ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকাসহ অনেকগুলো দেশী-বিদেশী সংবাদমাধ্যম এবং গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও বেকার সমস্যা বিষয়ে কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যা খুবই উদ্বেকজনক ও হতাশাব্যঞ্জক।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশে শ্রম বাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে খুবই উচ্চহারে। প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না।

বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট-এর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার কিন্তু আমাদের সরকার বা নীতিপ্রণেতাদের সে ব্যাপারে কোন বিকার আছে বলে মনে হয় না।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের (আইএলও) তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। বেকারত্বের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৫ সালে মোট বেকারের সংখ্যা ছয় কোটিতে দাঁড়াবে। সংস্থাটির মতে, বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান ১২তম।

এছাড়া জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্যমতে, দেশে বেকার যুবকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ থেকে ’৯৫ সালে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী বেকার যুবকের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ। কিন্তু ২০০৫ থেকে ’১০ সালের মধ্যে তা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে দাঁড়ায় এক কোটি ৩২ লাখে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০১২ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের মধ্যে কাজ পান মাত্র সাত লাখ মানুষ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত অর্থাৎ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যারা শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন, তারাও আছেন।

এই যখন বাংলাদেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের চিত্র, তখন ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’র মত, বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে কাজ করে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করছে বিদেশীরা। বিশেষ করে তৈরী পোশাক শিল্প, বায়িং হাউস, আইটি ও টেলিকম সেক্টর, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, রেস্টুরেন্ট, প্রিন্টিং প্রেস এবং এনজিওসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান ও সেবামূলক খাতে কর্মরত বিদেশীরা এই কাজে বেশি জড়িত। বিশ্ব ব্যাংকের প২০১৩ সালের রিসংখ্যান অনুসারে- ভারত বিশ্বের এক নম্বর রেমিটেন্স প্রেরণকারী দেশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত, আমেরিকা, সৌদি আরব এবং বৃটেনের পরে বাংলাদেশ হল ভারতের পঞ্চম বৃহৎ রেমিটেন্স প্রেরণকারী উৎস দেশ।

বাংলাদেশে বৈধ-অবৈধভাবে কাজ করছে পাঁচ লাখ ভারতীয়! ১২৩ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতের বৈদেশিক রেমিটেন্স আয়ের পঞ্চম উৎস উন্নয়নশীল এই বাংলাদেশ, যা শুনতে শ্রুতিমধুর হলেও তা যে আমাদের সার্বিক কর্মসংস্থানের উপর কতটা হুমকিস্বরূপ তা পরিসংখানেই অনুমেয়।

শুধু ভারতীয়রাই নয়, পাকিস্তানি, শ্রীলঙ্কান, ঘানা, নাইজেরিয়া, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, পশ্চিমা বিশ্বসহ আরও অনেক দেশের নাগরিকরা বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন এবং এদের সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের অজানা।
টুরিস্ট ভিসা, ওয়ার্কিং ভিসাসহ অন্যান্য ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও তা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেলে আর নবায়ন না করে তারা অবৈধভাবে অবস্থান করে দিব্যি ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।

অভিযোগ উঠেছে, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জোগসাজশে এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষমতাবলেই থেকে যাচ্ছেন এই বিদেশী নাগরিকরা। এতে করে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে বিদেশী নাগরিকদের সম্পৃক্ততা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কমপক্ষে ২০ হাজার বিদেশী এসব অপরাধ কর্মকাকাণ্ডে জড়িত রয়েছেন বলে গোয়েন্দারা ধারণা করছেন। বিদেশী নাগরিকদের অনেকেই ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। অবৈধ এই বিদেশী নাগরিকদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশী কিছু অপরাধীর সহায়তায় রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহর গুলোর অভিজাত এলাকায় বাসা, অফিস ভাড়া নিয়ে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ, সন্ত্রাস ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে যা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি বৈকি।

মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে চাহিদা, মূল্য, যোগান অনুসারে ভোক্তা তার ইচ্ছে অনুসারে যেকোনো ভৌগোলিক প্রান্তে উৎপাদিত পণ্য বা সেবা ক্রয় বা গ্রহণের অধিকার রাখে। কিন্তু কথা হচ্ছে সেটা অবৈধ উপায়ে কেন? বিশ্বের অন্য কোন দেশে অবৈধ অভিবাসীদের পক্ষে বড়জোর নিম্ন পর্যায়ের চাকরি/অড জব (অতিশয় কায়িক শ্রম; ক্লিনিং, কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক ইত্যাদি) করে সাধারণ জীবন নির্বাহ করা সম্ভব, অন্যথায় আমাদের দেশে বিদেশীরা অবৈধভাবে অবস্থান করে কর ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন শিল্প কারাখানার প্রকৌশলী, মধ্য ও উচ্চ সারির ব্যবস্থাপক, কর্মকর্তা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে বৈধ-অবৈধভাবে, মানি লন্ডারিং আইন ভঙ্গের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি ডলার নিজ দেশে পাচার করছে।

