ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

১৩৫ বছর আগে ব্রিটিশ আমলে ময়মনসিংহে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কাঁচা পাট আমদানীর লক্ষ্যে সিঙ্গেল ট্রেন লাইন চালু করা হয়। ১৮৮৫ সনে খ্যাতনামা ঢাকা স্টেট রেলওয়ে ময়মনসিংহ টু ঢাকা টু নারায়ণগঞ্জের পর্যন্ত ১৪৪ কিমি দীর্ঘ মিটারগেজ রেললাইন স্থাপন করে। দীর্ঘ এই ১৩৫ বছরে ময়মনসিংহ চলাচলকারী যাত্রীদের সময়ের গুরুত্ব বেড়েছে ।

mymensinghbroad-gauge-train-line-1
প্রতিদিন কতো সময় কেড়ে নিচ্ছে মানুষের অর্থনৈতিক গতি তার পরিসংখ্যান না থাকলেও চলাচলে দুর্ভোগ প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান। কেবলমাত্র মিটার গেজ লাইনের কারণেই প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ক্ষয়-ক্ষতি হচ্ছে যান-মালের। মিটার গেজের এই লাইনে লাখ লাখ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ চলাচল করছেন।

ময়মনসিংহ-ঢাকা রেল লাইনের রেলস্টেশনগুলিতে বিপুল পরিমাণে টিকেট বিক্রি হয়ে থাকে। এতে করে রেল বিভাগের লাখ লাখ টাকার রাজস্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই তুলনায় লাইনে যাত্রীসেবা পাচ্ছে না।

সোয়াশত বর্ষেরও অধিক প্রাচীন এই রেললাইনের আধুনিকায়নের দাবি উঠেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল থেকে ডাবল লাইন করার দাবি ছাড়াও অবিলম্বে এলাইনে আন্ত:নগর ট্রেনের আসন সংখ্যা বৃদ্ধির দাবি অন্যতম।

ঢাকা বিভাগের আওতাধীন অন্তহীন সমস্যা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ময়মনসিংহ রেলওয়ে। লোকবল সংকট, রেল লাইনের দু’পাশে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মান ও ময়লা আবর্জনা রেখে যথেচ্ছ ব্যবহার, লাইনের পাশে পুকুর ডোবা নির্মাণ, রেল কলোনীর ঘরবাড়ি বেদখল। রেল লাইনের উপর মানুষ ও গাবাদী পশুর অবাধ বিচরণসহ নানাবিধ কারণে ব্যাহত হচ্ছে রেলের স্বভাবিক কার্যক্রম।

রেল সূত্রে এবং খোঁজ নিয়ে সরেজমিনে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ শহরের ছায়াবানীর গেইট থেকে সানকিপাড়া পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত রেললাইনের দুপাশে আবর্জনার স্তুপ। আবার এই লাইনের দু’পাশে নির্মাণ করা হয়েছে অবৈধ হাট বাজার। তাছাড়া ঐ লাইনের পাশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে পানি প্রবাহে সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা। উপরোক্ত লাইনগুলোর দু’পাশে দেখা গেছে লাইনের পাশে মাছ চাষের লক্ষ্যে স্থাপন করা হয়েছে অসংখ্য পুকুর ডোবা। রেল লাইনের উপর দিয়ে চলাচল করছে মানুষ, গরু-ছাগল। রেল লাইনের উপর শোকানো হচ্ছে গোবর। পাশেই কাপড়-চোপড় শুকানোর জন্য টানানো হয়েছে।

mymensinghbroad-gauge-train-line-2
রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, রেল লাইন সংরক্ষনের জন্য লাইনের উপর সর্বদা ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও কেউ এ নিয়ম মানেন না। উল্লেখিত কারনে রেল এর ফিটিংন্স এলাইনমেন্ট প্যাকিং খারাপ হয়ে প্রায়সই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। লাইনের পাশে পুকুর ডোবার কারণে রেল লাইনের মাটি সড়ে যায়।

