ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

পার হয়ে গেছে স্বাধীনতার একচল্লিশ বছর । বিগত একচল্লিশ বছরে স্বাধীন বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থায় যারাই ক্ষমতায় এসেছেন, দায়িত্ব নিয়েছেন তারা প্রায় সবাই একই অবস্থা এবং একই চিন্তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে গেছেন । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্বের সময় ছিলেন গণমানুষের কাছের কিন্তু ৭২ পরবর্তী শাসক হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে আত্মীয়তা, আঞ্চলিকতা, চাটুকারীতাময় শাসনাবস্থা । শাসক হিসাবে ব্যর্থতায় স্বপরিবারে জীবন দিতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে । হত্যা পরবর্তী শাসন ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তনের ইতিহাস আমরা কম বেশি জানি। ৭৫ পরবর্তী ক্ষমতার সুবিধাভুগী জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে সকল সুবিধাবাদী শ্রেণীকে সহ যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতার অংশীদার করেও ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নির্মমভাবে নিহত হন এবং বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল রাজনৈতিক চর্চা জন্ম নেয় । যার ধারাবাহিকতায় স্বজনপ্রীতি, দূর্নীতি এবং দলীয় করণের মাধ্যমে আমরা বিশ্বের কাছে একটি অগ্রহণযোগ্য জাতিতে পরিণত হই ,যা থেকে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্খা আজ প্রতিটি নাগরিকের ।

১৯৯০ সালে তৎকালীন ছাত্র, শিক্ষক, জনতা এমনকি পেশাজীবী সহ সকলের অংশগ্রহণে বিদায় নেয় স্বৈরাচার সরকার নামে খ্যাত ‘এরশাদ’। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেদিন যে ছাত্র সমাজ স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছিল যে গণতন্ত্রের আশায় তা হল- ‘তথাকথিত গণতন্ত্র’, ‘আত্মীয় তন্ত্র’, ‘আঞ্চলিকতা তন্ত্র’ এবং স্বৈরাচারের বিভিন্ন পর্যায়ে দোসরদের পুনর্বাসনের একটি নগ্ন প্রক্রিয়া মাত্র । এতে এদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য দু’জন ব্যক্তিকে ‘পুঁজি’ হিসেবে শুধু ব্যবহার করেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বড় দুটি দল বরং দু’টি স্পষ্ট ধারা প্রতিষ্ঠা করা হয় যা আজ আমাদের মানবিক মূল্যবোধকেও দ্বিধা বিভক্ত করে ফেলেছে । তাদের ধারায় অংশগ্রহণ ছাড়া এদেশের কারোই কোন প্রকার মৌলিক অধিকার ভোগের স্বাধীনতা নাই ; তারা জন্ম দিয়েছে দু’টি রাজ পরিবার । এই দু’টি পরিবারের সদস্যদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দু’টি আঞ্চলিকতা এবং কিছু দুর্বৃত্ত ধারার । ৯০ এর আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি আত্মত্যাগ যাঁদের ছিল সেই ছাত্র সমাজের ১০ দফা বাস্তবায়ন করারও নূন্যতম কার্যকর ভূমিকা নেয়নি বিগত ১৯ বছরের গণতান্ত্রিক সরকার । এমনকি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার জন্য নেতা সৃষ্টির কারখানা খ্যাত ডাকসুসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র অধিকারের দাবীও ক্রমান্বয়ে স্তব্ধ করে দেয়, শুরু হয় দুটি দলের ক্ষমতায় আরোহনের হাতিয়ার হিসেবে ছাত্র সমাজকে ব্যবহারের অসম প্রতিযোগিতা । সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীরা তাদের কৃত কর্মের জন্য বিচারের মুখোমুখিও হয়েছে ২০০৮ এ সেনা সমর্থিত অনির্বাচিত সরকারের সময়ে; যা এদেশের প্রতিটি সৎ দেশপ্রেমিক মানুষের কাম্য ছিল ।

