ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

জীবনানন্দ দাশ বাংলা কবিতায় উজ্জ্বলতম নাম। জীবনানন্দকে কেউ বলেন নির্জনতার কবি, কেউ বলেন বোধের কবি, কেউ প্রকৃতি কবি আবার কে্উবা বলেন পরাবাস্তব কবি। নানান নামে, নানান উপমা-অলংকার দিয়েও শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দ কে, তাঁর কবিতার ধরণ কে ব্যাখা করা যায় না। তাই তো কবি নিজে বলেছেন,

‘আমার কবিতাকে বা এ কাব্যের কবিকে নির্জন বা নির্জনতম আখ্যা দেওয়া হয়েছে ; কেউ বলেছেন, এ কবিতা প্রধানত প্রকৃতির বা প্রধানত ইতিহাস ও সমাজ-চেতনার, অন্যমতে নিশ্চেতনার ; কারো মীমাংসায় এ কাব্য একান্তই প্রতিকী ; সম্পুর্ণ অবচেতনার ; সুররিয়ালিষ্ট। আরো নানারকম আখ্যা চোখে পড়েছে। প্রায় সবই আংশিকভাবে সত্য- কোনো কোনে কবিতা বা কাব্যের কোনো কোনো অধ্যায় সম্বন্ধে খাটে, সমগ্র কাব্যের ব্যাখা হিসেবে নয়। ’

এতো গেলো কবিতার প্রকৃতি কিংবা ধরণ। প্রকৃতি কিংবা ধরণ বুঝার আগে কবিতা কী সে সম্পর্কে একটু ধারণা থাকা মন্দ নয়। কবিতা কী, সেটি কেমন হয়, সেই সম্পর্কে জীবনানন্দ তার শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলনের ভূমিকায় নিজেই বলেছেন,

’কবিতা কী এ জিজ্ঞাসার কোন আবছা উত্তর দেওয়ার আগে এটুকু অন্তত স্পষ্টভাবে বলতে পারা যায় যে কবিতা অনেরকরম। হোমরও কবিতা লিখেছিলেন, মালার্মে র্যাঁষবোও রিলকেও। শেক্সপীয়র, বদলেয়ার, রবীন্দ্রনাথ ও এলিয়টও কবিতা রচনা করে গেছেন। কেউ কেউ কবিরে সবের উপরে সংস্কারকের ভূমিকায় দ্যাখেন ; কারো কারো ঝোঁক একান্ত রসের দিকে। কবিতা রসেরই ব্যাপার, কিন্তু এক ধরণের উৎকৃষ্ট চিত্তের বিশেষ সব অভিজ্ঞতা ও চেতনার জিনিস-শুদ্ধ কল্পনা বা একান্ত বুদ্ধির রস নয়।

কবিতা সৃষ্টি ও কাব্যপাঠ দুইই শেষ পর্যন্ত ব্যাক্তি-মনের ব্যাপার, কাজেই পাঠক ও সমালোচকদের উপলব্ধি ও মীমাংসায় এত তারতম্য। একটা সীমারেখা আছে এ তারতম্যের, সেটা ছাড়িয়ে গেলে বড়ো সমালোচকদের অবহিত হতে হয়। কাব্য চেনার আস্বাদ করবার ও বিচার করবার নানারকম স্বভাবও পদ্ধতির বিচিত্র সত্য মিথ্যার পথে আধুনিক কাব্যের আধুনিক সমালোচককে প্রায়ই চলতে দেখা যায়, কিন্তু সেই কাব্যের মোটামোটি সত্য অনেক সময়ই তাঁকে এড়িয়ে যায়।’

জীবনানন্দের কথাটি যথার্থ, ’যে কাব্যপাঠ শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি মনের ব্যাপার।’ তাই ব্যক্তি মানুষ কবিতাকে নিয়ে তার নিজস্ব চিন্তা, চেতনা, ভালোলাগা-মন্দলাগাকে নানান অংলকারের উপমায় প্রকাশ করে । যেমন জীবনানন্দকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি বুদ্ধদেব বসুকে লেখা এক চিঠিতে বলেছিলেন,

