ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোকিত সময় কোনটি? দ্বিধাহীন ভাবে একাত্তর। সেই একাত্তরেই পাকিস্তান নামক অন্ধকারাচ্ছন্ন মানচিত্র থেকে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে জন্ম নেয় ছাপান্নো হাজার বর্গমাইলের এমন একটি রাষ্ট্র, যেটি পাকিস্তানের বংশগত কোন রাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করেনি। ধর্মান্ধতা, স্বৈরশাসন, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, ফতোয়াবাদ, আর সেনাপ্রীতি কে বাতিল করে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্রের স্বপ্ন আর জনগনের অংশগ্রহনে গঠিত সরকার স্লোগান নিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশের। অবাক বিস্ময়ে ভাবতে বাধ্য হই মাত্র চব্বিশ বছর পূর্বে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া একটি রাষ্ট্র থেকে কি করে ধর্মনিরপেক্ষ আরেকটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়? চব্বিশ বছরে সাম্প্রদায়িক মানুষগুলো হঠাৎ করে সব অসম্প্রায়িক হয়ে উঠলো তাহলে? না, সেটি সম্ভব নয়। এত সহজে এত দ্রুত একটা সমাজের, রাষ্ট্রের মানুষের মনোজগত, ধর্মীয় বিশ্বাস পরিবর্তন হয় না। তাহলে কি করে, স্বৈরাশাসক আর ধর্মান্ধতার ছায়াতলে ঢেকে থাকা এক মানচিত্র থেকে গনতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্ম হলো?

এই অবিশ্বাস্য কাজটি সম্ভব হয়েছিলো একজন মহানায়কের আবির্ভাবে। সেই মহানায়কের নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সময়ের শৃঙ্খল আর সীমাবদ্ধতার সকল বাধাঁ পেরিয়ে যিনি রচিত করেছিলেন নতুন এক সূর্য্যদয়, জন্ম দিয়েছিলেন বাংলাদেশ নামক ভূ-খন্ডের। কিন্তু অভিজাত্যের দাম্ভিকতায় ভরা ধর্মান্ধতায় ডুবে থাকা জলপাই বাহিনীর কিছু সদস্য আর কৌশলী সাম্প্রদায়িক চক্রান্তকারীদের ষড়যন্ত্রে (যারা পাকিস্থান ভাগকে মানতে পারেনি) একাত্তরের পরাজিত শক্তির (পাকু/আমেরিকার) সহযোগিতায় খুন করা হয় বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধুকে খুনের পর জলপাই বাহিনী আর তাদের দোসর সাম্প্রদায়িক বুদ্ধিজীবি চক্র বছরের পর বছর বিকৃত ইতিহাস জানিয়ে এসেছে বাঙালি কে। জানিয়েছে শেখ মুজিবের অপশাসনে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে কিছু বিপদগামী (দেশপ্রেমিক) সেনাবাহিনী তাঁকে খুন করেছে। শেখ মুজিবুরের শাসন কতটা অপশানে ঢাকা ছিলো সেটি বুঝতে হলে বুঝতে হবে তাঁকে হত্যার পরে খুনীদের কর্মকান্ড। যদি ব্যাক্তি ক্ষোভের কারনেই শেখ মুজিব স্বপরিবারে খুন হয়ে থাকেন তাহলে কেন, কিভাবে ২৪ ঘন্টার মাঝে ’পিপলস রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’ হয়ে গেল ’ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ’ , জয় বাংলা স্লোগান প্রতিস্থাপিত হলো পাকিস্থান জিন্দাবাদের অনুরূপ বাংলাদেশ জিন্দাবাদে? ব্যাক্তি ক্ষোভের কিংবা অপশাসনের সাথে তো এর কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে কেন এমন হলো?

