যম থেকে মারাত্মক অ্যালার্জির সৃষ্টি হয় যাকে অ্যানাফাইল্যাক্সিস বলে। কাজেই দেহে এভিএস প্রয়োগ করার আগে আবার এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিষ্ক্রিয় করার অ্যান্টিডোটসহ ব্যবহার করতে হবে। আবার কেউ যদি কখনো বিষাক্ত বা সামান্য বিষাক্ত সাপের কামড় খেয়েও বেঁচে যান, তবে দ্বিতীয়বারের কামড়ে তাকে বাঁচাতে শক্তিশালী এভিএস ব্যবহার করতে হবে। কারণ প্রথম কামড়ের পর তার দেহে অ্যান্টিজেন থেকে যায়। দ্বিতীয় কামড়ের কারণে সেই অ্যান্টিজেকের সঙ্গে বিষ মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে ।
আমরা চাই চিকিৎসাধীন রোগ রোগীর মৃত্যু না ঘটুক ।