ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

horse
ধারণা করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব চার হাজার সালে মানুষ ঘোড়াকে ঘরে পোষা শুরু করে। মধ্য এশিয়ার যাযাবররা প্রথম ঘোড়াকে পোষ মানিয়ে গৃহপালিত পশুতে পরিণত করেছিল। প্রথম দিকে তারা ঘোড়াকে ভারবাহী প্রাণী ও চলাচলের বাহন হিসাবে ব্যবহার করতো। পরবর্তী সময়ে তারা পশুচারণের সময় ঘোড়ার পিঠে চড়ে তদারকি করতো। প্রায় একই সময়ে গাড়ির সাথে জুড়ে ঘোড়াকে ব্যবহার করতো।

একসময় দ্রুত দূরের পথ বা দুর্গম পথ অতিক্রমণে ঘোড়া একমাত্র বাহন ছিল। পরবর্তী সময়ে ঘোড়াকে মানুষ যুদ্ধে ব্যবহার করা শুরু করেছিল। যুদ্ধের জন্য ঘোড়াকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে সেনাবহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হতো। পরে অশ্ববাহিত বিশেষ ধরনের সেনাদল দিয়ে অশ্বারোহী বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন খেলাতে প্রশিক্ষত ঘোড়া ব্যবহার করার শুরু হয়েছে আরও পরে।

শেরশাহ ভারতবর্ষের সম্রাট (১৫৪০-১৫৪৫) ও শূর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নির্মিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ছিল সড়ক-ই-আযম (মহাসড়ক)। তিন হাজার মাইল দীর্ঘ এই মহাসড়ক সোনারগাঁও থেকে আগ্রা, দিল্লি ও লাহোর হয়ে মুলতান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং এর দুপাশে ছিল ছায়াদানকারী বৃক্ষশ্রেণি। উপনিবেশিক আমলে এই সড়ক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে পরিচিতি লাভ করে।

রাজধানী থেকে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং বাইরে থেকে রাজধানীতে সহজে ও দ্রুত সরকারি নির্দেশ ও সংবাদ আদান প্রদানের জন্য যাত্রাপথে পর্যায়ক্রমে সংবাদ-বাহকের ঘোড়া বদল করার এক অভিনব পদ্ধতি তিনি চালু করেন। পথের পাশের সরাইখানাগুলি সংবাদবাহী ঘোড়া বদলের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

সভ্যতার বিবর্তনে মানুষের চলাচলে এখন আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। চলাচলে যুক্ত হয়েছে যান্ত্রিক যান। যানবাহনে যুক্ত হয়েছে মোটর সাইকেল, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস। এরও আগে এসেছে ট্রেন। মুক্তাগাছার হরিপুর গ্রামের মকবুল হোসেন (৬০) এখনও ধরে রেখেছেন সেই প্রাচীন বাহন ঘোড়া। শিশুকাল থেকেই অভ্যাস ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো।

হাট-বাজার, উপজেলা শহর, কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি সব জায়গাই ঘোড়ার পিঠে চড়েই ঘুরেন বেড়ান মকবুল হোসেন। তিনি জানান, ঘোড়ার মুখে লোহার লাগাম, গলায় ঘুগরা, পিঠে উপর বেল্ট দিয়ে আটকানো জিন। জিনের উপর বসে এক হাতে চাবুক, অন্য হাতে লাঘাম, খট, খট শব্দে ঘোড়ার পিঠে উঠে ঘুড়ে বেড়ানোর মজাই আলাদা। আধুনিক যুগে বিষয়টিকে অনেকই খারাপভাবে নেন। তাতে তার কিছু যায় আসে না।

তিনি জানান, বয়সের ভারে তিনিও আজ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন। ঘোড়া পোষা অনেক কষ্টের ব্যাপার। তবুও তিনি ঘোড়া না দেখলে থাকতে পারেন না। এখনো তিনি নিজ হাতে ঘোড়ার খাবার দিয়ে থাকেন। তার খাওয়ার তালিকায় রয়েছে, ছোলা, দুধ, ডিম, ঘাস ইত্যাদি। কষ্ট হলেও তিনি পুর্বপুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।

সুদূর অতীতে মুক্তাগাছার জমিদাররা যে ধরনের পোশাক ও মুকুট পরে ঘোড়া নিয়ে বের হতেন। আবুল হোসেনও তাই করেন। যে কারণে এলাকাবাসী তাকে জমিদার মকবুল হিসাবে সম্বোধন করেন। শিশুকাল থেকে ঘোড়ায় চড়া লালিত সখ জীবনের দীর্ঘ সময় অপূর্ণ থেকে যায় তার। অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে যৌবনে তিনি ঘোড়া কিনতে পারেননি।

৬০ বছর বয়সে এসে তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ৫ বছর আগে তিনি জামালপুর সদর উপজেলার তুলশীপুর বাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকায় কেনেন একটি দেশি ঘোড়া। তার দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। এখন শুধু স্ত্রীকে নিয়েই তার সংসার। মকবুল হোসেন ঘোড়া নিয়ে চলে যান মেয়েদের বাড়িতে। নাতিদের ঘোড়ায় চড়িয়ে আনন্দ করেন। সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন ঘোড়া আজ তার সাথী।