ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 


দেশ আজ চরম সংকটে । আমরা আমাদের অর্জিত স্বাধীনতাকে ভোগ করাতো দূরের কথা রক্ষা করতে পারব কি না সেটা প্রশ্ন বোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।কেননা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিককে পাশের বন্ধু দেশ ভারত যেভাবে বিনা কারণে ,তুচ্ছ কারণে গুলি করে মারছে তাতে কি আমাদের মনে এ প্রশ্ন জাগে না ? আসলেই আমরা কি স্বাধীন দেশের নাগরিক ? নাকি ভারতের অঙ্গরাজ্য ? এছাড়াও একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের সংবিধানে বর্ণিত মৌলিক অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সরকারের ,কিন্তু সরকার কি আজ সকল নাগরিককে তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং ভোগের সমান সুযোগ দিচ্ছে ? নাকি তাদের অনুগত আঞ্চলিক কতিপয় দুর্বৃত্তকে লালন পালন করছে ? ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মাধ্যমে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব শূন্য করে দেয়া হয় যা আজও পূরণ হয়নি বরং আজ আমরা অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়েছি। ১৯৯০ সালে এদেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল দেশের গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ,কিন্তু ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ এর পরাজয় ,সূক্ষ্ম কারচুপির অভিযোগে সংসদ বর্জনের নতুন ইতিহাস, যা আজও চলমান।

১৯৮৪-৮৫ শিক্ষা বর্ষে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েছিলাম তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের রাষ্ট্র ক্ষমতার আমলে । সেশন জট এবং আবাসিক হলের অছাত্রদের দাপট মাথায় নিয়ে ছাত্র জীবন শুরু করলাম। সেই সময়ে ঐ হলের বাস্তবতা আর আজকে এই সময়ে আমাদের দেশের বাস্তবতার পার্থক্য শুধু আকারগত । হল ছোট একটি গণ্ডি আর দেশ আয়তনে বড়। শাসক এবং তাদের নীতি নৈতিকতা এবং প্রত্যাশা একই ।আমার আবাসিক হলের প্রথম জীবনে ছিলাম ছাত্র ইউনিয়নের সমর্থক এবং পরে হল শাখার প্রচার সম্পাদক (১৯৮৬-১৯৮৭ ডিসেম্বর)। সেই সময়ে হলের আধিপত্য বিদ্যমান ছিল মুজিববাদ ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের, একটি গোপালগঞ্জ অন্যটি বরিশালের; ঠিক তেমনি আজ আমাদের দেশে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপির আধিপত্য। দুই গ্রুপেই নেতৃত্বে ছিল আঞ্চলিক অছাত্র এবং তাদের লক্ষ্য ছিল হলের ডাইনিং কেন্টিনে ফাও /ফ্রি খাওয়া এবং হলের আবাসিক সিটে ছাত্র না রেখে নীলক্ষেত এলাকার কম আয়ের কর্মজীবীদের কাছে সীট ভাড়া দিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলের চেষ্টা ,যেমনটা আজ আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি তাদের কতিপয় আত্মীয় স্বজন এবং আঞ্চলিক লোকদের নিয়ে দেশের ক্ষমতা ব্যবহার করছে। সেদিন যারা হলে তাদের দুগ্রুপের এসকল কাজের সমালোচনা করত তাদের আবাসিক হলের সীট হারাতে হত, এমনকি শারীরিক ভাবেও লাঞ্ছিত হয়েছেন অনেক ভিন্ন সংগঠনের নেতা কর্মী। ফাও খাওয়ার বিরুদ্ধে কথা বলায় আমাকেও হারাতে হয়েছিল অছাত্র মোহম্মদ আলীর দ্বারা ১৫৭ নম্বরের বরাদ্দ পাওয়া আবাসিক সিট । আবাসিক সিট হারিয়ে সেদিন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলাম এসকল অছাত্রদের হল এবং দল থেকে তাড়ানোর এবং তা পেরেছিলাম ১৯৯২ সালের ২৭ মে তারিখে। সিট হারিয়ে হল ছাড়িনি দল ছেড়েছি,কেননা ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ আমার হারানো সিটের প্রতিবাদ পর্যন্ত করেনি হলের বাকি কর্মী সমর্থকদের নিরাপত্তার অজুহাতে। তাই অস্তিত্ব না থাকলে আদর্শের প্রয়োজন থাকে না -সেই ভাবনায় যোগ দিলাম সেই অছাত্র নেতৃত্ব নির্ভর ছাত্রলীগে এবং অবস্থান নিলাম গোপালগঞ্জ গ্রুপের সাথে । সে সময়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা শ্রদ্ধেয় সুলতান মোঃ মনসুর আহম্মদ,আব্দুর রহমান,এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে, হলে নেতৃত্বে ছিলেন মোল্লা মোঃ আবু কাউসার, মরহুম শহিদুল ইসলাম চুন্নু ভাই। কিন্তু হলের আবাসিক অবস্থানে আধিপত্য ছিল অছাত্র হাসমত কাইউম এর উত্তরসূরি মোহম্মদ আলীর। তাঁর ইচ্ছা অনিচ্ছাই ছিল আভ্যন্তরীণ আইন-কানুন, এমনকি প্রাধ্যক্ষ,আবাসিক শিক্ষক,কর্মচারী এমনকি ছাত্রদেরও তা মেনেই থাকতে হত। ছাত্রলীগে যোগদান করে সেই অছাত্র মোহম্মদ আলীর সাথেই গড়ে তুললাম সম্পর্ক এবং বেছে নিলাম অপ-রাজনীতির অন্ধকার অংশের দায়িত্ব; উদ্দেশ্য ছাত্রদের হলের আভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব ছাত্রদের হাতে পৌছে দেয়া। তারই অংশ হিসেবে ১৯৮৮-৮৯ শিক্ষাবর্ষে হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সমাজ সেবা সম্পাদক এবং ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হলাম বিপুল ভোটের ব্যবধানে। ১৯৮৮-৮৯ শিক্ষাবর্ষে হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে গোপাল গঞ্জ এবং বরিশালের প্রাধান্যে অর্থাৎ ভিপি গোপালগঞ্জ ( চুন্নু ) জিএস বরিশাল (রাজা) (তিনটি সম্পাদক আমাদের নব গঠিত থার্ড- ওয়ার্ল্ডের পেলাম ) প্যানেলেই হল ।

