ক্যাটেগরিঃ সুরের ভুবন

জনপ্রিয় ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন গায়ক হায়দার হোসেনের ত্রিশ বছর পরে শিরোনামে করা গানটি কে বিশ্লেষণ করে একটা লেখা লিখেছেন এবং নানান তুলনা দিয়ে শিল্পীর উদ্দেশ্য ও বিধেয় দুটোই উদ্ধার করেছেন। যাইহোক একটা গান, একটা কবিতা, একটা ছড়া কে অনেকে অনেকভাবে ব্যাখা করতে পারে, সে স্বাধীনতা সবার আছে। যেমন জীবনানন্দের বনলতা কে কেউ পতিতা বানিয়েছে, কেউবা আবার কবির চাচাতো বোন বানিয়ে ছেড়েছে। আমি জীবনানন্দ কিংবা বনলতা নিয়ে আলোচনা করতে চাইছি না, আমার আলোচনার বিষয় হলো হায়দার হোসেনের গানটি নিয়ে লুৎফর রহমানের এই বিশদ ব্যাখা। এই লেখাটি প্রথমে ফেসবুকেই পড়েছি, তারপর কয়েকটি পত্রিকার মতামত বিশ্লেষনে দেখলাম। স্বভাবতই এটি আলোচনার ঝড় তুলেছে। অতি আগ্রহীদের অনেকে লেখকের এই ব্যাখা দিয়ে হায়দার হোসেন কে জামাতপন্থি ছাগু ও বানিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে। বাঙালির এমন ট্যাগ দেওয়ার দক্ষতা অবশ্য নতুন নয়!

লুৎফর রহমান রিটনের এই ব্যাখ্যা কে বিশ্লেষণ করলে দুটো বিষয় পরিলক্ষিত হয়, প্রথমত তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন গানটি আসলে পাকিস্তানপন্থি জামাতিদের জন্যে এবং দ্বিতীয়ত খান আতাউর রহমানের সাথে উদাহারণ দিয়ে তিনি বুঝিয়েছেন হায়দার হোসেন আর খান আতাউর রহমানের উদ্দেশ্য একও অভিন্ন ছিলো।

কি দেখার কথা কি দেখছি? কি শোনার কথা কি শুনছি?
কি ভাবার কথা কি ভাবছি? কি বলার কথা কি বলছি?
তিরিশ বছর পরেও আমি স্বাধীনতাটাকে খুঁজছি-

ভালো করে লক্ষ করলে দেখা যাবে তিনটি লাইনে মোট পাঁচটি প্রশ্ন করা হয়েছে। এবং প্রথম চারটি প্রশ্ন পঞ্চম প্রশ্নের সাথে গভীর ভাবে সম্পর্কযুক্ত। প্রথম চারটি প্রশ্নের উত্তর যদি সন্তোষজনক হতো তাহলে কখনো পঞ্চম প্রশ্নটি আসতো না। অর্থাৎ যা দেখার কথা তা যদি দেখা যেত, যা শোনার কথা তা যদি শোনা যেতো, যা ভাবার কথা তা যদি ভাবা হতো, যা বলার কথা তা যদি বলা হতো তাহলে কি গানটি লিখা হতো? স্বাধীনতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো সবার জন্য সমান অধিকার, ধনী-গরীবের বৈষম্যহীন সমাজ, বাক-স্বাধীনতার অধিকার, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার। আমরা কি এই দেশে সবার সমান অধিকার দেখছি? ধনী-গরীবের বৈষম্য কমতে দেখেছি? আমরা কতটুকুই বা বাক-স্বাধীনতা পেয়েছি? আজও তো বাক-স্বাধীনতার অপরাধে কোপ খেতে হচ্ছে! নাকি হচ্ছে না?

প্রিয় ছড়াকার, গানে ফুটে উঠা সত্যগুলো কে পাশ কাটিয়ে এই লাইনগুলোর অর্থ স্বাধীনতা হাতছাড়া হয়ে যাওয়া কে বুঝায় না, গানে স্বাধীনতা কে খুঁজে যাওয়ার অর্থ কখনো গোলাম আযমের সাতচল্লিশে চেতনায় দেশ কে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া ইঙ্গিত করে না।

