ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

প্রতিটি মানুষ চাইলে দুটো জীবন যাপন করতে পারে। একটা তাঁর একান্ত নিজস্ব জীবন, যেখানে একটা নিদিষ্ট সময়ের জন্য সে বেঁচে থাকে এবং সেই সময়ের পাওয়া-না পাওয়া, ক্লান্তি-বিষাদ, অতৃপ্ততা কিংবা সুখের অনুভূতিতে পূর্ণ থাকে। আর আরেকটা জীবন সে বইয়ের মাধ্যমে পেতে পারে। বই-ই পারে মানুষ কে শত বছরের অদেখা লোকালয়ে নিয়ে যেতে, পারে অন্য আরো অনেক জীবনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। বই ছাড়া ইতিহাস জানা হয় না, শিল্প, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সভ্যতার পটভূমি পরিবর্তন সহ জীবনের ঘরের সব বিবর্তন কে জানা হয় না। বই আছে বলেই আমরা মোঘল আমল, বৃটিশ শাসন, পাকিস্তান পর্বের জীবনযাপন, সংস্কৃতিবোধ সম্পর্কে জানতে পারি, জানতে পারি আমাদের পূর্বপুরুষদের কথা, আমাদের শিকড়ের কথা। জ্ঞান বিজ্ঞান থেকে ইতিহাস-ঐতিহ্য সবকিছুই জানার সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো বই।

বই সে অনেক রকম হয়, তবে ভালো বই শেষ পর্যন্ত মানুষের কথা বলে, সময়ের কথা বলে, নিদিষ্ট মানচিত্রের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের কথা বলে। অচেনা কে চিনতে, অজনাকে জানতে বইয়ের চেয়ে ভালো কোন সৃষ্টিশীল মাধ্যম মানুষ আজো খুঁজে পায়নি। একজন সাহিত্যের পাঠক হিসেবে বইয়ের মাঝে আমি অদেখা সময়কে, জীবন কে, জীবনবোধকে দেখতে চাই বেশি। তাই সময় কে তুলে আনা, জীবনবোধ কে জাগ্রত করা বই সব সময় আমার কাছে আকর্ষনীয়।

সেই তাড়না থেকে বই বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের মাঝে যে বইটি প্রথম পড়ে শেষ করলাম তার নাম ’ঝড়ের তোড়ে।’ সিঁড়ি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইটির লেখিকা মায়মুনা লীনা। বইটির নাম আর মুখবন্ধে মূল গল্পের পটভূমির বর্ণনায় বইটি পড়তে আমি আগ্রহী হই। ৭০এর ঘূর্ণিঝড়ে একটি চর আর কিছু মানুষের গল্প নিয়ে লেখা উপন্যাস হলেও আমি আসলে উপন্যাসের ভেতর সেই সময়কে দেখতে পাবো বলেই সবার আগে পড়তে দারুন আগ্রহী হয়েছি।

16707449_1295791273840052_5524323349448936291_o

৭০র দশকে আমার জন্ম হয়নি, তাই সে সময়টা কে জানার আগ্রহ আমার প্রচন্ড। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের বছর বলেই সে সময়ের মানুষের চিন্তা চেতনা, জীবন যাপন কে আমি খুঁজি। ৬৯এর গণ অভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন আর ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুই আমাকে টানে। শোষিত, নিপিড়ীত মানুষ হিসেবে সে সময়ের মানুষদের মনস্ততাত্ব, চিন্তা চেতনা কতটা জাগ্রত হয়েছিলো, কিভাবে তারা বন্যায়, খরায়, ঘূর্ণিঝড়ের সাথে লড়াই করে নিজ চেষ্টায় বেঁচে ছিলো সেগুলো জানা আসলে জীবন কে জানা। আমি আধুনিক যুগের এ সহজ জীবন কে নয়, সংগ্রাম আর লড়াইয়ের জীবন কে জানতে চেয়েছি, জানতে চেয়েছি অভাব আর দারিদ্রতা ও কিভাবে সে সময়ের সম্পর্কের বন্ধনগুলো কে এতটুকু শীতল করতে পারেনি।

