ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

জেনেছি জন্ম আর মৃত্যু সৃষ্টিকর্তার হাতে। কিন্তু এই বঙ্গে জন্মে দেখছি মৃত্যু মৌলবাদীদের হাতে। মৌলবাদীদের চুরির তলে নিজ মস্তক বিছিয়ে দিয়ে পৃথিবীকে বিদায় জানাতে হবে এমন অলিখিত নিয়ম প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশে প্রতিটি সূর্যদয় আর সূর্যাস্তের সাথে। না এখন সাম্প্রদায়িক শক্তির দল ক্ষমতায় নেই, না এখন রাজাকারের দলও ক্ষমতায় নেই। এখন ক্ষমতায় যারা তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল, তারা ধর্মনিরপেক্ষ অসম্প্রদায়িক মানুষের দল। আর হ্যাঁ সেই দলের শাসনামলেই যখন একের পর এক মুক্তমনা মানুষ তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনা আর বিশ্বাস নিয়ে লেখালেখির অপরাধে মৌলবাদীদের কোপ খেয়ে মারা পড়ে তখন হতাশার গভীর চোরবালিতে ডুবে যাওয়া ছাড়া কোন পথ খোলা থাকে না। সেই হতাশার মাঝেও কিছু প্রশ্ন এবং তার উত্তর খোঁজা জরুরি। যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের ভবিষ্যত বলে দিবে, বলে দিবে আমরা কেমন বাংলাদেশ দেখতে চলেছি নিকট ভবিষ্যতে। আসুন প্রশ্নগুলোর দিকে একটু আলোকপাত করি।

কেন ব্লগার-রা খুন হচ্ছেন?

বাংলাদেশ এখন কাউকে খুন করার সবচেয়ে সহজ পন্থা হলো তাকে ব্লগার আর নাস্তিকের ট্যাগ দিয়ে দেওয়া। অর্ধশিক্ষিত লোকে ভরা মিড়িয়ার প্রচারের বদলৌতে আপামর বাঙালি আজ জানে ব্লগ মানেই নাস্তিকের আখড়া। আর নাস্তিক মানেই মৃতুযোগ্য অপরাধী। ফলে যখন কেউ জানে নিহত ব্যাক্তিটি ব্লগার তখনি সেই খুন সম্পর্কে তার স্বাভাবিক সহানুভূতি কিংবা প্রতিবাদী মনোভাবটুকু ‍উবে যায়। অস্বীকার করার কোন উপায় নেই এই ভূ-খন্ডের বেশিভাগ মানুষ চিরকাল-ই সাম্প্রদায়িক চেতনার সুপ্ত বীজ ধারণ করেছে নিজের মাঝে। উপযুক্ত আলো বাতাস পেলেই সে বীজ থেকে সাম্প্রদায়িকতার চারা গজিয়েছে। এখন সেই সুসময় আবার ফিরে এসেছে। বিএনপি-হেফাজতে জামায়েত সহ উগ্রপন্থি মৌলবাদী নানান গ্রুপ এবং অন্ধ কিছু আওয়ামি গ্রুপ মিলে নানান তত্ত্ব দিয়ে হত্যাকান্ডগুলো কে জায়েজ করছে দিনে রাতে। কেউ প্রকৃত মুসলমান তত্ত্ব নিয়ে আসে, কেউ খাঁসি (নাস্তিক দের খাঁসি ডাকছে) তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়, কেউ দেশ আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে বলে বাণী উড়াচ্ছে, আবার কেউবা দুপক্ষকে সমান দুষ্ট বলে সাম্যতা রক্ষা করে সব ভুলে আমাদেরকে সামনে তাকাতে হবে বলে দেশপ্রেমের হাঁক ছাড়ছে। এভাবেই তো চলছে আজকের বাংলাদেশ।