এদেশের মানুষ নাগরিক অধিকারের জন্যই স্বাধীনতা দাবী করেছিল কিন্তু তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার নাগরিকদের প্রকৃত অধিকার দেয়ার পরিবর্তে দেশ পরিচালনার স্তম্ভগুলো দলীয় করণই শুধু করেছে। এদেশের গুরুতকপূর্ণ স্তম্ভগুলো হল- ক) বিচার বিভাগ; খ) নির্বাচন বিভাগ; গ) পি এস সি; ঘ) দুর্নীতি দমন কমিশনসহ জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও দলীয়করণের ফলে প্রায় ধ্বংসের মুখোমুখী দাঁড়িয়েছিল ঠিক তখনই সেনা বাহিনী জাতীর পাশে দাঁড়ায়। ১/১১/২০০৭ । বিগত তথাকথিত ১৯ বছরের গণতন্ত্রের শাসনামলে যা ঘটেছে তা হল জাল সার্টিফিকেটের বিতর্ক থাকা আইনজীবীকে বিচারপতি নিয়োগ, অবসরে যাওয়া আত্মীয়কে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে সেনা প্রধান বানানোর মত অনিয়ম যা শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষমতা রক্ষার জন্য করা হয়েছিল । স্বৈরাচারের সহযোগীদেরকেও সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং দুর্নীতিবাজদেরকেও তারা সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে, তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী যা জনগণের কাম্য নয় । এই ১৯ বছরে এদেশের কৃ্ষি নির্ভর উৎপাদন কে ধ্বংস করেছে, অর্থনীতিকে করেছে আমদানী নির্ভর ।ধ্বংশ করা হয়েছে পাট শিল্পসহ নিজেদের উৎপাদন ব্যবস্থাকেও । শিক্ষা ব্যবস্থাসহ ছাত্র সমাজের কোন দাবী পূরণ করা হয়নি বরং ছাত্র সমাজের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য তাদেরকে টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজে পরিণত করেছে গণতান্ত্রিক সরকারগুলো । সুপরিকল্পিতভাবে ডাকসু সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসুস্থ দলীয় লেজুড় বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে যা আগামী দিন দেশ পরিচালনায় দেশপ্রেমিক সৎ সাহসী নেতৃত্ব শূণ্যতা সৃষ্টি ছাড়া কিছুই দেবে না দেশ ও জাতিকে । শিক্ষা ব্যবস্থাকেও তারা বাণিজ্যিকিকরণের মাধ্যমে পণ্যে রূপান্তর করেছে, যা ছিল অধিকার। দলীয় বিবেচনায় অনুগতদেরকে দিয়ে কোচিং সেন্টার, বেসরকারী ইংরেজী স্কুল প্রতিষ্ঠাও তাদের ভুল নীতির ফল । দলীয় নিয়োগদানের মাধ্যমে শিক্ষাঙ্গন এবং প্রশাসনকে মেধাহীন করা হয়েছে যা কোনভাবেই একটি উন্নত জাতি গঠনের সহায়ক হতে পারেনা । পিএসসি –তে দলীয় তাবেদারকে নিয়োগের ফলে সেখানেও ঘুষ, দূর্নীতি মেধাবীদেরকে করেছে তাদের অধিকার বঞ্চিত । বিচার বিভাগের অবস্থাও একই। আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্র মানে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের অধিকারের নিশ্চয়তা । কিন্তু আজ আমরা যা দেখছি তা ঠিক বিপরীত এই ১৯ বছরের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ।

আমাদের গরীব মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের নামে বিদেশের টাকায় পরিচালিত এনজিও গুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে ১০ ভাগ; এনজিও’র মালিক শাসকগোষ্ঠীর সরাসরি সহযোগিতায় নির্যাতন করছে গরীব মানুষদেরকে ঋণ সহায়তার নামে । মৃত্যু ভয়কে পুঁজি করে যারা ব্যবসা করেন সেই ইন্সুরেন্স কোম্পানীগুলোর দৌরাত্ম্য আজ সীমাহীন হয়েছে অপশাসনের মাধ্যমে । তাই আজ এই অবস্থায় সৎ, সাহসী, মেধাবী দেশপ্রেমিক ছাত্র সমাজের একটি ভূমিকা অপরিহার্য বলে আমি বিশ্বাস করি।

জাতি গঠনে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সরকারের লক্ষ্য । ছাত্র সমাজের ভূমিকা শুধু ছাত্র দাবী অনাদায়ের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ না করে দেশ গঠনে তাদের অংশগ্রহণ জরুরী । তাই ছাত্র সমাজের মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করণ- সমাধানের পথ সৃষ্টি এবং তাদের অংশগ্রহণের পূর্ব শর্ত হিসেবে ছাত্র সমাজের সমস্যা নিয়ে নতুন ধারণার রাজনৈতিক চর্চা ও ছাত্র সমাজকেই শুরু করতে হবে । এজন্য যা করা দরকার তা হল-

১। লেজুড় বৃত্তিক দলীয় অসুস্থ রাজনীতি বন্ধ করণ ।
২।নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে ডাকসু সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান ।
৩। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবাসন সমস্যার সমাধান করণ ।
৪। আবাসিক হলগুলোতে খাবারের মান উন্নয়ন ।
৫। পরিবহন সমস্যার সমাধান করণ ।
৬। ছাত্র থাকা কালীন খণ্ডকালীন চাকুরীর ব্যবস্থা করণ ।
৭। শিক্ষা শেষে কাজ পাওয়ার ব্যবস্থা করণ, অন্যথায় সার্টিফিকেট মর্ডগেজ (বন্ধক) রেখে নূন্যতম ৫০০০০০/- স্বল্পসুদে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করণ ।
৮। দেশকে খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে শিক্ষিত কৃষক শ্রেণী সৃষ্টি করণ ।
৯। কৃষি এবং কৃষকের মর্যাদা বৃদ্ধি করণ ।
১০। শিক্ষা উপকরণ ছাত্রদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনার ব্যবস্থাকরণ ।
১১। অতীতের সকল দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীদের গডফাদার এবং চোরা চালানী সিন্ডিকেট ধ্বংস করণ ।
১২। দাবী আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ভাংচুর, জ্বালাও-পোড়াও থেকে বের হয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের স্বপক্ষে জনমত গঠন ।
১৩। স্ব-স্ব ধর্মীয় মূল্যবোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করণ ।