ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

“বাঙ্গালি হুজুগে জাতি” – এটা একটা বহুল প্রচলিত কথা। আমি এই কথার সাথে পুরোপুরি একমত না। তবে আমার মতে বাঙ্গালি পুরোপুরি হুজুগে না হলেও বেশ খানিকটাই আবেগপ্রবণ, আর ক্ষেত্রবিশেষে একেবারেই কনফিউজড জাতি। এই জাতির আবেগের কারণে যেমন অনেক ভালো কিছু হয়েছে, তেমনি অনেক ভুগতেও হয়েছে। আবার, এদের বুদ্ধি-শুদ্ধিও নেহায়েত খারাপ না। বুদ্ধি-শুদ্ধি ভালো হওয়ার কারণে যুক্তিবোধও ভালো। তাই যখন যুক্তি আর আবেগের বিপরীতমুখী স্রোতের মধ্যে বাঙ্গালি পড়ে, তখন তারা হয়ে যায় চরম কনফিউজড। যুক্তিকে প্রাধান্য দেবে, নাকি আবেগের দ্বারস্থ হবে, তা বুঝতে পারে না। দেশের কতজন মানুষ যুক্তি দিয়ে বিএনপি বা আওয়ামী লীগ সাপোর্ট করে, আর কতজন আবেগের বশবর্তী হয়ে করে, তার একটা পরিসংখ্যান নিলেই মনে হয় ব্যাপারটা আরো ক্লিয়ার হবে।

যাই হোক, আসল কথায় আসি। কিছুদিন আগে সৌদি আরবে একটা ডাকাতি ও হত্যা মামলার রায় অনুযায়ী আট বাংলাদেশির শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে। এই খবর শোনা মাত্রই এর পক্ষে ও বিপক্ষে দুটো গ্রুপ তৈরি হয়ে গেছে। এই দুই গ্রুপের মাঝেও আবার বিভিন্ন সাবগ্রুপ আছে, এদের মধ্যে কিছু অংশ যুক্তি দিয়ে কোন একটা পক্ষ নেয়, আর কিছু অংশ আবেগের বশে নাচে। আমি আমার এই লেখায় পুরো ঘটনাটাকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে বিচার করার চেষ্টা করবো। এক্ষেত্রে আমাকে চালিত করবে শুধুই বাস্তবতা ও যুক্তি। আর এখানে আমি পুরো ঘটনাটাকে একে একে সেই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি দিয়ে দেখবো। তবে আমি ভালো-মন্দের মাপকাঠিতে কোন কিছু বিচার করতে বসবো না। অতএব, যারা ভাবছেন, আমি এখানে সৌদি আরবের শ্রাদ্ধ করবো, কিংবা ঐ হতভাগা বাংলাদেশিদের পিণ্ডি চটকাবো, তারা এখনি ব্রাউজার উইন্ডো বা এই ট্যাব ক্লোজ করে আমাকে উদ্ধার করেন। আর একটা কথা, আসল ঘটনা আমি-আপনি কেউ জানি না। জানা মনে হয় পুরোপুরি সম্ভবও না। কাজেই আমি এখানে অনেক ‘যদি’, ‘হয়তো’ ইত্যাদির আশ্রয় নেবো।

ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যারা:
ঘটনা সংক্ষেপে এরকম, ২০০৭ সালের এপ্রিলে ঐ আট বাংলাদেশি সহ আরো বেশ কয়েকজন একটা গুদামে ডাকাতি করেন এবং ঐ গুদামের মিশরীয় গার্ডকে খুন করেন। চার বছর ধরে বিচার চলার পর তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় ও সৌদি রাজধানী রিয়াদে প্রকাশ্যে শিরোচ্ছেদ করার মাধ্যমে এই দণ্ড কার্যকর করা হয়। কাজেই, ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মানুষ বা বিষয়াদি হচ্ছে:
১। আট বাংলাদেশি
২। মিশরীয় পরিবার
৩। সৌদি বিচার ব্যাবস্থা
৪। ইসলামী শরিয়াহ আইন

চলেন তাহলে দেখি, এদের দৃষ্টিতে ঘটনার পূর্বাপর অবস্থা কী ছিলো। যারা পড়বেন, তাদেরকে অনুরোধ করবো, ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের জায়গায় নিজেদের বসিয়ে চিন্তা করবেন ও ঘটনাটা তাদের দৃষ্টিতে দেখবেন। তারপর সবগুলো দৃষ্টিভঙ্গি যখন একসাথে কম্বাইন করবেন, তখনই হয়তো আপনি পুরো ব্যাপারটার একটা ন্যায়ভিত্তিক ব্যাখ্যা বা সমাধান খুঁজে পাবেন।