অথচ এমনটা ছিলো না কিছুদিন আগেও। ২০০১-০৬ এর ঘোর লাগা অন্ধকার সময় কে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ঠিকি এগিয়েছিলো প্রগতিশীল রাষ্ট্রের পথ ধরে। সমস্যাটা শুরু হলো রাজাকারের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকেই, বিশেষ করে গনজাগরণের আত্নপ্রকাশের পর থেকে। গনজাগরণের সময় যখন বাঙালির দুটো আলাদা শ্রেণীতে (প্রতিক্রিয়াশীল রাজাকার পন্থি আর প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধ প্রেমী) বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠেলো, ঠিক তখনি রাজীব হায়দার কে কোপানো হলো। এখানে একটা বিষয় একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করতে হবে। যারা নাস্তিক কোপানো তে মৌন সম্মতি দিচ্ছেন কিংবা বলছেন ধর্ম নিয়ে লিখলে কোপানো ঠিক আছে তাদের অবগতির জন্যে বলি ‘ব্লগার-রা অনলাইনে লেখালেখি করছে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে নয়, বাংলা ব্লগের ইতিহাস এত ছোট নয়। রাজীব-অভিজিৎ-অনন্ত বিজয় সহ যারাই খুন হয়েছেন এরা প্রায় প্রত্যেকে সাত-আট-দশ বছর ধরে ব্লগ জগতে লেখালেখি করতেন। তারা যদি ধর্মকে গালাগালি করেও থাকেন তাহলে সেটি নিশ্চয় ২০১৩ সাল থেকে নয়। তাহলে হঠাৎ করে কেন ২০১৩’র পর থেকে ব্লগারদের হত্যার লিষ্ট তৈরিকরণ? কেন নাস্তিকের ট্যাগ সংযোজন করে ধারাবাহিক ভাবে হত্যা?

উত্তরটা সহজ, প্রগতিশীল ব্লগার-রাই অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের অবিরত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চা, ধর্মান্ধদের মুখোশ খুলে দেওয়া, রাজাকারদের পাপাচার সবার সামনে নিয়ে আসার কাজগুলো, হেফাজতে জামায়েতের মতো মৌলবাদী দলগুলোকে কোনঠাসা করে ফেলেছে। ফলে অস্তিত্বের সংকট থেকে বের হতেই ব্লগারদের নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে তারা হত্যা করছে। আর এ কাজটি যার দ্বারা সূচিত হয়েছিলো তার নাম ‘মাহমুদুর রহমান’। এই কুলাঙ্গার রাজাকারদের বিচার থেকে জনগনের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে ‘নাস্তিক ইসলাম বিদ্বেষী’ ব্লগার তত্ত্ব হাজির করে।

যারা আজ ব্লগারদের বিষাদাগার করছেন তাদের কে বলি এই ব্লগারদের কারণেই ৫ই ফেব্রুয়ারিতে আরেকটি নতুন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিলো শাহবাগে। যুদ্ধপরাধের বিচারের দাবিতে সেই আন্দোলন শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন এই জাগরণের ইতিহাস উজ্জ্বল থাকবে। মনে রাখতে হবে সেই জাগরণের কারনেই যুদ্ধাপরাধ বিচারে নতুন আইন হলো, কাদের মোল্লার ফাঁসি হলো। সুতরাং বাংলাদেশে রাজাকারের বিচারের সাফল্য অর্জনের সাথে ব্লগারদের নাম উজ্জ্বলভাবেই লেখা থাকবে ইতিহাসে।

কিন্তু অকৃতজ্ঞ বাঙালিদের সাথে-সাথে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কন্ঠ মিলিয়েছে অন্ধ কিছু আওয়ামি সংগঠন। তারা সেইসব ব্লগারদের হত্যাকান্ডকে নানান অপব্যাখা দিয়ে বৈধতা দিচ্ছে। তাদের এই বৈধ্যকরণের পেছনে স্পষ্ট কিছু উদ্দেশ্য আছে। প্রথমত তারা চাইছে এই হত্যাগুলোতে সরকারের উদাসীনতা যেন সাধারণ মানুষের চোখে না পড়ে, হত্যার বিচারের দাবিগুলো যেন জোরালো না হয়। এ তো গেলো অন্ধদের অন্ধদল প্রেম। কিন্তু সরকার কেন উদাসীন থাকছে, কি এত হিসেব-নিকেষ কষে সাম্প্রদয়িক শক্তির সাথে উঠ-বোস করছে? এ ঐক্য বা উদাসীনতা কি তাদের জন্যে মঙ্গল বয়ে আনবে? আসুন একটু বিশ্লেষন করে দেখি।

সরকার কি সাম্প্রদায়িক শক্তির বিষয়ে উদাসীন?

