ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ইলিউশন বা মিথ্যে বিশ্বাসের উপর যে একটা অর্থনীতি টিকে থাকতে পারে সে কথাই আজকে বলতে চাচ্ছি। অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বলে একটা কথা আছে, যেটা আমাদেরকে শোনানো হয় বহু ভাবে বহু আঙ্গিকে। এর একটা উল্টো দিক সবসময়ে থাকে। অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় যদি আপনি একটা জিনিস উৎপাদন করে নিজেই কনসিউম করে ফেলেন তাহলে আপনি কিছুই উৎপাদন করেন নি। সেই অর্থে মাদার নেচার বা প্রকৃতি কোন দিনই কিছু উৎপাদন করে না। কারন প্রকৃতিতে বাড়তি সবকিছু রিসাইকেল হয়, স্বাভাবিক নিয়মে আপনি বেশি উৎপাদন করতে পারবেন না। আর যদি করতে যান মানে গ্রোথ বা প্রবৃদ্ধির জন্য তাহলে সেখানে নেচারকে বাইপাস করে বা ধ্বংস করেই করতে হবে। আর আপনি যদি উৎপাদন করতে যেয়ে শ্রমিকের বারোটা বাজিয়ে বা প্রানহানি করে কিংবা বায়ো ডাইভারসিটি ধ্বংস করেও যদি কোন না কোন ভাবে উৎপাদন বাড়াতে পারেন অর্থনীতির ভাষায় সেটাই প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন।

গত দু’বছর ধরে ভারতে দিল্লির আশেপাশে পাঁচটা মেগা টাউনশিপ এবং এক্সপ্রেস ওয়ে তৈরির জন্য জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছে । এর মধ্যে আবার একটা হবে স্পোর্টস সিটি ,আর তাতে থাকবে ফরমুলা ওয়ানের জন্য মোটর ট্র্যাক। আর এসব করতে যেয়ে কৃষকের কাছ থেকে জমি নিয়েছে একটি প্রতিষ্ঠান। কৃষককে তারা এজন্য প্রতি বর্গমিটারে ৩০০ রুপি করে দিয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি আবার ওই জমিটি মূল নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছে বর্গমিটারে ৬ লাখ রুপিতে। অর্থাৎ ২ লাখ % গ্রোথ অর্থনীতির ভাষায় ক্যাশ ফ্লো হচ্ছে আর ইকনমির পাই বা কেকটাও বড় হচ্ছে ।কিন্তু কেকটা খাচ্ছে কে? গরিব কৃষক?