‘জীবনানন্ দাশের চিত্ররূপময় কবিতাটি (মৃত্যুর আগে) আমাকে আনন্দ দিয়েছে।’

ধূসর পান্ডলিপি সম্পর্কে লেখা আরেক চিঠিতে রবীন্দনাথ ঠাকুন, জীবনানন্দকে বলেছিলেন,

’তোমার কবিতাগুলি পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখায় রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।’

জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রথম মন্তব্যটি দেখলে বুঝবো চিত্ররুপময় দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়েছেন, জীবনানন্দ কবিতায় যে ছবি বা দৃশ্য অঙ্কন করেন তা রূপের প্রাচুর্য্যতে ভরপুর থাকে। এখন প্রশ্ন হলো জীবনানন্দ তার কবিতায় আসলে কিসের নকশা অঙ্কণ করেন, যা এতো রূপময় হয়ে ওঠেছে রবীন্দ্রনাথের কাছে। আমরা জানি জীবনানন্দের কবিতায় সমাজ জীবনের নানান নিপীড়ন, শোষন কিংবা বিপ্লবের কথা উঠে আসে না। জীবনানন্দ, তাঁর কবিতায় সবচেয়ে বেশি গিয়েছেন প্রকৃতির কাছে। জীবনানন্দের কবিতায় প্রকৃতির চিত্রময় রূপটাই রবীন্দ্রনাথের কাছে ধরা দিয়েছে আনন্দ হয়ে, তাই তো সর্বশেষ মন্তব্যে বলেছেন, ‘তোমার কবিতা দেখার আনন্দ আছে।

কবি বুদ্ধদেব বসু জীবনানন্দ সম্পর্কে বলেছিলেন,
‘ জীবনানন্দ দাশ আমাদের নির্জনতম স্বভাবের কবি। তিনি বাঙলা কাব্যসাহিত্যে একটি অজ্ঞাতপূর্ব ধারা আবিষ্কার করেছেন বলে আমার মনে হয়।

তিনি এ পর্যন্ত মোটেই popularity অর্জন করতে পারেননি, বরঞ্চ তাঁর রচনার প্রতি অনেকেই বোধহয় বিমুখ; তারকারণ বোধহয় জীবনানন্দবাবুর কবিতা একটু ধীরে সুস্থে পড়তে হয়, আস্তে আস্তে বুঝতে হয়।
জীবনানন্দ একজন খাঁটি কবি, যেমন তার প্রমাণ স্বরূপ একটি লাইন উল্লেখ করি- ‘আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে-আকাশে।’… আকাশের অন্তহীন নীলিমার দিগন্ত-বিস্তৃত প্রসারের ছবিকে একটি লাইনে আঁকা হয়েছে। একেই বলে magic line । আকাশ কথাটার পুনরাবৃত্তি করবার জন্যেই ছবিটি একেবারে স্পষ্ট, সজীব হয়ে উঠেছে। শব্দের মূল্যবোধের এমন পরিচয় খুব কম বাঙালী কবিই দিয়েছেন।

জীবনানন্দ কি ধরণের কবি কিংবা তিঁনি কি ধরণের কাব্যচর্চা করে গেছেন, একজন পাঠক হিসেবে সেটি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। জীবনানন্দের কবিতা অন্য দশজন বাঙালির মতো আমাকেও মুগ্ধ করেছে, আলোকিত আর শিহরিত করে রেখেছে জীবনের প্রতিটি বাঁকে, এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক কি কারণে জীবনানন্দের কবিতায় এতো মুগ্ধ হই, শিহরিত হই তার খোঁজ করলে প্রথমেই দেখা যাবে, জীবনানন্দের কবিতায় মিল, অন্তর্মিলের ব্যবহার আমাদের কাছে অতুলনীয় হয়ে উঠে। উনার কবিতার বিষয়, উপমা, অনুপ্রাস সর্বতোভাবে তার নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র। জীবনানন্দের কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য শব্দ স্পর্শ রং রূপ গন্ধের অনুভূতিমুখর বাণী। একথা ঠিক এগুলো সরাসরি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি নয়, তিনি কল্পনার সঞ্জীবনী মন্ত্রে অনুভূতি মুখর। এমন ধারা বাংলা কবিতায় অভিনব। তাঁর কবিতায় এরকম অনুভূতি জীবন ও রূপ লাভ করে, বিশ্বময়ী প্রকৃতি, জীবন, মৃত্যু, কাল সমস্ত কিছুই তার কাছে রক্তে-মাংসে জীবন্ত। যেমন,