প্রথমেই এ প্রশ্নটার উত্তর খোঁজা জরুরি। আমরা দেখছি শুধু ব্লগার নয়, গত ৫-৭ বছরে সংঘটিত সকল সাম্প্রদায়িক হত্যা, লুন্ঠন, ঘরবাড়িতে আগুন, দখল কোনটার বিচার আওয়ামিলীগ সরকার করেনি। রামুতে বৌদ্ধ মন্দির হামলা হলো, ভোটের আগে-পরে অসংখ্য হিন্দুদের বাড়ি ঘর দখল, আগুন দেওয়া হলো। সেগুলোর একটারও চার্জশিট হয়নি এখনো, এমনকি কি কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। এটা কি চরম উদাসীনতা নয়? শুধু এখানেই ঘটনার শেষ নয়, ৫ই মে ঢাকা শহর কে নরক বানিয়ে যারা বিভীষিকাময় করে তুলেছিলো নাগরিক জীবন তাদের বিচারও বন্ধ। কেউ জানে না বাবুনগরী যে মামলায় কয়দিন রিমান্ড খাটলো তার কি খবর? বিচার হয়নি সিপিবির জনসভা, উদিচীর অনুষ্ঠান, আওয়ামী লীগের জনসভা, রমনার বর্ষবরণ অনুষ্ঠান, ময়মনসিংহের সিনেমা হল, সিলেটের মাজারের বোমা হামলার। বিচার হয়নি হুমায়ুন আজাদের উপর মৌলবাদীদের হামলার। শুধু তাই নয় আমরা বিস্ময়কর ভাবে দেখলাম হাটহাজারীতে ছাত্রলীগের উপর পৃথিবরীর বর্বরোচিত উপায়ে হামলা করে হত্যা করা হলো কয়েকজনকে। আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা হলো অসংখ্য হুন্ডা আর কার। অথচ সেটিরও বিচারের কোন খবর নেই। এমনি করে প্রতিটি ঘটনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় সাম্প্রদায়িক শক্তির বিপক্ষে, তাদের হত্যাযজ্ঞের বিপক্ষে সরকারের নৈতিক অবস্থান শক্তিশালী নয়। ফলে এ কথা এখন দৃঢ়চিত্তেই বলা যায় ’যে সরকার মৌলবাদী শক্তিকে দমনে অনেকটা উদাসীন’। আর সেই উদাসীনতার সুযোগে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী দলগুলো দিনে দিনে ভয়ংকর শক্তিশালী হচ্ছে।

ভোটের রাজনীতি নাকি সাম্প্রদায়িক শক্তিকে শান্ত রাখার মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা?

অন্ধ আওয়ামিমনাদের থেকে প্রায়ই শুনি সাম্প্রদায়িক শক্তিকে না ঘাটানো সরকারের এক প্রকার কৌশল। এই যে কৌশলের তত্ত্ব নিয়ে আসা হলো, তো সে কৌশল টা কি? কৌশল হলো দেশের ধর্মভীরু(প্রকৃতপক্ষে ধর্মান্ধ) মানুষদের আঘাত না করে শান্ত রাখা, সরকারের শত্রু বৃদ্ধি না করা। তারপর তাদেরকে নানান সুযোগ সুবিধা দিয়ে আওয়ামি পতাকা তলে নিয়ে আসা, যাকে ভোটের রাজনীতি বলছে লোকে।

প্রথম কথা কোন অন্যায়ের বিপক্ষে দাঁড়ালে যদি কোন দল কিংবা গোষ্ঠি আহত হয়, তাহলে বলতে হবে ওই দল কিংবা গোষ্ঠি মধ্যযুগীয় চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী। সেই মধ্যযুগীয় বিশ্বাসী কোন দল বা গোষ্ঠিকে শান্ত রাখার কৌশল প্রমাণ করে ক্ষমতাবান দলটি তাদের নীতি-আদর্শকে বিসর্জন দিচ্ছে। দ্বিতীয় কথা হলো সেই ধর্মভীরু (তথা ধর্মান্ধ)দের আওয়ামি পতাকা তলে নিয়ে আসার বাস্তবতা। সামন্যতম রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যাদের জানা আছে, তাদের প্রতেক্যে জানে এইসব ধর্মান্ধ দল/মানুষগুলো কে পুরো রাষ্ট্র লিখে দিলেও তারা কোনদিন আওয়ামিলীগকে ভোট দিবে না। সুতরাং ভোটের রাজনীতির তত্ত্ব ভুল আর শান্ত রাখার কৌশল পুরোপুরি আত্নঘাতী।