১। আট বাংলাদেশি:
এই আট বাংলাদেশি অনেক স্বপ্ন নিয়ে, অনেক আশা নিয়ে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলো, কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু আলোচ্য ঘটনায় সৌদি বিচার ব্যবস্থার দাবি অনুযায়ী এরা অপরাধী। এরা ঘটনা শুরু করেছে, ঘটনার শেষও এদেরই ট্র্যাজিক পরিণতির মাধ্যমেই। কথা হচ্ছে, তারা যখন সৌদি আরবে গিয়েছিলো, তখন তাদের উচিত ছিলো সৌদি আইন কানুন জেনে বুঝে সেখানে যাওয়া। যদি তা সম্ভব নাও হয়, উচিত ছিলো নিজের প্রবৃত্তি সামলে রাখা। মৃত্যুদণ্ড হোক বা না হোক, তা প্রকাশ্যে হোক বা না হোক, মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে চিল্লাচিল্লি হোক বা না হোক, একেকজন বাংলাদেশি বিদেশের বুকে একেকটা চলন্ত বাংলাদেশ। আপনি যদি বিদেশ গিয়ে অন্যায় করে বেড়ান, তার দায় যদি দেশকে নিতেই হয়, তাহলে এটাও স্বীকার করতে হবে যে দেশটা এরকম। এ কারণে আপনি যদি বিদেশ গিয়ে খারাপ কিছু করেন, তাহলে তা নিজ দায়িত্বেই করা উচিত। খারাপটা করার সময় দেশের কথা ভাববেন না, করার পর যখন লেজে গোবরে করে ফেলবেন, তখন দেশের আশ্রয় চাইবেন, তা হবার না। দেশ যদি আপনার দায়ভার নেয়, তাহলে প্রকারান্তরে আপনার অপরাধকেই স্বীকার করে নেয়, যা আপনার একার জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয় হতে পারে, গর্বে আপনার বুকের ছাতি ২ ইঞ্চি ফুলে উঠতে পারে, কিন্তু তাতে পুরো দেশের উপর, দেশের ষোল কোটি মানুষের মুখের উপর চুনকালি পড়ে। বিদেশে কোন বাংলাদেশি ধর্ষককে যদি রাষ্ট্র সাপোর্ট দেয়, প্রমাণিত হয় দেশে ষোল কোটি ধর্ষক বাস করে, কোন ডাকাতকে যদি সাপোর্ট দেয়, প্রমাণিত হয় দেশে ষোল কোটি ডাকাত বাস করে, কোন খুনিকে যদি সাপোর্ট দেয়, প্রমাণিত হয় দেশে ষোল কোটি খুনি বাস করে। এবার আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, “তা কেনো হবে? দেশ আমাকে সাপোর্ট করা মানেই কি দেশের সব মানুষ একরকম?” না, আসলে মোটেই তা না। কারণ দেশের সব মানুষ যদি ধর্ষক, ডাকাত বা খুনি হতো, সেই দেশে কি বাস করা সম্ভব? কিন্তু কথা হচ্ছে, আপনাকে যদি দেশ সাপোর্ট দেয়, তাহলে দেশের পলিসি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ফলে যুক্তিসঙ্গত কারণেই সবাই ধরে নেবে, আমার-আপনার বাংলাদেশ অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার প্রতি অনিচ্ছুক, তথা এই দেশ অপরাধীদের অভয়ারণ্য, তথা এই দেশ অপরাধের পৃষ্ঠপোষক, তথা দেশের সব লোক (না হলেও বেশিরভাগ) অপরাধী।

অতএব, বিদেশে গেলে “ইউ আর অন ইয়োর ওউন!” আপনি ভালো কাজ করলে দেশ আপনার কাজের জন্য গর্বিত হবে, আর খারাপ কাজ করলে লজ্জিত হবে। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই আপনার গৌরব বা শাস্তির (বিশেষ করে) ভাগ বা দায় নেবে না। তারপরও যদি রাষ্ট্র আপনাকে বাঁচানোর জন্য বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করে, সেটা আপনার সৌভাগ্য, সেটা আপনার অধিকার না। মনে রাখবেন, কোন ধর্ষক, ডাকাত বা খুনিকে বাঁচানোর জন্য দেশের ষোল কোটি মানুষ চৌদ্দ জায়গায় আঠারো বার ট্যাক্স দিয়ে সরকার পুষে না। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কঠোরতাই কাম্য ও স্বাভাবিক, দয়া প্রিভিলেজ। এখানেও অবশ্য একটা ‘কিন্তু’ থেকে যায়, যা আবার বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য। আর তা হচ্ছে, আপনি যদি রাঘব-বোয়াল জাতীয় কেউ হন, তাহলে আপনার অনেক দোষই ইগ্নোর করা হতে পারে। অনেকেই জানেন, কিছু দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী এক সরকারী কর্মকর্তা বিদেশে গিয়ে নিজের ফুলের মতো পবিত্র (!) চরিত্রের এক উৎকর্ষ পরাকাষ্ঠা দেখাতে গিয়ে আরেক বিপরীত লিঙ্গের কর্মকর্তার উপর চড়াও হন। এতে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি যে কোথায় গিয়ে পৌঁছে, তা বলাই বাহুল্য। সবচেয়ে ভালো হতো, যদি তাকে সেই দেশের আইনেই বিচারের জন্য তাদের বিচার ব্যাবস্থার উপর ছেড়ে দিয়ে আসা হতো। কারণ আপনি কী ভাবছেন জানি না, তবে আমি রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসাবে কোন ধর্ষকের আকামের দায়ভার নিতে রাজি না। যাই হোক, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশ্য নিজ দায়িত্বে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন দেশে বিচার করবেন প্রতিশ্রুতি দিয়ে, যা আজ অবধি বাস্তবায়িত হয় নাই বা হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

