ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির আগে ‘নার্সারি শ্রেণি’ চালু করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রাণয়। গত জানুয়ারিতে এই ঘোষণা আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

তিন-চার বছর হলেই আজকাল অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করাতে চান। সরকারি স্কুলে ভর্তির নূন্যতম বয়স পাঁচ হওয়ার বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনকেই বেছে নিতে হয় অভিভাবকদের।   এ ধারায় বদল আনতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।  এখন থেকে নতুন শ্রেণি নার্সারিতে ভর্তির সর্বনিম্ন বয়স হবে চার বছর।

দার্শনিক রুশো, অ্যারিস্টটল, প্লেটো থেকে শুরু করে আধুনিক দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ, ফ্রান্সিস বেকন, জন ডিউই প্রমুখ বলেছেন, শিশুদের ছয় বছরের আগে স্কুলে পাঠানো উচিত নয়।

এটা তো পরীক্ষিত সত্য যে শিশুরা প্রথম পাঁচ বছর প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। শিশুরা যতক্ষণ জেগে থাকে, ততক্ষণ একটার পর একটা বিষয় কিংবা জিনিস অথবা আসবাবপত্র নিয়ে  ব্যস্ত থাকে। একটার পর একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে, মুখের সামনে এনে দেখায়, জানতে চায় সেটি কী, কী কাজ করা হয় সেটি দিয়ে। শিশুরা একটি বস্তু নিয়ে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, আছাড় দেয়, সেখান থেকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এসবই প্রকৃতির শিক্ষা। এটিই একটি শিশুর সবচেয়ে বড় বিদ্যালয়, শেখার বড় জায়গা। আমরা সেই সবচেয়ে বড় বিদ্যালয় থেকে শিশুকে নিয়ে বন্দি করার ব্যবস্থা করছি কিন্ডারগার্টেনের বদ্ধ প্রকোষ্ঠে।

কিন্ডারগার্টেন কিংবা প্রাক-প্রাথমিক যাই বলি না কেন, সেখানে মূলত শ্রেণিশাসিত দেখাশোনা, পড়াশোনা হয়ে থাকে; যা তার স্বাভাবিক বিকাশ ও জানার জগত ও পথকে শুধু সীমিত নয়, বাধাগ্রস্ত করে।

সুতরাং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিল এই শিশুবিকাশবিরোধী নার্সারি, প্লে, প্রাক-প্রাথমিক ইত্যাদি ব্যবস্থা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া। তা না করে
কিন্ডারগার্টেনে শিশুদের গমন ঠেকাতে নিজেরাই কিন্ডারগার্টেনের স্রোতে গা ভাসাতে চাইছে মন্ত্রণালয়।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু ভর্তি না হওয়ার পেছনে কী শুধু ওই বয়সজনিত কারণই দায়ি? নাকি অন্য কোনো কারণও রয়েছে?

গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবরে পড়েছিলাম প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোনো এক শিক্ষার্থীকে ইংরেজিতে ‘ইংলিশ’ বানান জিজ্ঞেস করলে সে তা বলতে পারেনি। পরে তিনি দেখলেন যে, শিক্ষকরাও তা পারেন না। একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত আগের মন্ত্রী একবার দেখেছিলেন- পঞ্চম, চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণির কোনো শিক্ষার্থীই তাদের শ্রেণির বানান ইংরেজিতে লিখতে পারেনি। এই যখন অবস্থা, তখন সহজেই বোঝা যায় যে, অভিভাবকরা কেন শিশুদেরকে নিয়ে কিন্ডারগার্টেনে গিয়ে থাকেন।

বগুড়ার এক প্রত্যন্ত ইউনিয়ন নশরৎপুরে রয়েছে বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানকার এক অভিভাবকের সঙ্গে কথা হলো এ নিয়ে।

তিনি বলেন,  “প্রাইমারি স্কুলে পরীক্ষার সময় প্রশ্নের উত্তর শিক্ষকগণ ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দেন। যা দেখে দেখে ছাত্র-ছাত্রীরা খাতায় লিখে ভরাট করে।”

প্রথম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রী মালিহাও প্রায় একই কথা বললো আমাকে।

“ম্যাডামরা বোর্ডে উত্তর লিখে দেন। বাসায় যেটা পড়ে গেছি তখন সেটা ভুলে যাই।”

বিষয়টি নিয়ে এক শিক্ষকের সঙ্গেও কথা বলি। তিনি বলেন,  “যদি বাচ্চারা পাশ না করে তবে জবাবদিহিতায় পড়তে হয়। তাই শিক্ষকগণ একটু আধটু বোর্ডে লিখে দেন।”

শুধু তাই নয়, দরিদ্র ছেলে-মেয়েদেরকে পড়ালেখায় উৎসাহিত করার জন্য সরকার যেসব খেলার সামগ্রী, খাদ্যসামগ্রী ইত্যাদি প্রদান করে, সেসব সামগ্রী যেমন বিভিন্ন ধরনের খেলনা ও বিস্কুটের প্যাকেট ভ্যানিটি ব্যাগে করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় হাতে নাতে ধরা পড়েছেন অনেক শিক্ষক। নীলফামারিতে ঘটে যাওয়া এমন ঘটনা নিয়ে খবর বেরিয়েছে পত্রিকায়।

এই পরিস্থিতিতে শুধু তিন-চার বছর বয়সে শিশুকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নেই বলে অভিভাবকরা কিন্ডারগার্টেনে শিশুদেরকে ভর্তি করান এমন যুক্তি কাজ করে না। তাই  প্রাক-প্রাথমিকে নার্সারি শ্রেণি চালুর পূর্বে খতিয়ে দেখা উচিৎ কেন সন্তানদের নিয়ে কিন্ডারগার্টেনের পেছনে ছুটে থাকেন অভিভাবকরা। আর তার চেয়েও বড় কথা, শিশুদের উপর প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার পদ্ধতি যে বয়সের আগেই চাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে সে বিষয়ে ভেবেচিন্তে  শিশুবান্ধব ব্যবস্থা নেওয়া।

 

মন্তব্য ০ পঠিত