আজ তাদের শান্ত রাখার নাম করে বিকাশিত হতে দিলে, শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ দিলে একদিন তারা সংস্কৃতি মনা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ, প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ সহ তাদের একমাত্র মৌলবাদের অনুসারী ছাড়া বাকি সবাইকে খতম করবে। বিশ্বাস হয় না? বিশ্বাসে জন্যে তাহলে ফিরে যেতে হবে ২০০৫ সালের ১৭ই অগাস্টের স্বর্ণালী দিনে। যেদিন সারা দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটেছে। কোন নাস্তিক-আস্তিক নয় সর্বত্র মৌলবাদীরা বোমা ফুটিয়েছে। বোমা মেরে হত্যা করা হয়েছে সাবেক অর্থমন্ত্রি কিবরিয়া কে, বোমা মেরে অসংখ্য নেতাকর্মী হত্যা করা হয়েছে ২১শে আগষ্ট শেখ হাসিনার জনসভাতে, রমনায়, উদিচীতেও বোমার উৎসব চলেছে। সুতরাং শান্ত রাখার নাম করে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের শক্তিশালী করা অনেক বড় আত্নঘাতী সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগের জন্যে, বাংলাদেশের জন্যে। একটা বিষয় আওয়ামী লীগের মাথায় রাখতে হবে, এদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রধান শত্রু তারাই। বিএনপির সাথে সাম্প্রদায়িক শক্তির চিরকালের সখ্যতা। আপনি-আমি সবাই জানি মৌলবাদীরা ক্ষমতাবান হলেও বিএনপির গায়ে কোনদিন এক ফোটা আঘাত আসবে না।

স্বাধীনভাবে লেখালেখির সময় কি এসেছে বাংলাদেশে?

লেখালেখির জগতে স্বাধীনতা কি? স্বাধীনতা হলো কোন ভয়বিহীন, বাধাহীন-সংকোচহীন নিজের মত প্রকাশ করার অধিকার। এই স্বাধীনতাটুকুর কি প্রয়োজন? হুমায়ুন আজাদ তার এক প্রবন্ধে মানুষের ’স্বাধীনতার’ প্রয়োজনের উপর কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। প্রাসঙ্গিক বলে সেগুলোই তুলে দিচ্ছি…

শৃঙ্খলিত সিংহের চেয়ে স্বাধীন গাধা উত্তম। শৃঙ্খল মানুষকে, যে কোনো প্রাণীকে, রোধ ও বিনাশ করে; স্বাধীনতা বিকশিত করে। মানুষের মুখ্য লক্ষণ সৃষ্টিশীলতা, যার অন্য নাম প্রতিভা। সেই সৃষ্টিশীলতার, প্রতিভার, বিকাশের প্রথম শর্ত স্বাধীনতা। স্বাধীনতা শুধু রাজনীতিক হলে চলে না; তথাকথিত স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিবাসী মাত্রই যে স্বাধীন এমন নয়। যে রাষ্ট স্বাধীন কিন্তু তার অধিবাসীরা স্বাধীনতাহীন, এমন অবস্থা ক্ষতিকর পরাধীনতার চেয়েও, কেননা রাজনীতিক পরাধীনতার মধ্যে যে দ্রোহ ও স্বাধীনতাস্পৃহা থাকে জাতির চেতনাস্রোতে, ছদ্মস্বাধীনতায় তাও থাকে না। ছদ্মস্বাধীনতা নষ্ট করে সব কিছূ;- দ্রোহ, স্বাধীনতাস্পৃহা, মেধা ও প্রতিভা। স্বাধীনদেশে স্বাধিকারহীনতা এক ভয়াবহ ব্যাপার, তাতে সমগ্র জাতি পরিণত হয় দাসে বা জন্তুতে এবং এক সময় তা বিলুপ্ত হয়ে যেতে বাধ্য। কোনো রাষ্ট্রে কেউ হবে অবাধ স্বাধীন, আর কেউ বিপুল জনমণ্ডলি হবে পরিমিতভাবে স্বাধীন, এমন অবস্থা জাতির দরারোগ্য ব্যাধির লক্ষণ।

