ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

বই বিক্রি হয় না বলে প্রকাশকদের পক্ষে থেকে দীর্ঘদিন ধরে যে বিতর্ক জিয়ল মাছের মতো জিইয়ে রাখা হয়েছে, সে বিতর্কের অবসান হয়ে গেছে বলে মনে করি। কারণ যার ঘটে বিন্দুমাত্র বুদ্ধি রয়েছে তিনি বুঝবেন, বই বিক্রি না হলে ফি বছর লাখ টাকা খরচ করে বইমেলায় বেসাতি সাজিয়ে বসতেন না মহামতি প্রকাশকগণ। তাছাড়া তথ্য প্রমাণাদিও এহেন যুক্তির স্বপক্ষেই রয়েছে, যেমন: বিডি নিউজের প্রতিবেদন মারফত জানা যাচ্ছে, গত বছর (২০১৭) শুধু বইমেলাতেই ৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছে; যা ২০১৬ সালের চেয়ে ২৩ কোটি টাকা বেশি। এ বছরও বেশুমার বই বিক্রি হচ্ছে, তা বই মেলায় গেলেই চাক্ষুস দৃশ্যমান হয়।

তারপরও লেখক মারফত শোনা যায়, তাঁরা রয়্যালটি পান না। কবি চঞ্চল আশরাফ বলছেন, ‘শুদ্ধস্বর আমার দুটি বই বের করেছে। উপন্যাস করেছিল ২০১১ সালে। চুক্তিপত্র হয়েছিল। একটা টাকা পাওয়া যায়নি। ২০১৩ সালে প্রকাশিত কবিতার বই থেকেও কিছুই আসেনি। লেখক কপিও ৯টির বেশি দিতে পারেনি প্রকাশক। বলাকা প্রকাশনী আমার কবিতার চতুর্থ বই বের করেছিল ২০০৮ সালে। প্রকাশক বলেছিলেন, বই বিক্রি হয়নি। আমি অবিক্রীত বইগুলো দেখতে চেয়েছিলাম। দেখাতে পারেননি’ (সূত্র: সাম্প্রতিক দেশকাল, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। এ বিষয়ে কবি শোয়াইব জিবরানের বক্তব্য: ‘আমি শিক্ষা-সংক্রান্ত যত বইপত্র লিখেছি, সবগুলো থেকেই হাই রয়্যালিটি পেয়েছি বা পেয়ে থাকি। সাহিত্যের ক্ষেত্রে একমাত্র বাংলা একাডেমির বইগুলোর রয়্যালিটি পেয়েছি। বেসরকারি প্রকাশনা থেকে পাইনি। বরং প্রায় প্রতারণার শিকার হয়েছি। যেমন বই প্রকাশের মাঝখানে টাকা ধার নেওয়া হলো কাগজ কেনার নাম করে, সেই টাকা আর দেননি প্রকাশক। রয়্যালটি তো দূরের বিষয়।’ (সূত্র: সাম্প্রতিক দেশকাল, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)।

গল্পকার নুরুন্নবী শান্ত বলছেন, আমার চোখের সামনে আমার প্রথম বই প্রায় শ দুয়েক কপি বিক্রি হলো। কিন্তু প্রকাশক মাওলা ব্রাদার্স (মাহমুদ ভাই) বললেন, বেচা-বিক্রি নাই। আমি রয়্যালটি চাওয়ার উৎসাহ পেলাম না। পরের বইটাও তিনি করলেন, আমি সেবার একদিনের বেশি বইমেলায় যেতেই পারলাম না, একটা কাজে নেপাল গিয়ে বসে থাকলাম পুরো ফেব্রুয়ারি, ফিরে আসার পর ফোন দিলাম খবর জানার জন্য, প্রকাশক বললেন, ‘আপনার বই বের হলো আর আপনি মেলায় এলেন না, বই তো চলে নাই!’

তবে রয়্যালটি বিষয়ক সবচেয়ে বিষ্ফোরক খবর বেরিয়েছিল ২০১১ সালে। সে বছর বইমেলার আগে আটজন স্বনামধন্য কবি-সাহিত্যিক বাংলা একাডেমির কাছে নালিশ জানিয়েছিলেন ‘ঐহিত্য’ নামের একটি প্রকাশনীর বিরুদ্ধে এই বলে যে  ঐতিহ্য তাদেরকে রয়্যালিটি দেয়নি।(সূত্র: বিডিনিউজ, ২০ জানুয়ারি ২০১১)।