প্রথম ব্যাখ্যার চেয়েও নোংরা লেগেছে ১৫ই আগষ্ট খান আতাউর রহমানের গাওয়া গানের উদহারণ দিয়ে তুলনা করা কে। খান আতাউর রহমানের যে গান উল্লেখ করেছেন সেটি ছিলো বঙ্গবন্ধুর হত্যা কে বৈধতা দিতে। ইতিহাসের পাতায় এ কথা প্রতিষ্ঠিত যে খান আতা শেখ মুজিব বিদ্বেষী ছিলেন, ছিলেন ডালিমের কাছের মানুষ। আর এই ছিলেন বলেই তার মৃত্যু সংবাদে উল্লাস করেছেন, গান বেঁধেছেন। পচাত্তরের এমন জঘন্য কাজের সাথে যে নিজেকে মিলিয়েছে তার সাথে ঠিক কি যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতে হায়দার হোসেন কে আপনি তুলনা করেছেন আমি বুঝতে পারিনি। হায়দার হোসেন কি জামাত-বিম্পির গুণগান গেয়ে কোন গান গেয়েছে, তাদের কোন অনুষ্ঠানে পদ নিয়েছে? নাকি বঙ্গবন্ধু কে কোথাও কটাক্ষ করে কিছু বলেছে? তাহলে দুটো ভিন্ন চেতনার মানুষের সাথে এ তুলনা কেন?

হ্যাঁ, খান আতা তার গানে স্বাধীনতা কে খুঁজেছেন আবার হায়দার হোসেনও তার গানে স্বাধীনতা কে খুঁজেছেন! এ দুটো মিল ছাড়া অন্য কোন মিল তো আমি খুঁজে পেলাম না। একটা গান কে বিশ্লেষন করতে হলে তার জন্মলগ্ন সময় তথা গানের পটভূমি কে ও গুরুত্ব দিতে হয়। সেই বিবেচনাতে ফেললে খান আতার গানটি ছিলো বঙ্গবন্ধু কে হত্যার পরপর, আর হায়দার হোসেনের গানটি স্বাধীনতার ত্রিশ বছর পর অর্থাৎ ২০০১-০২ এর দিকে। আপনি নিজেই উল্লেখ করেছেন খান আতাউর রহমানের গানটি ছিলো বঙ্গবন্ধুর হত্যার অপরাধ কে ঢাকার জন্যে। অন্যদিকে হায়দার হোসেনের গানটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৩ সালের দিকে যেই সময়টি বিম্পি-জামায়তের দু:শাসনের। তাহলে গানটি কি সেই সময়ের সরকারের অপরাধ হালকা করতে চেয়েছে? না, বরং সেই অন্ধকার সময়টিকেই ইঙ্গিত করেছে।

জনাব লুৎফর রহমান রিটন এই গানটা তৈরি হওয়ার পেছনের কারণটি বোধহয় জানতে চেষ্টা করেননি। খুব দীর্ঘ আকারে না বললেও হায়দার হোসেন্ এই গানের আলাপচারিতায় বলেছেন দীর্ঘ দিন বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পরে যখন দেখলেন রাতের বেলা ঘর থেকে বের হতে পারছেন না, স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারছেন না, এ বিপদ ও বিপদ তখনি গানটা লিখেছেন। রিটন সাহেব বিম্পি-জামায়তের আমলে দেশ ছেড়েছেন তাই খুব সম্ভব সময়টাকে দেখেননি। আমরা যারা দেশে ছিলাম তারা দেখেছি, কি ভয়াবহ সেই সময়টি ছিলো। আমার নিজের পাড়াটা ছিলো আওয়ামি অধূষ্যিত তাই সন্ধ্যা বেলায় আমরা আমাদের পাড়ায় বের হতে পারতাম না, একসাথে তিনচার জন হতে পারতাম না। আমার কত বন্ধুকে বিনা কারণে পুলিশ পিটিয়েছে, মামলা দিয়েছে তার কোন হিসেব নেই। বাবার সাথে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বাসায় ফেরার পথে ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, পরে অর্থ দিয়ে তাকে ছেড়ে আনতে হয়েছে।এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটতে দেখেছি। ২০০১ সালের নির্বাচনের দিন কয়েক পরে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার নিজের পাড়াতে হাজার হাজার, সত্যি হাজার হাজার নতুন মানুষ। এখানে সেখানে দল পাকিয়ে আছে। এরা সবাই নিজের বাড়ি-ঘর ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলো দেশের সবচেয়ে বড় গনতান্ত্রিক দল ক্ষমতায় আসার সাপ্তাহ খানিকের মাঝে। ঠিক সেই সময় যদি কারো দেখা থাকে সে কি এমন করে স্বাধীনতা কে প্রশ্ন করবে না?