সুতরাং একথা দ্বিধাহীন ভাবেই বলা যায় মানুষের সৃষ্টিশীলতা প্রকাশের জন্যে স্বাধীনতা অপরিহার্য। মানুষের বিকাশের জন্যে যেখানে স্বাধীনতা অত্যাবশক সেখানে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সময় আসেনি বলাটাই সবচেয়ে বড় মূর্খতা। ’সময়’ বলতে তারা বুঝায় ধর্মান্ধদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। অর্থাৎ এক গোষ্ঠির সংখ্যাগরিষ্ঠতাই অন্য ব্যাক্তির স্বাধীনতার পরিমাপ নির্ধারণ করে দিবে, হিসেবটা অনেকটা এমন! তো সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েই মানুষের ব্যাক্তি স্বাধীনতার ইতিহাস কে দেখি তাহলে কেমন দেখায়। ’৪৭’ এ যে ভূ-খন্ড ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েছিলো, সেই ভূ-খন্ডেই ৭১ এ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভের অন্যতম ছিলো ধর্মনিরপেক্ষতা! প্রশ্ন আসতে পারে ’৪৭’ থেকে ’৭১’ এই চব্বিশ বছরে সব ধর্মান্ধ মানুষ কি প্রগতিশীল মুক্তমনা হয়ে গিয়েছিলো? না, হয়নি, একটি সমাজের, একটি রাষ্ট্রের মানুষের বিশ্বাস-চিন্তা চেতনা আর চরিত্র এত সহসা বদলে যেতে পারে না।

তাহলে কিভাবে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া একটি ভূ-খন্ডে থেকে দুই যুগ পেরুনোর আগেই ধর্মনিরপেক্ষ আরেকটি দেশের জন্ম হলো? হ্যাঁ সম্ভব হয়েছিলো একজন মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবির্ভাবে। যিনি সময়ের সকল সীমাবদ্ধতা আর সংকীর্ণতাকে পেছনে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। ইতিহাস ভুলে যাওয়া মানুষরা কষ্ট করে ১৫ই আগষ্টের পরের ঘটনাগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলেই বুঝতে পারবেন আপনাদের এইসব সংখ্যাগরিষ্ঠ তত্ত্ব কতটা হাস্যকার আর বাল্যখিল্য। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ২৪ ঘন্টার মাঝেই ’পিপলস রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’ হয়ে গিয়েছিলো ’ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’। তাই যারা এসব বুলি উড়ান যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি লেখালেখির তারা আসলে অজ্ঞ অথবা কৌশলী দলান্ধ। পরিবেশের উপর ভর করে এই পৃথিবীতে মিথ্যেকে সরিয়ে কোন দিন কোন সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্রুনো, গ্যালিলিও রা মৃত্যুকে ভয় পেয়ে তাদের সত্য আবিষ্কার থেকে পেছনে সরে আসেন নি। ’সু-সময়ের’ অপেক্ষো করে থাকলে মানুষের ঠিকানা এখনো জঙ্গলে আর গুহায় থাকতো।

আওয়ামিলীগ সমালোচনাকারী মাত্রই কি মুক্তিযুদ্ধ তথা বাংলাদেশের উন্নতির বিপক্ষে?
: একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলে দেখবেন অনলাইনে যারাই আওয়ামিলীগের যৌক্তিক-অযৌক্তিক যে সমালোচনাই করছে, তাদের সবাই কেই কিছু অন্ধ দলকানা মানুষ এবং তাদের সংগঠন ’জামায়াতে ঘরণার, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের মানুষ হিসেব চিন্থিত করছে’। আর ঠিক দু বছর তিন মাস আগে উদ্ভব হওয়া প্রগতিশীলদের মতোই দাবি করছে কেন তারা ব্লগার হত্যার বিষয়ে এত সরব হচ্ছে, কেন তারা পেট্রোলবোমা হামলার সময় নিশ্চুপ ছিলো? চিনতে পারছেন সেই প্রগতিশীলদের? হ্যাঁ, ঠিক এমন সুরেই দাবি উঠেছিলো শাহবাগে গণজাগরণের সময় নব্য প্রগতিশীলদের। মূলত তারা ছিলো দলকানা চুপা প্রগতিশীল, রাজাকারের বিচার চাই বলে প্রগতিশীলতার হুজুগে মুখেশটা সুযোগ বুঝে তখন পরে নিয়েছিলো ভন্ডরা। মুখশে প্রগতিশীলরা সেখানে বলেছিলো ’আমি যুদ্ধারপরাধীর বিচার চাই কিন্তু সাথে সাথে ফেলানী, সাগর-রুনি, শেয়ার বাজার, পদ্মা সেতু সহ দেশের যাবতীয় সকল অন্যায়ের বিচার চাই’। সে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা। দু-বছর তিনমাস পরে আজ এদের অবস্থাও ঠিক ওদের মতোই।একটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরো দশটা অন্যায়কে যারা টেনে আনে তারা আসলে কোন অন্যায়ের বিচার-ই চায় না। আজকে যারা ব্লগার হত্যা সহ সকল সাম্প্রদায়িক হত্যা-নির্যাতনের বিচার চাইছে, যারা হত্যাকাকেন্ডর জন্যে আওয়ামিলীগ নয় মৌলবাদী গ্রুপকে দায়ী করছে, তাদের প্রায় সকলেই পেট্রোলবোমা হামলার বিরুদ্ধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করেছে। কারণ অসম্প্রদায়িক মানুষ রাষ্ট্রের সকল অন্যায়-অসঙ্গতির প্রতিবাদ করে। যেমন করেছে ওয়াশিকুর, রাজীব হায়দার, দ্বীপ, অনন্ত বিজয়’রা।

