ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

“পাকিস্তান ডেজার্ট কি মাছলি” বা “ইন্ডিয়ান জনতা কি হনুমান” নামে দল বানাইয়া বাংলাদেশে রাজনীতি করা যাবে কি? যাবে না। নাকি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে “ইন্ডিয়ান জনতা কি হনুমান” দলটাকে রাজনীতি করতে দেবে আর বিএনপি থাকলে “পাকিস্তান ডেজার্ট কি মাছলি”? না। এই এই নামের কোন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে না। ইস্যুটা এই না যে এরা বাংলাদেশের নাগরিকদের ভোট পাবে না; বরং এই এই নামকরণ বাংলাদেশরে একটা স্টেট হিসাবে স্বীকার করে না। রাজনৈতিক দল স্টেটকে স্বীকার করার পরে।

এগুলি এক্সট্রিম উদাহরণ; মানে নাম দিয়াই স্পষ্ট জানাইয়া দেওয়া। আরেকটু আবছাভাবে জানাবার সিস্টেম হইলো ‘বাংলাদেশ শাখা’ ইন্ডিকেট করতে পারে তেমন নাম। যেমন, এইচএসবিসি বাংলাদেশ বা কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশ বা জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। এই রকম মাল্টিন্যাশনাল দল স্টেটের সভ্রেইনটি’র জন্য হুমকি। সো, রেজিস্ট্রেসনের জন্য ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ হইতে হইছে। ‘কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশ’ হইয়া গেছে ‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি’; যাঁরা এখনো সিপিবি ডাকেন/বলেন তাঁরা বিসিপি শুরু করতে পারেন।

তো, এইটাও সেন্সরশীপ। নীতিগতভাবে সেন্সরশীপের বিরোধী আছেন অনেকেই; তাদের বিরোধিতা এই পর্যন্ত যাবার নজির নাই। কারণ, কোন একটা রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব স্বীকার করে না, এমন কাউকে তো চালকের আসনে বসাবার ঝুঁকি নিতে পারে না। সেন্সরশিপের বিরোধীরা এই সীমার নিচে পর্যন্ত অবাধ স্পেস চান মাত্র।

তাহলে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রে রাজনীতি করার প্রাথমিক বাধ্যবাধকতা হইলো—এই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব স্বীকার করতে হবে। কোন কোন দল এইটা করে? বিচার করা দরকার আছে রাষ্ট্রের।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি করে। আরো অনেক দলই করে। কিন্তু, এইটা বোঝার জন্য পুরান দিনের কিছু বিষয় হিসাব করবে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পয়দা হওয়াটা তখনকার সব দল পছন্দ করে নাই। কোন কোন বামদল দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি বলছিলো। কমিউনিস্ট পার্টি কি ছিলো সেগুলির মধ্যে? এই নতুন দেশ এইসব দলরে রাজনীতি করতে দেবার কোন কারণ নাই। মুসলীম লীগ পাকিস্তান-বাংলাদেশ যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলো; জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পক্ষে ছিলো; রাজাকার, শান্তি বাহিনীতে দলীয়ভাবেই যোগ দিছিলো। বাংলাদেশ সরকার যখন ভারতের আশ্রয়ে থাইকা যুদ্ধ চালাচ্ছে তখন এরা পূর্ব পাকিস্তান সরকারে যোগ দিয়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলো। বাংলাদেশ রাষ্ট্র এদের রাজনীতি করতে দিতে পারে না। কারণ, এরা বাংলাদেশের পয়দা হওয়া সশস্ত্র ও রাজনৈতিকভাবে ঠেকাবার চেষ্টায় আছিলো।

কতগুলি নাম ব্যবহার করতে দিতে পারে না বাংলাদেশ। ‘শান্তি বাহিনী, ‘রাজাকার’, ‘জামায়াতে ইসলামী’, ‘মুসলীম লীগ’ ইত্যাদি। ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ বিরোধিতা করলে এই নামও ব্যবহার করতে দিতে পারে না বাংলাদেশ; করতে দেওয়াটা বাংলাদেশের জন্য সুইসাইডাল।

২.

৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলছেন, “জামায়াতে ইসলামী বরাবরই একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী শক্তি এবং বর্তমানে তারা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সাথে যুক্ত হয়ে একটি পরিপূর্ণ সন্ত্রাসবাদী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। জামায়াত কেবল দেশের জন্যই নয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও শান্তির জন্যও বিপদ ও ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।”

জামায়াতে ইসলামী’র বিরুদ্ধে আরো কিছু অভিযোগ করে থাকে সুশীল সমাজ। যেমন, “এই দলটা সাম্প্রদায়িক। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার করে। জঙ্গী, নারী বিরোধী ইত্যাদি।”

ইনু এবং সুশীল সমাজ এই দলটা নিষিদ্ধ করার যুক্তি হিসাবে এগুলি বলে থাকেন। এই যুক্তিগুলি পিছলা। এগুলির কোন না কোনটার সাথে সম্পর্ক আছে এমন রাজনৈতিক দল অনেকগুলি। যেমন, ইসলামী ঐক্য জোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, খেলাফত মজলিস সহ বেশ কিছু দল। সবগুলিকে নিষিদ্ধ করতে হবে তখন। তাতে আওয়ামী লীগের প্রতি পুরানা বাকশাল ধরনের নিন্দা শুরু হবে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ বলবার সুযোগ পায় যে, অতগুলি দলরে নিষিদ্ধ করতে হয় বলে জামায়াতে ইসলামীরে নিষিদ্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে, এ যুক্তিগুলি আসলে নিষিদ্ধ না করার পক্ষে।

এদিকে, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার কে করে না? বিএনপি আর আওয়ামী লীগও সমানভাবেই করে; নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা ওমরাহ, মাজার জিয়ারত করে, হিজাব পরে, ইসলামী দলের সাথে অ্যালায়েন্স করে। আওয়ামী লীগের ওলামা শাখা আছে। পোস্টারে ‘আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান’ লেখে। এমনকি আওয়ামী লীগের ধর্মের ব্যবহার আরো পুরানা। জাতির জনক মদ, জুয়া, ঘোড়দৌড় নিষিদ্ধ করছেন। এইটা রাষ্ট্রকর্মে ইসলামের ব্যবহার। পাকিস্তান আমলেও ইসলামের এতো ব্যবহার ছিলো না, এগুলি নিষিদ্ধ ছিলো না তখন। মদ নিষিদ্ধ করা অমুসলীমদের উপর রাষ্ট্রীয় জুলুম/নির্যাতন; খ্রীস্টানদের উৎসবে মদ দরকার হয়। জাতির জনক আইন কইরা খ্রীস্টানদের ধর্ম পালনে বাধা দিছেন। বিএনপি আর জাতীয় পার্টিও ধর্ম ইউজ করে রাজনীতিতে।

ফলে, ধর্মের ব্যবহার, সাম্প্রদায়িকতার যুক্তিতে কেবল জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করতে পারে না রাষ্ট্র। তাইলে আ. লীগ আর বিএনপিরেও নিষিদ্ধ করতে হয়। এগুলির চেয়ে জোরালো এবং কম বিতর্কের যুক্তি আছে এই রাষ্ট্রের। যে, এই দলগুলি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলো; হানাদারদের অংশ ছিলো। বা বাংলাদেশের জন্মের বিরোধী ছিলো এরা। তখন জামায়াতে ইসলামী না কেবল, মুসলীম লীগ বা সেই সব বাম দলকেও নিষিদ্ধ করবে বাংলাদেশ। আমার ধারনা, ‘শান্তি বাহিনী, ‘রাজাকার’, ‘জামায়াতে ইসলামী’, ‘মুসলীম লীগ’—এগুলি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে কোন নামে ব্যবহার করা যাবে না মর্মে একটা আবেদন আদালতে করা হলে আবেদন মঞ্জুর হবে। আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বলবে সরকারকে।

৩.

