ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সহযোদ্ধারা স্বীকৃতি পেলেও আব্দুল কুদ্দুস মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এখনো তালিকাভুক্ত হতে পারেননি। দেশের জন্য যুদ্ধ করে স্বীকৃতি না পাওয়ার কষ্ট তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ৪৫ বছর ধরে। আব্দুল কুদ্দুসের বয়স এখন ৬১। স্বীকৃতি না পেলেও মুক্তিযুদ্ধের মহোত্তম সেই স্মৃতি এখনো তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় একাত্তরের উত্তাল সেই দিনগুলোতে।

mymensinghrecognition-of-freedom
আব্দুল কুদ্দুসের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার গড় পয়ারী গ্রামে। তিনি গ্রামের প্রয়াত ইউসুফ আলী ও কদবানু বিবির ছেলে। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। ফুলপুর উপজেলা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরবর্তী আব্দুল কুদ্দুসের বসতবাড়ি। এক ছেলে তিন মেয়ের জনক এই মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

আব্দুল কুদ্দুস জানান, হালুয়াঘাটের সাকুয়াই গ্রামে বাবার মামার বাড়িতে লজিং থেকে সাকুয়াই উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তেন। ৭১-এ পরীক্ষার্থী থাকলেও লিবারেশন ওয়ারের কারণে তিনি ১৯৭২ সনে ২য় বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৭৪ সনে এক সাবজেক্টে ইন্টার ফেল করে আর বেশি দূর এগুতে পারেননি।

একাত্তরে তিনি ছিলেন একজন টগবগে যুবক। পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক নিরীহ বাঙ্গালির উপর জুলুম নির্যাতন নিষ্পেষণ ও নানা লোমহর্ষক ঘটনা শুনে ও নিজ চোখে দেখে আসছিলেন। এরই মধ্যে আপন চাচাকে হালচাষ থেকে পাকবাহিনী ধরে নিয়ে গেলে তার মনে ব্যথার উদ্রেক হয়। এ ঘটনা তাকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে অনুপ্রেরণা যোগায়।

এরপর সমবয়সী বন্ধুদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে ভারত যাওয়ার জন্য গোপন বৈঠক করেন তিনি। ঐ বৈঠকে ছিলেন- ইরন্ডির আনোয়ার, ইমাদপুরের শহিদ, মাটিচাপুরের হানিফ, আব্দুস সালাম, দেওলার আমজাদ, গড় পয়ারীর আব্দুল বাতেন সরকার, কাসেম সরকার, মৃত সাইদুর রহমান, আব্দুল লতিফ প্রমুখ। সবাই একমত হলে বাবা মা’র অনুমতি সাপেক্ষে ২য় দিন পর আব্দুল কুদ্দুস ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

বাহাদুরপুর আঞ্জুমান হাইস্কুলে সমবেত হয়ে সেখান থেকে ১০/১১ জনের একটি টিম কাশিগঞ্জে গিয়ে পৌঁছে। কাশিগঞ্জে একটি মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ তখন কাজ করছিল। কুদ্দুসদের ভারতে পৌঁছাতে তারা একজন রাহবর দেয়। সেখান থেকে নৌকায় কালা পাগলা গিয়ে নিজপাড়া আব্দুল হাকিম এমএলের বাড়িতে ওঠেন তারা। মধ্যরাতে আবার রওনা। গিয়ে পৌঁছেন তন্তুরে। মুয়াজ্জিন তখন ফজরের আযান দিচ্ছিল। পরে স্থানীয় আরফান মাস্টারও তাদেরকে ভারতের ডালু পৌঁছাতে সহযোগিতা করেন।

ডালুতে গিয়ে দেখা হয় ময়মনসিংহবাসির কান্ডারী প্রিয় নেতা আজকের ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের সাথে। তিনি ডালুতে রেশন কার্ডের ব্যবস্থা ও বেরাঙা থানায় উহা জমা দিয়ে রেশন চালু করে দেন। ১৪/১৫ দিন থাকার পর গ্রেনেড ট্রেনিংয়ের ডাক পরে। তিন দিন ট্রেনিং নেয়ার পর সেখান থেকে তাকে হানাদারদের বর্বরতার খবর দিতে গোয়েন্দাগিরির কাজ দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হয়। আনোয়ার, শহিদুল, আমজাদসহ বেশ ক’জন একই সাথে দেশে এলেও ভারতে আর ফেরা হয়নি তার।

খেয়ে না খেয়ে, নানা কষ্টে থাকায় স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায় তার। সন্ধ্যা বেলায় সাঁতরিয়ে নালিতাবাড়ির ভোগাই নদী পার হয়ে ভিজা কাপড়ে আসা তাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে বাবা ও ফুফু। পরে ভারতে ফিরতে তারা বাঁধা হয়। এরপর তার ভারতে ফেরা না হলেও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দেশে গুলি খাওয়া আহত পয়ারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক সত্যেন্দ্র চন্দ্র তালুকদার, নগু চৌধুরীর স্ত্রী কমল মাস্টারের মা প্রমুখকে সেবাদানসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা কাজ করেন তিনি।

ব্যক্তি জীবনে তিন ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি। প্রথম ছেলে শাহজাহান হুসাইন পল্লী চিকিৎসক, দ্বিতীয় ছেলে আবু কাওসার মসজিদের ইমাম, তৃতীয় ছেলে আসাদুজ্জামান মানিক ব্যবসায়ী ও মেয়ে সামিরা আক্তার বিউটি বিবাহিতা। কুদ্দুসের এখন সময় কাটে বাড়ি আর মসজিদে, যিকির আযকার নামাজ ও বাড়ির টুকটাক তথা কৃষিকাজ করে।

দেশের দু:সময়ে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া আব্দুল কুদ্দুস স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় তার অবুঝ নাতনী অপলক নয়নে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। ভারতে গ্রেনেড ট্রেনিংপ্রাপ্ত দেশের সেবায় নিবেদিত পল্লী চিকিৎসক আব্দুল কুদ্দুস একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চান।

এ ব্যাপারে তিনি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোজাম্মেল হকের সহানুভূতিসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনা করে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধে জীবনবাজি রাখার জন্য অনেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন। আমারও এই স্বীকৃতি থাকলে ভালো হতো। নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হতো। তাই মৃত্যুর আগে স্বীকৃতি চাই।”