ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

ময়মনসিংহে জেলা উপজেলার সর্বত্র একসময় সারাবছর কম-বেশি এবং পৌষ ভাদ্রে মাঠে-ঘাটে পত পত শব্দে আকাশে উড়ত অসংখ্য রঙ-বেরঙের ঘুড়ি ।
ghuri-3
ফসল কিংবা বিস্তীর্ণ অনাবাদী জমি, বিচরণভূমি আর খেলার মাঠে দলবেঁধে শিশু- কিশোর , যুবক এমনকি বড়দেরও লাটাই হাতে নিয়ে আকাশের দিকে ঘুড়ির পানে চেয়ে থাকাতে দেখা যেতো । সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আকাশ ছেড়ে যেতো ঘুড়িতে ।

ক্রমশ: মাঠ-ঘাট ,আবাদী অনাবাদী জমি সংর্কীর্ণ , বিচরণভূমি হ্রাস এবং ক্রমাগত বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে ঘুড়ি ওড়ানোর পরিধি কমে আসছে এবং ভিডিও গেমস এর প্রভাবে ঘুড়ি ওড়ানোয় আগ্রহী মানুষের সংখ্যাও দিন দিন কমছে । অন্য দিকে কিছু মানুষের সেই ইচ্ছে থাকলেও বাধ সাধছে দৈনন্দিন জীবনে সময়ের অভাব। সর্বপরী কমছে বাঙালীর ঐহিত্যবাহী এই খেলা । ঘুড়ির সেই বিলাশ আজ স্মৃতিতে ।
ghuri-1

সেসময় পরম্পরাগতভাবেই শিশুরা শিখে যেতো সুতোর লাটাই -চরকি লাটাই, চাকি লাটাই-বাংলা লাটাই তৈরি আর কী করে এসই সুতা মাঞ্জা দেয়া। এরারট সাবু, বার্লি, লাতা-পাতার রস, রং, কাচের গুঁড়া দিয়ে আঠায় মিশিয়ে কড়া মাঞ্জা, হাত-মাঞ্জা তৈরি করতে। বাতাস কম থাকলে ঝেটকে ঝেটকে ঘুড়ি ধিরে ধিরে আকাশে ওড়ানো হতো । অদ্ভুত কায়দায় ও অন্য ঘুড়ির সঙ্গে প্যাঁচ লড়াইয়ে বিভোর হয়ে থাকতো তারা । ক্ষণিকের টান টান উত্তেজনায় দ প্যাঁচের কৌশলে একে অপরের দফারফা করে দিতো। এই প্যাচ খেলায় অন্যের ঘুড়ির সুতা কেটে গেলে প্রবল চিৎকার উঠত: ফকস্সআ ! ফকস্সা ।
ghuri-2
পালা- পার্বণে কিংবা বিশেষ উৎসবে গোটা ময়মনসিংহের আকাশ-বাতাস ছেয়ে থাকত ঘুড়িতে। ঠিক যেন বাঙালির মহোৎসবের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করত। ঘুড়ি ওড়াতেন এসই প্রবীণরা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, সেই আওয়াজটা আজও যেন কানে বাজে। চোখের সামনে ভাসে সেই হাসি, গুনে গুনে ঘুড়ি কাটছেন চারদিকে রব উঠছে ‘অমুক ভাই জিন্দাবাদ’!
ghuri-4
বিভিন্ন কাঠ দিয়ে তৈরি লাটাইয়ের কারুকাজ ছিলো দৃষ্টিনন্দন । চাকতি দেওয়া লাটাই, মাঝখানে তার বাঁশের তালি। তাতে খানদানী সুতো আর নানা ধরনের ঘুড়ি। সবুজ, লাল, বাদামি, গোলাপী, নীল সাদা, বাবনাসহ নানা রঙের ছোট-বড় ঘুড়ি । বাতাসে টান টান লাটাইয়ের সুতা । সুতার টানে অন্য পরে ঘুড়ি কেটে যেত। ঘুড়ি কেটে যাওয়ার সময় যেন গোটা এলাকার উপর আলপনা এঁকে যেত সেই সুতায়। সহযোগীরা সেই সুতাাগুলিকে ধীরে ধীরে গোটাতেন। অথবা ঘুড়ি বেড়ে ধীরে ধীরে লাটাই গোটাতেন।

চঙ্গ, মই, চিল , পাখি, কালাপাড়, লাল পাহাড়, চুড়িদার,পেটকাটা, চুমকি, পঙ্খিরাজ, প্রজাপতিসহ আরো কত বাহারী নামের ঘুড়ি ওড়ানো শেষে সযত্নে রেখে দিতেন তারা। পরের দিন আবার ওড়াতেন । ঘুড়ি ছিল সেসময় বিনোদন আর মনোরঞ্জনের অন্যতম মাধ্যম। সেই মেজাজি দিনগুলো আজ আর নেই, সেই সব ঘুড়িও আজ নেই! বাঙালির ঘুড়ি বিলাস আজ কেবলই স্মৃতি! আজ শুধু নস্ট্যালজিয়া ঘুড়ি ওড়ানোর সেই নেশা ।