ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 

নিজ রাজ্যের বনের মধ্য দিয়ে হাতিতে চড়ে যাচ্ছিলেন রাজা। উদ্দেশ্য প্রজাদের অবস্থা অবলোকন সাথে ভ্রমণ। রাজ্যের সবকিছুতেই ঠিকমত চলছে বলে অবগত তিনি অধীনস্থদের দ্বারা। এরই মধ্যে বনের কিছু পশুর চিৎকার ভেসে আসলো। এরপর আবার, এরপর আবার। রাজা বিচলিত ভঙ্গিতে মন্ত্রীদের জিজ্ঞেস করলেন- কিসের এমন চিৎকার? তৎক্ষণাৎ মন্ত্রীদের মধ্যে আলোড়ন উঠলো- এই কে আছো, যাও দেখে আসো কে চিৎকার করে? পাইক-পেয়াদাদের মধ্যে ছুটোছুটির ভাব শুরু হয়ে গেলো। অতি উৎসাহী এবং চতুর দুই কর্মচারী এসে খবর দিলো- শীত তো তাই প্রজারা কষ্ট পাচ্ছে। ঠাণ্ডায় তারা চিৎকার করছে। তৎক্ষণাৎ বিচলিত রাজার গুরুগম্ভীর আহবান- কি করলে আমি আমার এই প্রজাদের কষ্ট দূর করতে পারি? এক মন্ত্রী বিনীতভাবে বলে উঠলেন- সবাইকে একটি করে চাদর অথবা শাল দিয়ে দিলেই প্রজারা শীতের কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে। রাজা তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিলেন- তবে তাই হোক। যত শাল লাগে আমার কষ্ট ভোগ করা প্রজাদের মাঝে দ্রুত দেয়ার ব্যবস্থা করো। রাজার হুকুম তামিলকারী মন্ত্রী পরিষদ হুকুম দিলো তার অধীনস্থদের। তারা দিলো তার অধীনস্থদের। সারা বন-জঙ্গল খুঁজে খুঁজে যখন একজন মানুষকেও পাওয়া গেলো না! সে কর্মচারীদের মধ্যে কয়েকজন বুদ্ধি আঁটল। যদি আমরা এই শাল বিলিয়ে না দিয়ে যাই। তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের ঘাড় কর্তন করা হবে। এই ভেবে তারা নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করে। সব শাল নিজেদের মধ্যেই ভাগ করে নিলো। এরপর দিন যায়, রাত যায়। বেশ কিছুদিন পর রাজা আবার সেই বনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবারও সে চিৎকার রাজার কানে এসে পৌঁছুল। রাজার আবারও বিচলিত প্রশ্ন- ওরা এখনও চিৎকার করছে কেন! মন্ত্রীদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেলো- কেন চিৎকার করছে খোজ নিতে হবে এখুনি। এরই মধ্যে এক মন্ত্রী বলে উঠলেন- আমিই দেখে আসছি। কিছুক্ষণ পর সে মন্ত্রী ফিরে আসলেন। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকা রাজার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন- হুজুর ওরা আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। ওরা আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ এই চিৎকার করছে। রাজা সহ মন্ত্রী পরিষদ এর সবাই বেশ খুশিতে গদগদ হয়ে গেলেন। সবাই তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আবার চলা শুরু করলেন।!

ইহা একটি প্রাচীন গল্পকে নিজের মতো করে বানানো। সে বোকা রাজা আর অসাধু অথবা বেকুব কর্মচারীদের জন্য তখনকার সে রাজ্যের প্রজাদের কি অবস্থা হয়েছিল। তা আমরা না জানলেও কিছুটা হলেও যে কেউই অবস্থাটা বিচার করতেই পারবেন। শুধু সহযোগিতার ক্ষমতা থাকলেই চলে না। তার সঠিক কার্যকারণ ঘটাতে হয়। আসুন তো দেখি বর্তমান নিয়ে আরেকটি গল্প বলি।