আহলাদের অবসাদে ভরে আসে আমার শরীর,
চারিদিকে ছায়া-রোদ-ক্ষুদ-কুঁড়া-কার্তিকের ভিড় ;
চোখের সকল ক্ষধা মিটে যায় এইখানে, এখানে হতেছে স্নিগ্ধ কান,
পাড়াগাঁর গায় আজ লেগে আছে রূপশালি ধানভানা রূপসীর শরীরের ঘ্রাণ।

কবিতার উপমা দিয়ে জীবনানন্দ কখনো হেঁটেছেন পরাবাস্তবতার পথ ধরে, কখনো ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া জনপদে, আবার কখনো ব্যক্তি বোধের গভীর অতলে। অতীতের সঙ্গে বর্তমানের, পুরানোর সঙ্গে নতুনের, অসম্ভবে-সম্ভবে, অবিশ্বাস্য-বিশ্বাস্যে, গ্রামের-নগরের, সমকালের-হাজার বছরের অতীতের অদ্ভুত সংমিশ্রণ এঁকে দিতেন জীবনানন্দ। যেমন ’বনলতা সেন’ কবিতায়, বিদিশা, শ্রাবস্তী আর সিংহল সমুদ্রতীর ছেড়ে যেই এসে দেখি নাটোরের বনলতা সেন, পাখির নীড়ের মতো চোখ মেলে বলে ’এতোদিন কোথায় ছিলেন’, আকস্মিক এ প্রশ্নের বিস্ময়ে আমরা শিহরিত হই। শ্রীলংকা থেকে নাটোরে চলে এসেছেন এক পলকে, এতো দূর আর এতো কাছে কে এতো অদ্ভুতভাবে মিশিয়ে সেখানে পাখি আর মানবের বন্ধন সেতু এঁকে দিলেন পাঠক হৃদয়ে।

একটু গভীর ভাবে দেখলে, দেখবো জীবনানন্দ মূলত পঙক্তিপ্রধান কবি। তাঁর এক একটি উপামা একটি কবিতার স্বাদ আনে এবং সে উপমা বেশিরভাগ সময়েই বক্তব্য স্বচ্ছ ও অর্থকারী করার জন্য ব্যবহার হয় না, কেবলমাত্র একটি আবহ সৃষ্টিই তাদের উদ্দেশ্য। ফলে স্বভাবতই জীবনানন্দের কবিতা পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। কারণ উনার কবিতায় একটি ভাবের সাথে আরেকট ভাবের যোগসূত্র আবিষ্কার বেশ দুরূহ ব্যাপার। যেমন,

রাতের বাতাস আসে
আকাশের নক্ষত্রগুলা জ্বলন্ত হয়ে ওঠে
যেন কাকে ভালোবেসেছিলাম
তখন মানবসমাজের দিনগুলো ছিলো মিশরনীলিমার মতো।

এখানে ভালোবাসার গভীরতা বুঝাতে মিশরনীলিমার উপমা দেওয়া হয়েছে। পাঠক কে এই মিশরনীলিমার উপমা বুঝে উঠতে হিমশিম খেতে হবে। জীবনানন্দ তার নিছক প্রেমের কবিতার মধ্যেও প্রকৃতির প্রলেপ দেন, যে অপ্রত্যাশিত প্রকৃতি আমাদের বিস্মিত করে। প্রকৃতির প্রতি অনুভূতি মানুষে আদি অনুভূতি, জীবনানন্দ তাই আদি অনুভূতির কবি, হৃদয়বেদনার ধূসর পদপাতেই তাঁর কাব্যের স্পন্দন। কখনো বিস্মিত শিশুর দৃষ্টি নিয়ে, কখনো ক্লান্ত পথিকের নিষ্পাপ স্পষ্টতা, এক সহজ নির্ভঙ্গিমা নিয়ে কোনো নবতর আত্নাকে আহবান করেন।