সত্যি হলো কোন অপশাসন কিংবা ব্যাক্তি ক্ষোভ নয়, শেখ মুজিবুর রহমান কে খুন করা হয়েছে বড় একটি উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে। ওরা জানতো শেখ মুজিব খুন মানে একটি ব্যাক্তিকে খুন করা নয়, একটি দেশকে খুন করা, একটি চেতনা কে খুন করা। আর সেই চেতনার নাম ধর্মনিরপেক্ষতা, সেই চেতনার নাম মুক্তিযুদ্ধ। শেখ মুজিব কে সরিয়ে দিতে পারলে অভিজাত শ্রেণী পাকিস্তানের মতো এই রাষ্ট্রেও অধিক সম্মান পাবে, মুক্তিযুদ্ধকে আড়াল করে রাখা যাবে, সাম্প্রদায়িকতার বীজ বুঁনে দেওয়া যাবে এবং সর্বশেষ প্রমাণ করা যাবে স্বীধানতার আগেই এই ভূ-ভাগের মানুষ ভালো ছিলো। আর সেটি প্রমাণ করতে পারলেই শেখ মুজিবুর রহমানকে ছোট প্রমাণ করা যায়, স্বাধীনতা যুদ্ধ ভারতের চক্রান্ত বলে প্রচার করা যায়।

সেই চেষ্টা ছিলো ৭৫ থেকে নব্বইয়ের শেষ পর্যন্ত। অভিজাত্যের দাম্ভিকতায় ঢাকা জলপাই সেনারাই দেশকে শাসন(ধর্ষন) করেছে দুই যুগেরও বেশি সময়। রাজাকারদের বিচার বাতিল করে তাদের পূর্ণবাসন করেছে, ক্ষমতায়ন করেছে, স্বৈরশাসন জারি রেখেছে, সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করে রাষ্টধর্ম ইসলাম যুক্ত করেছে। যেই পাকিস্তান থেকে নতুন একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের জন্ম হয়েছিলো বাংলাদেশ নামে, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মাঝে দেশি-বিদেশী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর চক্রান্তে সেটিকে পাকিস্তান বানানোর সকল চেষ্টা তখন করা হয়েছে। হ্যাঁ বাংলাদেশ তখন হেঁটেছে আবার পাকিস্তান হওয়ার পথে। নব্বইয়ের পর গনতন্ত্র (আধা-গনতন্ত্র) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও গোল্ডফিশ মেমোরি আর সাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষদের অাধিক্যের কারনেই সেই অভিজাত জলপাই বাহিনীর বংশধর ক্ষমতায় এসেছে কয়েকবার। যার সর্বশেষটি ছিলো ২০০১-০৬। স্বৈরশাসনের পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় ছিলো সেটি কিংবা স্বৈরাশাসকদের চেয়েও ভয়ংকার ছিলো। যারা দুটো সময়কে দেখেছে তারা আসলে সঠিক টি বলতে পারবে। অামি ৮০র দশকে মাটির সাথে কথা বলা মানুষ বলে স্মৃতিকোষে কিছু জমা নেই। আমি দেখেছি ২০০১-০৬ সময়টাকে। ২০০১ এর নির্বাচনের পরের দিন সকালে আমার পাড়ায় দেখি শত শত মানুষের আনাগোনা। দিন যত যায় তত বাড়তে থাকে সেই সংখ্যা। না এরা ভিনদেশী কোন নাগরিক ছিলো না, এদের অপরাধ এরা মুসলমান দের দেশে ভিন ধর্মের (হিন্দু) ছিলো। ধর্ষণ, হিন্দুদের বাড়ি-ঘরে আগুন আর দখলের যে উল্লাস তখন চলেছিলো তা ইখতিয়ারউদ্দিন বিন বখতিয়ারের মধ্যযুগ কে স্মরণ করিয়ে দেয়।

শুধু এখানেই থেমে থাকেনি। রাজকারদের গাড়িতে জাতীয় পতাকার সাথে সাথে চারিদিকে জঙ্গিগোষ্ঠির আবির্ভাব ঘটলো। সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা হলো। মু্ক্তচিন্তার মানুষ আর ক্ষেত্রগুলো আক্রমনের শিকার হলো। বাঙালির প্রধান উৎসব পয়েলা বৈশাখের রমনা বটমূলে বোমা হামলা হলো, প্রমাণ করে দিলো এই বাঙালিয়ানা, এই সংস্কৃতি তারা মানে না। তাদের দরকার আরেকটি পাক সার জমিন সাদ বাদ। কিবরিয়া-আহসানউল্লাহ মাষ্টারের মত জাতীয় নেতাদের বোমা মেরে পাকিস্তানের মতোই হত্যা করার সংস্কৃতি চালু করলো। তিন মাস স্থায়ী মিনি স্বৈরাশাসন ও চালু করেছিলো তৎকালীন বিম্পি জামাত সরকার। ৫৮টি তাজা প্রাণ আর অসংখ্য মানুষদের পুঙ্গ করে দিয়ে বাঙালিকে আবার স্বৈরাশাসনের সুফল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিলো হাতে নাতে।

সেই সময় টায় আমি ছাত্র। কেমন দেখেছিলাম তখনকার শিক্ষাঙ্গন? মনে পড়ে ক্যাম্পাসে আমার সহপাঠী মেয়ে বন্ধুদের সাথে কথা বলছিলাম একদিন। সাচ্চা মুসলমানের দল জামাতে ইসলামের এক সদস্য আমাকে ডেকে বলেছিলো ’ভাইয়া এটা বেদাতি কাজ, এগুলো ক্যাম্পাসে চলবে না। তার সাথে তর্ক করার দু মিনিটের মাঝেই সশস্ত্র ১৫-২০ জনের দল চলে আসলো। আমার তখন মনে হয়েছিলো আমি কি বিংশ শতাব্দীতে আছি নাকি মধ্যযুগে? আমি আমার সহপাঠীর সাথে বসে কথা বলতে পারবো না যে দেশে সে দেশ কি করে উদার আর অসম্প্রায়িক হয়? হ্যাঁ তখন আমার কাছে সেটিকে আরেকটি পাকিস্থান মনে হয়েছিলো। ২০০১-০৬ বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় ভাবেই হেঁটেছে পাকিস্থান হওয়ার পথে। একাত্তরে পরাজিত পাকুমনা শক্তিই সেই পথে পথ প্রদর্শন করেছে বাংলাদেশকে।

পাকিস্তান বানানোর সে চেষ্টায় দুটো মূল কাজ তারা করেছিলো সফলভাবে। এক সাম্প্রায়িক দেয়াল তুলে দেওয়া মানুষে মানুষে আর দ্বিতীয় ভারত বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া সর্বত্র। আর সে সময়টি ছিলো বাংলাদেশের জন্যে সবচেয়ে অন্ধকারের। সেই সময়ের বেড়ে উঠা মানুষদের মাঝে তাই পাকিস্তান প্রীতি আর ভারত বিদ্বেষ সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। অস্বীকার করার কোন উপায় নেই এই ভূ-খন্ডের মানুষ চিরকাল-ই সাম্প্রদায়িক চেতনার সুপ্ত বীজ ধারণ করেছে নিজের মাঝে। উপযুক্ত আলো বাতাস পেলেই সে বীজ থেকে সাম্প্রদায়িকতার চারা গজিয়েছে। ভুলোমনা, ইতিহাস অজ্ঞ আর সাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ ধারণ করা একটা জাতিকে তাই আরেকটা পাকিস্তানের দিকে নিয়ে যাওয়ার কাজটি সম্পাদন করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি ওদের।

কিন্তু সাম্প্রদায়িক চেতনার বাহিরেও এখানে অসম্প্রাদায়িক চেতনার একটা শ্রেণী ছিলো, আজো আছে। এরাই নেতৃত্ব দিয়েছে বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ে গণঅভ্যুথান। সংখ্যায় কম হলেও তারা ছিলো বলেই বাংলাদেশ আরেকটা পাকিস্তান হয়নি, আটকে থাকেনি আরবদের মতো মধ্যযুগে। তারাই সাম্প্রদায়িকতার সকল শিঙ্খল ভেঙ্গে মানুষকে মানুষ হতে শিখিয়েছি, ধর্মান্ধতার অন্ধ বিশ্বাস কে ছুঁড়ে ফেলে আলোর পথ দেখিয়ে গেছে। ফলে আলোর পথের যাত্রীদের কেই সরিয়ে দেওয়া ছিলো মূল কাজ পাকুমনা সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির। সেটািই তারা করেছে একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরে আর করছে আজকের ২০১৫তে।