এরপরের প্রতিটি ব্যাখ্যা তে আলাদা আলাদা প্রতিটি লাইন ধরে ব্যাখা করা হয়েছে। পরস্পর সম্পর্ক যুক্ত কোন কিছু কে বিশেষ করে যেখানে শেষ লাইনটি পাঞ্চ হয় সেখানে ভেঙ্গে ভেঙ্গে ব্যাখা করা হলে পুরো অর্থটাই বদলে যেতে পারে। এবং সেই বদলে যাওয়ার উৎকৃষ্ট উদাহরণ লুৎফর রহমানের এই ব্যাখ্যা। আমি পুরো প্যারাটা দেখে নিতে চাই একসাথে। হায়দায় হোসেন গেয়েছেন,

স্বাধীনতা কি বৈশাখী মেলা, পান্তা ইলিশ খাওয়া?
স্বাধীনতা কি বটমূলে বসে বৈশাখী গান গাওয়া?
স্বাধীনতা কি বুদ্ধিজীবির বক্তৃতা সেমিনার?
স্বাধীনতা কি শহীদ বেড়িতে পুষ্পের সমাহার?
স্বাধীনতা কি গল্প নাটক উপন্যাস আর কবিতা?
স্বাধীনতা কি আজ বন্দী আনুষ্ঠানিকতা?

ছয় লাইনের এই প্যারাতে শেষ লাইনটি হলে পাঞ্চ লাইন অর্থাৎ মূল বক্তব্যটা শেষ লাইনেই প্রকাশ করা হয়েছে। আর সেই প্রকাশ হলো স্বাধীনতা কি শুধুমাত্র নানান অনুষ্ঠানের মাঝে আটকে যাচ্ছে নাকি? এই প্রশ্ন সত্যি আসে, দেশের মানুষ কতটুকু স্বাধীনতা নিয়ে জীবন যাপন করছে? দেশের শাসক গোষ্ঠী স্বাধীনতার মূল যে উদ্দেশ্য তার প্রতি কতটা আন্তরিকতা রেখে কাজ করছে? এখানে বলা হয় নি বটমূলে বসে গান গাওয়া যাবে না, বলা হয় নি শহীদ বেড়িতে ফুল দেওয়া যাবে না, বলা হয়নি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প-উপন্যাস লেখা যাবে না। বলা হয়েছে স্বাধীনতা শুধু এগুলোর মাঝে যেন সীমাবদ্ধ না থাকে, স্বাধীনতা যেন জীবনের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে। অথচ লেখক স্বাধীনতার সীমারেখা বুঝাতে গিয়ে বলেছেন ”

আপনার হাতে গীটার, আপনি গান গাইতে পারছেন, যন্ত্রানুষঙ্গযোগে আপনি গান গাইছেন। স্বাধীনতা না এলে আপনি হতেন সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য।

অর্থাৎ আপনি গান গাইতে পারলেই স্বাধীনতার সুফল আপনার জন্যে হয়ে গেলো! আপনি স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারবেন কিনা, আইনের সম অধিকার পাবেন কিনা, সব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবেন কিনা, জীবনের নিরাপত্তা পাবেন কিনা, যোগ্যতার মূল্য পাবেন কিনা এগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ নয় শ্রেণী বৈষম্য, গুরুত্বপূর্ণ নয় সমাজের অন্যায়-অবিচার! স্বাধীনতার অর্থ হলো যে যেখানে থাকবে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে, যে শিক্ষক সে খেয়ে না খেয়ে ছাত্র পড়াবে, যে গায়ক সে শুধু তুমি-আমি নিয়ে গান গাইবে, যে লেখক সে শুধু মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের উপন্যাস লিখে যাবে! এর ব্যতিক্রম করা যাবে না, শিক্ষক প্রশ্ন করতে পারবে না কেন সে মানুষ গড়ার কারিগর হয়ে তৃতীয় শ্রেণীর জীবনযাপন করবে বরং তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে সে শিক্ষক হতে পেরেছে বলে। দেশ স্বাধীন না হলে সে তো শিক্ষক-ই তো পারতো না। তেমনি গায়ক-লেখকরা ও মানুষ কে শুধু বিনোদন দিয়ে যাবে, তারা কোন কিছু নিয়ে প্রশ্ন করতে পারবে না, প্রতিবাদ করতে পারবে না। আরে ব্যাটা দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই তো তোরা গায়ক-লেখক হয়েছিস, না হলে তো পাকিস্তানে বোমা খেয়ে মরতি!