এখানে একটা ফলস বিলিভ বা ইলিউশন তৈরি করা হয় , যত বেশি টাকা অর্থনীতিতে ঢুকবে ইকনমি তত সচল হবে এবং এটা আপনার জন্যও ভাল।উপরের প্যারাটি তে যে উন্নয়ন চিত্রটি এসেছে সেটা কার স্বার্থে , এটা কি আমাদের আসলেই দরকার ? আমার কথা হচ্ছে উন্নয়নটা কার জন্য? অবশ্যই কৃষকের জন্য না। এখানে যুক্তি হতে পারে কৃষক নিঃস্ব হবে কেন? হয়ে যাক না নির্মাণ শ্রমিক, দুবাই বা সউদিতে তো এর অনেক চাহিদা, সমস্যা কোথায় ? সমস্যা অনেক। দেশের কৃষি হবে তখন মনসানটো , ডাউ বা ডেবোর মত বায়োটেক কম্পানির দখলে । তারা আমাদের খাওয়াবে বিটি ধান , যেখানে ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল টক্সিন গুলো বিলট ইন থাকে। আর আমাদের এ থেকে হতে পারে সুদুরপ্রসারী ক্ষতি যেমন অরগান ড্যামেজ , ডায়াবিটিস, স্কিন অ্যালার্জি সহ অনেক কিছু। কারন ,এই বিটি যেটাকে আমরা হাইব্রিড বলি এটা গবাদি পশু খেলে তার ক্ষেত্রেও এ রোগ গুলো সৃষ্টি হয় । এগুলো নিয়ে আমেরিকা কোন এস্টাব্লীশড রিসার্চ করতে দেয় না ,কারন এই সিড জায়ান্ট গুলো সব আমেরিকান । আর ইউরোপ এসব রিসার্চ এ না যেয়ে তারা আগেই বিটি ফুড বর্জন করেছে বা লেভেল দিয়ে বিক্রি করছে। মানুষ যাতে অন্তত জেনে খেতে পারে। যার মূল্য অরগানিক খাবারটির প্রায় চার ভাগের এক ভাগ । আমেরিকায় বহু দিন ধরে এই বিটি বা জেনেটিক্যালি মডিফাইড ফুড(GM FOOD) গুলোর গায়ে লেভেলিং করার জন্য মুভমেন্ট হচ্ছে। প্রতি ১০ জনে ৯ জন আমেরিকানই এটা চায় । কিন্তু সরকার এটা করছে না । কারন ওবামার খাদ্য নিরাপত্তা কমিটিতে চিফ হচ্ছেন স্বয়ং মাইকেল টেলর তিনি কিনা আবার মনসানটোরও সিইও আবার সরকারি সংস্থা FDAর (FOOD AND DRUG ADMINISTRATION) প্রধান। এখানে সরকারকে কোন পলিসি মেক করতে হয় না । করপোরেট চিফ রাই ওবামা প্রশাসনে থাকেন এবং কাজের কাজটি করেন।

যারা বায়ো ডাইভারসিটির পক্ষে বা অরগানিক ফুডের পক্ষে কথা বলেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা উৎপাদনের বিপক্ষে এবং দারিদ্রতাকে আরও প্রলম্বিত করতে চান। ২০০২ এ মন্সান্টো যখন ভারতে ঢুকল তখন তারা তুলা চাষিদের টার্গেট করে বিটি কটন সিড বিক্রি শুরু করেছিল। এই হাইব্রিড বীজে তুলা উৎপাদন করতে যেয়ে কৃষক দেখল অত্যাধিক দামে সার, বীজ ও কীটনাশক কিনতে যেয়ে তাদের বাঁচাই মুশকিল হয়ে পড়ে। এসব থার্ড এবং ফোর্থ জেনারেশন কৃষকরা, যাদের তুলা বা সুতা উৎপাদনের দক্ষতা ছাড়া আর কিছুই জানা নেই তারা তখন যাবে কোথায় । এজন্যই গত এক দশকে প্রায় আড়াই লাখ কৃষক আত্মহত্যা করে এদের বেশির ভাগই হচ্ছে তুলা চাষি । এবং এরই মধ্যে মন্সান্টো শুধু ভারতে বিটি কটন থেকেই আয় করেছে দশ বিলিয়ন ডলার । এক্ষেত্রে দুটো কথাই ঠিক উৎপাদনও বেড়েছে, প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে ।কিন্তু সেটা কার কিছু দেশীয় এজেন্টের এবং মনসানটোর।

স্বাভাবিক ভাবেই বাঁচার তাগিদে বা ঋণ শোধের জন্য আমাদের দেশে এরই মধ্যে অনেক কৃষক ধান উৎপাদন ছেড়ে অন্য ফসলের দিকে ঝুঁকছে । ধান চাষ থেকে তরমুজ বা বাংগি চাষ যদি লাভ জনক হয় তাহলে তার দোষ কি । শুধু ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই শিউরে উঠতে হয়।