দলকানাদের এইটুকু বুঝতে হবে আওয়ামীমনা মুক্ত প্রগতিবাদী মানুষরা যতই আওয়ামী লীগের সমালোচনা করুক তারা কোনদিন সাম্প্রদায়িক শক্তি বিম্পি-জামাতকে সমর্থন দিবে না। তাদের পক্ষে দাঁড়াবে না। কিন্তু এখন সেই তাদের কেই যদি মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে দূরে রাখে এবং জামায়তের ট্যাগ দেয় তাহলে তারা একদিন ঠিকি আস্থাহীন হয়ে যাবে তাদের ’শেষ বিশ্বাসের’ প্রতি। আর তখন হয়তো নিজেকে গুটিয়ে ফেলবে নিজের বিশ্বাস আর ভালোলাগা থেকে এবং তাদের সন্তানদের ও এই আস্থাহীন রাজনীতি থেকে দূরে রাখবে। আপতত দৃষ্টিতে এই রূপান্তর চোখে না পড়লেও অদূর ভবিষ্যতে এটি রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। তাই যারা সবাইকে এক পাল্লাতে মাপা শুরু করেছেন তাদের কে অনুরোধ করবো হুমায়ুন আহমেদের লেখা কুদ্দুস বয়াতির গাওয়া ‘এই দিন দিন নয়, আরো দিন আছে, এই দিনেরে নিবা তুমরা সেদিনোরে কাছে’ গানটি মনে রাখতে। আজকে নিজেদের মধ্যে প্রায় একই পথের (মুক্তিযুদ্ধের চেতনা) মানুষদের সাথে বৈষম্য আর বিদ্বেষের দেয়াল তুলে দিলে এই দিন ভবিষ্যতের সেই দিন (সফল) হয়ে আসবে না।

যে জাতি তার সন্তানদের মুক্ত স্বাধীনতা দেয় না সে জাতি কখনো জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-চেতনায় উন্নত আর আধুনিক হতে পারে না। যে রাষ্ট্র মুক্তমনা, সাহসী সন্তানদের বেঁচে থাকার নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই রাষ্ট্রে সাহসী-মুক্তমনা মানুষের জন্ম হয় না। এখন আপনি কি চান? অন্ধকারে ডুবে থাকা মধ্যযুগীয় চেতনার একটা জাতি নাকি জ্ঞান-বিজ্ঞানে আলোকিত এক জাতি। যে পথে হাঁটছে আওয়ামীলীগ সেটা শুধু ভুল নয়, আত্নঘাতীও বটে। সেই ভুলের পথ ধরেই বাংলাদেশ এখন দিনে দিনে মুক্তমনা মানুষদের বসবাসের অনুপোযগী হয়ে উঠছে, আর অদূর ভবিষ্যতে আপনাদের জন্যেও সেটা বসবাস অনুপোযগী উপযোগী যাবে, কারণ আপনারাও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন, রাজাকার কে ঘৃনা করেন। এ দুটো অপরাধই আপনার মৃত্যুদন্ড ঘোষনার জন্যে যথেষ্ট সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের কাছে। সুতরাং সময় হয়েছে সর্বস্তরে মৌলবাদী গোষ্ঠির বিপক্ষে সচ্চার হওয়ার, তাদের কে রুখে দেওয়ার। এক্ষুনি রুখে দিতে না পারলে, শিকড় ধরে উপড়ে ফেলতে না পারলে বাংলাদেশে নামবে মহাকালের চেয়েও ঘোর অন্ধকার, সেই অন্ধকারে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি ছাড়া সবার জীবন হুমকির সম্মুখীন। আপনার-আমার পরাজয়ে তাদের হাত ধরেই বাংলাদেশ হয়ে যাবে একদিন বাংলাস্তান। একবার ভেবে দেখুন কি চান বাংলাদেশ না বাংলাস্তান?