ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

গুড়ের ফোঁটা (কন্যা ও পুত্র সন্তান জন্মদানে কে দায়ীঃ মা, বাবা না-কি ভাগ্য)

সমাজে ঘটিত ও ঘটমান ঘটনা বা ঘটনাবলীকে আমরা বিভিন্ন জন বিভিন্ন আঙ্গিকে দেখি। অনেক সামান্য বা অতি তুচ্ছ ঘটনা থেকেও আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি; যা কিনা আমাদের ভবিষ্যতে পথ চলা বা পা ফেলার জন্য চিন্তার পাথেয় হতে পারে এবং হয়ে ওঠে। অবশ্য সেটা পুরোটাই নির্ভর করে আমরা কোনো ঘটনা বা ঘটনাবলীকে কিভাবে দেখলাম অথবা সেখান থেকে কিছু শিখলাম কিনা তার উপর।

একটা সময় ছিলো আমরাই ছোটবেলায় দেখেছি গ্রামে বিভিন্ন ধরনের জিনিস ফেরি করে বিক্রি হতো। দই, মাঠা, মাটির হাঁড়ি পাতিল, এলুমিনিয়ামের হাঁড়ি পাতিল, মাটির খেলনা, আইসক্রিম, মেয়েদের স্নো পাউডার, চুড়ি ফিতা ইত্যাদি। এখনো অনেক রকম ফেরিওয়ালাই মাঝে মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। শুধু ফেরি করার ধরন ও সামগ্রী দিনে দিনে অনেকটাই পালটে গেছে। আমরা ছোটবেলায় দেখতাম অনেক কিছুই মৌসুমী ফসলের বিনিময়ে বিকোতো বা বিক্রি হতো। আমরাই ছোটবেলায় পেঁয়াজ রসুন এর বিনিময়ে আইসক্রিম কিনে খেতাম। যদিও আক্ষরিক অর্থে সেগুলো ইদানীংকার আইসক্রিমের মতো সত্যিকার অর্থে আইসক্রিম ছিলো না (ইগলু বা পোলার এর মতো নয় আরকি)। সেগুলো আসলে ছিলো বাঁশের কাঠি ওয়ালা এবং সেকারিন দেওয়া বরফের খন্ড। সেগুলোই আমরা লোভনীয় জিনিস হিসেবে বেশ মজা করে খেতাম। কিছু ছিলো লাল আর কিছু ছিলো সাদা। সাদা গুলোকে আমরা বলতাম দুধ মালাই। তারপর দিনের পালা বদলে দেখলাম ফসলের বদলে সেগুলোর বিনিময় বা বেচা কেনা মুদ্রা বা কয়েনে চলে এলো। পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা আর পঁচিশ পয়সা কিংবা পঞ্চাশ পয়সার প্রচলন আস্তে আস্তে উঠেই গেলো। এলো এক টাকার সাদা বা রুপালী কয়েন আর সোনালী বা তামার কয়েন। দুটোই সম মূল্যের অর্থাৎ এক টাকার কয়েন হলেও কেউ পছন্দ করতো সাদা বা রুপালী কয়েন আবার কেউ কেউ পছন্দ করতো সোনালী বা তামার কয়েন।  অনেক আগে থেকেই কয়েন মাটির ব্যাংকে জমানোর অভ্যাস অনেকেরই ছিলো। আমরা সেই সময় পূজো পার্বণের মেলা থেকে বেছে বেছে বিভিন্ন আকার ও রঙের মাটির ব্যাংক কিনে আনতাম। মাটির ব্যাংক হিসেবে আম, তাল, নারকেল, পেঁপে, কাঁঠাল ইত্যাদি আমাদের খুব নজর কারতো (যদিও মাটির ব্যাংকের একটা কমন বা চিরাচরিত আকৃতি যে চালু ছিলো সেটাও আমরা প্রায় সবাই দেখেছি)। মাটির ব্যাংকের প্রচলন এখনো আছে (শুধু গ্রামে নয় শহরেও)। মৃৎ শিল্পের শো-পিছ হিসেবে বর্তমানে মাটির ব্যাংকের কদর নাগরিক জীবন বা নগর কেন্দ্রিক জীবনেও কম আকর্ষণীয় নয় মোটেই।

