ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

১৯৭১ সাল, বর্ষা কাল (জুলাই, আগস্ট অথবা সেপ্টেম্বর মাস), সেবার প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। Winter General এর মত Rain General পাক সেনাদের মোটামুটি কাহিল করে রেখেছিল। আমরা তখন মেহেরপুরে থাকি। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ মেহেরপুরের উপর দিয়ে ভারতে যাচ্ছে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেবার জন্য। মেহেরপুরএর দক্ষিণ দিকে একটা গ্রামের ঘটনা, গ্রামের নামটা মনে নেই। মাটির রাস্তা, মাটির বললে ভুল হবে বর্ষা বৃষ্টি এবং বহু ব্যবহারে কাদার রাস্তা হয়ে গিয়েছে। হাঁটু পরিমাণ কাদা। রাস্তাটা প্রত্যন্ত গ্রামের ভিতর দিয়ে গিয়েছে, তাই নিরাপদ। ছেলে বুড়ো মহিলা বাচ্চাকাচ্চা সবাই এই হাঁটু কাদা ভেঙ্গে হেটে চলেছে, লক্ষ একটাই ভারতে পৌঁছান। দীর্ঘ পথ চলায় ক্লান্ত শ্রান্ত, চোখে মুখে প্রচণ্ড আতংক, যে ভাবেই হোক যত দ্রুত সম্ভব ভারতে পৌছাতে হবে। ক্লান্তি অনাহার পথের কাদা তাদের কাছে কোন বাধা নয়। শুধু একটাই ভয় আর্মি না এই রাস্তায় এসে পড়ে। তবে রাস্তাটা প্রকৃতই নিরাপদ। আমরা মেহেরপুরের বাসা ছেড়ে রায়পুর গ্রামে আশ্রয় নিয়েছি। প্রতিদিন সকালে বন্ধুদের নিয়ে ওই রাস্তায় চলে যাই, ভারত গমন রত এই অসহায় মানুষদের যেটুকু পারি সাহায্য করি। কয়েক দিন আগেও গ্রামের লোকজন এই সব শরণার্থীদের অনেক সাহায্য করত, রান্না করে খাওয়াত, চিড়া মুড়ি সঙ্গে দিয়ে দিত। এখন তারাও বিপদে আছে, সাহায্যের পরিমাণ কমে গিয়েছে। রাতে শরণার্থীরা সাধারণত গ্রামের স্কুলে আশ্রয় নিত, এখন সেখানেও ডাকাতি লুট শুরু হয়ে গিয়েছে। বেলা বারটার দিকে একটা পরিবার এলো, দেখে বোঝা যাচ্ছিল অনেক দুর থেকে এসেছে। দলের সবাই পথের ক্লান্তি, ক্ষুধা, আতংকে একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে। প্রধান এক ৩৫/৪০ বছরের লোক, সাথে বাবা মা বউ ৮/ ১০ বছরের ২টা ছেলে মেয়ে এবং আর এক বয়স্ক মহিলা। বাবা পঙ্গু, জানলাম বাবার কারনেই তাদের যত অসুবিধা। বাবা না থাকলে আরও ৫/৬ দিন আগে ভারত পৌঁছে যেতো। ফেলে রেখে যেতেও পারছেনা সাথে নেওয়াও দুরহ হয়ে পড়েছে। সারা পথ নানা ঝক্কি করে এই পর্যন্ত এসেছে। সর্বশেষ, বড় একটা ঝুড়ি বাঁশে ঝুলিয়ে বাঁশের দুপাশ দুজন লোক তাদের ঘাড়ে করে এই পর্যন্ত বয়ে এনেছে। তখন বৃদ্ধ পঙ্গু অচল লোকদের এই ভাবে বয়ে নিয়ে যাওয়া হতো, কর্দমাক্ত রাস্তায় এটাই ছিল একমাত্র বাহন। বাহকরা রাস্তার পাশে একটা উঁচু জাগায় বাবাকে নামিয়ে দিয়ে তাদের