এসব ঘটনার মাধ্যমে প্রধানত দুটি বিষয় আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি। প্রথমত: লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক। দ্বিতীয়টির কথা একটু বলে বলছি। তো কি নাম দেয়া যায় এ সম্পর্কের? ইঁদুর-বিড়াল? ইত্যবসরে মনে পড়ছে ফরাসি সাহিত্যিক ভিক্টর হুগোর সেই কালজয়ী চিঠির কথা। গল্পটা আপনারা জানেন, তবু আরেকবার বলি: ভিক্টর হুগো তাঁর বই কেমন বিক্রি হচ্ছে, তা জানতে প্রকাশককে চিঠি লিখলেন, ‘?’, মানে বিক্রি কেমন? সুরসিক প্রকাশক উত্তরে লিখলেন, ‘!’, অর্থাৎ দারুন!

চিঠির যুগ তিরোহিত। এখন ইমেইল-ফোনের যুগ। তো এই যুগে লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক কেমন? গতকাল (১৮ ফেব্রুয়ারি) কবি মিছিল খন্দকার তার ফেসবুক ওয়ালে একটি পোস্ট দিয়েছেন। ওই পোস্ট পড়লেই খানিকটা ধারনা লাভ করা যাবে সাম্প্রতিক লেখক-প্রকাশক সম্পর্ক বিষয়ে। মিছিলের স্ট্যাটাস: ‘এবার মেলায় জেব্রাক্রসিং প্রকাশনা থেকে আমার দ্বিতীয় কবিতার বই আসার কথা ছিল। প্রকাশক প্রথমে ৫ তারিখ, তারপর ৮ ও ১০ তারিখ বই আনার কথা বলে আজ পর্যন্ত বইটা আনতে পারেননি। বইটা করার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর থেকে তাকে যখনই ফোন দিয়েছি পাওয়া যায়নি। পরে ফোন ব্যাকও করেননি। এমনকি ইনবক্সেরও রিপ্লাই পাইনি। তার কাছ থেকে এ বই সংক্রান্ত আরো নানা অপেশদার আচরণের প্রকাশ পেয়েছে। এখন মেলার এই পর্যায়ে এসে আমার বইটা আসা মানে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এমতাবস্থায় আমি বই করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছি বলে প্রকাশককে জানিয়ে দিয়েছি। ফলে ‘পুষ্প আপনার জন্য ফোটে’ এবারের মেলায় আসছে না। এই সিদ্ধান্তের পরও বইটা মেলায় আনা হলে সেটা আমার সিদ্ধান্ত ইগ্নোর করা হবে।’

আরেক তরুণ কবি রিক্তা রিচির সঙ্গে কথা হচ্ছিল বই মেলা প্রাঙ্গনে। তিনি বিরস বদনে জানালেন, তাঁর কবিতার বইয়ের পাণ্ডুলিপি জমা দেয়া আছে এক স্বনামধন্য প্রকাশনীর কাছে। প্রকাশনী প্রধান আজ আনবেল কাল আনবেন বলে বলে মেলার ১৭তম দিনেও বই আনতে পারেননি। সেই মাহাত্মন প্রকাশক এখন ওই তরুণ কবির ফোন ধরেন না। ইমেইলের জবাব দেন না। ফেসবুকের ইনবক্সেও রিপ্লাই দেন না।

দ্বিতীয়ত, রয়্যালটি। বাংলা একাডেমি গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, গত বছর বই মেলাতে ৬৫ কোটি টাকার ওপর বই বিক্রি হয়েছে। যদি ১৫ শতাংশ রয়্যালিটিও ধরা হয়, তাহলে ৬৫ কোটির হিসেবে লেখকেরা ৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা পাওয়ার কথা। বাংলাদেশে লেখকের সংখ্যা ২০০-এর বেশি নয়। সৌখিন ও নিজের টাকায় বই করা লেখকের সংখ্যা আরও হয়তো ৫০০ হবে। তার মানে মোটামুটি সাত শ’ থেকে একহাজার লেখকের মধ্যে এই ৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ভাগ হওয়ার কথা। আসলেই কি লেখকদের মধ্যে সেই টাকা বণ্টন হয়েছে?