আবারো সেই প্রবৃদ্ধির গল্প বিনিয়গের গল্প বা ঝকঝকে তকতকে হবার তত্ত্ব । বাংলাদেশে এরই মধ্যে ভারতের সাহারা গ্রুপ নির্মাণ কাজে বিনিয়োগ করতে এসেছে। কিন্তু আমাদের এই বিনিয়োগের আদৌ কি কোন দরকার আছে? অনেকেই হয়ত বলবেন দেশীয় কন্সট্রাকশন কোম্পানি যারা ১০০% লাভ করে তাদের একটা শিক্ষা দরকার। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি সাহারা যখন এই ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা গুলো ডলারে কনভার্ট করে নিয়ে যাবে তখন দেশের মধ্যে ডলার-টাকার ভারসাম্য কোথায় যেয়ে দাঁড়াবে ।

১৯৪২ এ বাংলার দুর্ভিক্ষ নিয়ে অমর্ত্য সেন তাঁর এন্টাইটেলমেন্ট থিউরি প্রয়োগ করতে যেয়ে দেখিয়েছিলেন কি ভাবে যথেষ্ট ফলনের পরেও ২০ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা গিয়েছিলো। ( যে গবেষণা তাঁকে নোবেল সম্মাননা দিয়েছিল) ব্রিটিশ প্রভুরা খাদ্যের বিরাট একটা মজুত তখন ব্রিটেনে সরিয়ে নিয়েছিল। উৎপাদনের উপর অধিকার বা কতৃত্ত তখন কৃষকের বা দেশটির কারোই ছিল না , এখনও নেই। এই দুর্ভিক্ষ নিয়ে সলিল চৌধুরীর বিখ্যাত গন সংগীতটি (হেই সামালও ভাই ) মৃণাল সেন তার “আকালের সন্ধানে” ছবিতে ব্যাবহার করেছিলেন ,দেখিয়েছিলেন কিভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়। তখন ঔপনিবেশিক প্রভুরা চুরি করত। এখন দৃশ্যপট খুব একটা পাল্টায় নি । এখন বিদেশি কর্পোরেটরা তার দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি বা উৎপাদন বৃদ্ধি দেখিয়ে বিলিয়ন ডলার লাভ নিয়ে যায় । প্রতি বছরেই ৫ থেকে ৬% গ্রোথের মধ্যে কৃষিই নাকি দেয় ৩-৪%। এটা এমনই প্রবৃদ্ধি যেখানে চালের দামও কমে না কৃষকও হয় সর্বস্বান্ত ।

১৯৯৮ সালে ২৫ জুন নিউ ইয়র্কে মাইক্রো ক্রেডিট সামিটে ইউনুস যখন গ্রামিন মনসানটর জয়েন্ট ভেনচারের ঘোষণা দিয়েছিলেন এর পরে ৪ জুলাই এ নিউক্লিয়ার ফিসিসিস্ট ডঃ ভান্ডানা শিভা(এন্টি পেটেন্ট,এন্টি WTO, এন্টি GM FOOD এক্টিভিস্ট) একটা দীর্ঘ চিঠি লিখে জানিয়ে ছিলেন লিঙ্ক। এটা তোমার হাজারো ক্ষুদ্র ঋণ গ্রাহকের সাথে প্রতারনা হয়ে যাবে। সেদিন ব্লগার হৃদয়ে বাংলাদেশ ভাই জানালেন এই কৃতি সন্তানটি ২০০৬ এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মনসানটো কে ঢোকানোর একই চেষ্টা করেছিলেন ।আরেকজন আবেদ সাহেব টাঙ্গাইলে ব্রাকের কৃষকদের কাছে ৯৬ এর আওয়ামি সরকারের সময়ে বন্যায় খাদ্য ঘাটতির কারন দেখিয়ে সরকারের অনুমতি নিয়েই মনসানটর বীজ কৃষকদের দিয়েছিলেন । নোবেল ইউনুস এবং স্যার আবেদ দুজনই ছিলেন এবার হিলারি ক্লিনটনের সবচেয়ে গুরুত্তপুর্ন সাক্ষাতকার প্রার্থী ।