ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

স্বাধীনতার ৪১/৪২ বৎসর পার হয়েও দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনো এমন অস্থিতিশীল যা সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ড়িয়েছে। স্বাধীন দেশ হওয়া স্বত্তেও কেন এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা? শাসকদের ভুমিকা, জনগণের সচেতনতা ইত্যাদি এর কারণ বলেই অনেকে মনে করেন! কিন্তু শাসকদের মানসিকতা নিয়ে কেঊ তেমন কিছু বলেন না। কারণ ঘুরে ফিরে দুটি দল এবং ঐ দলের নিয়ন্ত্রণকারী দুটি পরিবারই এই ক্ষমতার বলয়কে নিয়ন্ত্রন করছে প্রায় ২২ বৎসর যাবত। তাদের দুই পরিবারের কাছে ক্রমেই বন্দী হয়ে যাচ্ছে আমাদের গণতন্ত্র একদল রাজনৈতিক উচ্ছিষ্ট এবং দুর্নীতিবাজ নষ্ট মানুষদের সহযোগিতায়। যদিও এই দল দুটির মধ্যে অসংখ্য ভাল মানুষ আছেন যারা ব্যক্তিগত জীবনে সৎ, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য, অতীতে দক্ষতা ও যোগ্যতার সাক্ষরও রেখেছেন স্ব স্ব অবস্থানে। কিন্তু আজ দলগুলোতে তাদের অবস্থান নিচের সারিতে; শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রথেকে বহুদূরে! কেন এমন বাস্তবতা। এই বাস্তবতার কারণ অনুসন্ধানে যা দেখা যায় তা হলো- দুই বড় দলের নিয়ন্ত্রণকারী দুই পরিবারের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়া এবং অবস্থান নিশ্চিত করার প্রবল ইচ্ছে। আর সেই ইচ্ছে বাস্তবায়নে যেনতেন প্রক্রিয়া অবলম্বন করা, সৎ, যোগ্য , দক্ষ ও গ্রহণযোগ্যদের পরাজয় ঘটছে অসৎ, অদক্ষ, অগ্রহণযোগ্যদের কাছে কালোটাকা আর মনোনয়ন বানিজ্যের কারণে। ইতিমধ্যেই দেশের আইন প্রণোয়নের মূল কেন্দ্র জাতীয় সংসদে ৬০% ব্যবসায়ী ও অবসরে যাওয়া আমলা, যাদের অনেকেই চাকুরিকালে দুর্নীতি স্বজনপ্রীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সেবার এমন কোন প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে প্রকাশ্য ঘুষ দুর্নীতি নেই! কি পুলিশ, কি বিচারক বা শিক্ষক। যার যেখানে যতটুকু দায়িত্ব সে ততটুকু দুর্নীতিপরায়ণ। দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনকারী আজ সফল মানুষের মর্যাদায় অধিষ্ট। অর্জনই কেবল যোগ্যতায় পরিণত। রাজনীতিতে যেমন সৎ যোগ্যদের অবস্থান পেছনে তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মধ্যেও দলবাজ দুর্নীতিবাজদের পেছনের সারিতেই সৎ, দক্ষ ও যোগ্যদের অবস্থান। এর প্রধান কারণ কি? কিভাবে বা কখন থেকে এই অবস্থার শুরু ? মূলত আমাদের স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যা ছিল পাকিস্থান সরকারের অনুগত ও বিশ্বস্থ এবং পাকিস্থান সরকারের সুবিধাভোগী শ্রেণী, তাদের প্রভাবে সৃষ্ট অনুগত বর্তমান প্রশাসন দেশ চালাচ্ছে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও প্রশাসন যা ছিল তাই শুধু নাম পরিবর্তনের মাধ্যমেই আজকের প্রশাসনে পরিণত হয়েছে এবং তারাই এখন দেশ চালাচ্ছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা আজ এমন এক পর্যায়ে যেখানে নেই কোন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি, নেই সুস্থ ভাবে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা। অপহরণ, খুন ,গুম আজ জনমনে আতঙ্কের অন্যতম বিষয়। স্বাধীনতার ৪১ বৎসর পরেও আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেই কোন উন্নয়ন, একধরনের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু আছে যা প্রতি ৫ বছর অন্তর নির্বাচনের মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ। আমাদের দেশের ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের মধ্যে নেই পারস্পরিক স্রদ্ধাবোধ, নেই সহনশীলতা বা অন্যের মতের প্রতি নুন্যতম শ্রদ্ধা, বিশ্বাস যা গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল কথা। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ- প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতিদমন কমিশন, পিএসসি সহ সকল প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের ফলে নীতি নৈতিকতাহীন দলীয় কর্মীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। যার উদাহরণ আমরা আজ দেখতে পাই- দুর্নীতিদমন কমিশনের কর্মকর্তা যখন গ্রেফতার হয় বিভিন্ন প্রশ্ন জালিয়াতির ঘটনায়; খাদ্য বিভাগের গাড়িতে উদ্ধার হয় কয়েক হাজার বোতল ফেন্সিডিল; ভোলায় কর্মরত একজন জজ যখন নিজের গাড়িতে করে রাজধানিতে ফেন্সিডিল সরবরাহ কালে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হয়; পুলিশ কর্তৃক নারী বিচার প্রার্থী ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটে; পুলিশ সদস্য কর্তৃক অস্ত্র-গুলি বিক্রি হয়।

