ক্যাটেগরিঃ কৃষি

বাংলাদেশ ও কৃষি একই সূত্রে গাঁথা । পুঁজিবাদের এরাম রাজত্বের ও বাংলাদেশকে আধা সামন্তবাদী কৃষি প্রধান দেশের তকমা দেওয়া হয়। শহরমুখী গনমাধ্যমে কৃষির জন্য স্থান নগন্যই বলা চলে । তারপরেও যতটুকু জায়গা জুড়ে কৃষি থাকে তা কর্পোরেট কৃষি এবং নেতিবাচক সংবাদে ঢাকা থাকে। গনমাধ্যমে আজ বহুলাংশে- ঢাকা উফশী ও হাইব্রিড ধান মুখী যা সার- কীটনাশকের বেশি ব্যবহারকেই উৎসাহিত করে । গনমাধ্যমে থাকেনা আমাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে চাষাবাদের কথা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১০ অনুযায়ী ২০০৯-১০ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের কৃষির অবদান ছিল ২০.১৬ শতাংশ এবং মোট জনসংখ্যার ৪৩.৬ শতাংশ এখনো কৃষি কাজে নিয়োজিত। সে তুলনায় আমাদের গনমাধ্যমে দ্বিদলীয় রেষারেষির রাজনীতির খবর বেশি গুরুত্ব পায়। যতটা জুড়ে কৃষি সংবাদ থাকে তা আধুনিক কৃষির কথা বলে যা এক অর্থে কর্পোরেট কৃষি সংবাদ।

আধুনিক কৃষি নিয়ে কিছু কথা
১৯৬০ দশকে রকফেলার ও ফোর্ড ফাউন্ডেশন এবং মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় লাল বিপ্লবকে ঠেকাতে সবুজ বিপ্লবের তত্ত্ব পাচার করে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশ গুলোতে। পাল্টে যায় আমাদের কৃষির ইতিহাস ও মনস্তত্ত্ব । প্রথম দিকে ইরি ধানের উৎপাদন বাড়লেও কয়েক বছরের মধ্যে ইরি ধানের উৎপাদন কম হওয়ার কারণে কৃষক আরো বেশি সেচ, সার প্রয়োগ করতে থাকে। এর ফলে দেশের অধিকাংশ জমি উর্বরতা ইরিয়ে এক ফসলী জমিতে পরিণত হয়। হারিয়ে যায় ৭ থেকে ১২ হাজার ধানের জাত। ইরির মতো উফশী ধানের পর বিশ্বব্যাংক ও আর্ন্তজাতিক ধান গবেষনা প্রতিষ্ঠান (ইরি) হাইব্রিড ধানের প্রেসক্সিপশন দেয়। হাইব্রিড ধানের বীজ থেকে দ্বিতীয় বার বীজ উৎপাদন করা যায় না। একইভাবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কপোরেশনের কাছ থেকে বীজ উৎপাদন ও আমদানি চলে যায় এসিআই, ব্যংাক, প্রশিকা, সিনজেন্টার মতো বড় বড় আমদানিকারকদের কাছে। শুধু ২০০৮ সালেই বেসরকারি খাত দিয়ে আমদানি হয়েছে ৪০০ কোটি টাকার হাইব্রিড বীজ। বীজ আমদানির পুরোটাই বেসরকারি খাতে চলে যাওয়ার কৃষক এখন এসব আমদানিকারকদের হাতে জিম্মি।

আধুনিক কৃষির আরেক কারসাজি প্যাটেন্ট। ২০০৭ সালে আন্তজাতিক ধান গবেষনা প্রতিষ্ঠান (ইরি) হাইব্রিড ধান গবেষনা কনসোর্টিয়াম গঠন করে। এখন সেই কনসোর্টিয়াম মাধ্যমে ইরি তার কাছে সংরক্ষিত হাজারো ধানের জাতে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের গবেষনার জন্য খুলে দেয়। এর ফলে সিনজেন্টা, মনসান্টোর মতো কোম্পানি গুলো ইরিতে সংরক্ষিত ধানের কিছু পরিবর্তন করে নতুন হাইব্রিজ বীজ উৎপাদন করে তা আবার ধান উৎপাদনকারি দেশগুলোতে বিক্রি করছে। অথচ এ বীজের উৎস হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনামের মতো দেশ গুলোতে থেকে সংগৃহীত হাজারো ধানের জাত। এখন কইয়ের তেলে কই ভাজার মতেই অবস্থা। অধুনিক কৃষির নামে অধিক উৎপাদনের লোভে পড়ে সার, কীটনাশক ব্যবহার করছে। কীটনাশকের বিষে মারা পড়ছে পরিবেশের জন্য উপকারী প্রাণী বৈচিত্র্য। হাইব্রিড ধানে সেচ বেশি লাগে। দিনকে দিন তাই ভূগর্ভের পনি স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভের পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার দেশের আর্সেনিক দূষনের অন্যতম কারণ। এভাবেই আধুনিক কৃষি অধিক উৎপাদনের লোভ দেখিয়ে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। সার-বীজের উপর নির্ভরশীল করে তুলেছে।