ঝুড়ি বাঁশ নিয়ে ফিরে গেল। লোকটা বাহকদের অনেক অনুনয় বিনয় করলো তাদের একটু বর্ডার পর্যন্ত এগিয়ে দিতে। বাহকরা চুক্তির বাইরে অতিরিক্ত পয়সা ছাড়া কাজ করতে রাজি ছিল না আর লোকটারও আর পয়সা দেবার ক্ষমতা ছিল না। যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত আতংকের, সেখানে ঘণ্টা খানিক কেটে গেল। দেখলাম লোকটা বাবাকে রেখে অন্য সবাইকে নিয়ে সামনের দিকে রওনা হল। আর বাবা ‘বাবারে আমারে ফেলে যাসনে’ ‘বাবারে আমারে ফেলে যাসনে’ বলে কান্না কাটি শুরু করলো। আমরাও লোকটাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু লাভ হল না লোকটাও পঙ্গু বাবাকে নিয়ে অসহায়। খানিক দুর গিয়ে লোকটা আবার ফিরে এলো, বাবার হাতে একটা প্যাকেট, সম্ভবত চিড়া মুড়ি হবে, ধরিয়ে দিয়ে আবার সামনে চলা শুরু করল। অসহায় জীবন বাবা, ছেলে, স্বজন এবং দর্শকদের মাঝে করুণ সুর ছড়িয়ে দিয়ে আকাশ বাতাস ভারী করে তুলল। তবে জীবন মৃত্যুর মাঝে দোল খাওয়া সেই সময়টায় দুঃখ বেদনাও কমে গিয়েছিল। বৃদ্ধ বাবা কিছুক্ষণ কান্না কাটি করে অসহায় দৃষ্টি শূন্যে মেলে দিয়ে বসে রইল।
ঘণ্টা খানিক পরে দেখি ছেলে আবার ফিরে এসেছে। বাবার কাছে বসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে খানিক কান্না কাটি করলো। বাবার চোখ মুখে দুঃখের কোনো লেশ নেই, আছে অচেনা এক আলোর ছটা। সেই আলো আনন্দের না বিশ্বাসের তা আমি বুঝতে পারলাম না। ছোট বাচ্চাদের আমরা যেমন পিঠে তুলে নেই ছেলে বাবাকে সেই ভাবে পিঠে তুলে নিলো, আর বলল ‘ভাল করে গলা জড়িয়ে ধরবা, খাবার জন্য ঘ্যান ঘ্যান করবা না, যদি করো এক জাগায় ফেলে রেখে আবার হাটা দেবো’। বাবার মাঝে ছেলের কথায় কোন ভ্রুক্ষেপ করার কোন লক্ষণ দেখলাম না। যদি বাবার চোখের ভাষা ঠিক ভাবে বুঝতে পেরে থাকি তাহলে বাবা তখন বলছিল “আমাকে ফেলে যাবি কোই, আমি তোর বাবা না?” ছেলে রওনা হল, দ্রুত যেতে হবে, বর্ডার এখনও আড়াই থেকে তিন মাইল দুর, রাস্তা দুর্গম। আমি সহ আরও অনেকের চোখে পানি দেখলাম, আমি আমার চোখের পানি পড়তে দিলাম মুছলাম না। উপস্থিত আমাদের সবার তখন একমাত্র কামনা ছেলে যেন বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ভাল ভাবে বর্ডার পাড়ি দিতে পারে।
পাদটীকা: বৃদ্ধ বাবা আর ছেলে রওনা দেবার মিনিট দশেক পর দেখি রায়পুর গ্রামের এক লোক (এতদিন পর তার নাম আর মনে নেই) সাথে অন্য দুজনকে নিয়ে এসে বৃদ্ধকে খুঁজছে, ছেলে ফিরে এসে বাবাকে নিয়ে গেছে সে জানেনা। তারা তিন জন এসেছে বৃদ্ধকে নিরাপদে বর্ডার পার করে দিতে। আবার প্রমাণ হল মানুষ মানুষের জন্য।