ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
11667256_10206446232611442_2754681054274317621_n

সম্পাদনাঃ আব্দুল্লাহ আল আরিফ, প্রচ্ছদঃ সব্যসাচী হাজরা, প্রকাশকঃ পলল প্রকাশনী, মূল্যঃ ৪০০ টাকা

 

তরুণ আইনজ্ঞ ও সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল আরিফের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘জুরিস’। সহজবোধ্য বাক্য-বিন্যাসে ঝরঝরা ইংরেজীতে, সুপাঠ্য পেপারব্যাক বাঁধাই এই বইটি পড়ে এর উপযোগিতা সম্পর্কে পাঠককে জানাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। আমারা আশা করি এই বইয়ের মাধ্যমে পাঠক তার রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তরাধিকার নিয়ে আরও জিজ্ঞাসু হয়ে উঠবেন। পাঠকের বোধ বিচারে আরো সূক্ষতা আসবে। মানুষের আইনী জিজ্ঞাসা আছেই, তাদের এই সমস্যা ও এর সমাধানের সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটাবে এই বই।

প্রচলিত রীতির প্রতি শ্রদ্ধা ও শাস্তির সম্পূরক ক্রিয়া আমাদের চিন্তাকে সবসময় নিরুদ্ধ করে রাখে। এই ভয় আর ভক্তির মাঝখানে আইন ভারসাম্য হয়ে টিকে আছে। আমাদের ধর্মসমূহ, সংগঠন, কাল্ট, শাস্ত্র এইগুলোকে আমরা প্রশ্নোর্ধ বলে মানি। ধর্ম, সমাজ, লোকাচারের এই তর্কাতীত অবস্থার মাঝে আইনের পথ তৈরি করা ও তাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর উপযোগী করে তোলা সহজ কাজ নয়। এই কাজটি করার একটি সফল উদ্যোগ হলো জুরিস। পূর্বাপর সমাধানকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে লোকস্বীকৃত প্রকরণে তাকে ব্যাখ্যা করে আমরা অভ্যস্থ। কিন্তু এর বাইরেও চিন্তার বিশাল জগত আছে। জুরিসে লেখকদের মতামতের মধ্যে পাঠকের চিন্তার জায়গা তৈরি হয়েছে। বিবিধ সম্ভাব্য প্রকল্পের উপস্থাপন এবং এই প্রস্তাবের অধ্যবসায়ী পুনর্বিবেচনা আছে এর প্রত্যেকটি প্রবন্ধে।ন্যায়-নীতি, ঔচিত্য-অনৌচিত্য, মূল্যনির্ণায়কের ভিত্তি,উপাত্ত এ সকলই জুরিসের অণ্বেষণে এসেছে। সুবেদী পাঠক এই বইটিকে আরও অর্থান্বিত করে তুলবেন বলে আশা করি।

