ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

এক মন দুধে এক ফোটা টক পড়ে গেলে সে দুধের নাম কি হয়? তা নিশ্চয়ই সবারই জানা। এই আমি অর্বাচীন এ কয়দিন ধরে গার্মেন্টস শিল্পের অবস্থা দেখে এবং পোষ্ট এ দেয়া ছবিগুলো দেখে। আশুলিয়াকে আমার এক মন দুধে এক ফোটা টক বলেই মনে হয়েছে। আরেক ফোটা অবশ্য এর সাথে যোগ হয়েছিল কাঁচপুরে, ভাগ্যিস তা বড় পর্যায়ে যায় নি। পোষ্ট এ দেয়া ছবিগুলো আরও বিপর্যয়েরই সংকেত বহন করে, দেখেই মন্ত্যব্য করবেন আশা করি। অবশ্য এর ফলে একটি লাভ হয়েছে এ শিল্পে- গার্মেন্টস বন্ধ এবং শ্রমিক-মালিক দু পক্ষই ছুটি কাটাচ্ছে!

গার্মেন্টস শিল্পের সাথে জড়িত শ্রমিকদের দুর্দশার প্রশ্ন যখন আসে তখন সাথে সাথে উচ্চারিত হয় গার্মেন্টস মালিক-গন বেশ ভালো আছেন। আসলেই কি তাই? এই রকম মুদ্রার দু-পিঠ এর বিপরীত মুখে অবস্থান দাড় করালে কার সুবিধা হয় ভাবতে গেলে ক্ষীণ কণ্ঠে আমরা উচ্চারণ করি অপশক্তি। ১৯৯৬ তে নাকি হলুদ হেলমেট পরে অরাজকতায় অংশ নিয়েছিল গার্মেন্টস সেক্টরে বেশ কিছু লোক। কিন্তু কারা তা, আজও জানতে পারিনি, এর আগেও এরকম হয়েছে সে দোষিদের খুজে বের করা যায়নি! কেউ কেউ অবশ্য দুধ কে ঘোল এ পরিণত করলে কার লাভ, তা বিচার না করেই আমরা মানবিকতার দিকেই শুধু দৌড়াই! এ দিকটাও যে কম বিবেচ্য না বৈকি। একটুকুনও ভাবিনা যা আছে তাকে ধরে রাখার সক্ষমতা না থাকলে কি হতে পারে? মানবিকতা দেখবো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে, তাই নয় কি?

বিজিএমইএ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে পাঁচ হাজার দু’শ গার্মেন্টস ছিল। যা আজকে এসে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার এ। এ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভাবতে গেলে যে কোন পাগলেও বলবে – গার্মেন্টস এর অবস্থা বেশ খারাপ। কিন্তু পৃথিবী ব্যাপী তো আছেই খোদ বর্তমান বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে নিয়ে ভাবুক মানুষরা বলছেন- বাংলাদেশের গার্মেন্টস এর অবস্থা বেশ ভালো। আর যদি পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ ভালোকে বলতে যাই, তাহলে বলতে হয়-বিশ্বে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে এ শিল্পে। ব্যাপারটি কেমন কেমন লাগে তাই না? তবে ব্যাপারটি বেশ গর্বের এবং ভবিষ্যৎ আশা-ব্যঞ্জক অবশ্যই।

অপরদিকে কখনও এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে কিনা জানি না- সে হারিয়ে যাওয়া অথবা ধংস হয়ে যাওয়া আনুমানিক আড়াই হাজার গার্মেন্টস এর কি হলো অথবা তার মালিকদের কি হয়েছিল? খোদ বিজিএমইএ এ নিয়ে কোণ গবেষণা অথবা কোণ বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়টা নিয়ে পিএইচডি হয়েছে কি না জানিনা। যা হারিয়ে যায় তাকে নিয়ে এ দেশে মাথা ঘামানোর লোকজনের সময় কোথায়, তাও অবশ্য ঠিক!

এরকম একজনের কথা অবশ্য আমি জানি। সে গার্মেন্টস মালিক আমার বন্ধুর বাবা। যিনি কিনা শেষ সময়ে এসে এ সম্ভাবনাময় শিল্পের প্রথম দিককার হয়েও আজ গ্রামের নিজস্ব ভিটিবাড়িতে পরিবার নিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সময় আজ তাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে! কেন তিনি সে আড়াই হাজার ধংসস্তুপের একজন হয়েছিলেন। কেউ যদি তার কারণ খুঁজতে চান। আমি অবশ্য বিনা ফিতে উনার ঠিকানা দিয়ে দিবো। তারপরও জানা দরকার ব্যর্থতা কেন হলো! আর এখনকার উদ্যোক্তা-গন সফল কেন।