উপরের আলোচনায় আমরা দেখেছি জনাব লুৎফর রহমানের ব্যাখ্যা লাইন বাই লাইন। লাইন বাই লাইন ব্যাখা হতে পারে কোন বক্তৃতার, কোন সাক্ষাৎকারের। গান-কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ মেলাতে হয় এবং বেশিভাগ ক্ষেত্রে মূল ভাবটি শেষ লাইনে নিয়ে আসা হয়। এই গানটিও তাই। মজার ছড়াকার হিসেবে পরিচিত রিটন সাহেব নিজেই অন্যের লেখার স্যাটায়ার ধরতে পারেননি কিংবা ধরতে চাননি। নিচের লাইনগুলি সেই উপহাস করে, বিদ্রুপ করে বলা।

স্বাধীনতা কি ঢাকা শহরের আকাশচুম্বী বাড়ি?
স্বাধীনতা কি ফুটপাতে শোয়া গৃহহীন নর-নারী?
স্বাধীনতা কি হোটেলে হোটেলে গ্র্যান্ড ফ্যাশন শো?
স্বাধীনতা কি দুখিনী নারীর জড়-জীর্ণ বস্ত্র?
স্বাধীনতা কি গজিয়ে ওঠা অভিজাত পান্থশালা?
স্বাধীনতা কি অন্যের খোঁজে কিশোরী প্রমোদবালা?

একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এখানে ছয়টি লাইনের প্রথম দুটো করে লাইন একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রথম লাইনটি তে যদি ধনী শ্রেণী কে বুঝানো হয়ে থাকে তবে দ্বিতীয়টিতে হতদারিদ্র মানুষদের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে শ্রেণী বৈষম্যের প্রকটতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হয়েছে। কথা ছিলো স্বাধীন হলে দেশে ধনী-গরীবের বৈষম্য কমবে, কথা ছিলো দেশ স্বাধীন হলে আর্থিক সাম্যতা আসবে। ঠিক সেই কারণেই স্বাধীনতা কে এই গানে প্রশ্ন করা হয়েছে। এরপরের লাইন দুটোও একিভাবে পরস্পর বিপরীত কিন্তু গভীর ভাবে সম্পর্কযুক্ত। তারপরের দুটো লাইনও তাই। এগুলোর ব্যাখা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বাংলাদেশে বাস করা মানুষ জানে পরস্পর বিপরীতমুখী দুটো দৃশ্যই বাংলাদেশে সদা দৃশ্যমান। এই ছয়টি লাইনের প্রতিটি ধনী আর দারিদ্রতা কে তুলে ধরা হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে দারিদ্রতা কি করে আকাশচুম্বী বাড়ীর পাশে গৃহহীন মানুষকে রেখেছে, কোটি টাকার গ্যান্ড ফ্যাশান শোর বাহিরে এ দেশে হাজার হাজার নারী এখনো জড়-জীর্ণ বস্ত্র পরিধাণ করে, অর্থের অভাবে আজও এখানে কিশোরীরা প্রমোদবালা হয়ে বাঁচে।

জনাব লুৎফর রহমান রিটন সবচেয়ে বালখিল্য এবং ভুল যক্তির ব্যাখ্যাটা করেছেন এরপরের ব্যাখ্যাটি তে। হায়দার হোসেন গেয়েছিলেন,

স্বাধীনতা কি নিরীহ লোকের অকারণে প্রাণদন্ড?

এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লেখক বলেছেন,

’না, নিরীহ লোকের প্রাণদণ্ড নয়, তবে অতি অবশ্যই যুদ্ধাপরাধীদের প্রাণদণ্ড।

হায়দার হোসেন যদি এ গানটি ২০১৫ তে এসে গাইতেন তাহলেই নিরীহ লোকের প্রাণদন্ডের সাথে যুদ্ধাপরাধের প্রাণদন্ডটি মিলিয়ে হায়দার হোসেন কে জামাতপন্থি প্রমাণ করে দেওয়া যেত! কিন্তু গানটির পটভূমি ২০০১ সালের, তখন যুদ্ধাপরাধের বিচার অকল্পনীয় ছিলো! সুতরাং এই লাইনের সাথে যুদ্ধাপরাধ মিশানো বালখিল্য এবং অতিমাত্রায় অন্ধতা।