গত ২০/২১ বৎসরে বাংলাদেশের প্রশাসন সহ সকল স্তরেই নীতি নৈতিকতা হীনদের রাজত্ব চলছে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ সমর্থনে। এমনকি শিক্ষা, চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান ইত্যাদি যা নাগরিকের মৌলিক চাহিদা সেগুলোও আজ বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। সর্বপরি দেশের সকল স্তর আজ পরিণত হয়েছে রাজনিতিকদের বাণিজ্য কেন্দ্রে দেশের মানুষের প্রকৃত অধিকার বাস্তবায়নে তাদের কোন প্রকার মাথা ব্যথা নেই। তাদের একমাত্র চিন্তা-চেতনা কিভাবে নগদ টাকা অর্জনের মাধ্যমে নিজের স্ত্রী-সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা যায়। তারা নির্বাচিত হওয়ার জন্য রীতিমত যুদ্ধ করে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে, কারণ নির্বাচিত হতে পারলে তারা পাঁচ বছরের জন্য নিশ্চিন্তে টাকা তৈরির মেশিনের মালিক হতে পারে। বছরের পর বছর এভাবেই চলছে। আর জনগণও বুঝে বা না বুঝে (দুই দলের বিকল্প না থাকায়) বার বার পালাবদলের মাধ্যমে তাদেরকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে চলেছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত ২২ বৎসরে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে তার ধারাবাহিকতায় চলছে দুর্নীতি, শেয়ার মার্কেট লুট, ডেসটিনি ও হল মার্ক কেলেঙ্কারি তারই দৃষ্টান্ত ।

বর্তমান এই বাস্তবতা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে জনগণকেই দায়িত্ব নিতে হবে , ভোট দিতে হবে বিবেচনায়, মার্কায় নয়- কেননা দুই বড় দলের দুই মার্কা ঘুরে ফিরে গত ২০ বৎসরের গণতন্ত্রে আমাদের জন্য সুশাসন দেয়নি , বরং তারা শাসন ক্ষমতায় অদক্ষ অযোগ্যদের অংশিদারিত্ত নিশ্চিত করেছে –আত্মীয়তা আর আঞ্চলিকতার মাপকাঠিতে যা স্বৈরাচারের আমলেও ছিল না । তাই আজ আমরা যারা জনগণ/ ভোটার তারাই আগামী রাজনৈতিক বাস্তবতা সৃষ্টির মূল ভুমিকা পালন করতে হবে অর্থাৎ সৎ যোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচনে ভোট দিতে হবে –দলীয় মার্কায় ভোট না দিয়ে ।তাই আজ আমাদের আবেগ বাদ দিয়ে বিবেক কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়ন এবং অগ্রগতির জন্য সৎ দক্ষ যোগ্যদের পাশে জনগণকেই দাঁড়াতে হবে- তাহলেই দুই বড় দলের ক্ষমতা কেন্দ্রিক রাজনীতির অবসান ঘটবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে । তাই জনগণের সচেতনতাই কেবল আমাদের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং দেশের উন্নয়ন ঘটাতে পারে।

তাই আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি- কোন উত্তরাধিকার বা দলীয় মার্কা নয়- যোগ্যতাই কেবল সকল অধিকার ভোগের মানদণ্ড।