গনমাধ্যমে কৃষি সংবাদঃ
পুঁজিবাদের এ জমানায় গনমাধ্যম কাঙাল হরিনাথদের মতো সেবার মানসিকতা নিয়ে থাকে না। গনমাধ্যমের অডিয়েন্স বাইরে আমাদের সনাতনী কৃষি সংবাদ গনমাধ্যমে স্থান পায় না। ধানের বাম্পার ফলন হলে, কৃষক হিমাগারে আলু রাখার জায়গা না পেলে- তা সংবাদ পত্রের প্রধান শিরোনাম হয় না। বাংলাদেশে ব্যবসায়ী গ্র“পগুলোর মালিকানাধীন পত্র-পত্রিকার কর্মসূচী সাধারন ভাবে প্রাইভেট সেক্টরের স্বার্থরক্ষা করা। আমরা কৃষি সংবাদের ক্ষেত্রে পত্রিকার সাথে টিভি চ্যানেল গুলোকেও এর সাথে মিলিয়ে পড়তে পারি। তা না হলে চ্যানেল গুলোর কৃষি সংবাদে হাইব্রিড বীজের কুফল নিয়ে প্রতিবেদন আসত। যে হাইব্রিড বীজের কারনে আমাদের দেশীয় ধানের জাত বিলুপ্তির মুখে। সে হাইব্রিড বীজ নিয়ে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো নিশ্চুপ। চ্যানেল আইয়ে কৃষি সংবাদের জন্য আলাদা স্লট আছে ভালো কথা। কিন্তু এ সংবাদের শিরোনাম ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে সুজলা- সুফলা হাইব্রিড বীজের নামে। এখন সর্ষেতেই ভূত। চ্যানেল আইয়ের হৃদয়ে মাটি ও মানুষের পাশাপাশি বাংলভিশনের শ্যামল বাংলা নামের কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। এ দুটো অনুষ্ঠানই কৃষিকে পোল্ট্রি ফার্ম, গরু মোটাতাজা করন, স্ট্রবেরি চাষ আর ছাদে পেয়ারা চাষে নামিয়ে এনেছে। এ ধরনের কৃষি সংবাদ প্রান্তিক কৃষকদের কোন উপকারেই আসে না। অথচ আমদানিকৃত জীব, সার, কীটনাশক ব্যবহারের জন্য ফি বছরই কৃষকের ব্যয় বাড়ছে। অথচ গনমাধ্যমে এ বিষয়ে নীরব। কারণ বর্তমানে গনমাধ্যম কর্পোরেট পুঁজির নিরাপদ প্রবাহের অতন্দ্র প্রহরী।

আর পত্রিকার কৃষি পাতায় ফিচার প্রতিবেদন সাধারন কৃষক পড়ে বুঝতে পারবে না। এসব ফিচার, প্রতিবেদনে থাকে হেক্টর, সেন্টিমিটার, মিলিগ্রামের গাণিতিক পরিমাপের উপর ভিত্তি করে চাষাবাদ পদ্ধতি। যা একজন কৃষিবিদের কাছেই বোধগম্য, সাধারন কৃষকের কাছে নয়। কৃষির কথা বলতে গিয়ে চলে আসে শাইখ সিরাজের নাম। তিনি বাংলাদেশ আধুনিক কৃষির এক বড় প্রবক্তা। তাই তিনি সর্বদাই হাইব্রিড বীজ, সার, নতুন প্রযুক্তির পক্ষে গুন গান গেয়ে যান। কৃষককে উৎসাহিত করেন এসব ব্যবপারে। তিনি কখনোই বলেন না বহুজাতিক কোম্পানির সার, বীজ, সেচের যন্ত্র ব্যবহারের ফলে কৃষক যে এসব কোম্পানির উপর নির্ভরশীল হয়ে যাচ্ছে তার কথা। তিনি তার বইয়ে ও বন্ধ্যা হাইব্রিড বীজের পক্ষে গুন গান করেন এভাবেই, খাদ্য চাহিদা পূরনের প্রশ্নে……. হাইব্রিড ধানের কোনো বিকল্প নেই। তাই শাইখ সিরাজের কৃষিসংবাদ আর হৃদয়ে মাটি মানুষ পুরো পুরি কর্পোরেট বহুজাতিক কোম্পানির অনুগামী।

ষাটের পশকের সুবজ বিপ্লবের ভূত এখনও আমাদের গনমাধ্যমের উপর সওয়ার। যার কারনেই আজ গনমাধ্যমে কৃষি আধুনিক প্রযুক্তি হাইব্রিড বীজ, কীটনাশক মুখী। কিন্তু আধুনিক এ কৃষির বাইরেও আমাদের সনাতন কৃষি আছে। যা আমাদের পরিবেশের সাথে মানানসই। কিন্তু কর্পোারেট পুঁজির প্রহরী গনমাধ্যম আমাদের সনাতনি কৃষিকে অবহেলা করে আধুনিক কৃষিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। আমাদের কৃষক সমাজ এ আধুনিক কৃষির নামে কি আজীবন বহুজাতিক কোম্পানির শৃঙ্খলে বাঁধা থাকবে? গনমাধ্যমের এ ভূমিকা নিয়ে “প্রগতিশীল” মিডিয়া ক্রিটিকরা একটু ভাবছেন কি?

তথ্যসূত্রঃ
১.শাইখ সিরাজ-মাটির কাছে,মানুষের কাছে
২.বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১০
৩.প্রথম আলো -২৪ জুলাই ২০১০
৪.|www.somewhereinblog.net/monjuraul/28864272