ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

পৃথিবীর সবচাইতে জঘন্য অপরাধ গুলো যেমন গণহত্যা ,মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ , যুদ্ধাপরাধ এই সবের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং বিচার করতে এই শতাব্দির শুরুতে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) হেগে তার যাত্রা শুরু করেছিল । এটা বোঝা খুবই সহজ যে একটা সরকারের সাহায্য ছাড়া একটা আন্তর্জাতিক সংস্থা কি করে দেশের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া এসব মারাত্মক অপরাধ গুলোর বিচার করবে । এ জন্য এটা খুব স্পষ্ট ভাবেই বলা আছে কোন সরকার যদি এ বিচার কার্জে নামে তাহলে সংস্থাটি নাক গলাবে না যতক্ষণ না পর্জন্ত প্রমানিত হচ্ছে বিচারটি ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে ব্যবহ্রিত হচ্ছে । এও বলা আছে চিহ্নিত কাউকে বাঁচানোর জন্যও যদি এটা করা হয় তাহলেও সংস্থাটি বাধা দিতে পারবে।

ক্রাইম সিন থেকে ফিজিক্যালি দূরে থাকা এবং তথ্য উপাত্ত সাক্ষ্য গ্রহনের ক্ষেত্রে অসুবিধার জন্যই সংস্থাটি জাতীয় বিচার ব্যবস্থাকে আদর্শ ধরবে এবং তাকে শক্তিশালী করবে। ফান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক সাহায্যের উপর নির্ভর করতে হয় বলে এর সীমাবদ্ধতা অনেক ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই নুরেমবার্গ ট্রায়ালের ক্ষেত্রেও বিচার হয়েছিল বিজয়ী দেশ গুলোর(আমারিকা , রাশিয়া , ব্রিটেন) প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনে। সেখানে পরাজিত শক্তির বলার কিছুই ছিল না । একে বিজয়ীর বিচার বলে অনেকেই তখন সমালোচনা করেছিলেন এবং এই বিচারকার্জের দুর্বল দিকগুলো নিয়েও সব সময় কথা হবে । বারো জনের ফাঁসি হয়েছিলো ।

মুলত নুরেমবার্গের ট্রায়ালের স্পিরিটের উপর দাঁড়িয়েই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) তৈরি হয়েছিল। আর বাংলাদেশে যে আই সি টি বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল ,এর চাইতে ভিন্ন কিছু না । আইসিসি ও এর বিরোধিতা করে নি । আইসিসি র আইনেও আছে রাষ্ট্রীয় এসব উদ্যোগ কে সমর্থন করার কথা । আগের যুগোস্লাভিয়ায় এবং পরের সার্ভিয়ার গণহত্যা র জন্য মিলোসেভিচ এবং কারাদজিকের বিচারকার্জের ক্ষেত্রেও জনরায় বা পপুলার ভার্ডিক্ট ই কাজ করেছে। মিলোসেভিচের বিচার চলাকালিন অবস্থায়ই মৃত্যু হয়েছে আর কারাদজিক কে বিচার কার্জের জন্য নেদারল্যান্ডে পাঠানো (এক্সট্রাডাইট) হয়েছে।

এ পর্জন্ত পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া যুদ্ধ অপরাধের বিচার গুলো পর্জবেক্ষন করলে দেখব সেখানে জনরায়েরই প্রতিফলন ঘটেছে । সেখানে সঠিক বিচারিক নিয়ম , স্বচ্ছতা এসব নিয়ে কথা হলেও এগুলো আদতেই ছিল Victor’s justice , সঠিক বাংলায় হয়তোবা হবে বিজয়ীর দ্বারা সংঘটিত বিচার। এটাই সত্য ।