কথা হচ্ছিলো ঐ আট বাংলাদেশিকে নিয়ে। তাদের উচিত ছিলো প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে রাখা। আর যদি না-ই পারে, তাহলে এটা ভুলে যাওয়া যে তার বাংলাদেশি ও রাষ্ট্র তাদের কোনো প্রকার সাপোর্ট দেবে। প্রথম ব্যাপারে তারা ব্যর্থ, তবে সম্ভবত দ্বিতীয় ব্যাপারে তারা সফল। অর্থাৎ, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোন প্রকার সাপোর্ট যাবে বা তাদেরকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হবে, এমন ধারণা মনে হয় তারা করে নাই। বরং সৌদি আদালতের দাবি অনুযায়ী তারা স্বীকার করেছে যে তারা দোষ করেছে।

২। মিশরীয় পরিবার:
এই মিশরীয় লোক ভিক্টিম। বেচারা মরে গিয়েই সব ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেছে! মরার পরে তারও আসলে তেমন কিছু করার ছিলো না। যেহেতু সে গার্ড হিসাবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মারা গেছে, কাজেই বলা যায় সে তার কর্তব্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ছিলো। কথা হচ্ছে, তার এহেন মৃত্যুতে তার পরিবার নিশ্চয়ই দুর্দশার মধ্যে পড়ে। আর যেহেতু অন্যায়টা অন দ্য ফার্স্ট প্লেস তাদের সাথেই হয়েছে, কাজেই ন্যায় বিচার পাওয়াও তাদের অধিকার। আপনি তাদের কারো অবস্থায় নিজেকে চিন্তা করে দেখেন। যদি আপনার বাবা বা ভাইকে দুর্বৃত্তরা মেরে ফেলতো, আপনি কি তাদের ছাড় দিতেন? তারা আপনার সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াবে আর আপনি আপনার আপনজন হারিয়ে চোখের জল ফেলবেন, এটা কি আপনি মানতে পারতেন? যদি বলেন আপনি তাদের মাফ করে দিতেন, তাহলে প্রথমেই যে ভাবনাটা কারো মাথায় আসবে, তা হলো আপনি মিথ্যা বলছেন। আর একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা হলো, আপনি অনেক মহানুভব ও ক্ষমাশীল। কিন্তু সবাই আপনার মতো ক্ষমাশীল হবে, এমনটা নাও হতে পারে। বরং আপনজনের বেলায় বেশিরভাগ মানুষই চাইবে ন্যায়বিচার। সৌদি আরবে যে আইন প্রচলিত বলে দাবি করা হয়, অর্থাৎ শরিয়াহ আইন অনুযায়ী ভিক্টিমের পরিবারের তিনটা পথ খোলা থাকে, খুনিকে মাফ করে দেয়া, অথবা রক্তপণ নেয়া, কিংবা কিসাস (হত্যার বদলে হত্যা) নেয়া। এই তিনটা পথের যেকোনোটাই ন্যায়ানুগ। কে কোনটা অ্যাপ্লাই করবে, তা তার ব্যাক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে। কাজেই, ঐ মিশরীয় পরিবার যদি হত্যাকারীদের মাফ করে দিতে না চায়, আমার আপনার কিছুই বলার নাই। বলাটা উচিতও না। হ্যাঁ, বড়জোর তাদেরকে মাফ করে দিতে অনুরোধ করা যায় বা রক্তপণ দেয়ার প্রস্তাব দেয়া যায়, কিন্তু এর বেশি কিছু না। কাজেই পুরো ব্যাপারটা তাদের দৃষ্টিতে যদি দেখেন, তাহলে আপনি কখনোই খুনিদের মাফ করতে পারবেন না বলেই মনে হয়।

আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, আমি মিশরীয় গার্ডের সম্পর্কে বলার সময় তার পরিবার নিয়ে অনেক কথা বললাম, তাদের দুর্দশার কথা বললাম, কিন্তু বাঙ্গালিদের পরিবার নিয়ে কিছুই বললাম না কেন? এর প্রধান কারণ হচ্ছে, বাঙ্গালি হোক আর মিশরীয়ই হোক, কোন অবস্থাতেই আমাদের ভুলে গেলে চলবে না কে অন্যায়কারী আর কে অন্যায়ের শিকার। নিরপেক্ষভাবে ভেবে দেখেন, মিশরীয় ঐ পরিবার কিন্তু ন্যায় বিচারের দাবি রাখে, আর তাদের প্রাপ্য সেই ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই বিচারের খড়গ নেমে আসবে অন্যায়কারীর উপর। আপনাকে যদি অন্যায়ের শিকার ও অন্যায়কারী উভয়ের পরিবার নিয়েই ভাবতে হয়, তাহলে তো ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে, তাই না? আপনি খুনির পরিবারের কথা ভেবে তাকে ছেড়ে দিলে তো অন্য আরেকজন খুন করার আগে চিন্তা করবে না, কারণ বিচারকের দয়ার শরীর! তাকে তো ছেড়েই দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে, ঐ খুন হওয়া ব্যাক্তি ও তার পরিবার যেমন ন্যায় বিচার পাবে না, তেমনি নতুন অপরাধকেও দমন করা যাবে না। তার উপর, যারা খুন করেছে, তারা কি খুন করার আগে যাকে খুন করছে, তার পরিবারের কথা একবারও ভেবে দেখেছে? কাজেই, যাকে খুন করা হয়েছে, তার পরিবারের কথা আগে ভাবতে হবে। তাই বলে খুনিকে শাস্তি দেয়ার পর তার পরিবারের কথা একেবারেই না ভাবলেও চলবে না। এটা নিয়ে পরে বিস্তারিত বলবো।

