ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতর তনু হত্যার পর সারাদেশের মানুষ সেই হত্যার প্রতিবাদে সামিল হয়েছে। আপতঃ দৃষ্টিতে এমন গণমুখী প্রতিবাদ দেখে যে কারো মনে হতে পারে বাঙালি অনেক বেশি প্রগতিবাদী, অনেক বেশি অন্যায়ের প্রতিবাদকারী হিসেবে আবার জেগে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবিক সত্য হলো এমন একটিমাত্র ঘটনার প্রতিবাদে বাঙালি প্রগতি কিংবা অন্যায়ের ঘোর বিরোধী কোনটাই আসলে প্রমাণিত হয় না!

কারণ, প্রথমত ধর্ষণ বাঙলার চিরায়ত একখান ঐতিহ্য, প্রতিদিন যতগুলো ধর্ষণের খবর পত্রিকায় আসে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি খবর পত্রিকার পাতায় কিংবা ফেসবুকের প্রচারণায় আসে না। প্রতিদিন যেখানে অসংখ্য ধর্ষণ সংঘটিত হয়, প্রতিদিন যেখানে অসংখ্য ধর্ষক আইন-আদালত-রাষ্ট্র কে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় সেখানে দু-একটি হত্যার প্রতিবাদ আমূল কোন পরিবর্তন আনতে পারে না।

দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ অপরাধীদের এমন একটি স্বর্গভূমি যেখানে প্রতিনিয়ত একটির পর আরেকটি চাঞ্চল্যকর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে এবং সদ্য জন্ম নেওয়া অপরাধটি আগের দিনের অপরাধটি কে ম্লান করে দিচ্ছে। ফলে কোন ঘটনাতেই জনগণের ফোকাস স্থায়ী হচ্ছে না।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বাঙালির অন্যায়ের প্রতিবাদ বর্ণ-দল-জাতি-ধর্ম তে বিভক্ত। তাই সব বর্ণের অন্যায়ে, সব অনুভূতির অন্যায়ে বাঙালি সমান প্রতিবাদী নয়, অর্থাৎ অন্যায়ের প্রতিবাদে বাঙালি অনেক বেশি সিলেক্টিভ। যেখানে ধর্ম নেই, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘুতা নেই এবং যেখানে নিজের পছন্দ করা দলের কেউ জড়িত নেই সেখানেই বাঙালি সবচেয়ে প্রতিবাদী! অন্যায় মাত্র অন্যায়, তার কোন বর্ণ, জাত, ধর্ম থাকে না। কিন্তু বাঙালি তা মানে না, তাই বাছাইকৃত প্রতিবাদে আশান্বিত হওয়ার কিছু নেই, বরং এগুলো ভবিষ্যত কে আরো অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। এবং সবার সেই সম্মেলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এখন সেই অন্ধকারের পথেই হাঁটছে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার তথ্য মতে ২০১৬ সালের প্রথম তিনমাসে বাংলাদেশে ৬৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষিত হয়েছে! এর মধ্যে ১৩জন হয়েছেন গণধর্ষণের স্বীকার! এসব ধর্ষণের অনেকগুলো মাদ্রাসার শিক্ষক কিংবা সেটেলার হলেও সেখানে বাঙালি নীরবতা পালন করেছে। সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফের গুলিতে একজন বাঙালি মানুষ নিহত হলে অনলাইনে জেগে উঠে যেসব বাঙালি, সেইসব বাঙালির অধিকাংশই নিজ মানচিত্রে আদিবাসীদের উপর বছরের পর বছর মিনি সামরিক শাসন চালু রাখলে, আদিবাসীদের বাড়ি-ঘর ধনসম্পদ লুট হলে, তারা ধর্ষিত কিংবা খুন হলে ঘুণাক্ষরেও সেটার প্রতিবাদ করে না!

বাংলাদেশ আদিবাসী মানবধিকার প্রতিবেদনের তথ্য মতে ২০০৯-১৩ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে আটটি সহিংস হামলায় সমতলের ৭১ এবং পাহাড়ের ২৭৫ পরিবারসহ মোট ৩৪৬টি পরিবারের ঘরবাড়ি লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়৷ এমনকি জনপদে ‘সেটেলার’ নামে পরিচিত ও অভিবাসী অ-আদিবাসীদের হামলায় পাহাড়ের ৪০০ পরিবারের প্রায় দুই হাজার মানুষ ভারত সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে৷ এ্ই প্রতিবেদন থেকে জানা যায় শুধুমাত্র ২০১৩ সালেই আদিবাসী-অধ্যুষিত পাহাড়ি এলাকায় প্রায় তিন হাজার ৭৯২ একর এবং সমতলের ১০৩ বিঘা জমি দখল করে নিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা৷ এ সময়ে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে ২৬ আদিবাসী পরিবার৷ গত এক বছরের মধ্যে ১২ জন পাহাড়ি নারীসহ মোট ১৫ আদিবাসী নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন৷ বাংলাদেশের আদিবাসী নারীদের সামগ্রিক প্রতিবেদন ২০১৫ মতে ২০০৭ থেকে ২০১৫ সাল, এ ৮ বছরে ৪৩৪ জন আদিবাসী নারী ও শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শুধু ২০১৫ সালে ১৪টি ধর্ষণ, ১২টি গণধর্ষণ, ১১টি শারীরিক লাঞ্চনা, ৬টি শারীরিক ও যৌন হয়রানি, ১৬টি ধর্ষণ চেষ্টাসহ ৬৯টি ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে।

