ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

রাকিব মোজাহিদের গল্প পড়তে শুরু করার দু’মিনিটের মাথায় পাঠক টের পায়, লেখক তাকে নিঃশব্দে আহ্বান জানাচ্ছেন- ‘আইসেন বাহে! গপ্পো শোনেন!’ এবং আরো দু মিনিট বাদে পাঠক টের পায়, সে ইতিমধ্যেই এ গল্পকারের কলমের সামনে ল্যাটা মেরে বসে পড়েছে। রাকিবের গল্প বলার ঢং এ এমনই এক সম্মোহনী শক্তি রয়েছে যে, তার গল্প না শুনে উপায় থাকে না। তিনি আদ্যিকালের গ্রামীণ দাদুদের মতো করে গল্পের বয়ান শুরু করেন আর আমরা পাঠকরা নিজের অজান্তেই বালক-বালিকার মতো তার চারপাশে গোল হয়ে বসে পড়ি।

সময়টা ভার্চুয়াল। শহর তো বটেই, এখন গ্রামের দাদু-নানুরাও পাটিপাতা উঠোনে নাতিপুতিদের নিয়ে গল্পের আসর জমান না। সাদা জোছনায় যখন বাড়ির কালো উঠোন ভেসে যায় তখন দাদুরা মনের সুখে নাতিদের নিয়ে ‘কিরণমালা’ উপভোগ করেন। আর শহরগুলোতে রাত যত গভীর হয়, ফ্ল্যাট বাড়ির ছোট ছোট কামরায় জ্বলে ওঠে নীল আলো। সারা দিনের ক্লান্ত নগরবাসীকে দু দণ্ড শান্তি দেয় ফেসবুকের নীল দুনিয়া। এক একটা নগরবাসী যেন এক একটা মাকড়সা; ইন্টারনেটের জগতে জাল বিছিয়ে দিয়ে বসে থাকে সে জালেরই মধ্যিখানে। এহেন প্রযুক্তিবান্ধব সময়ে রাকিব যখন হাজির হন চিরায়ত গ্রামীণ গল্পকথকের ভূমিকায় তখন বিস্ময় জাগে। কার এত সময় আছে ‘গপ্পো’ শোনার?

কিন্তু কেউ যদি একবার ভুল করে পড়তে শুরু করে রাকিবের গল্প তার আর নিস্তার নেই। তাকে গল্প শেষ করতেই হবে। আগেই বলেছি, পাঠক ভুলে যায় কখন সে বসে পড়েছে গল্পকারের সামনে। রাকিবের গল্পে রয়েছে সেই শক্তি যা এক হাজার এক রাত পর্যন্ত জাগ্রত রেখেছিল বাদশা নমদার শাহরিয়ারকে। রাকিব যেন সহস্র বছর পর শেহেরজাদী হয়ে জন্মেছেন এ ভূ-বাঙলায়। তিনি যদিও অলিফ লায়লা কিংবা আলী বাবা ও চল্লিশ চোরের গল্প শোনান না; ব্যঙমা-ব্যঙমী, ডালিম কুমার, কিংবা শুয়োরানী দুয়োরানীর গল্পও শোনান না; তিনি আমাদের জীবনেরই গল্প শোনান। সে গল্পে একজন মা থাকেন, বাবা থাকেন, মৃত হয়ে যাওয়া দুটো বোন, একটা ভাই আর জীবীত দুটো ভাইও থাকেন। কখনো কখনো সে গল্পে উঁকি দেন একজন বৃদ্ধ দাদি। খুব সাধারণ মানুষের মতো এই চরিত্রগুলোও হাসে, কাঁদে, বড় হয়, বুড়ো হয় এবং মরেও যায়। মৃত্যু দিয়ে শুরু হয় গল্প, শেষও হয় মৃত্যু দিয়ে। মাঝখানে বয়ে যায় জীবন। (গল্পের নাম: নির্বাক কথকতা)

rakib

কিন্তু রাকিবের বিশেষত্ব হচ্ছে এই, তিনি এত সরল পথে জীবনের সুখ-দুঃখ বয়ান করেন না। তাঁর গল্পের পরতে পরতে থাকে চাপা উত্তেজনা, যা পাঠককে টেনে নিয়ে যায় একেবারে গল্পের শেষ লাইন পর্যন্ত। তিনি মৃদু ভাষায় ছোট ছোট বাক্যে গল্প বলে যান। ফলে পাঠকের মনে বিরক্তি আসে না। আর তিনি কোনো ইউটোপিয়ার রাজ্য থেকে গল্পের পটভূমি হাজির করেন না-আমাদের দেখা জীবনই নতুন করে দেখান বলে সে গল্পের সঙ্গে আমরা একাত্ববোধ করি। রাকিব তার গল্পে উপমা ব্যবহার করেন অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ। ফলত তা আমাদের মনে দাগ কেটে যায় অতি সহজেই। ঠিক যেমন করে দাগ কেটে আছেন শৈশবের দাদু নানু কিংবা একজন শেহেরজাদী।

আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়। রাকিব তাঁর সাহিত্যচর্চাকে শুধু আয়না হিসেবে ব্যবহার করেন না। তিনি সাহিত্যচর্চাকে আদর্শ প্রচারের একটি মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করেন। রাকিব মনে করেন, তিনি যে আদর্শ লালন করেন তা বৃহত্তর পাঠকের কান অব্দি পৌঁছানো প্রয়োজন। তাই শোষিত, বঞ্চিত, অত্যাচারিত, লাঞ্চিত, প্রতারিত মানুষরা প্রতিবাদী হয়ে উঠবে একদিন; একদিন মানুষ জাগবে ফের—এই আদর্শের কথা ঘুরে ফিরে বলে যায় রাকিবের সৃষ্ট গল্পের চরিত্ররা। ঘর ছাড়ার গল্প পড়তে বসলে পাঠক দেখতে পাবেন একজন প্রতিবাদী রেজওয়ানাকে, যিনি প্রতারক প্রেমিককে খুন করতেও পিছপা হননি। মোখলেসের খাওয়া না খাওয়া গল্পেও পাওয়া যায় এমন একজন প্রতিবাদী মোখলেসকে।

রাকিবের বেশিরভাগ গল্পের পটভূমিই উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা এলাকাকে ঘিরে। তাই তার গল্পপাঠে পাওয়া যায় শিকড়ের আস্বাদ। পাওয়া যায় নিখাদ মাটিলগ্ন ভাষা আর জীবনলগ্ন সংস্কৃতির নির্যাস। আপনি যখন পড়বেন ‘বাপে যাক চুদির ভাই কয়া গাল পাড়ে তার আর মানসম্মান! মোর চৌদ্দ গুষ্টির কেউ তো আর মোর নাকান না খায়া থাকে নাই যে চুরি চামারি করবে’ তখন আপনার অজান্তেই মনে পড়ে যাবে একটি খোয়াবনামাকে; একজন ভবানী পাঠককে। রাকিবের শক্তি সম্ভবত এখানেই। তাঁর গল্পের ভাষা পাঠককে ভাবায়, তাঁর গল্পের পটভূমি পাঠকে ভাবায়, তাঁর গল্পের চরিত্ররা পাঠকের চিন্তার জগৎ ধরে নাড়া দেয়।

সমকালীন তরুণ গল্পকারদের মধ্যে রাকিব অপরাধী পর্যায়ের নিভৃতচারী। তিনি এতটাই প্রচারবিমুখ এবং আত্মকেন্দ্রিক যে, কোনো লিটলম্যাগ, সাহিত্য পত্রিকা কিংবা দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর গল্প পাঠানোর প্রয়োজন অনুভব করেন না। সাহিত্য সম্পাদকদের দিনের পর দিন অনুরোধ এবং তাগাদার পর তিনি হয়তো একটি গল্প পাঠান। এ ব্যাপারে রাকিবের ভাষ্য কী? ‘আমি এখনো প্রকৃষ্ঠরূপে প্রকাশযোগ্য হয়ে উঠিনি। নিজের নির্মাণকালই তো সমাপন হয়নি এখনো। আগে নিজেকে তৈরি করে নিই, তারপর প্রকাশিত হওয়া যাবে পাঠকের সামনে।’

আমি মনে করি, লেখকের নির্মাণযজ্ঞ দেখতে পারাও পাঠকের জন্য বিরল সৌভাগ্য। রাকিব মোজাহিদ কেন পাঠককে সেই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত কবরেন? রাকিবের কাছে তাই পাঠকদের পক্ষ থেকে দাবি, আপনি গুহা থেকে বেরিয়ে আসুন, পাঠকের সামনে প্রকাশিত হোন। আপনার নির্মাণপ্রক্রিয়া উপভোগ করতে চায় পাঠকরা।

ট্যাগঃ:

মন্তব্য ৩ পঠিত