৩। সৌদি বিচার ব্যাবস্থা:
এটা আসলে পুরো ব্যাপারটায় বেশ বিতর্কিত এক ইস্যু। এই ইস্যুর মূলত দুটো দিক। প্রথমত, সৌদি বিচার, দ্বিতীয়ত, ইসলামী শরিয়াহ আইন। এই পয়েন্টে আমি শুধু সৌদি বিচার ব্যাবস্থার উপর কথা বলবো। শরিয়াহ আইন নিয়ে কথা বার্তা থাকবে এর পরের পয়েন্টে। সৌদি বিচার ব্যাবস্থার আলোচনায় থাকবে শুধু তাদের বিচারের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন।

কোন আইন, তা দেশের আইনই হোক বা ইসলামী শরিয়াহই হোক, বিচারের ফলাফল বা শাস্তি বলে দেয়, কিন্তু কীভাবে অপরাধ প্রমাণ করতে হবে, তা বলে দেয় না। আসলে প্রত্যেক অপরাধ ইউনিক অপরাধ। অপরাধের কারণ, ফলাফল, প্রতিকার, শাস্তি ইত্যাদি নিয়ে অনেক আলোচনা হতে পারে, কিন্তু অপরাধ নির্ণয় প্রক্রিয়া নির্ভর করবে একান্তই ঐ অপরাধ ও তার সাথে সংশ্লিষ্টদের উপর। আপনি প্রয়োজনীয় সাক্ষীর সংখ্যা নির্ধারণ করে দিতে পারেন, কারা সাক্ষ্য দেয়ার উপযুক্ত, তাও ঠিক করে দিতে পারেন, কিন্তু অপরাধী ও সাক্ষীদের মনের খবর আপনি জানেন না। তা জানা সম্ভবও না। অতএব, সেক্ষেত্রে কিন্তু কিছু অনুমানের দারস্থ হতেই হয়। কথা হচ্ছে, সৌদি আরবের সেই বিচার ঠিক কী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছিলো, অপরাধ প্রমাণিত হয়েছিলো কিনা, কিংবা অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছিলো কিনা।

বিচার আসলে কী প্রক্রিয়ায় হয়েছিলো, তা মনে হয় কখনোই প্রকাশিত হবে না। কারণ, সৌদি আরব এ ব্যাপারে অনেকটাই কঠোর। এই কঠোরতা কোথাও স্বীকৃত না, না ইসলামী আইনে, আর না পৃথিবীর অন্য কোন আইনে। অপরাধের শাস্তি কঠোর হবে, না কোমল হবে তা নিয়ে আলোচনা পরে, কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার প্রশ্নে দ্বিমতের কোন সুযোগ নাই। একজন উঁচু স্তরের অপরাধীরও অবশ্যই জানার অধিকার আছে, তার অপরাধটা আসলে কী এবং ঠিক কোন নিয়ম কানুনের উপর ভিত্তি করে তার বিচার হচ্ছে, কারা সাক্ষ্য দিচ্ছে ইত্যাদি। ইসলামী আইনেও অপরাধীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। একবার এক ইহুদি খলিফা হযরত আলীর (রা) বর্ম চুরি করলে আলী (রা) তার বিপক্ষে আদালতে অভিযোগ করেন ও নিজ ছেলে হযরত হাসানকে (রা) সাক্ষী হিসাবে উপস্থাপন করেন। যদিও আলী (রা), হাসান (রা) প্রমুখ তাঁদের সত্যবাদিতা ও সততার জন্য প্রখ্যাত ছিলেন, তবুও বিচারক ঐ সাক্ষ্য গ্রহন করেন নাই, কারণ শরিয়াহর নিয়ম অনুযায়ী নিকটাত্মীয়র সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য না। কাজেই, বিচারক যদিও জানতেন যে সত্যবাদী আলীর (রা) পক্ষে মিথ্যা বলা অসম্ভব, কিন্তু তিনি রায় দিলেন ঐ ইহুদির পক্ষেই। অতএব, অপরাধের শাস্তি প্রদান পরে, আগে অপরাধ প্রমাণ। যদি অপরাধ প্রমাণে সঠিক নীতিমালা অনুসরণ করা না হয়, তাহলে শাস্তি বা খালাস, কোনটারই গ্রহণযোগ্যতা থাকে না। আরো কথা থাকে, চুরির শাস্তি হাত কাটা (শরিয়াহ অনুযায়ী) বা জেল-জরিমানা (বিভিন্ন দেশের আইন অনুযায়ী), কিন্তু আপনার বন্ধু আপনার একটা পেন্সিল চুরি করলো, আর আপনি ধরে তার হাত কেটে দিলেন বা জেলে ভরে দিলেন, এটা তো কোন কথা হতে পারে না। আগে রাষ্ট্রের নিশ্চিত করতে হবে, কারো যেন চুরি করার দরকার না হয়, সবাই যেন কাজ করে খেতে পারে, অর্থনীতির চাকা যেন সচল থাকে, আর সবাই যেন ঐ শাস্তির আদ্যোপান্ত সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকে। তারপর আপনি ঐ আইন প্রয়োগ করতে পারবেন। অতএব, যদি সৌদি বিচার ব্যাবস্থায় তাদের অপরাধ আসলেই প্রমাণ হয়ে থাকে, আর সেই ‘প্রমাণ’ যোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হয়, তাহলে অপরাধীদের পক্ষ নেয়ার কোন কারণ দেখি না। তা সে বাংলাদেশিই হোক বা অন্য যে কোন দেশের বা ধর্মের লোকই হোক।