নিজে খুব একটা পুঁজিপতিদের দেখতে পারি না যদিও, তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের আমি সবসময়ই শ্রদ্ধা করি। উনারা কিভাবে করেন টাকার পাহাড় সে দিকে না গিয়ে আমি ভাবি, উনার দ্বারা কতজন লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। কতটা পরিবার আজ খেয়ে পড়ে বেচে আছে এ কর্মহীন দেশটায়। যেখানে প্রতিবছর এ দেশেই লক্ষ বেকার যুক্ত হচ্ছে বেকারত্বের তালিকায়। যে দেশ থেকে প্রতি বছর হাজার শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষ লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে যাচ্ছে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকায় উপার্জন করে দিনে আঠার ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম ও কাজ এর বিনিময়ে। সেখানে আমাদের গার্মেন্টস শিল্প কত লক্ষ মানুষের উপকার করছে। আমি অবশ্য এভাবেই ভাবি। তবে তাই বলে শ্রমিকদের ন্যায্য স্বার্থ্য অবশ্যই সর্বদা যেন দেখা হয়। মালিক পক্ষ যা বলছে- আমরা করছি। সে ভুল ধরিয়ে দেয়ার কাউকেই তো এ কয়দিন দেখলাম না সুশীল থেকে! তাহলে কি,সে ভাবনায় আমরাই যেন খেই হারিয়ে ফেলি, গার্মেন্টস এর অরাজকতা কোথাও ঘটলে।

বিশেষ করে গার্মেন্টস এর মতন বিশ্বে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতা মূলক খাতটায় টিকে থাকতে এ দেশের গার্মেন্টস শিল্প মালিকদের কি পরিমাণ চাপের মধ্যে থাকতে হয়। তা তো বোধগম্যর বিষয়। রাস্তায় আগুন পুড়িয়ে আর এই অর্বাচীনের মতন দু’কলম লিখনে ওয়ালার মতন লিখলেই সে চাপের সঠিক পরিমাণ বোধোদয় করা যাবে না বৈকি।

উপরের কথাগুলি এতক্ষণ যারা পড়লেন- তারা নিশ্চয়ই ভাবছেন। আমি হয়ত এতক্ষণ গার্মেন্টস মালিকদের পক্ষেই কথা বলেছি। খেটে খাওয়া গার্মেন্টস শ্রমিকদের দিকে এতটুকুনও ভাবছি না অথবা বলছিও না। হ্যাঁ আমি ভাবছি অবশ্যই। আমার মনে হয় না গার্মেন্টস এর সাধারন শ্রমিক মানে বেশিরভাগ শ্রমিক এই সব অরাজকতার সাথে জড়িত অথবা উনারা মনে মনে কাম্য করেন এই সব।

গার্মেন্টস শিল্প ধংস হয়ে গেলে, তিন হাজার থেকে আরও দু হাজার গার্মেন্টস ঝরে পড়লে হালের এই সব অস্থিরতার কারণে। ভবিষ্যতে তখন সেখানে কর্মরত শ্রমিক-গনের কি হবে? এই বোধটুকুন বেশিরভাগ শ্রমিকগনের আছে, নাহলে এই আশুলিয়ার তিনলাখ শ্রমিক একসাথে আন্দোলনে নামতো। আমরা কিন্তু তা দেখিনি। তাই অবশ্যই অবশ্যই অরাজকতা সৃষ্টিতে লিপ্ত অসাধু শ্রমিক নামধারী লোকজনকে খুজে বের করে শাস্তির আওতায় এনে ফেলাই বাঞ্ছনীয়। সবার আগে খুজে বের করা উচিত ইন্ধনদাতাদের। কল-কাঠি কি এমনিতেই নড়ে, না কেউ নড়ায়? আর শুধু আশুলিয়াতেই কেন তারা পারে এইসব অরাজকতা করতে? সেগুলোও তো ভাববার বিষয়ই বৈকি। অবশ্যই তা খুজে বের করবে সরকার, এই গুরুদায়িত্ব তো সরকারেরই বলে জানি।

একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন কিনা জানি না কেউ- মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী আসার পর এবং পরবর্তীতে সে দেশেরই রাষ্ট্রদুত এর বাক্যালাপের পর, কেন জানি গার্মেন্টশ শিল্পে অরাজকতা বেড়ে গেলো! তাহলে কি আমরা অথবা আমাদের এই শিল্পকে বাচাতে মার্কীন কৌশলের সাথে হাত মেলাতে বাধ্য হতেই হবে আমাদের। আমার জানা মতে গার্মেন্টস শিল্পে এগিয়ে থাকা শ্রিলংকার গৃহযুদ্ধের পরই সে দেশের অনেক ব্যাবসা আমরা পেয়েছি এবং তা ধরেও রাখছি। এ দেশের শিল্প ধংস হলে আরও কার লাভ হতে পারে, সেদিকগুলোও ভেবে দেখা দরকার বৈকি!

“হিলারির সফরকালীন সংবাদ, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত ”

আহা! ছবি দুটিতে এবং এর ক্যাপশন আরও উস্কে দিচ্ছিল পরিস্থিতি এই দৈনিকটি, আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। ছবিদুটো ছিল প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান ছবি! তা কি ঠিক ছিল সে অবস্থায়?

মুখোশ অথবা কাপড় মুখে বাধা এই মানুষগুলো কি সাধারন শ্রমিক!? এদেরকে কি খুজে বের করে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় না?

বি: দ্রঃ- এ দেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মধ্যে ৭০ ভাগ হচ্ছেন নারী।