ক্রমাগত বিকল্পের ভেতর বাছাইয়ের মাধ্যমেই মানুষ তার অভ্যাসকে চরিত্রে ও চরিত্রকে আইনের অনুষঙ্গে পরিণত করে। আব্দুল্লাহ আল আরিফ সম্পাদিত এই বইয়ে যুক্তির সঙ্গে কল্পনা ও সৃজনীর অনুবন্ধ সুস্পষ্ট। আইন এভাবে বিজ্ঞানের জন্ম দেয়। আর বিজ্ঞান কোন চরম সিদ্ধান্ত আকঁড়ে থাকে না। প্রশ্নই আমাদের চৈতন্যকে জরার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। জীবনকে কোনভাবেই এড়ানো যায় না এটা আমরা জানি। তাই আইনের ধারাগুলো আমাদের ব্যক্তিত্বের উৎস ও মৌল স্বাধীনতার সংরক্ষক। আমাদের উদ্বিগ্নতার কারণ হলো অচেনাকে জানতে আমাদের অপরাগতা। আর আইন যাতে শুধু ধারার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে ক্রিয়া হয়ে উঠে এর জন্য প্রয়োজন জনগণকে খুঁটিনাটি আইনগুলো জানানো। সেই দায়িত্বের একটি প্রয়াস হলো জুরিস। তবে আমার মনে হয়েছে এই বইয়ের নিবন্ধগুলো কখনোই চায় না আইন মানুষের মনের ভেতর একটা কাঁচি হয়ে ঢোকুক, যেটা যখন তখন ‘এটা করা উচিৎ’ নয় বলে ঘ্যাচাং করে মানুষের ইচ্ছেগুলোকে ছেঁটে দেবে। সেই মানবিক আহ্বান ও জগতকে মানুষের কাছে সহজ করার প্রত্যয় নিয়ে জুরিসের একেকটি লেখা সত্যি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বইটির ভূমিকায় ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান লিখেছেন, ‘ঢাকা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক আইন পাতায় বিভিন্ন সময় প্রকাশিত কিছু উজ্জ্বল প্রবন্ধ নিয়েই এই বই। আমাদের লক্ষ্য ছিলো সাধারণ মানুষকে আইনী ব্যাপারগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া।’ নারী অধিকার, ব্যবহারিক আইন, আইনী প্রক্রিয়া, নৈতিক শিক্ষা, বাক স্বাধীনতা, সংবিধান, শিশু অধিকার, আইনগত সূক্ষদৃষ্টি,মানব পাচার, অপরাধ ও শাস্তি, বিকল্প বিতর্ক সমাধান, বৌদ্ধিক সম্পত্তি আইন, শ্রমিক ও কর্মসংস্থান, তথ্য আইন, কারা সংস্কার, শরণার্থী, মানবাধিকার ও মানবহিতৈষী আইন, আইনের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক, ভেজাল ঔষধ, খাদ্য নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন, সামুদ্রিক সীমানা, অসৎচিকিৎসা, জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব, পুলিশ সংস্কার, নৃতাত্ত্বিক আদিবাসীর অধিকার, প্রতিবন্ধীর অধিকার, তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার ও বই আলোচনা, মোট ২৯টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমকালীন প্রকরণ নিয়ে বইটি সাজানো হয়েছে। প্রত্যেকটি বিভাগে বাছাইকৃত প্রবন্ধগুলো দেয়া হয়েছে। সৈয়দ রাশেদ ইমাম তন্ময়ের চিত্রণ পুরো বই জুড়ে পাঠকের চোখকে শ্রান্তি দেবে।দেশের এক ঝাঁক তরুণ ও সম্ভবনাময় ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, উন্নয়নকর্মী, গবেষক, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবি ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার লেখা প্রবন্ধগুলো স্পষ্টতই সময়পযোগী। গত দুই শতাব্দী ধরে পৃথিবী জুড়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ‘নারী অধিকার’ দিয়ে শুরু হয়েছে বইটি। ১০টি চমৎকার প্রবন্ধ আছে এই বিষয় নিয়ে। ­­­­­­আমাদের বিকাশের সম্ভাবনা টিকিয়ে রেখেছে নারীমুক্তি আন্দোলন। ইংল্যান্ডে মেয়েদের ভোটাধিকার অর্জন করতে সোয়াশো বছর লেগেছে। এখনো চলছে অনেক দেশে। নারী বিষয়ে আমাদের সমাজ মানস ও অগ্রগতির একটা ছক পাওয়া যাবে এখানে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা নয়, যারা সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ তাদেরও সহায়ক হবে এই বইটি।

রাষ্ট্রের সাথে জনতার সে সম্পর্ক সেটার প্রতি পাঠকের আগ্রহ বাড়াবে জুরিস। বিশেষ করে শ্রমিক, আদিবাসী, মানব পাচার ইত্যাদি বিষয়গুলো সাম্প্রতিকতার নিরিখে আসায় খুবই বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা পাওয়া গেছে এখানে। অপরাধ প্রবৃত্তির সংঘাতের ভেতর দিয়ে মানুষকে ভয় দেখানো সম্ভবত আইনের কাজ নয়। আইনের কাজ এমন এমন সামাজিক অবস্থার সৃষ্টি করা যা রাষ্ট্র নাগরিক ব্যাক্তিত্ত্ব সৃষ্টির স্বপক্ষে কাজ করে। এমনিতে যারা আইনের লোক নন আইনের বই দেখলে তাদের একেকটি শব্দকে একেকটি পাথরের টুকরা মনে হয়। কিন্তু এই বইয়ে একটি সরল ভাষাকাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে যাতে যে কোন ঘরানার পাঠক প্রচলিত আইনের বইয়ের তুলনায় ভিন্ন পাঠ-অভিজ্ঞতা পাবেন বলে আশা করি।ধ্বংস, নীচতা, ঈর্ষা, জীঘাংসা, অন্ধতা যেখানে একদিকে, অন্যদিকে সুস্বাস্থকর আইন। এই বইটিতে জটিলতা নেই, আছে জিজ্ঞাসার যোগ্য প্রশ্নচিহ্ন।

আমার মনে হয় আইনের অনেক ধ্যান ধারণা গ্রহণ করার জন্য মানুষের মন এখনো তৈরি হয়নি। যা কিছু রুক্ষ তার প্রতি মানুষের অনাগ্রহ তৈরি হয়। জুরিসের প্রত্যেকটি লেখায় এসেছে সেই সারল্য ও নাগরিক পাঠককে সঙ্গী করে নেবার চেষ্টা। আইন যাতে শুধু কায়েমী স্বার্থের শাসন ও নাগরিক নিয়ন্ত্রনের উপায় না থেকে এক ধরণের চর্চা হয়ে উঠে সে ব্যাপারে এই বইয়ের সম্পাদক ও তার নির্বাচিত লেখকেরা ছিলেন সচেতন। বইটি পাঠকপ্রিয়তা পাবে বলে আশা করি।

বইটি পাওয়া যাবে শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেট পলল প্রকাশনীতে। অনলাইন পরিবেশক রকমারি ডট কম।