আমাদের দেশে যে সব শ্রদ্ধেয় বিচারপতি বা বিবৃতিজীবীরা এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে কথা বলেছেন তারা আসলেই জনদাবিকে মানতে চান না বা বোঝেন না । এরা হতে পারেন জামাত বিরোধী , বা সৎ লোক , কিন্তু এযাবত যে প্রক্রিয়ায় অন্যত্র বিচার হয়েছে সে গুলো আমাদের এখান থেকে শ্রেয়তর কিছু ছিল না । পিয়াস করিম বা আসিফ নজরুলের কথা ভাল লাগে , আমি তাদের একজন মনযোগী শ্রোতা । আমিও বিভ্রান্ত হই (ক্ষনকালের জন্য) পরে আবার জনদাবিতে একাত্ম হই। একজন দক্ষ আইনজীবীও ফৌজদারি আইনের ভিউ পয়েন্ট থেকে একে ব্যাখা করতে যেয়ে নিজে বিভ্রান্ত হচ্ছেন বা মানুশকে বিভ্রান্ত করছেন ।

এ মুহুর্তে প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনকে নানা ভাবে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে । এর অন্যতম একটা কারন হিসেবে দেখানো হচ্ছে এটা মুলত নাস্তিকদের লড়াই ,বাম রা এর নেপথ্যে । রাজিবের মৃত্যুর পর এই ইস্যুটা আরো সামনে এসেছে । ব্লগার রাজিবের বিভিন্ন পোষ্ট কে রঙ মাখিয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকায় ।রাজীবের নাস্তিকতা নিয়ে পোস্ট গুলো লিখা হয়েছিলো মুলত গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বা তার কিছু পরে। তখন কেন এগুলো নিয়ে কথা হয় নি । যদি এই ইস্যুটা চিরন্তন হয় তাহলে তখনই তো (জুলাই-আগস্ট ২০১২)এটার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যেত । ইনকিলাব বা আমার দেশ গোষ্ঠী তখন তো এত সরব ছিল না । তাহলে এটা ধরে নেয়া কি খুব কষ্টকর হবে যে এই গণজাগরণকে দিকভ্রান্ত করার জন্যই এই রাজীব এবং নাস্তিক ইস্যু টাকে সামনে আনা হয়েছে ।

এবার আসি বিএনপির কথায়। দলটি কিছুদিন আগে তাদের মহাসমাবেশে এই ইস্যুটিকে আবারো সামনে এনেছে এবং ধর্মান্ধ রাজনীতিতে ঘি ঢেলেছে । সরকার বিরোধিতার নামে ধর্মান্ধতাকে উস্কে দিয়ে চরম দায়িত্ব হীনতার পরিচয় দিচ্ছে। সাধারন মানুষের ধর্ম ভীরুতাকে এরা পুঁজি করে , কিন্তু এরা বুঝতে পারে না জনগনের রাজনৈতিক তথা সাংস্কৃতিক মান কতদুর এগিয়েছে ।

সে দিন রাতে দিগন্ত টিভি তে একটা টক শো তে কাদের সিদ্দিকি শহিদ রাজিবের জানাজায় অংশ নেয়া হাজারো জনতাকে কটাক্ষ করে বলেছিলেন এটা কিসের জানাজা , এরা কি ওজু করেছিল , কারো মাথায় তো টুপি ছিল না । আমার দেশ পত্রিকাটি এ বক্তব্যটি আবার অতি যত্নে ছেপেছে । জামাত তো সেই ডাক্তার ইমামের শাস্তি দাবি করেছে । আমি বলব এটা শুধু জানাজা নয় , তার চেয়ে বেশী কিছু । এটা ছিল একজন শহিদ কমরেডের প্রতি হাজারো যোদ্ধার হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসার প্রকাশ । মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকির এ বিবৃতি দেখে শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আজাদের একটা বচন মনে পড়ে , রাজাকার চিরকালই রাজাকার ,কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা চিরকাল মুক্তিযোদ্ধা নয়।

সকালে ব্লগার আরিফ জেবতিকের প্রশ্ন এবং সমাধান নিয়ে লিখাটি পড়ে তাহরির আন্দোলনে এপ্রিল সিক্স এর অন্যতম সংঘটক আহমেদ মাহেরের অহিংস নীতির কথাই মনে হল। অনেক মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন । আরিফ জেবতিক লিংক

আই সি সি লিংক
নুরেম্বার্গ ট্রায়াল লিংক