মূল কথায় ফিরে আসি। যে সময়টায় ছেলেমেয়েরা শখ করে মাটির ব্যাংকে রুপালী কিংবা সোনালী কয়েন জমাতো ঠিক সেই রকম সময়ের ছোট্ট একটি ঘটনা। গ্রীষ্মের প্রচন্ড গরমের এক দুপুরে মফস্বল কিংবা কোনো এক গ্রামের ফরিদ মাস্টার শরীর খারাপ লাগায় স্কুল থেকে বেরিয়ে তড়িঘড়ি করে বাড়ী ফিরে এলেন। এসেই বারান্দায় পাতা একটা কাঠের খালি চৌকির উপর মাদুর বা পাটি জাতিয় কিছু না বিছিয়েই সটান করে শুয়ে পড়লেন। মাঠের দিক থেকে আসা খোলা বাতাসে গায়ের ঘাম যখন প্রায় শুকিয়ে এসেছে তখন ফরিদ মাস্টার প্রায় তন্দ্রাচ্ছন্ন। খানিকবাদে তাঁর ছয় সাত বছরের ছোট ছেলেটা খালি গায়ে ও খালি পায়ে ফিতে বাঁধা একটা নীল হাফ প্যান্ট পরা এবং গায়ে ধুলোবালি মাখা অবস্থায় হন্ত-দন্ত হয়ে দৌড়িয়ে ঘরে ঢুকলো। ছেলের পায়ের শব্দে এবং ঘরে ঢোকার সময় দরোজার শেকল খোলার শব্দে ফরিদ মাস্টার পাশ ফিরে তাকালেন। চৌকিতে শুয়ে তিনি খোলা জানালা দিয়ে দেখতে পেলেন ছেলে কাঠের নড়বড়ে টুলটায় দাঁড়িয়ে কাঠের পুরাতন আলমারির উপর থেকে ওর মাটির ব্যাংকটা নামিয়ে মেঝেতে বসে ঝাঁটার কাঠি ব্যাংকের ফুটোয় ঢুকিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কয়েন বের করার চেষ্টা করছে। উৎসুকভাবে ফরিদ মাস্টার দেখতে লাগলেন ছেলের কীর্তি। দেখলেন খুব চেষ্টার পর ও’ একটা সাদা বা রুপালী কয়েন বের করতে পারলো। মনে হলো ছেলে সন্তুষ্ট হয়নি। কারণ তাঁর চিন্তায় মালাই বরফ খাওয়ার জন্য একটা এক টাকার কয়েনই যথেষ্ট; অথচ তিনি দেখলেন ছেলে আবারো কাঠি দিয়ে ব্যাংকের ফুটোয় খোঁচাতে শুরু করেছে। এবং এবারো একটা রুপালী বা সাদা কয়েনই বের হলো। ছেলেটা অসন্তুষ্ট মনে এবার একটা ভোঁতা-মতো ছুরির ডগা ঢুকিয়ে চেষ্টা করতে লাগলো। ফরিদ মাস্টার ছেলেকে এভাবে জমানো টাকা একের পর এক বের করতে দেখে একটু রাগান্বিত ও বিরক্তি বোধ করলেও ধৈর্য সহকারে নিরবে দেখতেই লাগলেন। কিন্তু তিনি বেশীক্ষণ ধৈর্যটা ধরে রাখতে পারলেন না। কারণ একটু পরেই মাটির ব্যাংকটা ভেঙে গেলো এবং বেরিয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লো এক থোকা রুপালী কয়েন এবং সবগুলোই এক টাকা।

ফরিদ মাস্টার বেশ খানিকটা বিরক্তি নিয়ে প্রায় ধমকের সুরে বললেন, সুমন, সবগুলো টাকাই তোমার লাগবে? কি করবে অতো টাকা দিয়ে? ছেলে জবাব দিলো, না আব্বা, লাগবে একটাই কিন্তু মালাই বরফ ওয়ালা তামার কয়েন ছাড়া লাল বরফগুলো দেয়না। তাই আমার একটা তামার বা সোনালী কয়েন চাই। তাই বারবার চেষ্টা করে শেষমেশ ব্যাংকটাই ভেঙে গেলো। কিন্তু একটাও সোনালী কয়েন নাই। ছেলের খুব মন খারাপ দেখে ফরিদ মাস্টার একটু দমে গেলেন (মনে মনে একটু হাসলেনও ছেলের বোকামি দেখে)। তিনি এবার নরম সুরে ছেলেকে কাছে ডেকে বললেন, তুমি যদি নিজে থেকে ব্যাংকে সোনালী কয়েন না ফেলে থাকো তাহলে তুমি হাজার খুঁচিয়ে ব্যাংক ভেঙে ফেললেও সেখান থেকে সোনালী কয়েন বের হবেনা, হবে? ছেলে লজ্জায় না সূচক মাথা নেড়ে মুখ নিচু করে রইলো শুধু। ফরিদ মাস্টার আরো বললেন, লাল মালাই বরফ আর সাদা বরফ দুটোর দামই এক টাকা। আজ না হয় তুমি সাদা বরফই খাও। তখন সে শুধুই একটা রুপালী কয়েন হাতে নিয়ে বাহির আঙিনায় বেরিয়ে গেলো মালাই বরফ কেনার উদ্দেশ্যে।