এরপরের প্রসঙ্গ, অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছিলো কিনা। এক্ষেত্রে মনে হয় উত্তরটা বিচার ব্যাবস্থার পক্ষেই যাবে। কারণ যদি অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না-ই দেয়া হবে, তাহলে চার বছর ধরে আসলে ঠিক কী হলো? একটা বিচার কখন চার বছর ধরে চলে? যখন তার পক্ষে, বিপক্ষে বাদী, আসামীরা বা তাদের উকিলরা বিভিন্ন যুক্তি প্রমাণ উপস্থাপন করে। এখানে গায়ের জোরে বলার কোন সুযোগ নাই যে, অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয় নাই। যেকোনো যুক্তিবোধসম্পন্ন মানুষই বুঝতে পারবে, এটা একটা ভুয়া দাবি। কারণ যদি তাদের সে সুযোগ না-ই দেয়া হবে, তাহলে তো আদালতে অভিযোগ আসার পরপরই তাদের মেরে ফেলার কথা। সেটা যেহেতু হয় নাই, কাজেই অপরাধীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছে বলেই আমার মনে হয়েছে।

এই দুই প্রসঙ্গের পর আরেকটা যে সম্পূরক প্রসঙ্গ আসে, তা হলো একজনের হত্যার বদলে আটজনের শিরোচ্ছেদ। এটা অবশ্য যে কারো কাছেই একটু অস্বাভাবিক ঠেকতে পারে, যদিও একেবারে অসম্ভব না। কুরবানির গরু জবাই করার জন্যও অনেক সময় দশ বারোজন মানুষ লাগে। আর একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষকে খুন করতে আটজন মানুষ অংশ নিতেই পারে। তবে ব্যাপারটা একটু অসম্ভাব্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শরিয়াহ আইন অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কিন্তু শুধু খুনের জন্যই প্রযোজ্য হয় না। ডাকাতি সহযোগে খুনের শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড। এখানেও আবার সেই একই কথা। ঠিক কীভাবে তাদের দোষী সাব্যস্ত করা হলো বা তাদের দোষ প্রমাণ করা হলো, তা অবশ্যই প্রকাশিত হওয়া উচিত। আর তা করতে হবে সৌদি সরকার বা তাদের বিচার ব্যাবস্থাকেই। এক্ষেত্রে তারা অন্য কারো ক্ষেত্রে কবে কী করেছিলো বা আদৌ তারা এসব প্রকাশ করে কিনা বা এটা তাদের পলিসির মধ্যে পড়ে কিনা, ইত্যাদি বিবেচ্য হতে পারে না। তাদেরকে নিজ স্বার্থেই এসব ব্যাপারে ক্রিস্টাল ক্লিয়ার থাকতে হবে। তা না হলে সন্দেহের তীর তাদের দিকে যেতেই পারে এবং পৃথিবীর বিচার ব্যাবস্থায় তারা পার পেয়ে গেলেও আসল বিচারের দিনে তাদের অবশ্যই এটার জবাব দিতে হবে। তার উপর, সৌদি সরকার যদি শরিয়াহ আইন অনুযায়ী বিচারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করেই সেই আইনের শাস্তিগুলো প্রয়োগ করে থাকে, তাহলে তারা নিজেদের বিচার ব্যাবস্থার সাথে শরিয়াহ ব্যাবস্থা গুলিয়ে খিচুড়ি বানানোর মাধ্যমে খোদ ইসলামী আইনের অপবাদের ক্ষেত্র তৈরি করার জন্য ইতিহাসের বুকে হিপোক্রিট হিসাবেই পরিচিত হবে।