নির্যাতনের এমন অসংখ্য তথ্য চাইলেই অনলাইনে পাওয়া যাবে। যদিও বাস্তবে আদিবাসীদের উপর এমন নির্যাতন, তাদের সম্পদ দখল-লুট, হত্যা, ধর্ষণের সংখ্যা অনেক বেশি। আদিবাসীদের উপর মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যে এমন নির্যাতন হয়ে আসছে তার কোনটাতে কি সমতলের এইসব প্রতিবাদী মানুষেরা প্রতিবাদ করে কোনদিন রাজপথে নেমেছে? রাজপথ বাদ দিলাম অনলাইনে ও কি তার প্রতিবাদ করেছে? উত্তর গুটিকয়েক বোকা-সোকা ব্লগার ছাড়া আর কেউই এ পথে হাঁটার প্রয়োজন-ই মনে করেনি!

পাহাড়ের সব খবর না হয় আপনার কানে আসে না, আসতে দেওয়া হয় না কিন্তু সমতলের সব খবর-ই তো আপনি পান। সেখানে কি অবস্থা? কেমন আছে সমতলে বাস করা সংখ্যায় কম ধর্মের মানুষেরা? আপনাকে জানাই শুধু ২০১৫ সালেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অন্তত ২৬২ টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী নির্যাতিতদের মধ্যে ২৪ জনকে হত্যা, ২৪ জন মহিলাকে অপহরণ এবং ২৫ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এর ফলে ১৫৬২ টি পরিবার খতিগ্রস্থ হয়েছে, সংখ্যালঘুদের ২০৯ টি প্রতিষ্ঠানে লুট হয়েছে এবং ৬০ টি পরিবারকে তাদের ভিটা বাড়ি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এই যে এত অন্যায়-এত অত্যাচার সংঘটিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত তার কয়টিতে বাঙালি বিশেষ করে মুসলমান বাঙালিরা প্রতিবাদী হয়েছে?

সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘুতা, ধর্ম-বর্ণ, গোত্র-মানচিত্র ভিত্তিতে সংঘটিত অন্যায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ বিষয়ে সাধারণ মানুষের ভূমিকা থেকে রাজনৈতিক দলের ভূমিকা, রাজনৈতিক দল থেকে সরকারে ভূমিকায় আসি এবার। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়তের জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশে আরেকবার ৭১ এর হিন্দু নির্যাতনের দৃশ্যপট হাজির হয়েছিলো। বেছে বেছে হিন্দুদের বাড়ি-ঘর দখল, ধর্ষণ, উচ্ছেদের এক মহাৎসব গিয়েছিলো সেই সময়টাতে। সেই দু:শাসন থেকে মুক্তি পেতে না পেতে আবার দু-বছর সেনা সমর্থিত সরকারের অপশাসন চললো দেশে। সেই অপ-শাসন থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হলো ২০০৮র ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে। ক্ষমতায় আসলো আওয়ামিলীগ তথা মহাজোট। এই মহাজোটের প্রধাণ শরীক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ধর্ম নিরপেক্ষ দল, তাঁরা ধর্মকে পুঁজি করে জামায়তের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে না। তাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে নাকি এ মানচিত্রের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় থাকে। অথচ দেখা যাচ্ছ সেই ধর্মনিরপেক্ষ অসম্প্রদায়িক দল ক্ষমতা থাকাকালেই দিনের পর দিন মাসের পর মাস চলছে হিন্দুদের উপর নির্যাতন, ধর্ষণ আর লুটের তান্ডব। শুধু তাই নয় সেই দলের লোকেরাই এখন এ নির্যাতনে, এ লুন্ঠনে সবচেয়ে বেশি অগ্রগামীতা অর্জন করেছে। নিজেদের লোক বলে এসব অপরাধের ঘটনায় কোথাও কেউ কোনদিন গ্রেফতার হয় না, বিচার সে তো অনেক পরের কথা। ২০১৬ তে এসে একটি সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর নির্যাতনে এই দেশ এখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাত সবাই ভাই ভাই, এদের মাঝে এখন আর কোন ফারাক নাই। সেই সংখ্যাধিক্য ধর্মের ভাই, রাজনীতিক ভাই-ভাই সহ বাকি সব ভাইয়েরা মিলে বাংলাদেশ থেকে চিরস্থায়ীভাবে হিন্দু উচ্ছেদের মিশনে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। পত্রিকা-টেলিভিশন খুললেই দেখতে পাই তাদের এ কার্যক্রম বেশ সফলতার সহিত এগিয়ে যাচ্ছে। আর দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেগুলো কে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। এভাবই চলছে, জানি এভাবেই হয়তো চলবে।