জীবনাননন্দ তাঁর কবিতায় বারবার বাংলাদেশে ফিরেছেন, ফিরেছেন বাংলার প্রকৃতির কাছে। আর কোন কবির কবিতায় এমন করে বাংলাদেশ কিংবা তার ফুল, পাখি, জীবজন্তু আসেনি। কার্তিকের ছায়া, হেমন্তের মিষ্টি রোদ, হিজলের জানালায় আলো আর বুলবুলি, হলুদ পাতায় শিশিরের শব্দ, বুনোহাঁস আর শঙ্খচিল, পেঁচা আর লাশকাটা ঘর, সোনালি ডানার চিল আর নক্ষত্রের তারা জ্বলা রাত সবকিছুই জীবনানন্দের কবিতায় স্পন্দন হয়ে এসেছে, এসেছে ভালোবাসার গভীর আবেশ হয়ে। অনেক শিরীষের ডাল, অশথের চূড়া, সুন্দরী অর্জুনের বন, বাবলার গলির অন্ধকার, সোনালী ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বথ বট, জলসিড়ি নদী, বিজন ঘাস, বাংলার শ্রাবণের বিস্মিত আকাশ, কলমীর ঘ্রাণ, হাসের পালক, গঙাফড়িং, চড়ুই, দোয়েল, শাদা বক এসেছে অলংকার হিসেবে নয়, এসেছ অবয়ব হয়ে কবিতার পরতে পরতে। জীবনানন্দের কবিতা পড়ে আমার চলে যাই হেমন্তের হলুদ বিকেলে যেখানে সোনালী ধানকাটা হয়েছে, চলে যাই গভীর কোন রাতে যেখানে ক্যাম্প করে রাতের স্তব্দতা আর প্রাণীকূলের পদচারণা অনুভব করতে পারি, হাওয়ার রাতে খোপার মতো গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রামগুলো কে দেখাতে পাই ধানসিড়ি নদীর বাঁকে বাঁকে। চোখের সামনেই কবিতা থেকে ওঠে আসে সেসব দৃশ্য, গ্রাম আর তার প্রকৃতি। সেই প্রকৃতিতে আমারা আবার জীবন্ত হয়ে উঠি, হারিয়ে ফেলা শৈশব আর কৈশোর খুঁজি, আর হয়তো খুঁজি বেতফলের স্লান সেই মেয়েটিকে, যে জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে কোথায় যে চলে গেছে।

এই ডাঙা ছেড়ে হায় রূপ কে খুঁজিতে যায় পৃথিবীর পথে!
বটের শুকনো পাতা যেন এক যুগান্তের গল্প ডেকে আনে:
ছড়ায় রয়েছে তারা প্রান্তরের পথে পথে নির্জন অঘ্রানে;-
তাদের উপেক্ষা করে কে যাবে বিদেশ বলো-আমি কোনো মতে
বাসমতী ধানক্ষেত ছেড়ে দিয়ে মালাবারে- উটিবার পর্বতে
যাবো নাকো, দেখিব না পামগাছ মাথা নাড়ে সমুদ্রের গানে
অশ্বথের পাতাগুলো পড়ে আছে স্লান শাদা ধুলোর ভিতর:
এই পথ ছেড়ে দিয়ে এ-জীবন কোনোখানে গেল নাকো তাই।