৪। ইসলামী শরিয়াহ আইন:
সৌদি আরবের ঐ ঘটনার পর এটা এখন সবচেয়ে আলোচ্য একটা বিষয়। অনেকেই এই আইনকে কঠোর বলে ব্লগে ব্লগে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছেন। উপরে শরিয়াহ আইন সম্পর্কে অনেক কথাই বলেছি। ইসলামী আইন শুধু অভিযোগ আর শাস্তি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না। ইসলামী আইনের মূল উদ্দেশ্য একটা ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। অপরাধীদের ধরে ধরে কঠোর শাস্তি দেয়া না। ইসলাম এমন এক সমাজ ব্যাবস্থার কথা বলে, যেখানে কোন সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চোরাকারবারি, ঘুষ ইত্যাদি থাকবে না। এই সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই ইসলাম মানুষকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে ও রাসূলের (স) জীবনাদর্শ অনুসরণ করতে বলে। যারা মুসলিম না, তাদেরকে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া হয়, যা মেনে চলার জন্য ইসলামে বিশ্বাসী হওয়া জরুরি না। অতঃপর সমাজের কাউকে যেন কোন অপরাধ করতে না হয়, রাষ্ট্র তার ব্যাবস্থা করে। যেমন, চুরি দূর করার জন্য সমাজ থেকে বৈধ উপায়ে অভাব দূর করে, মানুষকে দান-সদকা করতে উদ্বুদ্ধ করে, ধনী মুসলিমদের যাকাত দিতে বাধ্য করে। তারপর যখন সমাজের অর্থনীতিতে একটা ব্যালেন্স নিশ্চিত হয়, তখন থেকেই “চুরির শাস্তি হাত কাটা” আইন চালু করা হয় এবং সবাইকে রাষ্ট্র নিজ দায়িত্বে এই আইন সম্পর্কে সম্যক অবহিত করে। ইসলাম একটা বাস্তবসম্মত জীবন ব্যাবস্থা। হুট করে কোন সমাজে ঢুকেই বলে দেয় না, আজ থেকে যারা চুরি করবে, তাদের হাত কেটে ফেলা হবে! আগে এই কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করে, তারপর বলে। সেখানেও কথা থাকে; এমন হতেই পারে যে, এতো ব্যাবস্থা নেয়ার পরও কেউ হয়তো এই স্কিম থেকে বাদ পড়ে গেছে, ফলে সে চুরি করতে বাধ্য হয়েছে। এক্ষেত্রে সে যদি নিজের বা পরিবারের সদস্যদের একান্তই বেঁচে থাকার প্রয়োজনে অনন্যোপায় হয়ে চুরি করে, তাহলে তার উপর সেই শাস্তি বর্তায় না, বরং তাকে সে যাত্রা সতর্ক করে ছেড়ে দেয়া হয়। কথা হচ্ছে, এতো কিছুর পরও যদি কেউ চুরি করে আর তার সেই চুরির পরিমাণ সিগ্নিফিক্যান্ট হয় (উপরে পেন্সিল চুরির উদাহরণ দিয়েছি), তাহলেই কেবল শরিয়াহ অনুযায়ী তার হাত কাটার শাস্তি দেয়া হয়। আর চোরের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ দুইজন সত্যবাদী (যারা সত্যবাদী হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, কাজেই তাদের সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করা যায়) সাক্ষী দ্বারা পৃথকভাবে যাচাই হতে হবে। কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যা নীতিরও অনেক নিয়ম কানুন আছে। এক্ষেত্রেও খুন প্রমাণিত হওয়ার জন্য দুজন সত্যবাদী ও ন্যায়পরায়ন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য প্রয়োজন। অর্থাৎ, তারা পৃথকভাবে সাক্ষ্য দেবে যে, তারা নিজ চোখে খুনিকে খুনের উদেশ্যেই ধারালো অস্ত্র দ্বারা খুন করতে দেখেছে। এখানে খুনের মোটিভটাও জরুরি। অর্থাৎ, খুন করার উদ্দেশ্যে খুন করতে হবে। যদি খুন করতে না চায়, কিন্তু দুর্ঘটনাবশত খুন হয়ে যায়, তাহলে কিসাস প্রযোজ্য হয় না। আর শরিয়াহর এই বিচার ব্যাবস্থায় অপরাধ প্রমাণ বা শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে হাই অফিশিয়াল, ডিপ্লোম্যাট, রাজা-বাদশাহ বা সাধারণ মানুষের মাঝে কোন পার্থক্য নাই। উপরে হযরত আলীর (রা) উদাহরণ দিয়েছি। এছাড়াও, এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ রাসূলুল্লাহ (স) ও খুলাফায়ে রাশিদীনের আমলে পাওয়া যাবে। খলিফা হযরত উমার (রা) নিজ ছেলে আবু শাহমাকে মদ পানের অপরাধে বেত্রাঘাত করেছিলেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, সৌদি আইন ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী পরিচালিত (যেমনটা তারা দাবি করে) কিনা। উত্তর খুব সহজ, যদি তারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (অর্থাৎ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং পরিশেষে অপরাধের শাস্তি প্রয়োগ) শরিয়াহ আইন মেনে চলে, কেবল ও কেবল মাত্র সেক্ষেত্রেই তাদের আইন শরিয়াহ আইন বলে মেনে নেয়া যায়। এর এক চুল এদিক সেদিক হলেই সেটা শরিয়াহ আইন না। যে আইন অর্ধেক সৌদি, অর্ধেক শরিয়াহ, তাকে বড়জোর সৌদি-শরিয়াহ খিচুড়ি বলা যায়, কিন্তু কখনোই শরিয়াহ আইন বলা যায় না।

