ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

স্বাধীনতার ৪১ বছর শেষ হয়েছে । এই ৪১ বছরে দেশের জনসংখ্যাসহ অবকাঠামোগত অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে যা আমাদের প্রত্যাশা ছিল কিন্তু সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয় –দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে আশা জনগণ করেছিল তা না হয়ে রাজনীতি থেকে নীতি নৈতিকতা আজ নির্বাসিত । আজ দুর্নীতি রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত প্রায় ।একসময় রাজনীতি ছিল ব্রত, আজ তা হয়ে উঠেছে জীবিকা আর সম্পদ অর্জনের সহজ মাধ্যম । নীতি নৈতিকতা হীন রাজনীতি আমাদের রাজনীতিবিদদেরকে রাজনীতিজীবিতে পরিণত করে চলেছে যা একটি স্বাধীন জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্যের । ১৯৯০ সালে এদেশে স্বৈরাচার খ্যাত এরশাদকে গন আন্দোলনে বিদায় করার পর থেকে ক্রমেই সীমাহীন নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটে চলছে (১৯৯০ এর পূর্বেও যে নীতি-নৈতিকতা ছিল তা বলছি না; তবে জনগণ ৯০ ‘র গন অভ্যুথানের পর প্রত্যাশা করেছিল দেশে গণতান্ত্রিক সরকার নীতি-নৈতিকতা বজায় রেখে সততার সাথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে কিন্তু তা হয়নি)। এর জন্য দায়ী কে ? বিভিন্নজনের বিভিন্ন মত থাকতে পারে ,তবে আমার মতে -এর জন্য দায়ী আমাদের দেশের প্রধান দুই দলের উত্তরাধিকারী নেতৃত্ব এবং ক্ষমতার প্রতি তাদের সীমাহীন মোহ ।তাদের ক্ষমতাকেন্দ্রিক অসুস্থ রাজনীতির কারণে দেশের জঙ্গীবাদ, মৌলবাদ এবং যুদ্ধাপরাধীরা মাথা চাড়া দেবার সুযোগ পায়। এর দ্বারা জাল সনদের বিচারপতি নিয়োগের ঘটনা ছাড়াও প্রতিপক্ষের জনসমাবেশে গ্রেনেড হামলার মত জঘন্য ঘটনাও ঘটে। এসব অসুস্থ রাজনীতির ধারাবাহিকতা। তাদের ক্ষমতার মোহ তাদেরকে বিবেক শূন্য করে দিয়েছে এবং তাদের ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে তাঁরা অসৎ , অদক্ষ্য ,অযোগ্য চাটুকারদের অনুগত বাহিনী গড়ে তুলতে সদা সচেষ্ট আর সেকারণে আজ সর্বত্র সীমাহীন দুর্নীতির এই ছড়াছড়ি আমরা দেখতে পাচ্ছি ।শুধু তাই নয়, এদের ক্ষমতা লিপ্সার কারণে শিক্ষা আজ পণ্যে পরিণত হয়েছে; আর এই পণ্যকে বিণিজ্যিকিকরণ করা হচ্ছে ভর্তি বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, সার্টিফিকেট বানিজ্যের মাধ্যমে এবং ছাত্রনেতাদের টেন্ডারবাজ চাঁদা বাজে পরিণত করে ।

