ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

বঙ্গবন্ধু-সমতা-সাম্রাজ্যবাদ

লেখকঃ আবুল বারকাত, প্রচ্ছদঃ সৈয়দ এসরারুল হক সোপান ও আবু তালেব, প্রকাশনীঃ মুক্তবুদ্ধি প্রকাশনা, মূল্যঃ ৩০০ টাকা

মাজহার সরকার

 

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কেবল একাডেমিক ব্যবচ্ছেদ নয়, আবেগের অশিক্ষিত উল্লাস নয়, তাঁকে আত্মস্থ করতে চাই আমাদের যুক্তিমার্জিত স্বভাব। আবুল বারকাতের ‘বঙ্গবন্ধু-সমতা-সাম্রাজ্যবাদ’ বইটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সংস্কারমুক্ত একটি টেক্সট। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাজারে প্রচলিত অনেক শ্লোগাননির্ভর জনরঞ্জক বই থেকে আলাদা এই বই। তিনি পৌঁছেছেন বোধের সামগ্রিকতায়। আমরা যখন কোন বই পড়ি তখন কেবল বই পড়ি না, বইয়ের লেখককেও পড়ি, বইয়ে প্রতিফলিত আমাদের চেহারা পড়ি, সংস্কার ও কাম্যকে পড়ি, আমাদের স্বপ্ন ও সন্ত্রাসকে পড়ি। বই পড়তে গিয়ে এভাবে আমাদের অনেক কিছুই পড়া হয়। আমাদের রাজনৈতিকসংস্কার কীভাবে আমাদের অজ্ঞাতসারে অচলায়তনে পরিণত হয়েছে, ঔপনিবেশিক মুক্তবাজারের জৌলুসে আক্রান্ত রাজনৈতিক কর্মীরা তা বুঝতে পারেন না। অন্ধদের দেশে আয়না আনতে গিয়ে মুজিব আক্রান্ত হবেন এতে আর আশ্চর্য কি! বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে কোথায় পৌঁছতো বাংলাদেশ? এই প্রশ্ন আজ পাটীগণিতের সরলীকরণ নয়, আমাদের স্বপ্নসৌধ, আমাদেরই প্রত্যাশিত গন্তব্য যা আমরা আজ হারিয়ে ফেলেছি।

জীবনানন্দের লাইনটি মনে পড়ছে, ‘সময় নিজেই তবু সবচেয়ে গভীর বিপ্লবী/ ফুরিয়ে ফেলেছে সেই দিনরাত্রি সেরা সত্য-উদঘাটন সবই’। শেখ মুজিবকে আবুল বারকাত দেবতা করেননি, মানুষ হিসেবেই দেখেছেন। কি ছিলো বঙ্গবন্ধুর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী, জীবনদর্শন, রাজনীতিদর্শন, উন্নয়ন ও প্রগতিদর্শন? বঙ্গবন্ধুর ‘বৈষম্যহীন – প্রগতিবাদী – অসাম্প্রদায়িক সমাজ – অর্থনীতি – রাষ্ট্র’ বিনির্মাণ দর্শনের কারণেই সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের এদেশীয় এজেন্টরা ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ‘বেঁচে থাকলে’ আজকের বাংলাদেশের দৃশ্যপট কেমন হতো? কোথায় পৌঁছত বাংলাদেশ? আর সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-প্রভুত্বের আজকের যুগে পৃথিবীর একক কোন দেশে বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন – প্রগতিদর্শন বাস্তবায়ন সম্ভব কি? এসব প্রশ্নের বিশ্লেষণভিত্তিক নির্মোহ উত্তর জানতে এ গ্রন্থটি অবশ্য পাঠ্য।

