ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

ঢাকার ঠাসাঠাসি এক লোকাল বাস। মাথার ওপরের রড ধরে বাদুড়ের মতো ঝুলছে মানুষ। তার নিচে এক সিটে বসে আছেন দুই ভদ্রলোক। একজনের হাতে দৈনিক পত্রিকা আর আরেক জনের হাতে বই। দুজনেই পড়ছেন নিবিষ্ট মনে।

এ দৃশ্য বিরল হলেও ডুমুরের ফুল নয়। মাঝে মাঝে ইদানিং অফিস যাওয়ার পথে এমন দৃশ্য তো দেখা যায়ই। শুরুতে যে দুজনের কথা বললাম, তাদের একজন আমি নিজেই।

আমার হাতে ছিল এ বছর বইমেলায় প্রকাশিত ‘দ্বন্দ্ব ও পথের খেলা ’ নামের একটি ছোটগল্পের বই। পাশের ভদ্রলোক পত্রিকার পাতা থেকে চোখ উঠিয়ে সহাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী বই পড়ছেন? বললাম, ছোটগল্পের বই। ভদ্রলোক ‘হেহ’  করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, ছোটগল্প এখন কেউ পড়ে নাকি?

আমি তখন ‘দ্বন্দ্ব ও পথের খেলায়’ এতটাই বুঁদ হয়ে আছি যে ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ জমাতে ইচ্ছে হলো না। বইটির প্রতিটি গল্পে এমন সব দর্শনচিন্তা রয়েছে যে আমার মনে হচ্ছিল, অফিসে পৌঁছার আগেই বইটি শেষ করতে হবে।

এর ফাঁকে মনে পড়ে গলে ব্রিটিশ সাহিত্য সমালোচক আল কেনেডির কথা। কেনেডি ২০০৭ সালের জুন মাসে বৃটেনের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকায় এক নিবন্ধে ছোটগল্পকে ‘সাহিত্যের দুঃখি এতিম সন্তান’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘প্রকাশক ও সমালোচকরা ছোটগল্পকে গুরুত্ব দেন না। বুক শপগুলোতে ছোটগল্পের বই রাখা হয় খুব অযত্নে। বিশ্ব জুড়ে ছোটগল্পের বই প্রকাশের হার কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে।’

আমার আরও মনে পড়ে যায় বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথা। ইলিয়াস সেই নব্বই দশকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাংলা ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে?

দ্বন্দ্ব ও পথের খেলা বইয়ের মলাট। প্রকাশক: অগ্রদূত অ্যান্ড কোম্পানি। প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোস্তাফিজ কারিগর।

অস্বীকার করার উপায় নেই, কেনেডি কিংবা ইলিয়াসের আশঙ্কায় সত্যতা আছে। কারণ ফি বছর বইমেলা শেষে বাংলা একাডেমি বই বিক্রির যে খতিয়ান তুলে ধরে তাতে দেখা যায়, বিকিকিনির শীর্ষে আছে উপন্যাস। তারপর প্রবন্ধ, কবিতা, শিশু-কিশোরদের বই ইত্যাদি। উপন্যাস বিক্রির পরিমাণ যদি থাকে লাখের কোঠায়, তবে ছোটগল্প সেখানে থাকে শতকের ঘরে।

ছোটগল্পের এই নিগৃহীত দশা সত্ত্বেও বাংলার লেখকরা ছোটগল্প লিখে যাচ্ছেন। সংখ্যায় অপ্রতুল হলেও প্রতি বছর বইমেলাতে ছোটগল্পের বই প্রকাশিত হচ্ছে।

বাংলার নবীন-প্রবীণ সব লেখকই পরম ভালোবেসে সাহিত্যের এই ‘এনডেঞ্জারড’ প্রজাতিটিকে টিকিয়ে রেখেছেন। তেমনই একজন নবীন লেখক মোস্তাফিজুর রহমান। যার বই এখন আমার হাতে। আমি ভাবনা ভুলে আবার ডুবে যাই ‘দ্বন্দ্ব ও পথের খেলায়’।

অফিসে পৌঁছুতে পৌঁছুতে দেড় ঘণ্টা বিলম্ব হয়ে গেল। এই ফাঁকে পড়ে ফেললাম তরতাজা বারোটি গল্প। এজন্য যানজটকে কখনো কখনো আশীর্বাদ মনে হয়!

গল্প পাঠান্তরে মনে হলো, এই গল্পগুলো পাঠককে দার্শনিক করে ‍তুলবে এবং তাদেরকে ভাবাবে, হাসাবে, কাঁদাবে, ভাসাবে এবং দোলাবে অনুভবের দ্বান্দ্বিক দোলায়।

পাঠক গল্পের অন্দরমহলে প্রবেশ করা মাত্র দেখতে পাবেন, প্রতিটি গল্পের পাটাতন জুড়ে রয়েছে জীবন, যৌবন, যৌনতা, যন্ত্রনা, কাম, ক্রোধ, প্রেম ও ভালোবসায় অন্তর্লীন অসংখ্য জীবন; যেসব জীবন পাঠকে নিয়ে যাবে অন্য এক জীবনের আনন্দমহলে।

আমার তখন আবারও মনে পড়ে যায় আল কেনেডির নিবন্ধের কথা। ছোটগল্প সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “সাইজ ডোন্ট ম্যাটার বলে যে কথাটা আছে তা আসলে ভুল। সাইজ আসলেই একটা ম্যাটার। যা আকারে ছোট তাকে গুরুত্বপূর্ণ না ভাবাটাই স্বাভাবিক। আকারে বড় যা তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়াটাই নিয়ম। কিন্তু একটা বুলেটের কথা ভাবুন। আকারে এটি ছোটই বটে। কিন্তু সেটি যদি প্রচণ্ড গতিতে তীক্ষ্ণ পথে আপনার মাথার দিকে ছুটে আসে তবে সেটাকে অগুরুত্বপূর্ণ ভাবাটা কতোটা সম্ভব হতে পারে?”

পাঠ শেষে মনে হলো, ‘দ্বন্দ ও পথের খেলা’ নিঃসন্দেহে একটি বুলেট।