উল্লেখিত তথ্য অনুসারে, ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বের মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে বহির্বিশ্বে বৈদেশিক মুদ্রার প্রেরণের পরিমান ৩.৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০১২ সালের তুলনায় ১৬% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ডলারের ঘাটতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার সংরক্ষণ এবং ব্যালেন্স অফ পেমেন্টসহ (বিওপি) সার্বিক অর্থনীতির উপর অত্যন্ত বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

অবশ্যই স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের অনেক অর্জন আছে কিন্তু উপরোক্ত চিত্রটি আমাদের তরুণ প্রজন্মের নিকট খুবই হতাশাজনক।

প্রশ্ন
১। বাংলাদেশে ভ্রমণ, চাকরি, ব্যবসা ও অন্যান্য উপলক্ষে অবস্থানরত বিদেশী নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যা কত? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বোর্ড অফ ইনভেস্টমেন্ট (বিওআই), বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটি (বেপজা), বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফেকচারিং অ্যান্ড এক্সপোর্টিং অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এর কাছে কী পরিমাণ তথ্য আছে?

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বিমানবন্দর ও অন্যান্য বন্দরের মাধ্যমে বিভিন্ন উপলক্ষে আগত বিদেশীদের অবস্থান ও সংখ্যার হিসাব রাখাটা অসম্ভব কিছু নয়। এছাড়া উপরে উল্লেখিত খাতসমূহে অনুসন্ধান ও অভিযান চালিয়ে অবৈধদের সংখ্যা বের করা সম্ভব।

২। বাংলাদেশে অবস্থানরত ও কর্মরত বৈধ বিদেশীরা কি আইন অনুসারে আয়কর দিচ্ছেন? না দিলে তা আদায়ের ব্যবস্থা কি? জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে কি এর কোন তথ্য আছে এবং এ ব্যাপারে তাদের পদক্ষেপ কী?

৩। বৈধ বা অবৈধ বিদেশী নাগরিকদের রাষ্ট্রের আইনবিরোধী তৎপরতা ও কর্মকাণ্ড দেশের সার্বিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কতটা হুমকিসরূপ, তা নিয়ে কি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অবগত?

৪। কি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রতি মাসে দেশের বাইরে বৈধ ও অবৈধ উপায়ে পাচার হচ্ছে তার পরিসংখ্যান কি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আছে? এই ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?

৫। অশিক্ষিত বা সল্পশিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা বাদই থাকল, দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী ৪৭% শিক্ষার্থী বেকার কেন? তাদের কর্মসংস্থানের জায়গাগুলো কি বিদেশীদের দখলে? তাহলে এটা কি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা, নাকি সার্বিক অব্যবস্থাপনা? এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

৬। তৈরী পোশাক শিল্প, বায়িং হাউস, আইটি ও টেলিকম সেক্টর, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, রেস্টুরেন্ট, প্রিন্টিং প্রেস এবং এনজিওসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান ও সেবা খাতে ও বিভিন্ন দেশী-বিদেশী সংস্থা, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর মধ্য ও উপরের সারির কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক পদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশী নাগরিকদের দখলে, এর মূল কারণ কী? আমাদের কর্মকর্তাগণ কি সম-যোগ্যতা সম্পন্ন নয়? আমাদের ঘাটতি কোথায়?

৭। অবৈধভাবে অবস্থানরত বিদেশীদের দ্বারা পরিচালিত ব্যবসা-বাণিজ্য আমাদের দেশীয় শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উপর কী প্রভাব ফেলছে তার কি কোন অনুসন্ধান বা গবেষণা হচ্ছে? কিংবা এসব তথ্য সরকারি ও বেসরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত হয়েছে?

৮। বেকারত্বের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৫ সাল নাগাদ মোট বেকারের সংখ্যা ছয় কোটিতে দাঁড়াবে, এই নাজুক অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদের সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ এবং করণীয় কী?

৯। সার্বিক শিল্পায়ন ও আরো নতুন নতুন খাতে কর্মসংস্থান তৈরির জন্য কী কী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি?

স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও দেশের কিছু উদীয়মান সেক্টরে উচ্চ প্রযুক্তি জ্ঞান ও বাবস্থাপনার দক্ষতা সম্পন্ন বিদেশী কর্মকর্তার প্রয়োজন মেনে নেয়া যায়, কিন্তু সার্বিক কর্মসংস্থানের তথা শ্রম বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অবৈধভাবে ভিনদেশীদের দখলে যাওয়া কোন ভাবেই কাম্য নয়।

বাংলাদেশের গণমানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে, জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর ও তার বাস্তবায়ন করে এই সংকটের কবল থেকে অতি দ্রুত মুক্ত হওয়া অতীব জরুরি।

মো. একরাম হোসেন, পিএইচডি গবেষণা সহকারী, হোহাই বিশ্ববিদ্যালয়, চীন।