অতএব, ‘রয়্যালটির প্রদান’ কাজটাকে প্রকাশকরা যে নিতান্ত অপছন্দ করেন, সে বিষয়েও আর বিতর্কের অবকাশ রইল না; কেননা পূর্বোক্ত ঘটনাবলির মাধ্যমে তা প্রমাণিত। তবে কোনো কোনো প্রকাশক কোনো কোনো লেখককে কচিৎকদাচিৎ রয়্যালিটি দেন বৈকি। এতদবিষয়ক প্রমাণাদিও রয়েছে পত্রিকার প্রতিবেদনে। কবি চঞ্চল আশরাফ বলছেন, ‘রোদেলা প্রকাশনী আমাকে কিছু টাকা দিয়েছে। এর আগে গল্পের বইয়ের জন্য অঙ্কুর প্রকাশনী দিয়েছিল কিছু।’ (সূত্র: সাম্প্রতিক দেশকাল, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। ইদানিং ফেসবুকেও কিছু প্রমাণ দৃশ্যমাণ হয়। যেমন তরুণ গল্পকার মাসউদ আহমাদ তার ফেসবুক ওয়ালে ব্যাংকের চেকের ছবি আপলোড দিয়ে লিখেছেন, রয়্যালিটি বুঝে দিলেন প্রকাশক।

তো মাসউদ আহমাদ একটি পথ দেখিয়েছেন। নবীন-প্রবীণ লেখকদের উচিত তার পথ অনুসরণ করা। গল্প, আড্ডা, সাক্ষাৎকারে এমনকি ফেসবুকে রয়্যালিটি বিষয়ে কথা বলা উচিত। যেসব প্রকাশক লেখকদের রয়্যালিটি প্রদান করেন তাদেরও উচিত খবরটি প্রচার করা।

 

এবারের বই মেলার মৌসুমে দেখা যাচ্ছে, অনেক লেখক নিজেদের বইয়ের প্রচার করছেন ফেসবুকে। নিজের বই নিয়ে নানা অনুভূতির কথা লিখছেন, বই হাতে ভক্তদের সঙ্গে তোলা সেলফি আপলোড করছেন, পত্র-পত্রিকা-টেলিভিশনে নিজের বই নিয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারের লিংক শেয়ার করছেন। প্রথম মুদ্রণ শেষ… দ্বিতীয় মুদ্রণ শেষ… আলহামদুলিল্লাহ, বই স্টকআউট ইত্যাদি বলে বলে নিত্যই ফেসবুকে সংবাদ প্রচার করছেন। বেশ ভালো কর্মতৎপরতা। সাধুবাদযোগ্য। এসবের পাশাপাশি লেখকরা যদি রয়্যালিটি প্রাপ্তির কথা (বিগত বছরের), প্রকাশকের সঙ্গে চুক্তিনামার কথা ইত্যাদিও প্রচার করতেন, তবে নিজের মঙ্গলের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র লেখককূলেরও মঙ্গল সাধন করতে পারতেন।

একটু ভেবে দেখুন, কেবল লেখালেখি করতে গিয়েই প্রায় না-খেয়ে, বিনা চিকিৎসায়, হতাশায় মরে গেছেন জীবনানন্দ দাশের মতো কবি, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো লেখক, শিবরাম চক্রবর্তীর মতো সুরসিক, সুপ্রকাশ রায়ের মতো পরিশ্রমী গবেষক, শামসুদ্দিন আবুল কালাম ও কায়েস আহমেদের মতো প্রতিভা। অথচ তাদের বই আজও প্রকাশ করে চলেছেন প্রকাশকরা। দু-চার পয়সা ব্যবসা তাদেরই হচ্ছে। সুতরাং হে নবীন লেখক, আপনি যদি আজ সোচ্চার হোন, তবে আগামীকাল আপনার পরের প্রজন্ম আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে।

একইভাবে প্রকাশকদেরও দেখা যাচ্ছে, তারা নতুন বই নিয়ে ছোট ছোট ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। অত্যন্ত প্রশংসাযোগ্য উদ্যোগ। এসবের পাশাপাশি আপনি যে লেখককে রয়্যালটি প্রদান করেন, সেই খবরটিও প্রচার করুন, হে প্রকাশক। লেখকদের আস্থা ফিরিয়ে আনুন। আপনাদের প্রতি অর্থাৎ প্রকাশকদের প্রতি আস্থা ছিল না বলেই স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রকাশনা ব্যবসায় নেমেছিলেন। একইভাবে কবি জসীমউদ্দীন নিজেই ছিলেন প্রকাশক। বর্তমানে ঔপন্যাসিক মঈনুল আহসান সাবের সাফল্যের সঙ্গে প্রকাশনা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এটা লেখকদের জন্য মোটেও কোনো সুখবর নয়। কারণ প্রকাশনা শিল্প চালাতে গিয়ে তারা আর সাহিত্য সাধনায় মনোনিবেশ করতে পারছেন না। এটা আখেরে বাংলা সাহিত্যের জন্যই নিদারুন ক্ষতি।