এবার আসা যাক, পরিপূর্ণ শরিয়াহ আইন মানবিক নাকি অমানবিক সে আলোচনায়। এটার আসলে নির্দিষ্ট কোন মাপকাঠি নাই। এটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করবে। কাজেই, এখানে কোন সর্বজনীন সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব না। তাই আমি শুধু আমার ব্যাক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিই ব্যাখ্যা করবো। ইসলামী রাষ্ট্র আসলে দেশের সব জনগণের জন্য অভিভাবক বা গার্জিয়ান স্বরুপ। গার্জিয়ানের সব দায়-দায়িত্ব পালন করার পর যদি কেউ অন্যায় করে, তাহলেই কেবল রাষ্ট্র তার উপর কঠোর হয়। এর আগ পর্যন্ত আপনি রাষ্ট্রপ্রধানের সামনে তার চোখে চোখে চোখ রেখে উঁচু গলায় কথা বলতে পারবেন; যদি সে অন্যায় করে, তার কাছে ভরা মজলিশে কৈফিয়ত তলব করতে পারবেন; তার অন্যায়ের মাত্রা বেশি মনে করলে তাকে এমনকি ধমকও দিতে পারবেন। টাকার গায়ে যেমন লেখা থাকে চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে, ঠিক তেমনি একজন ইসলামী রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান তার কোন নাগরিক চাওয়া মাত্র যেকোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য থাকে, হোক সে নাগরিক কোন জজ-ব্যারিস্টার বা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বা মুচি-মেথর-ডোম। সোজা কথা, ইসলামী রাষ্ট্রের একজন সুনাগরিকের জন্য শাসক যত না ‘শাসক’, তার চেয়ে বেশি ‘সেবক’, যার তুলনা অন্য যেকোনো শাসন ব্যাবস্থায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর এই শাসন ব্যাবস্থাই চালু ছিলো রাসূলুল্লাহ (স) ও খুলাফায়ে রাশিদীনের আমলে, যার ভুরি ভুরি উদাহরণ পাওয়া যাবে। বর্তমানে এর খোঁজ মেলা কঠিন, তা বলাই বাহুল্য। যাই হোক, কথা হচ্ছিলো শরিয়াহ আইনের কঠোরতা নিয়ে। এখন, রাষ্ট্র যখন আপনাকে এতো কিছুর নিশ্চয়তা দেবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আপনার উপর দেশের অন্য সব মানুষকে নিয়ে সুখে থাকার দায়িত্ব বর্তাবে। আপনার চুরি করার কোন কারণ নাই, খুন করার কোন কারণ নাই, ধর্ষণ বা ব্যাভিচার করার কোন কারণ নাই, তবুও আপনি যদি এসব করেন, তাহলে প্রথমেই আপনি একজনের মানবাধিকার নষ্ট করলেন এবং সমাজে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করলেন, যা আপনার কৃত অপরাধের উপর নির্ভর করে আশেপাশের একটা বড় অংশের শান্তি-শৃঙ্খলার বিঘ্ন ঘটাতে পারে। আবার, আপনার দেখাদেখি অনেকেই হয়তো একই কাজ করতে প্রবৃত্ত হবে। অতএব, এক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে শাস্তি প্রদান করা উচিত বলেই আমি মনে করি। কারণ দুটো, অপরাধীর শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে অপরাধী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার করা এবং দৃষ্টান্ত স্থাপন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ অপরাধ করার আগে অনেক ভেবে-চিন্তে নেয়।

কথা হলো, অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার পর যদি পরিবারকে দেখার মতো ক্ষমতা তার না থাকে (যেমন চুরির শাস্তি দেয়া হলে মানুষ কর্মক্ষম নাও থাকতে পারে বা মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে তো মারাই গেলো), তাহলে তার পরিবারের কী অবস্থা হবে? এক্ষেত্রেও শরিয়াহ আইন উপায় বাতলে দেয়। কারণ, শরিয়াহ আইন শুধু অপরাধীকেই শাস্তি দেয়, তার নিরপরাধ পরিবারকে না। ইসলামী রাষ্ট্রে যেকোন অসহায় ব্যক্তির দেখাশোনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। খুনি আসামীর অসহায় পরিবারের ভরণ পোষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারের যদি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কেউ জীবিকা নির্বাহের মত কেউ না থাকে। এমনকি যদি অপরাধী শাস্তি পাওয়ার ফলে এমন অবস্থায় পড়ে, যার কারণে সে আর উপার্জন করতে পারবে না, সেক্ষেত্রে অপরাধীর দায়িত্বও রাষ্ট্রের। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্র কারো অপরাধ মনে পুষে রাখে না। কাউকে তার কৃত অপরাধের শাস্তি দিয়ে দেয়ার পর তার ও একজন নিরপরাধ নাগরিকের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার দিক দিয়ে পার্থক্য করার কোন সুযোগ নাই। প্রশ্ন আসতে পারে, যদি কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, তাহলে তার লাশের কী হবে? শরিয়াহ আইন অনুযায়ী তার লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় ও এটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যদি ঐ পরিবারের লাশ দাফন করার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে তা সঠিকভাবে দাফন করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই আলোচনার পর সৌদি আরবের শাসকগণ কি শরিয়াহ অনুযায়ী যোগ্য শাসক, নাকি ভোগবাদী রাজা-বাদশাহ, তা বিচারের ভার সচেতন পাঠকের উপর ছেড়ে দিলাম। যারা শরিয়াহ আইন শুধু নিজেদের অধীনে থাকা মানুষদের উপর প্রয়োগ করে, কিন্তু নিজেদের বেলায় গা বাঁচিয়ে চলে; যাদের নিজেদের সাত খুন মাফ, পর্দা মাফ, কিন্তু মানুষ অপরাধ করলে শাস্তি দেয়, পর্দা না করলে বেত্রাঘাত করে; তারা ঠিক কতটুকু ‘শরিয়াহ আইন’ অনুযায়ী কাজ করছে, আর কতখানি নিজেদের খেয়াল খুশি মতো কাজ করছে, তা বলাই বাহুল্য।