মূল প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে পরস্পর সম্পর্কিত ও যুক্তি পরস্পরা রক্ষার স্বার্থে গ্রন্থটিকে (প্রথম অধ্যায়ঃ কেনো এই গ্রন্থ? প্রারম্ভিক কিছু কথা’সহ) নিম্নলিখিত মোট আটটি অধ্যায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। অধ্যায়সমূহ যথাক্রমে নিম্নরুপঃ যে ইতিহাস না জানলেই নয় (অধ্যায় ২); দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু কি চেয়েছিলেন, কি ছিলো তাঁর উন্নয়ন-দর্শন? আর হলোটা কি? (অধ্যায় ৩); যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও সমাজে ক্ষয়ক্ষতির ধরণ অনুযায়ী পরিমাণ, মাত্রা ও প্রভাব-অভিঘাতঃ একটি রাজনৈতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ (অধ্যায় ৪); বঙ্গবন্ধুর ১৩১৪ দিনঃ যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি ও সমাজের গথন-পুনঃগঠন, পুনর্বাসন, নির্মাণ পুনঃর্নিমানসহ ‘সোনার বাংলার’ ভিত গঠনে বঙ্গবন্ধু কি করলেন? (অধ্যায় ৫); বঙ্গবন্ধু ‘বেঁচে থাকলে’ আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ কতদূর যেতো? (অধ্যায় ৬); বঙ্গবন্ধুর বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও উন্নয়ন দর্শনের নিরিখে বঙ্গবন্ধু ‘বেঁচে থাকলে’ বাংলাদেশের রুপান্তরিত আরথ-সামাজিক কাঠামোটি কেমন হতে পারতো? উপসংহারিক বক্তব্য (অধ্যায় ৭); এবং সর্বশেষ অষ্টম অধ্যায়ে প্রশ্ন উত্থাপন ও অনুসন্ধান করা হয়েছে যৌক্তিক যে বিষয়টি তা হলো, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব প্রভুত্বের বর্তমান যুগে একক কোন দেশে বইশ্ম্যহিন-প্রগতিবাদী সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব কিনা? অনুসন্ধান করা হয়েছে একই সাথে সম্ভাব্যতা ও অসম্ভবের কারণসমূহ।

অধ্যায় ৭ এর উপসংসারিক বক্তব্যে অধ্যাপক আবুল বারকাত দেখিয়েছেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জীবনটা যথেষ্ট সংক্ষিপ্ত, মাত্র ৫৫ বছরের (১৯২০-১৯৭৫)। তার মধ্যে সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন আনুমানিক ৩৭ বছর- মুক্তিযুদ্ধের আগে প্রায় ৩৩ বছর আর মুক্তিযুদ্ধের পরে (১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত) মাত্র সাড়ে তিন বছর (১৩১৪ দিন)। ১৯৭১ এর মহান মুক্তযুদ্ধপূর্ব সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের ৪০ শতাংশ সময় বঙ্গবন্ধু জেলে জেলে কাটিয়েছেন। আর ৪৮ শতাংশ সময় ব্যয় করেছেন মানুষের সাথে জীবন্ত যোগাযোগ রক্ষা করে সংগঠন গড়ে তোলাসহ মাঠের আন্দোলন সংগ্রামে, ঘুমিয়েছেন মাত্র ১২ শতাংশ সময় (দিনে গড়ে ৩-৩.৫ ঘণ্টা)। কারণ একটিই- তা হলো নিখাদ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ বঙ্গবন্ধু এদেশের মানুষের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) ন্যায্য অধিকার আদায়ের ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে ছিলেন অনড়-অটল-অবিচল বিশ্বস্ত। …’ রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক আবুক বারকাত আমাদের এমন অসংখ্য সত্যের মুখোমুখি করিয়েছেন যার প্রাপ্তিটুকু হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো। আমাদের অভিজ্ঞতার অতীত এমন এক জাগরণকে খুঁজে এনে তিনি আমাদের সামনে রেখেছেন।

