ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

Facebook-acquires-video-ad-

একটা দৃশ্য চিন্তা করুন । একটি পরিবার, বাবামা এবং দুই ছেলেমেয়ে যারা চার কক্ষের একটি বাড়িতে থাকছে। এদের প্রত্যেকেরই একটি করে ল্যাপটপ আছে। ছেলেমেয়ে দুটো কলেজ সেরে নিজের রুম এ ঢুকছে প্যাকেটে রাতের খাবার বাবামা-ও একই ভাবে যে যার কক্ষে। রাতে একটা লম্বা সময় তারা স্যোশাল নেটওয়ার্কিং এ ব্যস্ত থাকছে ।পরের দিন আবার তারা মেটেরিয়ালিসটিক জীবনে ঢুকছে, বাবামা টাকা উপার্জন করছে আর ছেলেমেয়ে দুজন পরীক্ষায় পাস দিচ্ছে রাতে আবার নেট ওয়ার্কিং এ ব্যস্ত থাকছে । এভাবে বেশ কদিন যাবার পরে তাদের কাছ থেকে ল্যাপটপ, হ্যান্ডসেট, টিভি সবই নিয়ে নেয়া হলো । ল্যান্ডফোনটা অবশ্য ছিল । পরের দৃশ্যটি হচ্ছে তারা সকালে একসাথে ঘুম থেকে উঠছে , জগিং করছে, মল এ শপিং করছে এবং রান্নায় একে অন্যকে সাহায্য করছে । যেই টেকনোলজি তাদেরকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলো, তার অনুপস্থিতিতেই তারা একে অন্যের উপর নির্ভরশীলতাকে আবিস্কার করলো । এই সত্যি ঘটনাটি অপেরা উনফ্রে তার রিয়েলটি শোতে দেখিয়েছিলেন । আর পুরোপুরি না হলেও এর কিছুটা মিনি ভার্সন আমাদের দেশেও আছে অন্তত ছেলেমেয়েদের জীবন যাত্রায় । এই স্যোশাল নেট ওয়ার্কিং আমাদের পারিবারিক বা সামাজিক বন্ধন কে কতটা শক্তিশালী করছে? আর যদি নাই করে তাহলে আমরা কেন এই মেকি জীবন যাত্রার আফিমটা গিলছি?

ফেসবুক-অন লাইন সোস্যাল নেট ওয়ার্ক, যেটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে আট বছর আগে হার্ভার্ড ইউনিভারসিটির একটি হোস্টেলের ছোট্ট একটি রুম থেকে, আজকে এই নেট ওয়ার্ক ব্যাবহার করছে প্রায় ৮৫ কোটি গ্রাহক । দা ইকনমিস্ট ( লন্ডন বেসড) গত সপ্তাহের ইস্যু তে একটা আর্টিকেল ছেপেছে হেড লাইন ছিল ” দা সান নেভার সেটস”। অর্থাৎ এই ফেসবুক সাম্রাজ্যের ফেসবুকাররা পুরনো ইম্পিরিয়ালিসট বা ওই ঔপনিবেশিক সীমানা মেনেই যোগাযোগ করেন । সম্প্রতি ফেসবুক ২১৪ টি দেশের মধ্যে জরিপ করে দেখিয়েছে এদের ফেসবুকাররা তাদের পূর্বতন ঔপনিবেশিক শাসক দেশ যেমন ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন বা পূর্তগালের সাথেই বেশি যোগাযোগ রাখেন । মানে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ,পূর্ব আফ্রিকার দেশ গুলো এবং এই উপমহাদেশ সহ যাদের কিনা একটা বন্ধন ছিল ব্রিটেনের সাথে এদের লোকগুলো তাই করছে । একই ব্যাপার ঘটছে লাতিন আমেরিকার স্প্যানিশ বলতে পারা ফেসবুকার রা স্পেনের সাথে, তেমনি পূর্তগীজদের সাথে যোগাযোগ রাখছে ব্রাজিলীয়ানরা । ফেসবুকের টপ ব্রাসরা এ রিসার্চ টা করে বা ইকনমিসট এটা ছেপে আমাদের পুরনো ঔপনিবেশিক কানেকশনটাই হয়তো মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছেন। ব্যবসার জন্য কাউকে জোর করে নস্টালজিক বানানো আর কি!

