ক্যাটেগরিঃ নাগরিক আলাপ

 

অনেকদিন আগে রেডিওতে একটি নাটক শুনেছিলাম। গরীব মা তার সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। একদিন কিছুই জুটেনি ভাগ্যে শুধু অল্প কিছু ভাত তার কর্মস্থল থেকে নিয়ে এসেছে। অল্প খাবার দু সন্তান আর মা খাবে। ভাত এর সাথে দেয়ার মতন কিছুই নেই। অবোধ সন্তানদের সাথে মা চালাকি করে কাঁচামরিচ দিয়ে দেয়। নাটকের ভাষ্য অনুযায়ী মার চোখ দিয়ে টপটপ করে চোখের পানি পড়ছে আর সন্তানদের বলছেন- তোরা খা, বেশ মজা লাগবে। মা জানে মরিচ দিয়ে ভাত খেলে ওরা পানি চাইবে এবং পানি বেশি খাবে। ফলে তার ততটুকুন ভাত দিয়েই সন্তানদের খিদে মিটে যাবে। ঝাল এর চোটে ওরা পানি খেয়ে পেট ভরে ফেলবে! সেদিন বাংলাদেশ বেতার এর সে নাটক শুনে আমারও চোখ দিয়ে পানি টপটপ করে গড়িয়ে পড়েছিল। এ আমার আবেগ। আমি নিশ্চিত এখন আর বাংলাদেশ বেতারের সে নাটক আমি নিজে শুনলেও আমার মধ্যে ভাবান্তর ঘটবে না। এখন মানুষ এর অনুভূতি ভোতা হয়ে গিয়েছে বলেই আমার কাছে মনে হয়।

এই জামানায় গরীবরা সুখে থাকে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় জর্জরিত যে নিম্ন মধ্যবিত্ত। তা অবশ্য অনেকের বোধগম্য নয় বলেই মনে হয়। আওয়ামী সরকারকে এ সময় পছন্দ করেছিলাম- শুধুমাত্র চালাকি একটি মন্ত্রী সভা না দিয়ে নতুনদের দিয়ে সাজিয়েছিল এ সরকার। ব্যর্থতা আর সফলতার প্রশ্ন যদি করি- হয়ত সফলতা বেশি। কিন্তু সব সফলতা যে একটি-দুটি ব্যর্থতা দিয়ে শেষ হয়ে যেতে পারে। তা এই সরকারের সর্বোচ্চ মহল অবগত কিনা আমি জানি না। তবে প্রধানমন্ত্রীর আশে পাশে থাকা উপদেষ্টাদের কারনে মানুষ যে কত জ্বালায় জ্বলছে। তা ভাবতে গেলে মন খারাপ হয়ে যায়।

সরকারী স্থপতি বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কথায় কথায় প্রকাশ করলাম- আমি ছোট একটি ফ্যাক্টরি করতে চাই। উত্তরে বন্ধুটি বলল তিনলাখ আলাদা করে রাখো। আমি বললাম কেন- বলল গ্যাস, পানি এবং বিদ্যুৎ এর সংযোগ এর জন্য তোমার এই অর্থটা খরচ হবে। তুমি জানো না বিদ্যুৎ এবং গ্যাস বন্ধ! বললাম আমি তো ছোট-খাটো একটি চানাচুর উৎপাদন এর কারখানা দিবো। আমার বাজেটও তো এত নেই! তাহলে? উত্তরে আমার বন্ধুটি বলল –বন্ধু আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারবো না সঠিক পন্থায়। তবে তুমি চাইলেই অবৈধ পন্থায় এর সবগুলোই হাসিল করতে পারবে। আমি বললাম- বিএসটিআই? উত্তরে সে বলল- তাদের ম্যানেজ করা তো আরও সহজ। ধরে নাও আরও পঞ্চাশ। আমি হেসে উত্তর দিলাম- বন্ধু থাক আমার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হওয়ার সাধ মিটে গিয়েছে আপাতত। সময় আসুক।