আজকাল ভাবাবেগ দিয়ে সাজানো-গোছানো কথাকে সাধারণ মানুষ সন্দেহ করে, কারণ ভিখিরির মুখোশ পরেই ধনীরা অন্যদের শোষণ করেন। যুক্তি ছাড়া বিকল্প প্রগতি নেই। ৭৫ এর কলঙ্কের পরে আমাদের এই ভূখণ্ডে হয়েছে পশ্চিমী শূন্যতার আমদানী, অন্ধ অনুকরণ, আনা হয়েছে উচ্ছিষ্ট প্রযুক্তি, হয়েছে হিগেমনিক বর্গীকরণ। উত্তর-উপনিবেশিক বিশ্বকাঠামোয় ‘বঙ্গবন্ধু-সমতা-সাম্রাজ্যবাদ’ আমাদের সুযোগ করে দেয় নিজেদের নিয়ে নতুন করে ভাববার। আমাদের ভবিষ্যৎহীনতা, অন্ধত্ব, অসহায়ত্বের কারণে ‘ বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে কোথায় পৌঁছত বাংলাদেশ? এই প্রশ্নটিকে করে তুলেছে প্রাসঙ্গিক ও বিজ্ঞানমনস্ক। কারণ এর সমাধান প্রস্তাবে আছে আমাদের করণীয়।

‘বঙ্গবন্ধু-সমতা- সাম্রাজ্যবাদ’ বইয়ের যৌক্তিকতায় অধ্যাপক বারকাত নিজেই বলছেন, ‘‘১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিলো বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মিত হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই লক্ষ্যেই এগুলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৪ বছর যেতে না যেতেই মুক্তি-বিরোধী আন্তরজাতিক-জাতীয় ষড়যন্ত্রকারীরা জাতির পিতাকে হত্যা করলো। হত্যা হলো আমাদের মুক্তির স্বপ্ন; হত্যা হলো বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণ স্বপ্ন; রুদ্ধ হলো মুক্ত-চিন্তার পথ, পুনর্বাসিত হলো রাজাকারতন্ত্র। অর্থনীতি দুর্বৃত্তায়িত হলো। দুর্বৃত্তায়িত হলো রাজনীতি। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদ জেঁকে বসলো। সৃষ্টি হলো অন্যের সম্পদ দখলকারী রেন্ট-সেকারদের এক সর্বশক্তিমান লুটেরা গোষ্ঠী যারা রাষ্ট্র-সরকার-রাজনীতিকে তাদের অধীন সত্তায় রুপান্তরিত করলো। কেন হলো এমনটি? এসব প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর অনুসন্ধানে বোঝা দরকার বঙ্গবন্ধুর জীবনদর্শনের অন্যতম অনুষঙ্গ তাঁর ‘প্রগতশীল উন্নয়ন দর্শন’ , আর সেইসাথে বোঝা দরকার বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজ কোথায় পৌঁছতো বাংলাদেশ। এসব নিয়ে ভাবনা-প্রক্রিয়া যতই এগুতে থাকলো ততই প্রশ্নের পিঠে প্রশ্ন এসে শেষ প্রশ্ন দাঁড়ালো এরকমঃ সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-প্রভুত্বের আজকের যুগে পৃথিবীর একক কোন দেশে বৈষম্যহীন–প্রগতবাদী সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র বিনির্মাণ কি সম্ভব? শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেলো এসব প্রশ্নের সম্ভাব্য যৌক্তিক উত্তর।’’

আমাদের চেতনা এখন এক খচ্চর-সদৃশ সংকরতায় আচ্ছন্ন। সেই আবরণ সরিয়ে, মুখোশ ছিঁড়ে সত্যকে বার করাই এই বইয়ের প্রধান দিক। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে ধরণের হিস্টেরিয়া-আক্রান্ত ডিসকোর্স প্রচলিত তা আমাদের মূল প্রগতীবাদীতা থেকে বিচ্যুত করে। মুজিবের প্রতি মূর্খ ভালোবাসা ও মুজিবের আদর্শ প্রতিষ্ঠায় কর্তব্যবোধের মধ্যে বিরোধ দেখা দিচ্ছে। আমাদের স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাসে এই বই একদিক থেকে বিভাজক রেখা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে প্রাগ্রসর বাংলাদেশের যাত্রা থেমে গিয়েছিলো তা অন্তঃ সলিলা স্রোতের মতো থেকে গেছে। ‘বঙ্গবন্ধু-সমতা-সাম্রাজ্যবাদ’ আমাদের চেতন জগতের প্রতি একটি আঘাত যা আমাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির সংকট ও উত্তরণের অ্যালিগরি হয়ে ওঠে।