নদী মাতৃক দেশ বলেই আমাদের দেশে অসংখ্য চর আছে। সে চরগুলো তে বাস করে অসংখ্য মানুষ, যাদের জীবন যাপন দেশের অন্য যে কোন প্রান্তের জীবন যাপনের চেয়ে আলাদা। অভাব-অনটন ছাড়াও ঝড়ের সাথে লড়াই তাদের নিত্য নিয়ত। তাই চরের মানুষের বঞ্চনার, সুখ-দু:খ, আনন্দ-বেদনার কাব্য কেমন ছিলো সেটাই জানার মূল আগ্রহ ছিলো। আমরা কমবেশি সবাই জানি ৭০এ একটা প্রলংয়করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছিলো আজকের বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। লক্ষাধিক মানুষ আর গবাদি পশু মারা গিয়েছিলো সে ঝড়ে। ব্যস, এই পর্যন্তই আমরা জানি, এর বেশি কিছু না। এক রাতের ব্যবধানে কতটুকু বদলে গেলো একটা মানচিত্রের জীবন, হারিয়ে গেছে কত লোকালয়, সে গল্প কেউ বলেনি। প্রকৃত অর্থে ৭০র সেই ঘূর্ণিঝড় নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে তেমন বিস্তৃত আকারে কেউ কিছুই লিখেনি। একটা রাতের ব্যবধানে লক্ষাধিক মানুষ কি যে গভীর বেদনা আর সীমাহীন শূণ্যতা নিয়ে ‘নেই’ হয়ে গেলো, হারিয়ে গেলো সে গল্প, সেই বেদনার কথা কোথাও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়নি দেখে আমি ব্যথিত হই, ক্ষুদ্ধ হই।

মায়মুনা লীনা যখন সেই ঘূর্ণিঝড় কে উপজীব্য করে চরের মানুষদের নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছেন জানলাম তখন আনন্দিত হলাম। যাক, অবশেষে কেউ না কেউ লিখেছে। এ লেখিকার লেখার সাথে পূর্বেই পরিচয় ছিলো বলেই জানি উনার লেখার মূল শক্তির জায়গাটা হলো ’আবেগ’। এ লেখাও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হৃদয়ের কাঙ্খিত শব্দমালা দিয়ে তিনি এমন ভাবে বাক্য বিনাস করেন যে পাঠক কে সত্যি সত্যি বর্ণিত দৃশ্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন। যেমন এ বাক্যগুলোর মাধ্যমে আঁকা কল্প দৃশ্যের কথাই ধর যাক,

’’সূর্যের কমলা-লাল আভা কেবল উঁকি দিচ্ছে পূব আকাশে। দূরে ওপারের গ্রামে বড় বড় কৃষ্ণচূড়ার ফাঁক দিয়ে জ্বলন্ত থালার মতো সূর্যটা তার উপস্থিতি জানান দিলো। তারই প্রতিবিম্ব কীর্তনখোলা নদীর রুপালী জলে আছড়ে পড়ে আলোর ঝিলিমিলি ছড়িয়ে দিচ্ছে চারিদিকে।” এমন বর্ণনার পর কে না কীর্তনখোলা নদীতে ডুবে যাওয়া সূর্যের শেষ বিকেল টা চোখের সামনে দেখতে পায় না?