আজকে আমার লিখার উদ্দেশ্য এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমটি নিয়েই । নিজেদের দায়িত্বশীল বলে প্রচার করা দা গার্ডিয়ানের (ইউ,কে) সংজ্ঞাটি আমার ভালো লেগেছে। ওরা ই-মেল, টেক্সট মেসেজ বা ফেসবুকিং -কে তিন ভাবে দেখিয়েছে। ই-মেল মানুষ করে খুব সিরিয়াস ব্যাপারে যেটা হতে পারে অফিসিয়াল বা ব্যবসায়িক ফর্মাল বিষয়ে, যেটার কলেবর অনেক বেশি হতেই পারে। আর মানুষ টেক্সট করে খুব জরুরি ব্যাপারে, অর্থাৎ যেটা এখনই জানানো দরকার । আর ফেসবুক এ দুটোর ব্যতিক্রম । এর আবেদনটি হচ্ছে এফিমেরাল বা ভীষণ ক্ষণস্থায়ী । যেটা হারিয়ে যায় নিমেষেই। তাহলে কেন এতো উন্মাদনা? ব্যাপারটা হচ্ছে আপনি এসব শ্যালো ফ্রেন্ডশিপ বা অগভীর সম্পর্ক নিয়ে ব্যাস্ত থাকুন ঘণ্টার পর ঘণ্টা । নাগরিক অধিকারের মতো সিরিয়াস ব্যাপার নিয়ে ভাবার জন্য তো রাষ্ট্র তো আছেই । অর্থাৎ রিলাক্স বস আমরা তো আছিই, আপনি চালিয়ে যান ।

আর রিলাক্স করতে যেয়ে আমরা বন্ধুদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়িয়েই চলেছি । ওদের সাথে যোগাযোগ করতে যেয়ে আমরা এতই ব্যাস্ত হয়ে পড়েছি যে আমার পাশের বাড়ির প্রতিবেশীটিকে অচেনা লাগে । এতো বেশি মানুশ তার সাথে যোগাযোগ করছে যে সে নিজেকে মিনি সেলিব্রিটি মনে করে । এই মানুষগুলো নিজের সেলফ ইমেজ নিয়ে এতই ব্যস্ত বা অবসেসড থাকে যে সে তার প্রোফাইল পিকচার বার বার বদলায় । সাইকোলজির ভাষায় এদের নারসিসিসট বা আত্মপ্রেমি বলে। এরা অন্যদের দ্বারা প্রশংসিত বা প্রত্যক্ষ্য (ওয়াচড) হতে দারুন ভালোবাসে । আর যদি সেটা ডেইলি বেসিস এ হয় তাহলে তো কথাই নেই । ফেসবুকের বদৌলতে এসব নারসিসিসট মনের সেলফিশ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এরা ইনস্ট্যান্ট গ্রাটিফিকেশন বা তাৎক্ষনিক আত্মতুষ্টি চায়। সমালোচনাকে এরা খুব এগ্রেসিভলি নেয়।

আচ্ছা, পাঠকই বলুন প্রতি মুহূর্তে স্ট্যাটাস আপডেট করার কি আছে ? আমার এক বন্ধু ফেসবুকে বাংলা এবং ইংরেজির চরম অবনমন দেখে তার সাথে যারা যোগাযোগ করতো তাদের কে সে দারুন ভাষায় লিখতে থাকল, উদ্দেশ্য একটাই ল্যাঙ্গুয়েজ সচেতনতা বাড়ানো । আমি বললাম যে যোগাযোগের কনসেপ্টটাই হচ্ছে হালকা, সেখানে একটা ছবির মন্তব্য “জোস হইছে” বলাটাই তো উচিত। চুলোয় যাক বাংলা বা ইংরেজি।

গত বছর ভালোবাসা দিবসের কোন এক টক শো তে আনিসুল হক (প্র,আলো) বলছিলেন এখনকার প্রেমিকদের-প্রেমিকাদের বিচ্ছেদে কাতর হতে হয় না। ফেসবুকের কল্যাণে তাদের জন্য পাইপ লাইনে অপেক্ষা করছে অন্তত কয়েকজন। এখনকার ভালবাসার মানুষরা প্রিয়ার চিঠি বুক পকেটে নিয়ে শহর দাপিয়ে বেড়ায় না, তারা চার দেয়ালের মাঝে চেয়ার টেবিলের অবরুদ্ধ সামাজিকতায় ব্যস্ত ।

প্রয়াত শামসুর রাহমান, সৈয়দ হক এনারা তাদের জীবনের একটা সেরা সময় কাটিয়েছিলেন পুরোন ঢাকার বিউটি বোডিং এর আড্ডায় (ষাট -এর দশকে)। স্বাধীনতার পরে তাদের লেখনিতে সেরা লিখা গুলোই বের হয়ে এসেছিলো । আর এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যানে আমরা জানি ফেস টু ফেস কম্যুনিকেশন কিভাবে আমাদের সৃষ্টিশীলতাকে উদ্দীপ্ত করে, আর ফেস বুকের মত পুউর নন ভারবাল স্কিল কিভাবে তাকে গ্রাস করে।

এতো কিছুর পরেও বলতে হয়, আহমেদ মাহেরের নেত্রিত্বে এপ্রিল সিক্স সংগঠনটি মিসরে আরব বসন্ত এনেছিল ফেসবুককে ব্যাবহার করেই । তাই কাজের কাজটি হবে টেকনোলজির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে টেকনলজি কেই আমাদের নিয়ন্ত্রন করা অর্থাৎ নিজেকে এর দাসে পরিনত না করে, টেকনোলজিকেই আমাদের দাসে পরিনত করা।