এক কবিতায় কতগুলো কল্পদৃশ্য এঁকে দিলেন, বটের শুকনো পাতায় যে দীর্ঘশ্বাস আর অতীতের পদচারণা আছে সে শিকড় ছেড়ে কবি চান না যেতে পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে। খড়কুটো আর সোনালী ধানক্ষেত, ধুলোপথ আর নির্জন অঘ্রান কবির বুকে গভীর যে ভালোবাসা সৃষ্টি করে সেটি পামগাছ আর মালাবার উটিবার পর্বতে যাওয়ার ইচ্ছেকে তুচ্ছ করে। বাংলা আর তার প্রকৃতির প্রতি কবির এ নিখাদ প্রেম আমাদের এলোমেলো করে দেয়। আমরা তার গন্ধ পাই, স্পর্শ অনুভব করি, যেখানে যতদূরেই থাকি, দুচোখ বন্ধ করেই বাংলার সমস্ত রূপ দেখত পাই। জীবনানন্দের কবিতায় তাই শুধু দৃশ্যকল্প আঁকা হয় না, দৃশ্যের রূপ, রস, গন্ধ সব সব অনুভব করা যায়।

জীবনানন্দের ’রূপসী বাংলা’ যেমন বাংলার প্রকৃতি, প্রাণী আর রূপের কথা বলে ঠিক তার বিপরীতে ’বনলতা সেন’ কাবগ্রন্থে কবিতাগুলো পরাবাস্তবতার কথা বলে। বিখ্যাত ’বনলতা সেন’ কবিতার শেষ দুটি পঙক্তিতেই দেখি- ‘সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী-ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন/থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’,। এখানে দেখা যাচ্ছে বনলতা সেনের সাথে কবির মিলন হচ্ছে জীবনে নয়-জীবনাতীতে, স্বপ্নে, কল্পনায়। আবার ’হাওয়ার রাত’ কবিতায় হৃদয় যে পৃথিবী ছিঁড়ে উড়ে যায়, ‘বুনো হাঁস’ কবিতায় বুনোহাঁস পৃথিবীর সমাপ্তির পরে হৃদয়ের শব্দহীন জ্যোৎস্নার ভিতর উড়ন্ত, ’নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতায় ইতিহাসের বর্ণাঢ্যতার ভিতর একটি জাগ্রত হাত, ‘হরিণের’ কবিতায় প্রথম পঙক্তিতেই স্বপ্নের ইশার-প্রভৃতিতে পরাবাস্তবতার ছাপ স্পষ্ট।

প্রকৃতি, পরাবাস্তবতার পরে জীবনানন্দের কবিতায় সমাজ ও ইতিহাসচেতনা এসেছে নিবিড় ভাবে। জীবনানন্দ নিজেই বলেছেন,

’কবিতার অস্থির ভিতরে থাকবে ইতিহাসচেতনা ও মর্মে থাকবে পরিছন্ন কালজ্ঞান।’

ঠিক সে জন্য তাঁর কবিতায় আমরা ইতিহাসের উপর গুরুত্ব আরোপ দেখি। যেমন, হাওয়ার রাত কবিতায় কয়েকটি পঙক্তি লক্ষ্য করলে দেখা যায়,

যে নক্ষত্রেরা আকাশের বুকে হাজার হাজার বছর আগে মরে গিয়েছে
তারাও কাল জানালর ভিতর দিয়ে অসংখ্য মৃত আকাশ সঙ্গে করে এনেছে ;
যে রূপসীদের আমি এশিয়ায়, মিশরে, বিদিশায় মরে যেতে দেখেছি
কাল তারা অতিদূর আকাশের সীমানায় কুয়াশায় কুয়াশার দীর্ঘ বর্শা হাতে
করে কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে যেন-
মৃত্যুকে দলিত করাবার জন্য?
জীবনে গভীর জয় প্রকারশ করবার জন্য?
প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলবার জন্য?

