ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

১৯৬৯ সালে পটুয়াখালী থেকে এস এস সি পরীক্ষা দিয়ে মেহেরপুর এসেছি। বাবা আগেই মেহেরপুর চলে এসেছিলেন, আমি পরীক্ষা দেবার জন্য পটুয়াখালী রয়ে গিয়েছিলাম। মেহেরপুর ছোট্ট এক শহর, তবে খুব সুন্দর এবং একে বারে নিরিবিলি (অন্ততঃ তখন নিরিবিলি ছিল)। খুব ভাল লাগতে লাগল মেহেরপুর। আমাদের বাসার কয়েকটা বাসা পরেই মামার বাসা। মামা মেহেরপুরের বড় ব্যবসায়ীদের অন্যতম। মামা খুব স্মার্ট ছিলেন। প্রতিদিন বিকালে হাফ প্যান্ট, পোলো শার্ট পরে অফিসার্স ক্লাবে টেনিস খেলতে যেতেন, তখনকার দিনে টেনিস খেলা কেবল মাত্র অফিসারদের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। মামা সবসময় একেবারে ফিটফাট থাকতেন। একটা ছড়ি ব্যবহার করতেন, যেটার হাতলটা ভাজ করে ঠেস দিয়ে বসা যেত, বিরাট হাই ফাই ব্যপার। মেহেরপুরের প্রধান রাস্তার উপর সামনে বারান্দা ওয়াল সুন্দর দোতালা বাড়ী মামার। এক পাশে একটা লন (লনটা এখন নেই), সেখানে শীত কালে আমরা রেকেট খেলতাম। দোতালার বারান্দায় বেশ কয়েকটি ফ্রেমে বাঁধানো ছবি ঝুলানো যার একটা বাঘ শিকারের। মামা হাফ প্যান্ট টিশার্ট পরা পায়ে কেডস্ হাতে একটা জেফ্রিকান দোনালা বন্দুক পায়ের নীচে একটা মরা বাঘ। ছবিতে আছে আরো এক দঙ্গল লোক যাদের দেখেই বোঝা যায় এই রকম একটা ছবির অংশ হতে পেরে তারা ধন্য হচ্ছে আর মামা “জিম করবেট অভ মেহেরপুর”। এবার সেই বাঘ শিকারের গল্প।

তখন চুয়াডাঙ্গা থেকে মেহেরপুরের উদ্দেশ্যে শেষ বাস ছাড়ত রাত দশটায়, মেহেরপুর পৌঁছাত রাত ১১টার দিকে। মেহেরপুর ঢুকতে প্রথমে যক্ষা হাসপাতাল এর পরেই গোরস্থান। আগের দিন রাতে মেহেরপুর ঢুকতে বাসের ড্রাইভার ও যাত্রীরা হেড লাইটের আলোয় দেখল একটা বাঘ কলেজের দিকের বাগান থেকে বেরিয়ে গোরস্থানে ঢুকল। ড্রাইভারের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, হাওয়ার বেগে গাড়ী চালিয়ে একেবারে বাসষ্টান্ড। সকাল থেকেই সমস্ত শহরে বিশাল উত্তেজনা। এতদিন পরে প্রকৃত একটা উত্তেজনা জ্বর শহরবাসীদের বিশেষ করে ছোটদের আক্রান্ত করল। লাঠিসোটা নিয়ে সবাই চলেছে গোরস্থানের দিকে যে ভাবেই হোক বাঘ মারতে হবে। মেহেরপুর শহরের প্রান্তে তখন বেশ কিছু সাঁওতাল সম্প্রদায় বসবাস করত, দুর্দান্ত শিকারী, তীর ধনুক বল্লম নিয়ে তারাও হাজির। মামা তার দলবল নিয়ে হাজির,পরনে হাফ প্যান্ট টিশার্ট, হাতে দোনালা বন্দুক। গোরস্থানের বাইরে রাস্তা লোকে লোকারণ্য, গোরস্থানের ভিতর মামা সহ অন্যান্ন শিকারী ও সাহসী লোকেরা। সবাই খোঁজাখুজি করছে কোথায় বাঘ, কোথায় বাঘ? হঠাৎ এক কোনায় ঝোপের কাছে চিল্লাচিল্লি এবং ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। তার আঁচ পড়ল সমস্ত গোরস্থান ও রাস্তা জুড়ে, নিরাপদ জায়াগার খোঁজে শুরু হয়ে গেল হুড়াহুড়ি দৌড়াদৌড়ি। মামা দিগ্বিদিক জ্ঞান শুন্য হয়ে একার এদিক একবার ওদিক দৌড়াদৌড়ি করে হাতের বন্দুক মাটিতে ফেলে একটা গাছে উঠতে লাগলেন। মামা একটু মোটা ছিলেন তাই গাছে ওঠা তার জন্য সহজ ছিলনা তার সঙ্গীদের মাঝে দুইজন তাকে ঠেলেঠুলে গছে ওঠাবার চেষ্টা করছিল, সে একটা দেখার মত দৃশ্য। হঠাৎ করেই আবার দৌড়াদৌড়ি চেঁচামেচির শেষ হলো দেখা গেল ঝোপের ধারের লোকেরা লাঠি বাশ দিয়ে কিছু একটা পিটিয়ে মারছে। কাছ থেকে এই দৃশ্য দেখার জন্য সবাই গোরস্থানের ভিতর ঢুকতে লাগল। মৃত প্রাণীটি সবার দেখার জন্য যখন বাঁশের লাঠির মাথায় উচু করে তোলা হলো দেখা গেল বাঘ নয় একটা শিয়াল, বাঘ এখনো গোরস্থানের মধ্যে লুকিয়ে আছে। যেসব সাহসী(?) লোকেরা বাঘ মারা পড়েছে ভেবে গোরস্থানে ঢুকেছিল দৌড়াদৌড়ি হুড়াহুড়ি তারা আবার গোরস্থানের বাইরে নিরাপদ স্থানে অবস্থান নিল। মামা গাছ থেকে নামতে যাচ্ছিলেন, নামা থামিয়ে আরও দু’ডাল উপরে উঠলেন। শেষমেষ অনেক খোঁজাখুজির পর পুরানো একটা কবরের মধ্যে বাঘের দেখা মিলল। সাঁওতালদের বর্ষার আঘাতে তার দেহাবসান হলো। আনন্দ ফুর্তির বান ছুটলো। মামা সকালেই চুয়াডাঙ্গা লোক পাঠিয়ে ছিলেন, এর মধ্যে সেও ক্যামেরাম্যান নিয়ে ফিরেছে (তখন মেহেরপুরে ষ্টুডিও ছিলনা)। বিভিন্ন পোজে মামার অনেক গুলো বাঘ শিকারের ছবি তোলা হোল।

এই আনন্দ উত্তেজনা মেহেরপুরের লোকজন অনেকদিন মনে রেখেছিল। আমাদের ইংরেজি সিলেবাসে Mrs Packletide’s Tiger পড়ানো হতো, খুব মজা করে পড়াতেন প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম স্যার (১৯৭১ সলে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট কলেজে চাকুরী কালীন সময়ে পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন)। আমরা ব্যাক বেঞ্চাররা স্যারের লেকচার না শুনে বৃথাই Mrs Packletide এর সাথে মামার মিল অমিল নিয়ে নীচু গলায় তর্ক জুড়ে দিতাম।