আদিবাসী কিংবা হিন্দু সম্প্রদায় না হয় বাঙালি মুসলমানের নিজের দলের কেউ না তাই নীরবতা পালন করে। কিন্তু যখন নিজ ধর্মের কোন মুয়াজ্জিম, চিন্তাবিদ, সাধক কে হত্যা করা হয় তখন কি বাঙলার এই খাঁটি মুসলমান-রা জেগে ওঠে? না, এখানেও সেই ধারাবাহিকতা। মাওলানা ফারূকী কে হত্যা করা হলে বাঙলার খাঁটি মুসলমান-রা নীরব থাকে, শিয়াদের উপর বোমা মেরে মানুষ হত্যা করলে নীরব থাকে, মসজিদের মুয়াজ্জিন কে হত্যা করা হলে বাঙালির ভীষণ প্রগতিবাদী সব খাঁটি মুসলমান-রা নীরব থাকে। যেখানে নিজ ধর্মের নিজ বিশ্বাসের মানুষ কে হত্যা করা হলে অধিকাংশ মানুষ দেখেও না দেখার ভান করে রয় সেখানে দলহীন-বর্ণহীন ব্লগার(বাঙালির কাছে যার অর্থ নাস্তিক) হত্যায় বাঙালি প্রতিবাদ করবে এমনটা এখন আর কেউ আশা করে না।

ব্যক্তি, দল কিংবা সরকার যতই অস্বীকার করুক সত্যি হলো, মসজিদে বোমা, শিয়া মিছিলে বোমা, মুয়াজ্জিম হত্যা, ইসলামি চিন্তাবিদ হত্যা, ব্লগার-মুক্তমনা হত্যা, ধর্ষণ, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের উপর নির্যাতন, পাহাড়ি জনপদে আদিবাসীদের বাড়ি-ঘর দখল, প্রচন্ড ভারত বিদ্বেষ এগুলো কোনটাই আসলে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো সবি এক সূত্রে গাঁথা এবং এগুলোর নিয়মিত উপস্থিতি ঠিকি জানান দিচ্ছে বাংলাদেশ অনেকদিন আগে থেকেই বাংলাস্তান হওয়ার পথে যাত্রা শুরু করেছে। সেই যাত্রায় সরকার যখন অনুভূতির জন্য আইন প্রণয়ন করে, হেফাজতি ভয়ে বইমেলায় বই নিষিদ্ধ করে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পর ও রাষ্ট্রধর্ম কি হবে সেই সিদ্ধান্ত আদালতের দিকে ঠেলে দিতে থাকে, ঘোষণা করে দেশ চলবে মদিনা সনদে, আইন করে বৈশাখী অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে বিকেল পাঁচটার মধ্যে তখন নিশ্চিত ভাবেই চারিদিকে সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ শক্তির জয়ধ্বনি শুনা যেতে থাকে, তাদের জয়ের পথ প্রশস্ত হতে থাকে।

একটি নিদিষ্ট মানচিত্রে জনগণ থেকে রাষ্ট্র, রাজনীতিক দল থেকে সরকার সবাই যখন এমন সিলেক্টিভ হয়ে যায়, সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে যখন মাথা নত করে ফেলে তখন ধর্ষণ-সাম্প্রদায়িক হত্যা-লুন্ঠন বেড়ে যেতে থাকে। যেমনটা এখন বাংলাদেশে হচ্ছে এবং এগুলো দিনে দিনে তা শুধু চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তেই থাকবে। ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্র চোখে টিনের চশমা পরে থাকলে এদের কারো পক্ষেই এ ঘনিয়ে আাসা অন্ধকার দেখা সম্ভব না। অবকাঠামোর উন্নয়ন আর রাজাকারদের বিচারের বিনিময়ে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করতে সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে মাথা নত করে নিলে বাংলাদেশ কে বাংলাস্তান হওয়ার হাত থেকে বাঁচাবে কে?