ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর মাস ১৯৭১, দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে। আমরা ঐ সময় মেহেরপুর থাকি এইচ এস সি পড়ি। ঢাকায় যাব, বড় বোন দুলাভাই আর আদরের পিচ্চি ভাগ্নি ঢাকা থাকে তাদের কোন খবর পাচ্ছিনা তাই ঢাকা যাওয়া। তখন মেহেরপুর বা চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকা যেতে হলে ঝিনাইদহ থেকে বাসে উঠতে হতো। আগের দিন ঝিনাইদহ এসে খালার বাসায় রাত কাটিয়ে পরের দিন সকালে বাসে উঠেছি। ঝিনাইদহ থেকে যারা বাসে উঠেছে তাদের মাঝে আমার বয়সী স্বল্প পরিচিত/ চেনা মুখের কয়েকটা ছেলেও আছে। তরা ঘাটে পাক আর্মির ক্যাম্প। তরায় কালীগঙ্গা নদীতে তখনও ব্রিজ হয়নি, যানবাহন ফেরীতে পার হতো, বাস ফেরী থেকে নামলেই আর্মির চেকপোষ্টে আমাদের গাড়ী থামিয়ে সবাইকে নেমে লাইন দিয়ে দাড়াতে বলল। লাইনে আমার সামনে অচেনা এক মহিলা সাথে স্বামী ও দুটো ছোট বাচ্চা। লাইনের সামনের দিক থেকে একজন সৈন্য লাইনে দড়ানো লোকদের একজন একজন করে চেকিং ও জিজ্ঞাসাবাদের পর বাসের দিকে পাঠিয়ে দিচ্ছিল, যুবক বয়সীদের আলাদা করে অন্য লাইনে দাড় করিয়ে রাখছিল। আমার সামনে দাঁড়ান মহিলার বাচ্চা দুটির একটি তার কোলে অন্যজন পাশে দাড়িয়ে কাঁদছিল। চড়া রোদ, মনে আতংক হালকা ঘাম বের হচ্ছে। হটাৎ আমি কেন জানি আমার সামনে দাঁড়ানো মহিলার দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলাম। বাচ্চাটাও আমার কোলে উঠে চুপ করে গেল। মহিলার স্বামী অস্বস্থি, ভয়, বিরক্তি অথবা অন্য কোন কারনে আমাকে বলল ওকে কোলে নিতে হবেনা, নামিয়ে দিন। আমি বাচ্চাটাকে আমার কোল থেকে নামিয়ে দিতে যচ্ছিলাম, কিন্তু মহিলা নীচ এবং চাপা গলায় তার স্বামীকে ধমকের সুরে বলল নামাতে হবেনা, বাবু ওনার কোলেই থাক। আমরা আস্তে আস্তে সামনে এগোতে থাকলাম। আমাদের পালা এলো, সৈন্যরা হয়ত ভাবল আমরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। সামান্য জিজ্ঞাসাবাদের পর এক এক করে মহিলার স্বামী, মহিলা ও আমাকে বাসের দিকে এগিয়ে যেতে ইশারা দিল, মনে হল নূতন জীবন ফিরে পেলাম। আমার বয়সী বেশ কয়েক জনকে পাশের লাইনে দাড়িয়ে থাকতে দেখলাম। ঝিনাইদহের ছেলে কয়টিও (সম্ভবত: ৩ জন) আতংকিত মুখে পাশের লাইনে দাড়িয়ে ছিল। একটু পরেই আমাদের বাসকে চলে যেতে ইশারা দেওয়া হলো। অন্য লাইনে দাঁড়ানো এক যুবকের বাবা আর্মিদের সাথে কথা বলে না পেরে নেতা টাইপের এক আর্মির পা জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদাকাটি করে ছেলেকে ফিরিয়ে আনল। অসহায় কয়েকজন মানুষকে হায়েনাদের মুখে রেখে আমরা সবাই ঢাকার দিকে রওনা হলাম। বাসে উঠে বাচ্চাটা আমার কোলে ঘুমিয়ে থাকল। মহিলা সাভারে নেমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বাচ্চাটা আমার কোলে ঘুমিয়ে ছিল। তখনকার মানসিক অবস্থার কারনে মহিলা অথবা তার স্বামীর সাথে কোন কথা বলা হয়নি বা পরিচয় নেওয়া হয়নি। ঝিনাইদহের ছেলেগুলোকে আর খুজে পাওয়া যায়নি। তাদের পরিবারের ভাষ্য তারা ঢাকায় রওনা দিয়েছিল কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে নাই। অচেনা বোন আপনি কি জানেন আপনার জন্যই আপনার এই ভাই তার জীবন ফিরে পেয়েছে ?