আওয়ামী লীগের ভাগ্য খুব ভালো। আওয়ামী লীগের বড়ো প্রশংসাগুলি সাধারণত তার শত্রুরাই করে থাকে। যেমন, পাকিস্তান ও পাকিস্তানপন্থিরা পাকিস্তান ভাঙার জন্য শেখ মুজিবকে দায়ী করে। কিন্তু, বাংলাদেশপন্থিদের কেউ কেউ বলেন যে, মুজিব আসলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হইতে চাইছিলেন, বাংলাদেশ চান নাই। আবার, শাহবাগকেন্দ্রীক এখনকার আন্দোলনকে বিরোধীদলগুলি সরকারের দালালী বলতে চাইছে দেখলাম। ফেসবুকে একজন স্ট্যাটাস দিছেন এই রকম–তারুণ্য আর সরকারের দালালী এক না। যেনবা, ওয়ার ক্রাইমের বিচার আওয়ামী লীগের এজেন্ডা; এদিকে আন্দোলনকারীরা সরকারের লোকজনকে বক্তৃতা দিতেই দিচ্ছে না! হা হা।

বারবিকিউ

যে যাই দেখুক বা না দেখুক, আন্দোলন ভয়ংকর দিকেই যাচ্ছে। ফেসবুকে দেখলাম, কাদের মোল্লার রডের সাথে বাইন্ধা কাবাব বানানো হচ্ছে; মানে, কার্টুন প্রচার চলছে। কাবাব উপাদেয় হবে বলেও আশা প্রকাশ করছেন আমার এক স্টুডেন্ট। আরেকজন জানাইলেন একটা ব্যানারের কথা; যে, কাদের মোল্লারে শাহবাগে মুক্তি দেওয়া হোক, বাকিটা তাঁরাই বুঝবে। এই আন্দোলন প্রধান প্রধান মিডিয়াও করছে; তারা রিপোর্ট না করে শ্লোগান দিচ্ছে; রিপোর্টার আর আন্দোলনকারীর ফারাক পাওয়া যাইতেছে না। সারা দেশেই ছড়াচ্ছে আন্দোলন। দেশব্যাপী বিশাল এবং অসংখ্য ‘মব’ তৈরি হচ্ছে ক্রমেই। এরা রাজাকার নিধনের ডাক দিচ্ছে। শোনা যায়, আওয়ামী লীগের উপর মহলেও কিছু রাজাকার আছেন। ওয়ার ক্রাইমের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাজাকার আর যুদ্ধাপরাধীর একটা দূরত্ব তৈরি করছিলো; এই আন্দোলন সেই দূরত্ব কমাইয়া আনছে। সরকার এখনি লাগাম ধরতে চাইবে আন্দোলনের, আন্দোলন যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেও গড়াইতেছে ক্রমে! দমন করায় কিছু ঝামেলা আছে সরকারের; তাতে আঁতাতের গুজব সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাইতে চাইবে। এসব ক্ষেত্রে কুৎসিত গেম শুরু হবার সম্ভাবনা থাকে। এই ‘মব’রে শান্ত করার জন্য মবের হাতে রক্ত লাগাবার চক্রান্ত হইতে পারে; মবের হাতে শিবির বা জামাতের লোকজন দেওয়া হইতে পারে। কয়েকটা খুন ‘মব’রে নৈতিকভাবে দুর্বল কইরা দিতে পারে। বহু মানুষ সমর্থন তুইলা নিতে পারেন তাতে। কয়েকটা খুন করাইতে পারলেই আন্দোলন দুর্বল হইয়া যাইতে থাকবে।

এদিকে বিপ্লবপন্থি কিছু লোক আছেন। তাঁরা নিজের ঠ্যাংগে গুলি কইরা তাহের হইয়া উঠতে চাইতে পারেন। এই জমায়েতে এরা বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখছেন; পাওয়ার চাইতে খুঁইজা বাইর করাই সহজ সবসময়। এরা আরো অ্যাকটিভ হইলে আন্দোলন বিভক্ত হবার সম্ভাবনা দেখা দেবে।

