ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সাথে বিস্তারিত আলোচনার পর ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন ভারত বিভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন (এটি “৩রা জুন পরিকল্পনা” নামে পরিচিত)।ঘোষণাটি ছিল আকশ্মিক ও অপরিনামদর্শী। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রায় আড়াই মাস আগে দেশ ভাগের ঘোষনা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে বহু গুনে বাড়িয়ে দেয়।সারা ভারতবর্ষতো বটেই বিশেষ করে দুই বাংলা কেন্দ্রিক এ দাঙ্গা ভয়াবহ রুপ ধারণ করে।মহাত্মা গান্ধী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোধে কলকাতা এলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও মহাত্মাজীর সাথে যোগ দিলেন। সোহরাওয়ার্দী বিভাগোত্তর ভারতে অবস্থানরত চার কোটি মুসলমানের জান-মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা বিধানের মহান দায়িত্ববোধে উদ্ধুদ্ধ হয়ে ভারত বিভাগের সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য নেতার মত পাকিস্থান অভিমুখে যাত্রা করেননি। মহাত্মাজীর সাথে তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গারোধে আপ্রান চেষ্টা করেছেন।১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে পাকিস্থান আসার আগ পর্যন্ত তিনি কলকাতা ছিলেন।

বিভাগপুর্ব বঙ্গীয় মুসলিম লীগে দুটি সক্রিয় গ্রুপ ছিল।খাজা নাজিমুদ্দিন-নুরুল আমীন একটি গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন।অপর গ্রুপটির নেতৃত্বে ছিলেন সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশেম (লেখক বদরুদ্দিন ওমরের পিতা)।পাকিস্থান সৃষ্টির নয় দিন আগে ৫ই আগস্ট ১৯৪৭ সালে পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারী পার্টির বৈঠকে খাজা নাজিমুদ্দিন ৭৫-৩৯ ভোটে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পরাজিত করে পার্লামেন্টারী দলের নেতা নির্বাচিত হন।১৪ই আগস্ট দেশ স্বাধীন হলে খাজা নাজিমুদ্দিন পুর্ব পাকিস্থানের প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি তার মন্ত্রীসভায় অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ‘সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভার’ কাউকে রাখলেন না।উপরন্ত দেশ ভাগের পর কলকাতা থেকে যাওয়ার কারণে তার চেষ্টায় সোহরাওয়ার্দীর সংসদ সদস্যপদও বাতিল করা হয়। এ সময় মুসলিম লীগে সোহরাওয়ার্দী পন্থী নেতা কর্মীরা(শামসুল হক, আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ প্রমুখ) কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েন।

সোহরাওয়ার্দীর প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ ও প্রাদেশিক সরকারের কুপমন্ডকতা “পুর্ব পাকিস্থান আওয়ামী মুসলিম লীগ” গঠনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।ভাষা প্রশ্নে খাজা নাজিমুদ্দিনের অবস্থান, দেশব্যাপী খাদ্য ঘাটতি, কৃষিজাত দ্রব্যের মুল্য বৃদ্ধি, সাধারণ জনতার উপর পুলিশি নির্যাতন, সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ ইত্যাদি নানাবিধ কারণে পুর্ব পাকিস্থানে মুসলিম লীগ সরকার ক্রমান্বয়ে জন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।জনতার মিছিলে পুলিশের গুলি নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয় এবং এ সংখ্যা বাড়তেই থাকে।পুর্ব পকিস্থান পুলিশের অফিসিয়াল তথ্য মতে ১৯৪৮ সালে ৩৮ বার, ১৯৪৯ সালে ৯০ বার, ১৯৫০ সালে ১১০ বার পুলিশ সরাসরি সাধারণ জনাতার মিছিলে গুলি চালায়।২৬শে এপ্রিল ১৯৪৯ সালের পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্তৃক এক বিবৃতিতে বলা হয় “ পুলিশ কর্তৃক সাধারণ জনতার উপর গুলি আসঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে”।কিন্তু উক্ত সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

আসাম প্রাদেশীক মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী দেশ ভাগের পর টাঙ্গাইলে চলে আসেন এবং দক্ষিণ টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে অংশ গ্রহন করে সেখানকার মুসলিম লীগের শক্তিশালী প্রার্থী করটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করে পুর্ব পাকিস্থান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।কিন্তু নির্বাচনী ত্রুটির অজুহাতে গভর্ণরের এক আদেশ বলে উক্ত নির্বাচন বাতিল ঘোষনা করা হয় এবং মাওলানা ভাষনীকে ১৯৫০ সাল অবধি নির্বাচনে অংশ গ্রহনের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।২৬ শে এপ্রিল ১৯৪৯ সালে পুনরায় উক্ত আসনে নির্বাচনের ঘোষণা করলে শামসুল হক (পুর্ব পাকিস্থান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক) পন্নীর সাথে প্রতিদ্বন্দিতা করেন এবং এবারও মুসলিম লীগ প্রার্থী পন্নী পরাজিত হয়। এরপর থেকে ’৫৪ এর নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে শুন্য হওয়া ৩৫টি আসনে মুসলিম লীগ সরকার আর কোন নির্বাচন দেওয়ার সাহস করেনি।জনবিচ্ছিন্ন মুসলিম লীগ সরকার মুষ্টিমেয় কিছু অভিজাত শ্রেণীর সরকারে পরি্ণত হয়।এমতাবস্থায় জনগনের প্রতিনিধিত্বশীল একটি রাজনৈ্তিক সংগঠনের প্রয়োজনিয়তা তীব্র হয়ে উঠে।এই সাংগঠনিক শুন্যতা পুরণ করতেই ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর নেতৃত্বে “পুর্ব পাকিস্থান আওয়ামী মুসলিম লীগের” জন্ম হয়। শামসুল হককে সাধারন সম্পাদক ও শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করে এগার সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে এই সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়।খন্দকার মোশতাক এই কমিটির সহ-সম্পাদক ছিলেন।

যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল যোগ্য নেতৃত্ব, আত্ব-উৎসর্গের মানসিকতা ও প্রগাঢ় দেশাত্ববোধ।মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান সকলেই তা প্রদর্শন করতে সক্ষম হন।প্রতিষ্ঠার বছরেই অক্টবর মাসে ভাষানীকে ও শামসুল হককে গ্রেফতার করা হয়। তার পরের বছর শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তাদের গ্রেফতার সংগঠনের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে নি।১৯৪৯ সালের অক্টবর মাসে মাওলানা ভাষানী ‘সাপ্তাহীক ইত্তেফাক’(পরবর্তিতে ১৯৫৩ সালে দৈনিকে রুপান্তরিত হয়) পত্রিকা বের করার ব্যাবস্থা করেন।এই পত্রিকা তাদের মুখপত্র হিসেবে কাজ করতো।সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বুদ্ধি ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে তা্রা সংগঠন পরিচালনা করেছেন।প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ সৃষ্টি অবধি এই সংগঠনটিই মুলত বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।’৫২ এর ভাষা আন্দোলনে প্রাক্কালে মাওলানা ভাষানী ও আবুল হাশেম (তিনি দেশ ভাগের পর খেলাফতে রাব্বানী নামক দল গঠন করেন)এর নেতৃত্বে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হলে ভাষা আন্দোলনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখে।১৯৫৩ সালে নিখিল পকিস্থান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এর সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। মাওলানা ভাষানী, সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবর রহমানের সম্মলিত নেতৃত্বে সংগঠনটি নিখিল পাকিস্থানের সর্ববৃহত সংগঠনে পরিণত হয় এবং ১৯৫৬ সালে পাকিস্থানের কেন্দ্রীয় সরকার ও পুর্ব পাকিস্থানের প্রাদেশিক সরকার উভয়টিই এই সংগঠনটি গঠন করে।বিভিন্ন সময়ে সংগঠনটির নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫৭ সালে বৈ্দেশিক নীতি নিয়ে মতবিরোধের যের ধরে মাওলানা ভাষানী সংঠন থেকে বের হয়ে গেলেও সংগঠন থেমে যায় নি।কারণ আওয়ামী মুসলিম লীগ কারোর ব্যাক্তিগত সংগঠন হিসেবে কখনই বিবেচিত হয়নি।

শেখ মুজিবুর রহমান সংঠনটির যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠালগ্নে্য এর সাথে সম্পৃক্ত হন।এরপর ১৯৫২ সালে কারা বন্দী থাকা অবস্থায় শামসুল হক মানষিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৯৫৩ সালে পুর্ব পাকিস্থান মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবর রহমানকে এই সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক করা হয়।এরপর সময়ের ব্যাবধানে ও রাজনৈ্তিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৬ সালে এর সভাপতি নির্বাচিত হন।সাংগঠনে গনতন্ত্রের চর্চা সকলকে দেশ গঠনে সমান সুযোগ করে দিতে সক্ষম হয়। যার ফলে শেখ মুজিবুর রহমানের মত নেতৃত্ব সংগঠনটি উপহার দিতে সক্ষম হয়েছে।ভাষানীর দল ত্যাগ শুন্যতার সৃষ্টি করলেও তা কাটিয়ে ঊঠা সম্ভব হয়।দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কারো ব্যাক্তিগত সংগঠনে পরিণত হয়নি।জনগনের দাবীর মুখে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটি জনগনেরই সংগঠন ছিল। উল্লেখ্য সংগঠনটি প্রতিষ্ঠার সময় শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে বন্দী ছিলেন। তারপরও তিনি তার প্রাপ্য অবদানের স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হননি এবং অতি যুবক বয়সেয় তাকে সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক করা হয়েছিল।সংঠনটি যদি ভাষানী কিংবা সোহরাওয়ার্দী ব্যাক্তিগত সংগঠন বলে মনে করতেন তাহলে হয়তো শেখ মুজিবের মত নেতৃত্ব পাওয়া যেত না।কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ আর জনগনের আওয়ামী লীগ নেই, এটি একটি পারিবারিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।তাই এ সংগঠনের পক্ষে দ্বিতীয় কোন মুজিবের জন্ম দেওয়া সম্ভব নয়।এক সময়ের আওয়ামের (জনতার) সংগঠন আজ একটি পরিবারের কাছে কুক্ষিগত।

ক্ষমতা গ্রহনের অল্প পরে শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের সামনে একবার বলেছিলেন “সম্ভবতঃ এ জাতির স্বাধীনতার জন্য একজন নেতৃত্ব দেবে আর একজন জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে”।তিনি দেশে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন।এ দেশ গঠনে প্রয়োজন আরো অনেক মুজিবের।কিন্তু আল্লাহ যদি সকল মুজিবকে একটি পরিবারে পাঠাতে বাধ্য হয়ে না থাকেন তা হলে আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্ভবত দ্বিতীয় আর কোন মুজিবের জন্ম দেওয়া সম্ভব নয়।তাই কোন মুজিবকে যদি এ বাংলায় জন্মাতেই হয় তাহলে তা ভিন্ন পথেই হতে হবে।