কিন্তু ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনে হলের আসনে গোপাল গঞ্জ এবং বরিশালের প্রাধান্য হল না,আমাকে জিএস মনোনয়ন দিতে হবে এমন বাস্তবতায় আমাদের থার্ড ওয়ার্ল্ডের আমার পাশের জেলার (গাজীপুর) জুয়েল ভাইকে দলীয় মনোনয়ন ঘোষণা করলেও থার্ড ওয়ার্ল্ডের ভোটের বাস্তবতায় দলীয়ভাবে আমাকেই নির্বাচন করতে দেয়া হয় এবং মনজুরুল আলম টোকন- মাসুম আহম্মেদ প্যানেলে নির্বাচনে আমি আমার সাথে থাকা গোপালগঞ্জ এবং বরিশালের প্রার্থীদের চেয়ে অনেক বেশী ব্যবধানে নির্বাচিত হই ।

প্রথম নির্বাচন (১৯৮৮-৮৯) হলের স্ব স্ব হওয়াতে খাবারের দিকে মানে ডাইনিং ক্যান্টিন দেখার অফিসিয়াল ভার পেলাম আমি এবং সুযোগ আসল ছাত্র রাজনীতির নামে হল গুলোর খাবারের দিকে কি হয় এবং এর প্রতিকারে সরাসরি ভুমিকা রাখার । নির্বাচনের ফলাফল পেয়ে মনে নতুন করে দায়িত্ব বোধ জাগ,আর তখনই আবার সাধারন ছাত্রদের কাছে কাজের বা দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা চাইলাম, পেলামও। অল্প সময়ে অছাত্র ছাড়া ছাত্র এবং রাজনীতি/আঞ্চলিকতা ইত্যাদির অজুহাতে ফাও খাওয়ার চিত্র হাতে পেলাম,ভিপি -জিএস এবং হল প্রাধ্যক্ষ (পিতৃতুল্য অধ্যাপক আবুল মনসুর মোঃ আবু মুসা) স্যারের সাথে আলাদা এবং একত্রে আলাপ আলোচনা করে এবং মোল্লা মোঃ আবু কাউসার ভাইকে জিজ্ঞেস করে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে হলের খাবারের মান পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেদিন একটি পুঁজি ছিল আমার, তা ছিল- হলের সকল জেলার ভাল ছাত্ররা,তারা আমার পাশে থেকে আমাকে সহযোগিতা করেছিল।ডাইনিং এ খাবারের মান উন্নয়নের ফল পরের নির্বাচনে ছাত্ররা আমাকে বিপুল ভোটের মাধ্যমে দিয়েছে।

