ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

১৯৮২ সালের ২৪সে মার্চ দুর্নীতি সন্ত্রাস অনিয়মের অভিযোগে বিচারপতি ছাত্তার সরকারকে বিদায় করে এদেশের ক্ষমতা গ্রহণ করেন সামরিক বাহিনী প্রধান হোসেন মোঃ এরশাদ। যুব প্রতিমন্ত্রী কাসেম সাহেবের বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয় তৎকালীন সরকারের পৃষ্ঠ পোষকতায় থাকা সন্ত্রাসী ইমদু, গালকাটা কামাল সহ অনেক সন্ত্রাসীদের। এদেশের জনগণ তখন কিছুটা সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দেশে সুশাসন আসবে ভেবে এবং দেশের জনগণের একটি বড় অংশ সামরিক সরকারের তৎকালীন কর্মকাণ্ডে খুশিও হয় এবং সমর্থন করে। কিন্তু সেই বাস্তবতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, ক্ষমতায় স্থায়ী হতে এরশাদ গ্রেফতারকৃতদের একটি অংশকে সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি দিয়ে রাজনীতির মাঠে পুনঃর্বাসন করে; তখন থেকেই রাজনীতিতে সন্ত্রাস ক্রমেই হয়ে উঠে এক নিয়ামক শক্তি। তখন থেকেই জনগণ সতর্ক হতে শুরু করে এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এবং দানা বাঁধে ক্ষোভের। দেশে তখন প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ ছাড়াও বঙ্গবন্ধুহীন আওয়ামী লীগ, জিয়াহীন বিএনপি অসংগঠিত রাজনৈতিক দল এবং দল দুটির উত্তরাধিকারী নেতৃত্বে শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদ ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে ততোদিনে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল স্তরে সমাজের চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের পুনঃর্বাসনে ব্যাস্ত। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড গুলোতে সন্ত্রাসীদের করা হয় কমিশনার এবং প্রশাসন হয় তাদের তাবেদার। রাজনীতি এবং সমাজ হয়ে পড়ে সন্ত্রাসীদের উপর একপ্রকার নির্ভরশীল। এরশাদ ক্ষমতায় থাকতে সন্ত্রাসী ছাড়াও দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী এবং আমলাদের প্রশ্রয় দিতে শুরু করলে জনগণের মধ্যে তাঁর (এরশাদ) সরকারের সমর্থন কমতে শুরু করে এবং সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রের শাসনের দিকে যেতে জন-আকাংখা বাড়তে থাকে।

দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক শাসনের প্রত্যাশা বাড়তে থাকায় এরশাদ প্রথমে ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি দেয় এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার প্রস্তুতি নেয় যেখানে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ১৫০ -১৫০ আসনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিল দল গুলো যাতে স্বৈরাচার খ্যাত এরশাদের বিদায় হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি অংশ না নিয়ে বরং আওয়ামী লীগকে স্বৈরাচারের সাথে আঁতাতের অভিযোগ আনে ১৯৮৬ সালে। আওয়ামী লীগ সেই নির্বাচনে ৮ (আট) দলীয় জোটের মাধ্যমে অংশ নিলেও তেমন ভাল ফলাফল করতে পারেনি বরং এই নির্বাচনের মাধ্যমে স্বৈরাচার খ্যাত এরশাদের বৈধতা মিলে গণতান্ত্রিক সরকারের এবং একটি রাবার স্ট্যাম্প সংসদের জন্ম হয়, যদিও দেশে তখন রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন চলছিল। সেই সংসদেই এরশাদ ৩০ জন মহিলা সদস্য মনোনয়ন দেয় যা ৩০ সেট অলংকার হিসেবে খ্যাত। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মহিলা আসনে যাদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল তাদের রাজনৈতিক কোন যোগ্যতার চেয়ে এরশাদের মনোরঞ্জনের মাধ্যমে প্রাপ্তি ঘটার কথা ছিল প্রচলিত এবং তাদের (মহিলা সংসদ সদস্য) বিরুদ্ধে সচিবালয় সহ সরকারী প্রশাসনে অনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের অভিযোগও ছিল এমনকি রাজনীতিতে নারী এবং যৌনতার মিশ্রণও তখন থেকেই শুরু যা আজ মহামারী আকারে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সামরিক স্বৈরাচারী এরশাদ আমলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবহারে রাষ্ট্রীয় কর্মচারীকে দলীয় ব্যক্তিগত কর্মচারীতে পরিণত করার কাজটি শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ২০,০০০/- (বিশ হাজার) টাকায় প্রকাশ্য ঘুষের মাধ্যমে (এরশাদ অনুগত একদল শিক্ষক নামধারী সমিতির নেতা কতৃক) এস এস সি/সমান পাশ সনদের মেয়ে/নারিদের ঢালাও নিয়োগেড; ব্যাখা ছিল নারীর কর্ম সংস্থান। নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে ঠিকই কিন্তু আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার কি হয়েছে? সেই থেকে আজ আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয়করন আত্মীয়করণ আঞ্চলিকতা করণ হয়ে এর কু-প্রভাব বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখছি। তাহলে আমরা সেদিন কি চেয়েছিলাম? কোন শাসন আর কোন গণতন্ত্র? আমরা ক্ষমতায় ব্যক্তি/দল নাকি দেশ পরিচালনায় নীতির বদল চেয়েছিলাম? ১৯৯০ সালে আমরা ক্ষমতায় ব্যক্তি/দলের বা রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রপতি/ সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়ত চেয়েছিলাম, কিন্তু কেন? কারণ যোগ্য লোকের/নাগরিকের যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মান এবং কর্ম পাবে এই আশায়। কিন্তু এখন দেশে কি ঘটছে? পছন্দের তাবেদারকে নিয়োগ দেয় চুক্তি ভিত্তিক আর অপছন্দেরকে দেয় বাধ্যতামূলক অবসর এতে আমাদের মেধাবীরা হচ্ছেন বঞ্চিত সম্মানিতরা হচ্ছেন অপমানিত। দেশ পরিচালনার প্রধান অংশ বিচার বিভাগও আজ আস্থা সংকটের দিকে যাচ্ছে, পুলিশ আজ দলীয় থেকে আত্মিয়তা ছেড়ে আঞ্চলিকতা নির্ভরে পৌঁছে যাচ্ছে, যা একটি স্বাধীন দেশের নিয়মিত বাহিনীর জন্য তো নয়ই, আমাদের জন্যও চরম ক্ষতিকর। আজ এ দেশে, অভিভাবক তুল্য বুদ্ধিজীবীগন দলীয় আনুগত্যতার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এক নেতৃর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী রাজনৈতিক সচিব ছাড়িয়ে দেশের উল্ল্যেখযোগ্য শিল্পপতি; অন্যজনের বাড়ির নিরাপত্তা কর্মী আগামী সংসদে নিজ এলাকার দলীয় প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাহলে আমরা কি চেয়েছিলাম/এখন কি চাই তা ভাবনার সময় এসেছে। কেননা তারা ক্ষমতাকেই শুধু ভালবাসে, জনগণকে না; তাই তারা কেউ নিজে ধর্ম নিরপেক্ষ হয়েও রাষ্ট্র ধর্মকে বদলায়নি; অন্য-জন তো ক্ষমতায় থেকে ইসলামী জঙ্গিবাদের জন্মই দিলেন; এছাড়াও আমরা যাদের স্বৈরাচার ও রাজাকার বলে প্রত্যাখান করি- ক্ষমতার জন্য তারা তাদের পুনর্বাসন করছে। তারা দুই দল (আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ) দেশটাকে আজ নিজেদের উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত সম্পত্তি মনে করে। নয়ত শেয়ার মার্কেটে ৩২ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারিদের পুঁজি লুটের বিচার চাইতে হত না; অথচ এ ব্যপারে বিএনপি ও আন্দোলনে যায় না। কেননা তাদের ফালু-কালোরাও দরবেশ সাধুদের সাথে শেয়ার মার্কেট লুটে জড়িত।

আজ আমাদের ভাবনার সময় এসেছে, আমরা কি আমাদের ৬৪ জেলার বাংলাদেশকে কোন বিশেষ এলাকা বা জেলার আর ১৬ কোটি মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছাকে দুই পরিবারের নিকট জিম্মি থাকব আর আমরা থাকব শুধুই আম-জনতা? আজ আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে যেভাবে বিভক্তি এসেছে তাঁর কারণ অনেক কিছুই কিন্তু আমার মনে হয়, প্রধান কারণ আমাদের দেশের দ্বি-দলীয় ক্ষমতার রাজনীতি এবং তাদের দুর্নীতি। দুর্নীতি আজ এক প্রকার জাতীয়করণের বিষয় মাত্র কেননা আমাদের অভিভাবকরা মেয়ে বিয়ে দিতে ছেলের চরিত্রের চেয়ে আর্থিক স্বচ্ছলতার দিকেই বেশী গুরুত্ব দেয়; কলেজ শিক্ষকের চেয়ে পুলিশ প্রাধান্য-দেয়ার মত একধরণের অসুস্থতাও আমরা দেখছি। তাহলে গণতন্ত্র কেন? সংসদীয় সরকার কেন?

আসলে আমাদের বর্তমান গণতন্ত্র আমাদের জনগণের কল্যাণের নয়- শোষণের; তাই দুর্নীতির জাতীয়করণের গণতন্ত্র চাই না, চাই জনগণের কল্যাণের স্বৈরশাসন;
চাই-
দেশপ্রেমিক স্বৈরশাসক….