অপরদিকে লাইনের পাথর নানা কারণে যথেচ্ছ অপব্যবহার হয় । রাজনৈতিক কারনে প্রতিপক্ষরা ঢিল হিসাবে পাথড় ছোঁড়ে। লাইনের পাশে কুলসহ নানাবিধ ফল পাড়তে ঢিল হিসাবে ব্যবহার করা হয় পাথড়। অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহ রেলওয়ের আওতাধী মালগোদাম, নিউ কলোনী, স্টেশন কলোনী, পাওয়ার হাউজ কলোনী, কেওয়াটখালী কলোনীর অসংখ্য ঘর প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর ধরে বেদখল করে রেখেছে। রেল বিভাগ এর প্রতিবাদ করলে হামলা লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়।

এই ঘর এবং সম্পত্তি দেখভালের জন্য রেলের ভূ-সম্পত্তি বিভাগের একজন কাননগো এবং একজন আমিন দায়িত্বে থাকলেও খোদ রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীগনই তাদের কখনও দেখেননি বা চেনেন না। যোগাযোগ মন্ত্রী ময়মনসিংহের রেল বিভাগের কর্যক্রম পরিদর্শনে এসে উল্লেখি দের ঘটনাস্থলে না পেয়ে ভৎসনা করেন। রেলের সম্পত্তিতে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের জন্য ঢাকা বিভাগে রয়েছেন মাত্র ১ জন ম্যাজিস্ট্রেট। সময় স্বল্পতার কারণ অথবা অন্য কারণে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয় কালে-ভদ্রে।

এ ক্ষেত্রে রেল বিভাগের সমন্বয়হীনতাকেও অনেকে দায়ী করছেন। এতবড় জনসংখ্যার কলোনীতে নেই গ্যাস সরবরাহ। এতে যারপরনাই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কলোনীবাসীকে। রেল বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীদের স্বাস্থ্য সেবার জন্য কলোনীতে রেলওয়ে চিকিৎসালয় থাকলেও অধিকাংশ সময়ই এটি বন্ধ থাকে। জানা যায়, এই চিকিৎসালয় দেখভালের জন্য রয়েছেন মাত্র ১ জন ডাক্তার।

তাও তিনি আসেন ঢাকা থেকে। ময়মনসিংহ জংশনে আসা ভূক্তভোগীরা জানান, দেশের ঐতিহ্যবাহী ময়মনসিংহ জংশনের প্ল্যাটপর্ম বর্ধিত হওয়াও একান্ত প্রয়োজন। ময়মনসিংহ রেলের সূত্র জানায়, প্রকৌশল বিভাগে (স্থায়ী পথ) ৩৫ টি পদের বিপরীতে মঞ্জুরীকৃত লোকবল ৪৩৪ জনের মধ্যে রয়েছে মাত্র ১৯৯ জন।

রেল পরিচালনার স্বার্থে সাময়িক সমস্যার সমাধান করা হয় অস্থায়ী লোক নিয়োগ করে আউট সোর্সি এর মাধ্যমে। ময়মনসিংহ রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজ জিন্নাহ জানান, রেল দেশের সম্পদ। এ লক্ষ্যকে সামনে নিয়েই তিনি তার কর্যক্রম পরিচালনা করছেন। তিনি যোগদানের পর বাংলো সংস্কার ও এক ডজন কলোনীর ঘর সংস্কার করেছেন। তিনি রেলের অবৈধ দখলদারদের উৎখাতে ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

যাত্রী সাধারণ জানান, উপরোক্ত সমস্যার সমাধানসহ অন্তত ময়মনসিংহ- ঢাকা পথে টঙ্গি পর্যন্ত লাইনটি ডাবল (ব্রড গেজ) করা হোক। ডাবল লাইন করা হলে সরকারের রাজস্ব যেমন বাড়বে ঠিক তেমনি বাড়বে মানুষের জীবনযাত্রা মানের গতি। কমবে দুর্ঘটনাও।