মায়মুনা লীনার ঝড়ের তোড়ে উপন্যাসটি ঝড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প, স্বজনহারা অসংখ্য মানুষের ছাই চাপা বেদনার গল্প বলেই আমাকে ছুঁয়ে গেছে। এটি কাহিনী নির্ভর একটি উপন্যাস বলেই হয়তো লেখিকা চরিত্র নির্মাণে খুব বেশি মনোযোগ দেননি। তারপরও প্রাঞ্জল ভাষা আর শ্রুতি মধুর শব্দ চয়নে এর গদ্য চোখের শান্তি দিয়েছে, মনের খোরাক মিটিয়েছে। চরিত্রগুলো আরো শক্তিশালী ও বিস্তৃত হলে এবং লেখার কলবরটা আরেকটু দীর্ঘ হলে এ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হতে পারতো এ কথা বলতে পারি।

দৃশ্যের বর্ণনায়, গল্পের বর্ণনায় এ উপন্যাস যতটুকু মুগ্ধ করেছে ঠিক ততখানি হতাশ করেছে চরিত্রায়নে। অন্য আট-দশজন মানুষের মতো এ উপন্যাসের মূল চরিত্র আজিজ মিয়াও গ্রামে পরিবার রেখে শহরে চাকরি করতো সে সময়ে। ঘূর্ণিঝড়ের দিনেও সে শহরে ছিলো। ঘূর্ণিঝড়ের পরে যখন পত্রিকার মাধ্যমে সে জানতে পারে একটা মানুষখোকো ঝড় বয়ে গেছে তার গ্রামের উপর দিয়ে, যে ঝড়ে জীবত মানুষের চিন্থ নাকি কোথাও নেই! অর্থাৎ লেখার শুরুতেই পাঠক ধাক্কা খায়, প্রস্তুত হয় বড় ধরণের দু:খের সাথে একটু পরেই তার পরিচয় হবে। সেই ভয়টা, সেই শংকা টা যদিও গল্পের মাঝখানেই উবে গেছে লেখিকা বাস্তবতার পথে হেঁটেছেন বলে। মুখবন্ধেই লেখিকা জানিয়েছেন, এটি সত্যি কাহিনীর উপর লেখা উপন্যাস। তাই বাস্তবতাই যেমন এ উপন্যাসের মূল শক্তি আবার সেই বাস্তবতার পথ ধরে চরিত্রগুলোর হাঁটাই এ উপন্যাসের মূল ব্যর্থতা মনে হয়েছে। আমরা জানি উপন্যাস চরিত্র নির্ভর হয়, সেখানে চরিত্রগুলো অনেকভাবে বিকাশিত হয়ে শেষ পর্যন্ত গল্পটাকে টেনে নিয়ে যায়। অর্থাৎ চরিত্রের মাঝে গল্প বেঁচে থাকে, গল্পের মাঝে চরিত্র নয়। ৬৫ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাসে অবশ্য চরিত্র খুব বেশি শক্তিশালী হওয়ার কথা ও না। তারপরও মূল গল্পটাতে অবিচল থেকে চরিত্রগুলো কে কিছুটা লেখিকার সৃষ্টিশীলতা দিয়ে নতুনভাবে সৃষ্টি করলে কে জানে এ উপন্যাস হয়তো ৭০র ঘূর্ণিঝড়ের উপর রচিত উপন্যাসের মাঝে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হতো।

ব্যক্তিক বিষাদ না থাকলে ও ছিলো সামষ্টিক বিষাদ, ছিলো সামষ্টিক হাহাকার। বিস্তৃত আকারে না হলেও ছিলো লড়াই করে আবার জেগে ওঠার গল্প। সবকিছু মিলিয়ে সে সময় কে আর তাদের জীবন যাপন কে জানা যায় এ লেখার মাধ্যমে। আমরা জানি যে মানুষ শুধু নিজের জীবনের সময়ের মাঝে বেঁচে থাকে সে অন্য জীবনের স্বাদ পায় না। জীবন কে ঘুরে ঘুরে দেখতে হয়, সেই ঘুরে দেখার জন্য বই, ইতিহাস নির্ভর, হারিয়ে যাওয়া সময় নির্ভর রচনার কোন জুড়ি নেই। ৭০র এর ঘূর্ণিঝড় আর হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য মানুষের হাহাকার কে জানতে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মাত্র ৬৬ পৃষ্ঠার উপন্যাস ‘ঝড়ের তোড়ে’ এবারের বইমেলার উল্লেখযোগ্য একটি রচনা হয়ে থাকবে, এ কথা বলা যায়।