৯০ পূর্ব রাজনীতিতে নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রয়োজন হত ব্যক্তিগত সততা ,মেধা ,সাংগঠনিক দক্ষতা ইত্যাদি আর আজ নেতৃত্ব নির্বাচনে চাটুকারিতা ,আত্মীয়তা ,আঞ্চলিকতা ,আনুগত্যতা ইত্যাদির প্রাধান্য বই আর কিছু নেই। অতীতে যেখানে ছিল সততা -সেখানে আনুগত্যতা, যেখানে মেধা -সেখানে স্থান পেয়েছে চাটুকারিতা ,যেখানে সাংগঠনিক দক্ষতা সেখানে স্থান পাচ্ছে আত্মীয়তা বা আঞ্চলিকতা এবং এভাবেই সৎ- মেধাবী ,দক্ষ ,যোগ্যরা হয়েছে বঞ্চিত আর নীতি নৈতিকতা হয়েছে নির্বাসিত । আজ এমন কোন সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠান নাই যেখানে ঘুষ ছাড়া নাগরিক তার যথাযথ সেবা পাচ্ছে; এর প্রধান কারণও একই ।ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতায় যাবার প্রত্যাশী বড় দল দু’টি রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানকে দলীয় অনুগত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে চলছে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংশ্লিষ্টতায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা আজ মালিক মনে করে নিজেদেরকে ।আজ আমরা এমন এক বাস্তবতায় -যেখানে দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ বিএনপির অনুগত না হলে মৌলিক অধিকার ভোগের সুযোগ পর্যন্ত নাই । দলীয় করনের ফলে আজ সমাজ ব্যবস্থার মধ্যেই শুধু পরিবর্তন আসেনি ,এসেছে পারিবারিক ব্যবস্থায়ও ব্যাপক পরিবর্তন । দাদা -নাতি বাস করা অতীতের যৌথ পরিবার ক্রমেই শূন্যের কোঠায় ,সামাজিক বন্ধন এবং দায়িত্ব বোধ ও আজ নেই বললেই চলে ।এর অনেক কারণ আছে কিন্তু প্রথম এবং প্রধান কারণ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বা অযোগ্য নেতৃত্বের এই গণতান্ত্রিক শাসন বলেই আমার ধারনা । কেননা তাদের দ্বারা দেশের জনগণের মধ্যে বিভক্তি এসে গেছে যা কোনভাবেই একটি সার্বভৌম দেশের জন্য কল্যাণের হতে পারে না বরং সার্বভৌমত্ব নষ্টই হতে পারে । আজ বড় দুটি দল দেশের জনগণকে ভরসা করে না যতটা করে ভারত পাকিস্তান কে ।

১৯৯০ সালে এদেশের জনগণ সুশাসন সামাজিক ন্যায় বিচার সহ মৌলিক ও নাগরিক অধিকারের জন্য স্বৈরাচারের পতনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারই কেবল পেয়েছে ,পায়নি আকাংখার বাস্তবায়ন ,বরং যেটি ঘটেছে তা হল পতিত স্বৈরাচারের দোসর এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্ষমতার অংশীদার এবং রাজনীতির মাধ্যমে (পুঁজিহীন ব্যবসা) ধনী হবার পথ । ১৯৯০ পরবর্তী বাড়িতে ঘর না থাকা ডাকসুর ভিপি-জিএস আমান – খোকন সহ আলম, মিলন্, অসীম কুমার উকিল , সফি আহমদরা সহজে টাকার মালিক হবার মডেলে পরিণত হয়, যা আমাদের ছাত্র সমাজকে করেছে বিপথ গামী । দল গুলোতে এখন আর কোন আদর্শের বালাই নাই আছে উপরের নেতৃত্বের বন্দনা । কয়েকদিন আগে একটি দৈনিক পত্রিকায় একজন কলামিস্টের লেখায় পড়েছিলাম- ” দিনে দিনে রাজনীতি যখন আদর্শ ও দর্শনহীন হয়ে নিছক ক্ষমতা অর্জনের বাহনমাত্র হয়ে পড়ে, তাতে রাজনীতিবিদদের বাস্তব ও কূটবুদ্ধির পরিচয় হয়তো পাওয়া যায়; কিন্তু প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, মহত্ত্ব কিংবা অন্যান্য উচ্চতর মানবিক গুণাবলির প্রয়োজন পড়ে না । এভাবে আজ রাজনীতি কোনো উচ্চ ভাব, আদর্শ বা দর্শনকে ধারণ করছে না, কেবল ক্ষমতাকে ঘিরে ক্ষুদ্র স্থূল লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়া হয়ে পড়েছে। ফলে রাজনীতিতে ভিড় বাড়ছে ব্যবসায়ী ও অন্যান্য উচ্চাভিলাষী ভাগ্যান্বেষণের; হারিয়ে যাচ্ছেন উচ্চ আদর্শ ও চিন্তার মানুষজন “। এভাবেই জন্ম নিয়েছে কবরের বাঁশ বিক্রেতা থেকে শিল্পপতি ফালু , অছাত্র হয়েও ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি পিন্টু , আত্মীয়তার কারণে অবসরে যাওয়া চাকুরে পেয়েছিল সেনা প্রধানের দায়িত্ব । আর আমদের ত্যাগী সৎ মেধাবী মানুষগুলো ক্রমান্বয়ে ছিটকে পড়েছে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক দায়িত্ব থেকে ; সর্বোপরি রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হয়েছে নীতি- নৈতিকতা, সততা ও দেশপ্রেম ।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া স্বত্তেও সরকারের অপকর্মের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করলে দেশদ্রোহিতার মামলায় পড়তে হয় কিংবা হাইকোর্টের রুল জারির মাধ্যমে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয় । একে গণতন্ত্র না বলে মানুষের বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলা বাঞ্ছনীয় । সীমান্ত থেকে বেড রুম পর্যন্ত অবাধে চলছে হত্যা, গুম, গুপ্ত হত্যা, প্রকাশ্য হত্যার মত ঘটনা । পুলিশ, র্যাব জনগণের সেবার বদলে জনগণকে অত্যাচার করছে; যা কে ইচ্ছে তা কে রাস্তায় ফেলে বেধরক পেটানো, আদালত চত্তরে লাঞ্ছনা, সুযোগ পেয়ে ধর্ষণ, সাংবাদিক নির্যাতন কিংবা বিনা বিচারে বেআইনিভাবে ক্রস ফায়ারে দেওয়া হলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না । সরকার কেন নিশ্চুপ ? মানুষের নিরাপত্তা কোথায় ? দেশকে গোপন চুক্তির মাধ্যমে বিদেশী রাষ্ট্রের তাবেদার বানাতেও এদের বাঁধে না । আর যারাই বিরোধী দলে থাকে তারাও জনগণের কথা কখনই ভাবে না , যখন-তখন তারা নিজেদের স্বার্থে হরতালের ঘোষণা দিয়ে দেশের অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে অরাজকতার জন্ম দিচ্ছে । অতএব সরকার বা বিরোধী দল কেউই সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করে না তা পুরোপুরি স্পষ্ট । আজ আমাদের ভাবতে হবে আমরা কি এসব ক্ষমতা লোভী, স্বার্থপর পালাবদল আর দলবদলের রাজনীতিকে সমর্থন করব নাকি খোঁজ করব তাদের ,যারা নিজের এবং দলের কর্মী সমর্থকদের ভাগ্য বদলের চিন্তায় থাকবে না বরং দেশ ও দেশের জনগণের ভাগ্য বদলে নিজেদের নিয়োগ করবে ।