দেশে তখন শুরু হল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। আন্দোলন এতটা জমতো না/সংগঠিত হত না যদি তৎকালীন স্বৈরাচার খ্যাত এরশাদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে তাঁর দলীয় বিবেচনায় অযোগ্যদের নিয়োগ না দিত এবং ঘন ঘন এরশাদ ভ্যাকেশন না দিত। সেই সময় থেকে দুষ্টের পালন শুরুর মাধ্যমে দুর্নীতির জাতীয়করণের সুচনা হয় যা আজ দুই বড় দলের পালাবদলের গণতন্ত্রের আমলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। তা হলে আমরা জনগণ কি চেয়েছিলাম? এরশাদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার জন্য পালাবদলের গণতান্ত্রিক সরকারের স্বৈরাচারিতা? নাকি যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাপ্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেয়ার মত সরকারী বিধি ব্যবস্থা পরিচালনা করার ব্যবস্থা, যা আমাদের আজও হয়নি? সেই আন্দোলনে আমিও অংশ নিয়েছিলাম, কেন নিয়েছিলাম? আজকের এই লুটপাট আর দুর্নীতিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাইয়ে দেয়ার জন্য? -না; শিক্ষাকে দলীয় করণ, বানিজ্যিক করণের জন্য? -না; শিক্ষা এবং চিকিৎসাকে ধনীর কেনা পণ্যে পরিণত করার জন্য? -না; বাড়ির দাড়োয়ান, গাড়ীর ড্রাইভার,পিএস -এপিএসদের ভাগ্য বদলানোর জন্য? -না; ১৯৯০ সালে যে স্বৈরাচারকে বিদাই দেয়া হল ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনসহ সর্বত্র তৎকালীন বিএনপি দ্বারা স্বৈরাচারের সহযোগীদের একটি বড় অংশ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়ে যায়। এমনকি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মীকে করা হলো রাজনৈতিক সচিব, অথচ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব ছিলেন ডাকসুর ভিপি জননেতা তোফায়েল আহমেদ। তারপর থেকে ক্ষমতাকেই বেশী আপন ভেবে নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে আওয়ামী লীগও পতিত স্বৈরাচারের কিছু দোসরকে রাজনীতি এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয় এবং পুণরায় ক্ষমতা প্রাপ্তির জন্য রাজপথের সহকর্মী ১৪ দলীয় জোটভুক্ত ছোট দলের নেতা কর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে ১৯৯০ এ জনগণ কর্তৃক বিতারিত স্বৈরাচার খ্যাত এরশাদকে সাথে নিয়ে আজকের আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়। এখানেও আমাদের প্রত্যাশা পূরনের চেয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলের মহোৎসব চলছে,যা আমাদের প্রত্যাশা না। আজকে সরকারী এমন কোন প্রতিষ্ঠান নাই যেখানে ঘুষ নাই; কেন এমন হবে? তাহলে সরকার কোথায়? তাঁর উপস্থিতি আমরা দেখি রেল মন্ত্রী সুরঞ্জিত বাবুর এপিএস এবং রেলের দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের রক্ষা করার দায়িত্ব নিতে। একজন জাল সনদধারীকে বানান হয় হাইকোর্টের বিচারপতি, আরেকজন অবসরে যাওয়া আত্মীয়কে সেনাপ্রধান, দেশে যেন যোগ্য লোকের অভাব পড়েছে। রাজধানীর সরকারী কোন একটি প্রতিষ্ঠান নাই যেখানে দলীয়করণের নগ্নতা দেখা যাবে না,এমনকি আঞ্চলিকতার দৃষ্টান্ত আজ হাতের কাছেই পৌঁছে গেছে। গত ২০/২১ বৎসরে রাজধানী ঢাকার সরকারী অফিসগুলো কি অবস্থায় পৌছেছে? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চিত্র কি? দলীয় তাবেদারদের দ্বারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে উচ্চ শিক্ষা আজ মেধাবীর নয় বরং তা টাকায় কেনা পণ্যে পরিণত হয়েছে অথচ শিক্ষা নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। প্রশাসনের উপরের পর্যায় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধিনে কলেজ গুলোতে দলীয় তাবেদারদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দুর্নীতি আর দলীয়করণে নারী শিক্ষার বড় প্রতিষ্ঠান ইডেন কলেজ আজ পতিতা সরবরাহের স্বীকৃতি পেয়েছে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে, যা জাতীয় দৈনিকের আকর্ষণীয় সংবাদ হিসেবে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। তাহলে আমরা কেন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা চেয়েছিলাম, কেনইবা আমরা ১৯৯০ এ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম? কখনো গোপালগঞ্জ-কিশোরগঞ্জ, কখনো নোয়াখালী-বগুড়ার দুই পরিবারের তাবেদারিতে অনুগত গোলাম হবার জন্য আমরা এবং আমাদের পূর্ব পুরুষরা যুদ্ধে যায়নি। তাই আজ এই দুই দল এবং দুই পরিবারের অযোগ্য উত্তরাধিকারীদের হাত থেকে আমাদের স্বীকৃত অধিকার আদায়ের জন্য একটি বিকল্প সরকার মানে আমাদের জনগণের সরকার, যার নাম তৃতীয় শক্তির সরকার দরকার বলে মনে করি। আর নয় ভারত-পাকিস্তানের দালালি। আমরা স্বাধীন জাতি আমরা বাঙালি; জনতার জয় অনিবার্য ।

মোঃ মাসুম আহম্মেদ
এল এল এম (১ম বর্ষ),
ওয়ার্লড ইউনিভারসিটি অব বাংলাদেশ।
সাবেক জি এস, জহুরুল হক হল ছাত্র সংসদ ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।