ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

কোন হত্যাটি বৈধ? একজন রাখাইন মেয়েকে তিন রোহিঙ্গা কর্তৃক ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা এবং রোহিঙ্গাদের বহনকারী একটি বাসে রাখাইনদের হামলা ও দশজনকে হত্যা যাদের সাথে পূর্বের ঘটনার কোন সম্পর্ক নেই।প্রথমটির সাথে সংশ্লিষ্ট তিনজনের শাস্তি হয়েছে মৃত্যুদণ্ড, যাদের একজন বিচার শেষ হওয়ার আগেই মারা গেছে কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায়।অপর ঘটনাটি পেয়েছে বৈধতা, কারন নিহতরা হচ্ছে রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গাদের কি পরিচয়?যেসকল প্রাণী গৃহপালিত নয় তাদের ঠিকানা বনে।কিন্তু রোহিঙ্গাদের দেশ কোনটি, কোথায় তাদের স্থায়ী ঠিকানা?মায়ানমার বলছে তারা আমাদের দেশের কেও না, তারা হচ্ছে বাঙালী।বাংলাদেশ বলছে তারা মায়ানমারের বাসিন্দা।বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রায় ১৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা কার্যত কোন দেশ নেয়, কোন পরিচয় নেয়।

এ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে ১৯৮২ সালে মায়ানমারের সামরিক সরকার কর্তৃক প্রবর্তিত নাগরিক আইনের মাধ্যমে।এ আইন অনুযায়ী যারা ১৮২৩ সালের আগে মায়ানমারে বাস করতো না তারা মায়ানমারের নাগরিক হতে পারবেনা। সে দেশের সরকারের দাবি রোহিঙ্গারা এসেছে বাংলাদেশ থেকে ১৯৫০ সালের পরে। তাই তারা সে দেশের আইন অনুযায়ী মায়ানমারেরর নাগরিক নয়।কিন্তু রোহিঙ্গাদের দাবি তারা সে দেশে বসবাস করছে আরও অনেক আগে থেকে।

ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে পাওয়া যায় অষ্টম শতকে বর্তমান সেন্ট মার্টিন দ্বীপের নিকটে আরব বণিকদের এক জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটে।উক্ত ঘটনায় জীবিত নাবিকেরা আরাকান রাজ্যের উপকূলবর্তী এলাকায় আশ্রয় গ্রহন করে।সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা তাদেরকে ডাকাত মনে করে ধরে নিয়ে যায় তাদের রাজার কাছে।রাজার কাছে এ সকল আরব বনিকরা রহম! রহম! (করুণা) বলে আরজি করলে তাদের পরিচয় হয়ে যায় উক্ত নামে। স্থানীয় উচ্চারন ভঙ্গিমায় এই ‘রহম’ পরবর্তীতে ‘রোহাং’ এবং আরো পরে রহিঙ্গা রূপ ধারণ করে।এই সকল আরব বনিকরা ছিল মুসলমান।এদের সংস্পর্ষে এসে যারা ইসলাম গ্রহন করতো তাদেরকেও উক্ত নামে সম্মধন করা হত।পরবর্তিতে অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মুসলমানদেরকেও তাদের রীতি প্রথার মধ্যে মিল থাকার দরুন উক্ত নামে ডাকা হয়।