ঘটনাটা এটুকু বলেই থামছি।  এই ঘটনাটাকে অনেকে বলবেন মফস্বল কিংবা গ্রামের প্রেক্ষাপটে একটা টুকরো গল্প অথবা ছোট্ট একটি ঘটনা মাত্র। কেউ কেউ বলবেন এখানে দু-এক দশক আগেকার একটি বাস্তবানুগ চিত্র ফুটে উঠেছে (হয়তোবা)। গল্পটিতে বরফ ওয়ালা বা যিনি গ্রামে গ্রামে বরফ ফেরি করে বিক্রি করেন তিনি নিছক ছেলে-মেয়েদের ভোলানোর ছলে সম মূল্যের সাদা ও লাল বরফ বাচ্চাদের কাছে যথাক্রমে রুপালী ও সোনালী কয়েনের বিনিময়ে বিক্রি করেন (যেখানে কয়েন দুটোর মূল্যমান সমান অর্থাৎ এক টাকা)। এটা তাঁর একটা বিপণন কৌশলমাত্র। অনেকেই বলবেন ব্যাপারটা সত্যিই হাস্যকর। সত্যিই সমাজের মাঝে বিরাজমান এই রকম বহু হাস্যকর বিষয় আমাদেরকে ধোয়াচ্ছন্ন এবং কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে। মানুষ তো মানুষই; সে পুরুষ কিংবা নারী।  উভয়েই সমানে সমান। রুপালী কয়েন আর সোনালী কয়েনের মতোই শুধুমাত্র বাহ্যিক পার্থক্য থাকতে পারে। মুল্যমানে কেউ কারো চেয়ে কম যেমন নয় বেশীও নয় একরত্তি। বিজ্ঞানের বদৌলতে আজ আমরা সবাই জানি শুধুমাত্র সমান সঙ্খ্যক X অথবা Y ক্রোমোজমের পার্থক্যই হচ্ছে নারী ও পুরুষের মধ্যে একমাত্র ও মৌলিক পার্থক্য। পুরুষের দেহ থেকে নারী-গর্ভে Y ক্রোমোজম যদি না-ই যায় তাহলে নিশ্চিতভাবেই নতুন যে জাইগোট গঠিত হবে তাতো শুধুমাত্র XX বিন্যাসে একজন নারী শিশুরই জন্ম দেবে। সমাজ পুরুষকে প্রাধান্য দিয়ে পুত্র সন্তান লাভের আশায় চেষ্টা চালিয়েই যাবে আর গর্ভধারিণী মাতাও নারী শিশু বা কন্যা সন্তানের জননী একজন নিষ্পাপ মাতা সমাজের চোখে ঘৃণিত ও লাঞ্ছিত হতেই থাকবে। এমনটিই হয়ে চলেছে। এমনকি শিক্ষিত সমাজের মাঝেও। এ কথা পুরুষকে কেউ আঙুল তুলে বলবে না, তুমিই Y ক্রোমোজম দিতে ব্যর্থ হয়েছো! ব্যর্থতা বর্তাবে নারীর ঘাড়েই (কেনো সে পুত্র সন্তান জন্ম দিতে পারলো না)। কেউ সত্য কথাটি উচ্চারণ করবেনা যে, যতক্ষন পর্যন্ত পুরুষের স্খলিত বীর্যে Y ক্রোমোজম থাকবেনা ততোক্ষন পর্যন্ত ওই জননী নারী কন্যা-সন্তানের জন্ম দিতেই থাকবে। একাধিক গর্ভ-ধারণ ও প্রসব জনিত স্বাস্থ্য-হানির কারণে (মূলত পুরুষের ব্যর্থতা অথবা ভাগ্যদোষে) ওই জননীর হয়তোবা অকাল মৃত্যুও হবে একদিন। কিন্তু গল্পের সুমন হয়তো রুপালী কয়েন আর সোনালী কয়েনকে তার জীবনে আর আলাদা করে দেখবেনা। কারণ সে জেনে এবং বুঝে গেছে দুটোর মূল্যমানই সমান (অর্থাৎ এক টাকা)। দুটোই এক টাকার কয়েন।