পৃথিবী জুড়ে রাজনীতির ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় তরূণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ ছিল সবচেয়ে বেশি । কারণ তরুণ বা নবীনেরা সতেজ চিন্তাশক্তির বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে দেশ তথা জাতির মঙ্গলের চিন্তা করে নিঃস্বার্থভাবে যা অনেক পূর্ণ বয়সী রাজনৈতিকের মধ্যে অনুপস্থিত । সময়টা এখন সেরকম পর্যায়েই- চারপাশে অরাজকতা; রাজনৈতিক অস্থিরতা; সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মানুষকে ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত । আজকে চারদিকে তাকালে দেখা যায় সব বয়সী মানুষের মধ্য শুধু হাহাকার । না পাওয়ার বেদনায় সবাই অস্থির কেবল নিজের ভাগ্যের পরিবর্নের জন্য । দেশের সকল অস্থিতিশীলতা পরিবর্তনের জন্য কারো কোন খেদ নেই । সবাই সব কিছু রেডিমেড চায় । সবাই মুখে বলে দেশের এই পরিবর্তন আসুক সেই পরিবর্তন আসুক কিন্তু নিজেরা ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসে না । এক প্রকার হাওয়ায় গা ভাসিয়ে চলছে সবাই ।
আমাদের দেশের এই মুহূর্তে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে তা কেবল তরুণ প্রজন্মই নিঃস্বেশ করতে পারে । কারণ তরুণের হাতে সেই শক্তি/মনোবল রয়েছে । কারো মধ্যে সুপ্ত আবার কারো মধ্যে প্রকাশ্য । এই শক্তিকে নষ্ট না করে কাজে লাগানোর জন্য এখনই সময় । কেউ নেই তাদেরকে পথ দেখানোর । এখন তাদেরকেই একত্রিত হয়ে নিজেদের পথ সৃষ্টি করে নিতে হবে । বাংলাদেশে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক আগ্রাসন দূর করতে হলে তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি জরুরী। এই তরুণ/তারুন্যই পারে তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াতে ।

তাই আসুন আমরা যারা এদেশের এবং জনগণের মঙ্গলের কথা ভাবি তারা ঐক্য বদ্ধ হই ,উত্তরাধিকারের রাজনীতির বিরুদ্ধে -যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যেকের প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অসৎ -দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিজীবিদের প্রতিহত করার মিছিলে ।

মোঃ মাসুম আহম্মেদ,
১ম বর্ষ এল এল এম /১৬ তম ব্যাচ,
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ ।