ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

কয়েকদিন আগে এক আন্টির সঙ্গে বাসে পরিচয়। হাতে কাগজ ’শাপলা সমবায় সমিতি’ নামে কিছু বই। কই নামবেন বলে কথা শুরু করে তার ব্যবসার দিকে টেনে গেল। বুঝান শুরু করল ’প্রত্যেকদিন মাত্র ১০ টাকা। আপনি স্টুডেন্ট, এটা কোন ব্যাপার না। মাসে হবে কত? ৩০০ টাকা! বছরে ৩৬০০ টাকা। ২ বছরে ৭২০০ টাকা। পাবেন কত? ১০০০০ টাকা”। শুনেই তো আমি টাস্কিত। ১০ টাকা কোন টাকাই না, এটার ফলে যদি ২ বছরে ১০০০০ টাকা পাই। আমারে আর কে পায়? কিন্তু জিনিষ কি এতোই সোজা? পূর্বঅভিজ্ঞতা নিজেকে রোধ করল সদস্য হতে।

২০১১ সাল। আম্মু আমাকে উদ্ভাস সায়েন্স ল্যাবের ব্রাঞ্চে কোচিং করাতে নিয়ে যেত, ওখানে সুন্দর একটা সমবায় সমিতি খুলেছিল। গালভরা নাম “ দি স্টেট মাল্টি কো- অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড ( SCL)” । আম্মুকে খুব সুন্দর করে বুঝাল, ১০ টাকা ২ বছরে ১০,০০০ টাকা, ৫০ টাকায় ৫০,০০০ টাকা, ৮০ টাকায় ৮০০০০ আর ১০০ তে লাখ টাকা। হুররে! বড়লোক হয়ে গেছি, ১০ টাকা থেকে। মা কে বুঝানো হল, মা চাকরিজীবী না, হোমমেকার। তাই এইভাবে ইনকাম করলে ক্ষতি কী?

আম্মু অবশেষে করল। আমার উদ্ভাস পড়া শেষ হয়ে, এমআইএসটি ভর্তি হয়ে গেলাম, সায়েন্স ল্যাব আর যাওয়া লাগত না। কিন্তু মা প্রত্যেক মাসে গিয়ে সায়েবস ল্যাবে কষ্ট করে গিয়ে, মাসকালীন টাকা ৮০*৩০=২৪০০ টাকা দিয়ে আসত। এর ফাঁকে একদিন লোকেরা বলল আমরা লোণ দেই, আপনি নিবেন দরকার পড়লে। ব্যাঙ্কে যেখানে জমা টাকার ৩০% লোণ দেয়, এরা দিত ৯০%!!!! এক্কেরে হাজি মুহাম্মদ মহসিন!

দুই বছর কষ্ট করে ৫৮,৪০০ টাকা জমাল। প্রতীক্ষিত দিন পেল ফোন করে। ওরা বলল, এতো তারিখে আসুন, আপনি ৮০০০০ টাকা নিয়ে যান। মা গেল। গিয়ে দেখল অফিস নাই, খোলা রুম পড়ে আছে, একগাদা মানুষ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। নিচে বিড়িওয়ালা দার্শনিক হয়ে বলল “ কি হবে আপা ভেবে! চোর চুরি করলে সে শাস্তি পাবে”।

সায়েন্স ল্যাব শাখা অফিস ছিল, আম্মু মেইন অফিস যাত্রাবাড়ী তে দৌড়েছে। ওখানেও সুন্দর তালা ঝুলছে টাইপ ( থাই দরজায় তালা অবশ্য ঝুলে না, লক বলতে পারি)। এক মেয়ে ছিল, উনার নম্বর ছিল আম্মুর কাছে। সে বলল “ আপা আমি কিছু জানি না, লোকেরা টাকা নিয়ে পালিয়েছে, আমি তো সাধারণ কর্মী। মালিক পক্ষ এমন করেছে, আমাকে ধরে লাভ কি। আমার ক্যান্সার”। মেয়ের ক্যান্সার ছিল কি না আমি জানি না, যদি থেকে থাকে সিম্প্যাথি। মায়া ছিল মেয়ের নাম।

এই হচ্ছে আমাদের সমবায় জীবন। এর আগে যুবক, ডেস্টিনি ধাক্কা খেয়েছিল আম্মু। পাক্কা হয় নাই। সমবায়ের পর পাক্কা হয়ে গেছে। সমবায়ের ব্যাংকিং সিস্টেম বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন করা ছাড়া সম্ভব নয়। কিন্তু তারা অবৈধভাবে এই ব্যাংকিং চালায়, টাইম আসলে সুন্দর মতো লোটা কম্বল সহ দৌড় দেয়। না না! কেউ কিন্তু টাকা পায় ! সত্যি! এটা বিশ্বাসভাজনের জন্য অ্যাডভারটাইজ! আম্মুকেও একজন আন্টি বলেছিল “ করেন ভাবি, সব টাকা পাবেন, আমি পাইছি”। উনি ঠিকই পাইছেন । আম্মু পায় নাই। আরও হাজার লোক পায় নাই। একজনকে টাকা দেওয়া মানে সবার কাছে স্বচ্ছতা প্রমাণ করা।

যেটা বললাম, শাপলা সমবায় সমিতি। ওই সমবায়ের কর্মী শ্যামলী পর্যন্ত আমাকে বুঝাল করেন। কত লাভ! এই সেই করবেন! বিয়ে হবে যখন, নিজের কিছু থাকবে, কতই আর টাকা! বললাম” মাকে না বলে করি না”। শুরু করছে “ বড় হইছেন, সব মাকে বলতে হয়, প্রেম করেন নিশ্চয়, সেটা বলেন মা কে ?”। আমি আবেগে আপ্লুত হয়ে বাস থেকে নেমে দৌড় দিছি। তো সমবায় সমিতির প্রধান টার্গেট থাকে প্রধানত হোমমেকার। বুঝায়, “নিজের জীবনে কিছুই করলেন না, এই বার করেন।“ তারপর স্টুডেন্ট এবং স্বল্প আয়ের কর্মীরা। বুঝায় “ মাত্র কয় টাকা, করলে কত লাভ”।

এই ছোটখাট লাভ করতে গিয়ে যে প্রতারণার সম্মুখীন হতে হয়? রিস্ক নিব কেন ? দেশে এতগুলো ব্যাংক, পাবলিক, প্রাইভেট, তারপর আছে পোস্ট অফিসের পারিবারিক সঞ্চয়পত্র, কতকিছু হাবিজাবি! সঞ্চয় করতে চাইলে সঠিক পথে, ভেবে চিনতে করা উচিত। সঞ্চয় করতে দিয়ে যদি প্রতারণা হয়ে সব খুইয়ে ফেলি লাভ কই?