ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

গত ২৬ তারিখ আগারগাঁওয়ে মহিলা পলিটেকনিকে ছাত্রীদের সড়ক অবরোধের সময়ে ছবি তুলতে যেয়ে তিনজন সাংবাদিক পুলিশের দ্বারা নির্যাতিত হন । সরকার নাকি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সদের পদবী ২ থেকে ৩ এ নামিয়ে দিয়েছে আর সে জন্যই ছাত্রীদের এ প্রতিবাদ।সরকার অবশ্য এ ধরনের কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা অস্বীকার করেছে। দেশের আরও কিছু ইনস্টিটিউটেও আন্দোলনের খবর হয়ত পাওয়া গেছে ।পুলিশের অতি তৎপরতার কারনে ছাত্রীদের আন্দোলন হাইলাইটেড হয়েছে বা সাংবাদিকরা আহত হয়ে ছাত্রীদের আন্দোলনের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে , দুটির যেকোনোটিই হতে পারে। আমার লিখার বিষয় এর কোনটিই নয়।

আর একটি ঘটনা হল বহু দিন ধরে বেসরকারি প্রাইমারি শিক্ষকরা তাদের চাকুরি টিকে রেগুলার করার জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবেই আন্দোলন করছিলেন , এরই ধারাবাহিকতায় তাঁরা গত ১৫ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে স্মারকলিপি দেবার জন্য শান্তিপূর্ণ ভাবেই অগ্রসর হবার সময় শাহবাগে পুলিশ তাদের গতিরোধ করে জল কামান এবং বেদম লাঠিচার্জ করে । অনেক শিক্ষক আহত হয়েছিলেন । একজন শিক্ষক পরে পরে মারা গিয়েছিলেন । উনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধাও।

দুই ঘটনায় পুলিশ জড়িত । শাহবাগের ঘটনাটিতে শিক্ষকদের উপর পুলিশের নির্মম অংশগ্রহন এবং সে সম্পর্কিত পত্রিকায় ছবিগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। পুলিশ,মন্ত্রি,আমলা থেকে শুরু করে আমরা যে কেউই আমাদের জীবনের প্রথম শিক্ষাগুরুদের বা যাদের কাছে আমরা পাঠদান পেয়েছিলাম বা পেয়ে থাকি তাদের শ্রদ্ধার আসনেই রাখি।এ অনুভূতিটাই আমাদের শান্তি দেয়। এটাই তো মূল্যবোধ ।

শাহবাগের ঘটনায় পুলিশের কিচ্ছু হয়নি আর পলিটেকনিকের ঘটনায় ছজন পুলিশ বরখাস্ত হয়েছেন সাময়িক ভাবে। তার মানে টা কি ? মানে সাংবাদিকরা শিক্ষকদের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ(তাও আবার একটি শীর্ষ দৈনিকের সাংবাদিক বলে কথা) । না হলে দুটি ঘটনায় সরকারের দু রকম আচরণ হবে কেন ?পুলিশের এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন মস্তিস্কগুলো আবার আহত সাংবাদিকদের দেখতে গিয়েছেন ,সান্তনা জানিয়েছেন।আর অন্যদিকে কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল। হায়রে মূল্যবোধ , তুই কোথায় ?

তবে এটাই মনে হয় ঠিক। সাংবাদিকেরাই তো গুরুত্বপূর্ণ । উনারা আপনার ঢোল বাজাবেন আবার প্রয়োজন মতো ঢোল ফুটোও করে দিতে পারেন । তাই তো এনারা গুরুত্বপূর্ণ । কোথাকার কোন শিক্ষক সরকারকে নাড়াবে, প্রশ্নই আসে না । মূল্যবোধের এই দেউলিয়াপনা আমরা রাষ্ট্র যন্ত্র থেকেই শিখি। এজন্যই দুর্নীতি হয়, স্বজনপ্রীতি হয় , সব অনিয়ম দেখেও আমরা চোখ বুজে থাকি।

আশির দশকের শেষে আইএসএসবি(সামরিক বাহিনিতে ভর্তি) পরীক্ষার নিমন্ত্রন পত্র পেয়েও যখন অংশগ্রহণ করি নি তখন আমার এক কাছের আত্মীয় বলেছিলেন বাবা ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে গেলে না, টিকেই তো যেতে , দেশের প্রেসিডেন্ট হতে পারতে। তখন দেশের সামাজিক বাস্তবতায় (জিয়া এবং পরে এরশাদের প্রতাপ দেখার পরে) ওনার এ বক্তব্যটাই ছিল স্বাভাবিক । ওনার এ উপলব্ধিটা সে সময়কার বিদ্যমান নীতিহীনতাকেই দেখায়। আর এখনকার বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় এখন থেকে শিক্ষক পেটানকেই স্বাভাবিক ধরে নেয়া হবে।

যে সরকারটি পরিবর্তনের কথা বলে ক্ষমতায় এসে কেবল নিজেরই অবস্থার পরিবর্তন করে, যে পত্রিকাটি বদলে দেবার কথা বলে বিদ্যমান অর্থনৈতিক কার্যকলাপ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়কে চালু রাখে , যে সাংবাদিকরা ব্যক্তিগত লাভক্ষতির কথা চিন্তা করে সহকর্মীর নির্মম হত্যার বিচার চাইতে কুণ্ঠিত হয়, আমাদেরই উচিত এদের মুখোশ উন্মোচন করা ।