কিন্তু এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কী? আন্দোলনকারীরা আদালতের উপর অনাস্থা দেখাইতেছেন বলা যায়। এইটা প্রতীকীভাবে এই রাষ্ট্রেও অনাস্থা জ্ঞাপন বটে। ট্রাইবুনালের উপর চাপ পড়ছে; এর পরের রায়ে কারো ফাঁসি হইলে সেইটা যথার্থ না বইলা অভিযোগ করার স্কোপ তৈরি হচ্ছে এতে। বলার সুযোগ হবে যে, আন্দোলনের চাপে এই রায় হইছে। পরে তো আসামীরা আপীল করবে; তখনো কি এই রকম আন্দোলনের চাপ রাখা যাবে। চাপ যদি সফল হয় আর আপীলের সময় যদি চাপ না রাখা যায়—তখন কী হবে?

এই আন্দোলনে বিচার প্রক্রিয়ার উপর প্রশ্নের সম্ভাবনা বাড়বে বই কমবে না। তাতে জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগ—উভয়ের লাভ। বিচার ঝুলাইয়া রাখা যাবে। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সুবিধা পাবে। সোনালী ব্যাংক, পদ্মা সেতু বা শেয়ার বাজার ইস্যু সামনে আসতে পারবে না।

তার চেয়ে আন্দোলনের দাবী কিছুটা পরিবর্তন করাই ভালো হবে। আপীল করা, রায় পুনর্বিচারের আবেদন করা এবং বাংলাদেশ বিরোধী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা। এইটা যাতে কোনভাবে ধর্মীয় ইস্যুতে যাইতে না পারে। ইনুর বক্তব্য বর্জন করা দরকার আন্দোলনকারীদের। ইনুর বক্তব্য বাংলাদেশ বিরোধী রাজনীতি নিষিদ্ধ করাটা কঠিন কইরা তোলে। আওয়ামী লীগও নিষিদ্ধ করতে চাইবার কথা না; কেননা, তাতে বিএনপির থেকে আওয়ামী লীগরে আলাদা করাটা কঠিন হইয়া পড়ে।

বাংলাদেশ বিরোধী রাজনীতি নিষিদ্ধ করায় রাষ্ট্রের আগ্রহ থাকার আরো কারণ আছে। ইস্যুটা মারা দরকার এই রাষ্ট্রের। রাজাকার, আল বদর, আল শামস্, শান্তি বাহিনীর সদস্য ও ছেলেমেয়েরা যাতে বাংলাদেশপন্থিদের সম্ভাব্য নির্যাতনের শিকার না হয় সেই ব্যবস্থা করার কথা রাষ্ট্রের। এনাদের নাগরিক অধিকার আছে। রাষ্ট্র দল নিষিদ্ধ করবে কিন্তু সেই দলের কোন প্রাক্তন সদস্য (রাজাকার, আল বদর, আল শামস্, শান্তি বাহিনী) যুদ্ধাপরাধী না হইলে তাদের নাগরিক অধিকার সমান। তাদের সন্তানরা যাতে নিগৃহীত না হয় সে ব্যাপারে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। ৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পরে কাদের সিদ্দিকীর বাহিনী ওসমানী উদ্যানে বেয়োনেট দিয়া খোঁচাইয়া রাজাকার হত্যা করছিলো; সেইটা অপরাধ ছিলো; ইভেন, সেইটা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই অপরাধ। বন্দীদের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নতুন রাষ্ট্র তখন নিরাপত্তা দিতে পারে নাই; সেই ঘটনার বিচারও করতে পারে নাই। কিন্তু আজকে যাতে আবার রাজাকার নিধন শুরু না হয়।

৭-৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

ফেসবুক লিংক: https://www.facebook.com/notes/rezaul-karim/শাহবাগ-কই-যায়/10151405247816162