লেখকের সবচেয়ে মজার ব্যাখাটি এসেছে একেবারে শেষে। এবং এখানে এসে লেখক আর লাইন বাই লাইন ব্যাখায় যাননি, এমন কি গানের কোন অংশ কে নিয়ে অালোচনা করার আগ্রহ পাননি। সম্পূর্ণ অপ্রসাঙ্গিক ভাবে আলোচনার বিষয় বস্তু বদলে ফেলেছেন! তিনি আবদার করেছেন,

“স্যার আপনার গানে রাজাকারের কথা নেই যে! ঘাতক দালালের কথা ? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা কই? এককথায় স্বাধীনতাবিরোধীদের কথা কোথায়, এই গানে? তিরিশ বছর পরের বাস্তবতায় ”স্বাধীনতা কি রাজাকারদের মন্ত্রী হবার গল্প” কিংবা ”স্বাধীনতা কি খুনির গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড্ডীন” ধরণের একটি চরণও ঠাঁই পায়নি এই গানে।”

গত কয়েক বছর যারা অনলাইনের জগতে সক্রিয় এবং সমাজের-রাষ্ট্রের কিংবা বিশ্বের কোথাও কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তারা জানে তাদের কোন প্রতিবাদের পরপর-ই একটা শ্রেণীর আবির্ভাব হয় যারা বলে, আরে আপনাকে তো ওমুক ঘটনায় কথা বলতে দেখলাম না, তমুক ঘটনায় আপনি কেন নীরব ছিলেন? এই গোত্রীয়রাই বলে ড. জাফর ইকবাল কে আমিও মানতাম যদি না তিনি ‍ওই বিষয়ে মুখ খুলতেন, সেই বিষয়ে সরব হতেন। অর্থাৎ কেউ যখন ফিলিস্তিনে মানুষ হত্যার প্রতিবাদ করবে তার টুটি চেপে ধরে বলতে হবে আরে ব্যাটা আল কায়েদার হত্যাযজ্ঞের সময় তুই চুপ ছিলি কেন? আবার ফ্রান্সের জন্যে শোক জানানো মানুষ কে টুটি চেপে ধরে প্রশ্ন করতে হবে আরে ব্যাটা তোর লেখায় সিরিয়া-ইরাক হামলার প্রতিবাদ আসলো না কেন?

কি আসতে পারতো আর কি আসতে পারতো না এমন করে যদি আমিও প্রশ্ন করি প্রিয় ছড়াকার কে, তাহলে কেমন হবে? চুয়াল্লিশ বছর পরে আজকে লেখকের কোন ছড়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শক্তির সাথে স্বৈরাতন্ত্রের রাজপুত্র এরশাদ যে মিশে আছে তার কথা এসেছে? নাকি এরশাদ কোন অপরাধীর নাম নয়, এরশাদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নাম?

প্রিয় ছড়াকার আপনাকে জানাই একজন মানুষের পক্ষে দুনিয়ায় সংঘটিত সকল অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করা সম্ভব নয়। কারো একটা লেখায়, একটা গানে দুনিয়ার যাবতীয় বিষয় আসবে এমন আশা করাও ভুল। তাই আপনার কবিতায় এটি আসেনি কেন, আপনার গানে ওটি আসেনি কেন এমন দাবি করার অর্থ হলো লেখক কিংবা গায়কের আজকের লেখা তথা প্রতিবাদের বিষয়টা কেই হালকা করে দেওয়া, অগুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ করতে চাওয়া। আপনার পুরো লেখায় সেই চেষ্টা ছিলো। দয়াকরে সম্পর্কযুক্ত চরণগুলো ধরে ধরে বুঝতে চেষ্টা করুণ, তাহলে হয়তো গানটির মর্মার্থ বুঝতে সক্ষম হবেন। স্বাধীনতা অর্জন কে নয় বরং জীবনের ছাপান্নো হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি মানুষের জীবনে স্বাধীনতার সত্যিকার সুফল যে এখনো আসেনি, এখনো যে বৈষম্য আর ভেদাভেদ দূর হয়নি সেটিই এ গানে বুঝানো হয়েছে। এরপর ও আপনি গানটির অর্থ আর উদ্দেশ্য বুঝতে অক্ষম হন তাহলে সেটি আপনার চেতনার সমস্যা, আপনার অন্ধতার সমস্যা, আমাদের নয়।