গত সাত-আট বছরে পথের শত বাঁধা পেরিয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে আশাতীত ভাবে। আইনের শাসন পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার হতাশা আছে, হতাশা আছে দুর্নীতি আর দলান্ধ নেতাদের সাফল্যে। কিন্তু এই হতাশার বাইরেও আশাবাদী হওয়ার মতো অনেক অর্জন এসেছে জাতীয় জীবনে। এখানে নারীরা এখন ঘরে বাহিরে সমান্তরালে কাজ করছে, অর্থনীতির চাকা সচল হয়েছে, জঙ্গিবাদ অনেকটাই দমন করা গেছে, তথ্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটছে সর্বক্ষেত্রে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, বেড়েছে মাথাপিছু আয়। যোগাযোগ আর বিদুৎ ব্যবস্থায় ঘটেছে অভাবনীয় উন্নতি। এমনটা ছিলো না ঠিক এক যুগ আগেও। আমার নিজের ছোটবেলায় আমি দেখেছি দিকে দিকে অভাবের সন্ত্রাস। আমাদের গ্রামে আর্থিকভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলো আমার দাদার বাড়ী। সেই বাড়ীতেই আমি দেখেছি দু-চার ঘরে একবেলা উপোস কিংবা আধা-উপোসে দিন কেটেছে। আর এখন সেই ঘরেই ফ্রিজ-টিভি আর ডায়নিং টেবিল সজ্জিত থাকে নানান রকম বিলাসী ফলাদি তে। সেই সময়টাতে ফতোয়া দেওয়া হয়েছিলো ইন্টারনেট ব্যবহার করলে দেশ থেকে তথ্য প্রাচার হয়ে যাবে, দেশের মানুষ খারাপ হয়ে যাবে। ঘরে বাহিরে তখন বোমার উৎসব হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ভাবে রাজাকারদের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। জন্ম হয়েছে জেমবি, হরকাতুল জিহাদ, বাংলা ভাইদের। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠ পোষাকতায় হিন্দুদের বাড়ি-ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে, ধর্ষণ আর খুনের মতো মহৎ কাজ সম্পাদিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কে করা হয়েছে বিকৃত, মুক্তিযোদ্ধাকে করা হয়েছে সবার সামনে লাঞ্চিত।

আর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে যখন রাজাকার বিচার শুরু হলো ঠিক তখন থেকেই বাংলাদেশের দুটো ধারা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঠিক তখনি তথাকথিত নিরপেক্ষরা বলতে শুরু করে কি প্রয়োজন জাতিকে দুভাগে ভাগ করার? আমাদের কে অতীত (মুক্তিযুদ্ধ) ভুলে এক হয়ে সামনে চলতে হবে। এদের অনেক কেই বলতে দেখেছি যে ’একাত্তরে বাঙালি এক ছিলো’। কিন্তু কথাটা আমার কোনদিনও বিশ্বাস হয়নি। ইতিহাস বলে বাংলাদেশে চিরকাল-ই দুটো ভিন্ন ধারার স্রোত ছিলো, আজো আছে, ভবিষ্যতে ও থাকবে। সেই দুটোর একটা স্রোত ধর্মান্ধতায় মৌলবাদ থেকে শুরু করে শুধু নিজ ধর্মের হলে তাকে সাপোর্ট দেওয়া মানুষজন। ভিন ধর্মের মানুষরা নিজে মানচিত্রে নির্যাতিত হলে এরা চুপ থাকে, দেখে না দেখার ভান করে আর এই মানচিত্রের বাইরে কোথাও তাদের স্ব-ধর্মের মানুষেরা নির্যাতিত হলে অনলাইনে প্রতিবাদ আর হ্যাশট্যাগের বন্যায় নিজেকে ভীষন প্রতিবাদী করে তুলে। এরাই সংখ্যায় আধিক্য। এদের দখলেই মিড়িয়া, এদের দখলেই রাষ্ট্র সমাজ আর আইন-প্রশাসন।