বর্তমান মায়ানমারের নাফ নদীর উপকূলবর্তী পশ্চিমাঞ্চল ও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিন অঞ্চল নিয়ে গঠিত আরাকান রাজ্যটি ইতিহাসের অধিকাংশ সময় ধরে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল।১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খানের পুত্র বুজর্গ উমেদ আলী খান চট্টগ্রাম দখল করে নিলে আরাকান রাজা দুর্বল হয়ে পড়েন এবং পরবর্তিতে রাজ্যের অবশিষ্টাংশ বার্মার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।স্বাধীন আরাকান রাজ্যে মুসলমান রহিঙ্গা ও বৌদ্ধ রাখাইনদের মধ্যে সদভাব বজায় ছিল।রাজ্য ভাগ হয়ে গেলে রহিঙ্গাদের একটি অংশ কক্সবাজার অঞ্চলে থেকে যায়, যারা পরবর্তীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালী জাতির অংশে পরিনত হয়।এবং অপর বৃহৎ অংশ বার্মাভুক্ত আরাকান রাজ্যেই সংখ্যালঘু হিসাবে বাস করতে থাকে।রাজ্য ভাগ হলেও এ উভয় অংশের মধ্যে অবাধ যাতায়াত ছিল। ব্রিটিশ উপনেবিশকালে বার্মাও বৃটেনের শাষণাধীন ছিল।এ সময় কক্সবাজার অঞ্চল থেকে অনেকেই আরাকানে যেত শ্রমিক হিসেবে।এদের মধ্যে কেউ কেউ সেখানে স্থায়ী বসতিও গড়ে তোলে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপান বার্মা আক্রমন করলে আরাকানে বসবাসরত রোহিঙ্গারা বৃটিশদের পক্ষাবলম্বন করে। অপরদিকে রাখাইনরা জাপানিদের পক্ষ গ্রহন করে।যুদ্ধে বৃটিশদের প্রাথমিক পরাজয় ঘটলে এবং আরাকান থেকে বিতাড়িত হলে রোহিঙ্গারা জাপানী সৈন্য ও রাখাইনদের কাছে হত্যা, ধর্ষন ও লুটপাটের স্বীকার হয় এবং ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ এক দিনে প্রায় ৫০০০ রহিঙ্গা নিহত হয়। এ সময় প্রায় ৪০,০০০ রহিঙ্গা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে কক্সবাজারে চলে আসে।এরপর থেকেই মুলত রহিঙ্গা ও রাখাইনদের মধ্যে শত্রু ভাবাপন্ন পরিবেশ তৈরি হয়।যুদ্ধে অক্ষ শক্তির পরাজয় ঘটলে বৃটেন আবারও ক্ষমতা গ্রহন করে এবং রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ তাদের আদি আবাসে ফিরে আসে। ১৯৪৮ সালে বৃটেন অন্যান্য অঞ্চলের সাথে বার্মাকেও স্বাধীনতা প্রদান করে।

১৯৬২ সালে জেনারেল নি উইন ক্ষমতা গ্রহন করলে রোহিঙ্গারা মারাত্মক বঞ্চনার স্বীকার হয়।সামরিক বাহিনী থেকে সকল মুসলমান রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়া হয় এবং সরকারের অন্যান্য অংশ থেকেও তাদের অপসারণ করা হয়। ফলে তারা সমাজের নিচু শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত হয়।সামরিক সরকার তার ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে উসকিয়ে দেয়।রাষ্ট্রীয় প্রচার যন্ত্র সাম্প্রদায়িকতা প্রচারে অগ্রনী ভুমিকা রাখে।আমেরিকার এক সময়ের এশিয়া পলিসি বিষয়ক উপদেষ্টা ‘কেলি কুরি’ বলেন, “বছরের পর বছর মায়ানমার সরকার বৌদ্ধকে রাষ্ট্রের এক মাত্র সত্যিকারের ধর্ম বলে প্রচার করেছে।যার ফল স্বরূপ রোহিঙ্গারা আজ এই দুরাবস্থার স্বীকার হয়েছে”।মারাত্মক বঞ্চনার স্বীকার রোহিঙ্গারা এ সময় আরাকান রাজ্যের স্বাধীনতার দাবীতে সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। রোহিঙ্গারা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অংশে, যেমন কাচিন জাতিগোষ্ঠী, স্বাধীনতার দাবিতে এ সময় সসস্ত্র বিদ্রোহ করে। ১৯৭৮ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি মায়ানমারের সামরিক সরকার রহিঙ্গা বিদ্রোহ দমন করতে অপারেশন ‘কিং ড্রাগন’ পরিচালনা করে আরাকান রাজ্যে।এ সময় সামরিক বাহিনীর হাতে রোহিঙ্গারা হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের স্বীকার হয়। লাখ লাখ রোহিঙ্গা দেশ থেকে জোরপূবর্ক নির্বাসিত হয়।প্রায় ২৫০,০০০ রোহিঙ্গা নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।যারা বাংলাদেশে আসতে পারেনি তারা থাইল্যান্ড ও মালয়শিয়ায় আশ্রয় নেয়।বাকিরা যাত্রা পথে গভীর সমুদ্রেই হারিয়ে যায়। এরপর ১৯৯১-১৯৯২ এ চলে অনুরুপ রাষ্ট্রীয় বর্বরতা। এ সময়ও হাজার হাজার রহিঙ্গা দেশান্তরিত হয়।এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে তিন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহন করেছে।বাংলাদেশ ছাড়াও থাইল্যান্ডের নয়টি শরনার্থী শিবিরে ১১০০০০ এবং মালয়শিয়ায় ৩০,০০০ রোহিঙ্গা শরনার্থী মানবেতর জীবন যাপন করছে।