যাই হোক, অনেক লম্বা আলোচনা করে ফেললাম। কথা হচ্ছে, যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশ কী করতে পারে? প্রথমত, কোন অবস্থাতেই কোন খুনি বা অপরাধীর পক্ষ নেয়া উচিত হবে না। তবে তার আগে নিশ্চিত হওয়া উচিত তারা আসলেই খুনি কিনা। আর সেজন্য সৌদি আরবের সহায়তা প্রয়োজন। কাজেই, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সৌদি সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে কী উপায়ে তাদের বিচার হয়েছে তা প্রকাশ করার জন্য। দ্বিতীয়ত, যাদের শিরোচ্ছেদ করা হয়েছে, তাদের পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্বও সরকারকে নিতে হবে। এক্ষেত্রেও সৌদি আরবের উপর চাপ প্রয়োগ করা যায়, যাতে তাদের পরিবারকে আর্থিক সাহায্য করা হয়। তৃতীয়ত, নিহতদের পরিবার যদি চায়, তবে অবশ্য অবশ্যই তাদের লাশ ফেরত আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। সৌদি আরবের পলিসি কী, তা এখানে আলোচ্য বিষয় না। বিদেশের মাটিতে কয়েকজন বাংলাদেশি মারা গেছে। তারা ভালো, খারাপ যেমনই হোক, তাদের কবর এই বাংলাদেশেই হবে। লাশ পাঠানোর দায়িত্ব সৌদি সরকারের আর এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারের। চতুর্থত, কোন অবস্থাতেই এমন কিছু করা যাবে না, যাতে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রম বাজার হুমকির মুখে পড়ে। তবে ন্যায়ের সাথে আপোষ করার পক্ষপাতিও আমি না। যদি এমন কোন অবস্থার সৃষ্টি হয়, যেখানে ন্যায় ও বাজার দুটোর যেকোনো একটা ধরে রাখতে হবে আর বাকিটা ছেড়ে দিতে হবে, তাহলে আমি ন্যায় ধরে রাখার পক্ষে। পঞ্চমত, ভবিষ্যতে যেন আর কোন বাংলাদেশিকে এরকম দুরাবস্থার মধ্যে পড়তে না হয়, তার জন্য আগে থেকেই যারা যে দেশে যাচ্ছে, সে দেশের আইন কানুন সম্পর্কে তাদের সম্যক অবহিত করতে হবে। আর এই কাজটা করতে হবে সরকারকেই। তা না হলে এরকম ঘটনার পুনরাবৃত্তির দায়ও সরকারের উপর পড়বে।

সব শেষে, যারা শরিয়াহ আইন বর্বর বলে চিৎকার করে গলার রগ ফাটিয়ে ফেলার উপক্রম করছেন, তাদের লাছে আমার বিনীত কিছু প্রশ্ন:
১। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের শাস্তি প্রদান বা শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে বিদেশে অবস্থানরত খুনিদের ফিরিয়ে আনাকে সমর্থন করেন কিনা?
২। ১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচার চান কিনা? যদি চান, তাহলে কি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চান, নাকি তাদের সারাজীবন বসিয়ে বসিয়ে আমার আপনার ট্যাক্সের টাকায় খাওয়াতে চান? ‘যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’ ব্যাবস্থাকে অ্যাট লিস্ট এক্ষেত্রে অন্য কিছু ভাবতে পারছি না বলে দুঃখিত।
৩। উপরের প্রশ্নদুটোর উত্তর যদি যথাক্রমে ‘হ্যাঁ’ ও ‘ফাঁসি’ হয়, তাহলে ঠিক কী কারণে শরিয়াহ আইনের সমালোচনা করছেন? ইসলামী আইন বলে?

‘৭৫ ও ‘৭১ কে এই ঘটনার সাথে তুলনা করার জন্য যারা অলরেডি আমাকে মনে মনে গালি দিচ্ছেন, তাদের বলি, আমি কোন তুলনা করি নাই। তবে আমি কী বুঝাতে চেয়েছি, তা বুঝতে পারবেন, যদি এক মুহূর্তের জন্য “আপনি মানুষ” শুধু এই পরিচয়ে নিজেকে ‘৭১ বা ‘৭৫ এর ক্ষতিগ্রস্থদের একজন ভাবেন, তারপর ২০০৭ এ খুন হওয়া সেই মিশরীয় পরিবারের একজন ভাবেন। এরপর ভেবে দেখেন, কোন ক্ষেত্রে আপনি কী করতেন।

আর যারা সৌদি আইনকে এক বাক্যে শরিয়াহ আইন মনে করে কূপমণ্ডূকের মতো লাফাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্যেও বিনীত প্রশ্ন:

১। কখনো ভেবে দেখেছেন, শরিয়াহ আইনের শাস্তি প্রয়োগের আগে সৌদি আরব তার পূর্বের প্রয়োজনীয় ধাপগুলো পূরণ করে এসেছে কিনা?
২। একবারও চিন্তা করেছেন, আসলে যদি বিচারে কোন ভুল থেকে থাকে?

আর সব ধরণের পাঠকের উদ্দেশ্যে একটা কমোন প্রশ্ন:
কিছুদিন আগে বাংলাদেশের ক্ষমাশীল ও দয়ার্দ্র রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলামের খুনি ও লাশ টুকরো টুকরোকারী বিপ্লবকে মাফ করে দেয়াকে কীভাবে দেখেন?

প্রিয় পাঠক, আমার লেখার উদ্দেশ্য কোন সিদ্ধান্ত দেয়া না। আমার উদ্দেশ্য একটাই, আর তা হলো আপনাকে কিছু চিন্তার খোরাক দেয়া। দয়া করে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেন। আবেগের বশে কোন কাজ করবেন না। যুক্তি দিয়ে চিন্তা করেন ও পুরো ঘটনাকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেন।

[লেখাটা পূর্বে সদালাপে প্রকাশিত]