অন্য যে ধারাটি আছে তারা ধর্ম-জাতি-বর্ণের বাহিরে ভাবতে পারে, অন্যায় কে অন্যায় বলতে গিয়ে ধর্মকে টেনে আনে না, প্রতিবাদ করতে গিয়ে কখনো জাতি-বর্ণ-গোত্র খুঁজে না। এরা মুক্তিযুদ্ধকে বুকের গভীর থেকে ভালোবাসতে শিখেছে, পাকিস্তানকে হৃদয় ঘৃনা করতে শিখেছে। এই মুক্তমনাদের, পাকুদের প্রতি ঘৃনার চাষাবাদের কারনেই আজ অনলাইনে পাকু ভক্তদের দেখা যায় না। অথচ আমাদের বেড়ে উঠার সময়টাতেও ক্রিকেট পাকিস্তানের ভক্তের জনজোয়ার ছিলো বাংলাদেশে। পাকিস্তানের জয়ে মিছিল হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে, সংসদে আনন্দ প্রস্তাব পাশ হয়েছে। এখন সেই দল নিজেদের লেজ গুটিয়ে ফেলেছে প্রায়। অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধ চর্চা তথা ইতিহাস চর্চার কারণে নতুন প্রজন্ম অনেক অজানা লুকিয়ে রাখা ইতিহাস জানছে এখন, যেটা আমরা জানতে পারিনি আমাদের ছেলেবেলায়। ফলে মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তমনা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে দিনে দিনে।

কিন্তু মুক্তমনা মানুষ বাড়ার সাথে সাথে বাংলাদেশে গত দুই-তিন বছরে আশাংকা জনক ভাবে বাড়ছে উগ্র মৌলবাদীদের সংখ্যা। বিশেষত রাজাকারপন্থিরা গনজাগরণের সময় কোনঠাসা হওয়ার পরেই মুক্তিযুদ্ধ প্রেমিক মুক্তমনা মানুষদের পেছনে নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আমার দেশ নামক পত্রিকা দিয়ে প্রথম জানিয়ে দেওয়া হয় অনলাইনে যারা লেখালেখি করে (ব্লগার) তারা নাস্তিক। সেই থেকে মৌলবাদীদের প্রধান টার্গেট হয়ে যায় ব্লগাররা। তারপর সুশীল আর তথাকথিত নিরপেক্ষ (জামাত ও পাকিস্থানপন্থিরা) রা ব্লগারদের বিপক্ষে নানান অপবাদ আর কুৎসা রটাতে শুরু করলে বাংলাদেশে ব্লগারদের জীবন হুমকির মুখে পড়ে। আগেই বলেছি এই দেশের বেশি ভাগ মানুষ সাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে। তার সাথে নাস্তিকতার ডোজ মিশিয়ে সাধারণ অজ্ঞ জনগনকে বুঝানো হয়েছে ব্লগার মানেই নাস্তিক, আর নাস্তিক মানেই তাকে কতল করতে হবে, তার মৃত্যুতে কোন শোক কিংবা প্রতিবাদের প্রয়োজন নেই। সেই সূত্র ধরেই রাজীব হায়দার কে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্লগার হত্যার নতুন ইতিহাস রচিত হয় গনজাগরণের সেই সময়ে।

রাজাকার বিরোধী আন্দোলন কে স্মিত করতেই জন্ম হয় নাস্তিক বিরোধী আন্দোলন। সেই আন্দোলনের জন্মদাতা হেফাজতকে শান্ত রাখতে মু্ক্তচিন্তার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের চারজন ব্লগারদের গ্রেফতার করে সরকার আরেকটি নতুন কলঙ্কের জন্ম দেয়। এরপর জন্ম হয় ৫৭ ধারা নামক আরো একটি কালো আইন। বাতাসে ভাসতে থাকে হেফাজতের সাথে সরকারের নানা আপোস তত্ত্ব। আপোস হোক আর অন্য কোন রাজনৈতি কৌশল‘ই হোক তাদের শান্ত রাখার সেই চেষ্টা বৃথা গেছে। ২০১৫ তে আবার তারা সেই পুরানো চেহারায় হাজির হয়েছে। প্রথমে অভিজিৎ রায় কে হত্যা, তারপর ওয়াশিকুর রহমান বাবু কে হত্যা করে জানিয়ে দিয়েছে আজ ব্লগার দের নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে হত্যা করছে আর কাল হত্যা করবে মুক্তিযোদ্ধ আর রাজাকার বিরোধীদের। আজ যারা বলছেন ধর্ম নিয়ে লেখার মত সময় কিংবা পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি বাংলাদেশে, তাদেরকে একটু অতীতে যেতে বলবো। যদি তাদের এই কথাই সঠিক হতো তাহলে ব্রুনো’র কোন দরকার ছিলো না বেশিভাগ অপ্রস্তুত সমাজে ধর্মান্ধদের বিপক্ষে কথা বলে আগুনে পুড়ে মরার, সমাজের শান্তি রক্ষার্থে ডারউইনের কোন প্রয়োজন ছিলো না ধার্মিকদের বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করে বিবর্তনবাদ পেশ করার। পরিবেশ কিংবা সময়ের অজুহাতে ব্রুনো কিংবা ডারউইন কি থেমে গিয়েছিলেন সত্য প্রচারে? না থেমে যান নি, থেমে যাননি বলেই মানুষ আজ সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থান করছে। অতীতের থেকে এবার একটু ভবিষ্যত কে দেখার চেষ্টা করি।