মায়ানমার সরকার বারংবার এই সকল শরণার্থীদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বরং তারা রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ।সকল আন্তর্জাতিক আবেদন উপেক্ষা করে, অযৌক্তিক এক আইনের অধীনে তারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। কারোর পক্ষেই দুইশত বছর আগের স্থানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। এরপরও তারা এই আইনকেই মানদণ্ড হিসেবে আকড়ে ধরেছে।

কোন নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক না হওয়ায় তারা নানা প্রকারের শোষণের স্বীকার।তারা কার্যত সকল প্রকারের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। মায়ানমারে বর্তমানে ৮০০,০০০ রোহিঙ্গা বসবাস করে।স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার তাদের নেয়। যেকোন মুহুর্তে তারা আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের স্বীকার হতে পারে।তাদেরকে ইচ্ছার বাইরে শ্রমে বাধ্য করা হয়।এমনকি তাদের রাষ্ট্রীয় অনুমতি ছাড়া বিয়ে করারও অনুমতি নেয়।তারা রাজ্যের অন্যান্য নাগরিকদের মত ইচ্ছামত সন্তান গ্রহন করতে পারে না। সর্বোচ্চ দুইটি সন্তান নেওয়ার অনুমতি আছে।তাছাড়া রাষ্ট্রযন্ত্রের অবিরাম বিরুপ প্রচারের ফলসরুপ শুধুমাত্র স্থানীয় রাখাইনরাই নয় বরং দেশের ৭০% বৌদ্ধ সম্প্রদায় আজ তাদের বহিরাগত বলে মনে করে। নাগরিকত্ব না থাকাই তারা সম্পত্তির মালিকানা থেকে বঞ্চিত। এমনকি তারা উত্তরাধিকার থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তিরও মালিক হতে পারে না।শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত।

পৃথিবীর সকল দেশই তাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করেছে।মালয়শিয়ায় জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত শরনার্থী শিবিরে ৩০,০০০ রোহিঙ্গা বাস করে। সে দেশের নাগরিকত্ব না থাকায় তারা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। শিক্ষার সুযোগও খুবই অপ্রতুল। থাইল্যান্ড-মায়ানমার সীমান্তে নয়টি শরনার্থী শিবিরে ১১০,০০০ রোহিঙ্গা বাস করে। এরাও থাই সেনা সদস্যদের হাতে নির্মমতার স্বীকার হয় মাঝে মাঝেই। ২০০৯ সালের ফেব্রয়ারি মাসে ১৯০ জন রোহিঙ্গাকে নৌকাই উঠিয়ে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেওযা হয়। এদের মধ্যে কয়েকজন বাদে সকলেই সমুদ্রেই নিহত হয়। জীবিতদের ইন্দোনেশিয়া কর্তৃপক্ষ উদ্ধার করে।একই বছরের ফেব্রুয়ারীর শেষের দিকে পাঁচটি নৌকা ভর্তি রোহিঙ্গা থাই সেনা কর্তৃক সমুদ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর মধ্যে চারটি নৌকা সমুদ্রেই ডুবে যায় এবং একটি উপকূলে পৌছাতে সক্ষম হয়। তবে সকলেই নিহত হয়।জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) এর মতে “পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জাতি হচ্ছে মায়ানমারে বসবাসরত রোহিঙ্গারা”।

রোহিঙ্গা ইস্যুর প্রধানতম সমস্যা তাদের নাগরিকত্বের জটিলতা। এ সমস্যার সমাধান ব্যতিরেকে অন্য কোন সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।এর জন্য মায়ানমারকে উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে।নোবেল জয়ী নেত্রী অং সান সু চি বলছেন “তার দেশের নাগরিকত্ব আইন এ সমস্যা সমাধানে প্রধান অন্তরায়”।তাহলে এই নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হোক। বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাথে নিয়ে এ সমস্যা সমাধানে মায়ানমারকে চাপ প্রয়োগ করা। পাশের ঘরে আগুন লাগলে তা নিজের ঘরেও লাগার সম্ভবনা থাকে। একটি জাতি বছরের পর বছর ধরে নিজ দেশে পরবাসি হয়ে বাস করতে পারে না।