পর-পর তিনটি সম্পূরক প্রশ্নের ভিতরেই রয়েছে উত্তর। ঐ রূপসীরা মৃত্যুকে দলিত করেছে, জীবনের গভীর জয় প্রকাশ করেছে, প্রেমের ভয়াবহ গম্ভীর স্তম্ভ তুলে ধরেছে। সময় কে অতিক্রম করে যাওয়ার বাসনা ছিলো জীবনানন্দের প্রখর। অজস্র প্রেমের কবিতায় জীবনানন্দ সময়কে অতিক্রম করে গেছেন। অতীত-বর্তমান এক করে ইতিহাসচেতনায় গেঁথেছেন কাব্যকে। ’হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ এই পঙক্তিতে কেবল ক্লান্তির কথা নয়, এর মধ্যে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত-পরিব্যাপী যে পরিভ্রমনের কথা আছে, শেষ পঙক্তি দুটিতে ফিরে এসেছে জীবনাতীত জগতাতীত রহস্যের মধ্যে দীপ্যমান প্রেমিকতার প্রসঙ্গ। নাটোর নামক একটি সামান্য শহরের কোন নারী তখন হয়ে উঠেছে চিরন্তনী। ইতিহাসচেতনা জীবনানন্দকে দিয়ে বাস্তবতার ক্লেদের ভিতর থেকে ফুটিয়েছে অপরাজেয় রক্তগোলাপ।

জীবনানন্দ স্থির থাকেননি কোনো এক স্থানে, বরং সতত সর্বত্র চলিঞ্চু। সন্ধানী। ক্রমপরিবর্তমান। ক্রমঅগ্রসরমান । যেমন একই বিষয়কে তিনি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্নভাবে দেখেছেন, তেমনি জীবনের অজস্র দিককে স্পর্শ করেছেন। প্রথাগত পথে তিনি হাঁটেননি, যেমন বাংলা কবিতায় রোমান্টিসিজমের সাথে বর্ষার সম্পর্ক নিবিড়। রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই বাংলা কাব্য-সাহিত্যে বর্ষাকাল, ভালোবাসার-ভালোলাগার অনুভূতি প্রকাশে প্রধান পরিচয় হয়েছে। কিন্তু জীবনানন্দ তার কবিতায় বর্ষাকালের চেয়ে হেমন্ত আর কার্তিকের কাছে গিয়েছেন, তাদের রূপ বর্ণণা করেছেন। সর্বত্রই জীবনানন্দ নতুনের খোঁজ করেছেন, তাই তাঁর ’ঝরাপালকের’ সঙ্গে মিল নেই ’বেলা অবেলা কালবেলার’, ’রূপসী বাংলা’ আর ’সাতটি তারার তিমির’ এর মধ্যে আসমান জমিন ফারাক। ’ধূসর পান্ডুলিপি’ আর ’বনলতা সেন’ দুই বিরোধী দিগন্তকে স্পর্শ করে আছে। জীবনানন্দের সমস্ত কবিতা মূলত তারই ব্যক্তিচিন্থিত হলেও, তার মাঝে বিষয়ে বক্তব্যে ব্যঞ্জনায় বিন্যাসে রয়েছে অসংখ্য বৈচিত্র্য। তিঁনি যেমন স্বপ্নের হাতে নিজেকে সমর্পণ করেছেন, তেমনি এক পর্যায়ে লিখেছেন ব্যঙ্গ কবিতাও । প্রেম ও মৃত্যুর মতা দুই বিপরীত কে মিলিয়ে দিয়েছেন। তবে সবকিছুর উপরে স্থান দিয়েছেন হৃদয় কে। আর আমরা জানি কবিতার বাস সেই হৃদয়ের গভীর অন্ধকারেই। কবি বলেছেন,

যে-জিনিস বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীর গহ্বরে!-
নক্ষত্রের চেয়ে আরো নিঃশব্দ আসনে
কোনো এক মানুষের তরে এক মানুষীর মনে।

জীবনানন্দের কবিতা বহুমাত্রিক, কোন নিদিষ্ট একটি উপমা দিয়ে তাঁর বিপুল রচনাকে চিন্থিত করা যায় না। জীবনানন্দনীয় কবিতার জন্যই তিঁনি বেঁচে থাকবেন হৃদয়ের গভীর গহ্বরে, নক্ষত্রের চেয়েও নি:শব্দ সে আসনে, প্রতিটি কাব্যপ্রেমী মানুষের মনে।