বাসার বিদ্যুৎ বিল বেশি আসছে বলে বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে বললাম- আগে তো এত বিল আসতো না! এখন কি হল হঠাৎ করে যে বাড়ির বিদ্যুৎ বিল এতটা আসে। বিল ম্যান হাসতে হাসতে বললো- আপনার সারা বাড়িতে মিটার একটা। আমি বললাম তো কি হয়েছে? বললো এই উত্তরটা আপনি আমাদের ডিভিশন ম্যানেজার এর কাছ থেকে জেনে নেন। আপনি তো যাচ্ছেনই আপনার বকেয়া বিল কিস্তি করার জন্য। আমি বললাম- আচ্ছা। যথারীতি উনার রুমে প্রবেশ করে বকেয়া কিস্তি এবং বিদ্যুৎ বিল বেশি আসা প্রসঙ্গ তুলতেই উনি বললেন। আপনাকে কিস্তি দেয়া হবে না। আর নতুন আরেকটি নিয়ম আমাদের উপর থেকে নির্দেশ দেয়া আছে। আমি বললাম সেটি কি? বললো ৪০০ ইউনিট এর বেশি হলেই আপনাকে প্রতি ইউনিট ৭টাকা হারে দিতে হবে এবং এর সাথে ১৫% ভ্যাট যোগ হবে। হতাশ মন নিয়ে আমার হাতে ধরা বিদ্যুৎ বিল এর দিকে তাকিয়ে দেখলাম গত মাসে বাড়ির ব্যাবহার প্রায় ৬০০ ইউনিট এর কাছাকাছি। আমি বললাম- আপনাদের নিয়ম অনুযায়ী তো ১০০থেকে দুশো ইউনিট এক দাম, দুশো থেকে তিনশ ইউনিট একদাম এবং তিনশ থেকে চারশো ইউনিট এর আরেক দাম। আমি কি সে নিয়মে পরিনা? উনার সাফ জবাব- চারশো ইউনিট ক্রস করেছেন তো আপনার প্রতি ইউনিট ফ্লাট রেট এ ৭টাকা হারে ধরা হবে। বললাম আমাদের তো খুব কষ্ট হচ্ছে এই বিল পরিশোধ করতে। তাহলে আমাকে আরও দুটো মিটার এর ব্যবস্থা করে দিন? বললো নতুন মিটার আপনি নিতে পারবেন না, উপরের নির্দেশ আছে, এখন মিটার ইস্যু করা যাবে না। আমি বললাম- সরকার তো বলেনি। উত্তরে উনি বিরক্তি সহকারে বললেন- আপনি এখন আসতে পারেন।

আমি একজন সাধারণ মানুষ, আমার ভাবনায় কিছুই যাবে আসবে না। তবে অনেক অনিয়মই আমি দেখি। এই তো গত কয়েকদিন আগেও আমার নিজের ন্যায্য নাগরিক অধিকার এর কাজটিতেও আমাকে ঘুষ দিতে অথবা বলতে পারেন বাধ্য হয়েছিলাম দিতে। সে সময় নিজেকে বড্ড ছোট লেগেছিল- আমি অপরাধী। কেউ বিশ্বাস আর নাই বিশ্বাস করেন- আমি দিতে বাধ্য হয়েছিলাম শুধুমাত্র আমার পরিবারের দিকে বিবেচনা করে। একজন সরকারী অফিসার এর কক্ষে আমার জন্য বসার জায়গা নেই, দাঁড়িয়ে ছিলাম। সময়মত দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারীটি টেবিল এ নেই দেখে আমাকে অফিস এর পরও তিন ঘণ্টা সে অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। আমি সাধারণ বলে আমার বেলায় এরকম আর একজন টিভি সেলিব্রেটি আসার সাথে সাথে সরকারী ভদ্রলোক নিজেও দাঁড়িয়ে গেলো! সাথে সাথে উপস্থিত সবাই। মুহূর্তের মধ্যে উনি উনার কাজটি করে চলে গেলেন সাথে পেলেন চায়ের আমন্ত্রণ। আর সে কাজটি সম্পন্ন করতে আমার লেগেছে পাক্কা চারদিন। আমি অর্বাচীন বোকার মতন শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেই গেলাম। এ দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হওয়া যে কতটা কষ্টের তা যদি এ দেশের সমাজ ব্যবস্থায় যারা আছেন। তারা সবাই একটু বুঝতেন অথবা আমাদের মতন সাধারণের পরিস্থিতিতে এসে নিজেকে বিচার করতেন। তাহলেই অনেক অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত বলে কেন জানি আমার কাছে মনে হয়। এক প্রকার জিম্মি হয়েই আছি আমরা যেন সরকারী অথবা বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের সবার কাছে। এ ক্ষেত্রে নেতা-নেত্রীদের দোষ দিয়ে আসলে লাভ নেই। পুরো সমাজের সবার উপরই এ দায় বর্তায়। সব খারাপের মাঝেও ভালো লোকজন আছে বলেই নগণ্য সংখ্যায় সমাজের বিশৃঙ্খলা এখনও চরম অবস্থায় পৌঁছেনি। তবে তা হতে কতক্ষন!

এখন আমি ভাবছি, সাধারন একজন নাগরিক হয়ে কি ভুলই না জানি করলাম। চেষ্টা করে একজন সেলিব্রেটি অথবা একজন উপরওয়ালার মানূষ যদি হতে পারতাম। আফসোস আমি তো বাচতে চেয়েছিলাম একজন সাধারন হয়ে!

উপর তলার মানুষদের আমার এ আকুতি কি কেউ পৌছানোর ব্যবস্থা অথবা তাদের বোধকে জাগ্রত করার কি ব্যবস্থা হবে না কোনদিন?