আমরা জানি ভবিষ্যতকে বিচার করতে হয় বর্তমানে দাঁড়িয়ে। তাই বর্তমানটা দেখি আগে। মৌলবাদীদের হাতে কিছুদিন আগে খুন হয়েছেন মাওলানা ফারুকী। তিনি তো নাস্তিক ছিলেন না, আস্তিক ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশের নাম করা ইসলামি চিন্তাবিদদের একজন? তবু কেন তাকে হত্যা? তাকে হত্যা করা হয়েছে কারণ তিনি সেই মৌলবাদীদের বিপক্ষধারার আর মতের ছিলেন। সুতরাং আস্তিক-নাস্তিক কোন বিষয় নয়, তাদের মতানুসারী না হলেই আপনাকে আজকে না হয় কালকে প্রাণ দিতে হবে। এই যে অনলাইনে কিংবা অফলাইনে আপনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করছেন, একাত্তরে রাজাকারদের বিভৎস ইতিহাস তুলে ধরছেন নতুন প্রজন্মের কাছে, জেনে রাখুন এটিও তাদের বিপক্ষে আপনার অবস্থান নির্দেশ করে। একদিন আপনাকেও তারা হত্যা করবে এই অপরাধে আর বলবে ভারতপ্রেমীদের, মুসলমানদের দেশে কোন জায়গা নেই। তখনও কি অাপনি আজকের মতো বলবেন মুক্তিযুদ্ধ আর রাজকারদের বিপক্ষে কথা বলার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি এখনো? আজ যদি এমন হত্যা মেনে নেন তাহলে কাল তারা যখন ফতোয়া দিবে টেলিভিশন দেখা, নারী-পুরুষের একসাথে কাজ করা হারাম। এগুলো নাস্তিকের কাজ, আর জানেন তো শফি হুজুর বলেছেন আর নাস্তিক হত্যা করা এখন ওয়াজিব। তখন কি মেনে নিবেন? নিতে পারবেন? আজ তাদের কে প্রশয় দিলে কাল তারা এটাই বলবে নিশ্চিত থাকুন। সুতরাং সময় হয়েছে জেগে ওঠার, মনে রাখা প্রয়োজন মৌলবাদীদের দ্বারা সংঘটিত কোন খুন কে কোন কিছু দিয়ে সহি/বৈধ করার চেষ্টা করলে সেটি ভবিষ্যতে আত্নঘাতী হয়ে ফিরে আসবে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের আরো একবার জেগে ওঠতে হবে, মনে রাখতে হবে একাত্তর কে হৃদয়ে ধারণ করা মুক্তমনা মানুষদের জন্যে এই দেশে সবচেয়ে বড় শত্রু সেই মৌলবাদীরা। তাদের সাথে লড়াইয়ে কোন ভেদাভেদ নয়, সময় এখন একসাথে রুখে দাঁড়াবার। আসুন সবাই মিলে মৌলবাদী শক্তির বিপক্ষে দাঁড়াই। এক হয়ে দাঁড়াতে পারলেই জয় আমাদের হবেই। জয় হোক প্রগতিশীলতার, জয় হোক একাত্তরের প্রজন্মের, নিপাত যাক মৌলবাদ।