মাননীয় প্রধান বাণিজ্য মন্ত্রী সভা করছেন জনগণের মঙ্গল এর জন্য। তৎক্ষণাৎ বাহিরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিক গন সভায় কি আলোচনা হচ্ছে তা জানার চেষ্টা করছেন। সভা শেষে ঘোষণা করা হল সামনে অতিরিক্ত চাহিদা ও ন্যায্য বাজার মূল্য বিবেচনা করিয়া এই মর্মে ঘোষণা করা হল- আগামী দিন থেকে চিনি ২০ টাকা দরে বিক্রি করতে হবে। যে এই নির্দেশ পালন না করিবে, তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে! সারা দেশে হুলস্থূল বেশে গেলো। সাংবাদিকগণ পাতার পর পাতা ভরে ফেললেন। চিনির দাম আজ থেকে ২০ টাকা, সাথে শাস্তি শব্দটিও উচ্চারণ করিতে ভুলিলেন না! সারাদেশের জনগণ স্বস্তি পেলো। সংবাদ বেরুনোর দিন গিয়ে রাত হল। অতি উৎসাহী ইলেক্ট্রনিক্স গণমাধ্যম গুলো বাজার থেকে ঘুরে এসে জানালেন- বাজারে চিনি নেই! ভোক্তারা ফেরৎ আসছে বাজার থেকে। কাঙ্ক্ষিত চিনি পাচ্ছে না! পরদিন আবারও চিন্তিত প্রধান বাণিজ্যমন্ত্রীর দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি, ছুটোছুটি শুরু হয়ে গেলো। কি হল? কি হল! এই বলে রব উঠলো। তৎক্ষণাৎ সভায় সবাই অবগত হলেন- চিনির যথেষ্ট মজুদ আছে! তাহলে আর চিন্তা কি! এরই মধ্যে দাম নির্ধারনী কমিশন এর সাথে প্রধান উৎপাদক এবং আমদানিকারকদের সাথে বৈঠকে রীতিমতো সরকারের কঠোর মনোভাবের কথা জানিয়ে দিলেন কমিশন। ঘোষণা আসলো নতুন- চিনির যথেষ্ট মজুদ আছে! দোষ ব্যবসায়ীদের! তারা ঠিকমতো কাজ করেন না। তর্ক- বিতর্কের পর সিদ্ধান্ত হল এবং নতুন ঘোষণা- আগামীকাল থেকে চিনির সরবরাহ শুরু করছে সরকার। চিনির কোন ঘাটতি নেই। বাজারে যথেষ্ট চিনি আছে!সবাই খুব আশ্বস্ত হল। প্রকৃত ক্রেতারা বাজারে এসে চিনি না পেয়ে হাতের কাছে আবারও হতাশ হল। এইবার দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সভা করলেন। উপস্থিত পরিবেশক, উৎপাদক, আমদানিকারক, বাণিজ্যমন্ত্রী সহ উপস্থিত সবাই বিচলিত প্রধানমন্ত্রীকে এই বলে আশ্বস্ত করা হলো- সব ঠিক হয়ে যাবে। আবারও সবাই আশ্বস্ত হল। প্রধানমন্ত্রী হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। বাণিজ্যমন্ত্রী বাসায় গিয়ে রিল্যাক্স এর একটি ঘুম দিলেন। ঘুম থেকে উঠে কড়া মিষ্টি করে একগাদা চিনি দিয়ে বানানো লেবুর শরবত খেয়ে চাঙ্গা হয়ে হলেন। অন্য দিকে নিকটস্থ দোকানে গিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষজন একবারেই চিনি না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসলেন। যারাও কিনতে পারলেন হয় তারা বেশি দাম দিয়ে কিনলেন অথবা আরও বেশি যাতায়াত খরচ দিয়ে অন্য জায়গা থেকে সংগ্রহ করলেন! জনগণ আবারও দুষলেন সরকারকেই!

আসুন একটি বাস্তব ঘটনা শুনি- রিকশা থেকে নেমে বাড়ির সামনের এলাকার দোকানদার হারুন ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম হাসতে হাসতেই
-ভাই চিনি দেন।
– চিনি নেই। উনারও একগাল হাসিমাখা উত্তর
-কেন চিনি নেই!
– চিনি পাই না।
– চিনি কেন পান না? আগে যেখান থেকে সংগ্রহ করতেন সেখানে কি হয়েছে? সেখান থেকেও কি পান না?
– ওরা গত কয়েকদিন ধরেই আসছে না!
– হারুন ভাই সত্যি আমার চিনির দরকার। বেশি দাম হলেও নিবো। সমস্যা নাই। শুনেছি সবাই চিনি লুকিয়ে রেখেছে!
– তোমাকে কি না করবো বল!
– তা আমি জানি থাকলেও না করবেন না! বাজার থেকেও তো আনলে পারতেন। তাহলে?
– তোমার কি মনে হয় ৬৫ টাকা দরে কিনে এনে ৬৫ টাকাই বিক্রি করা উচিৎ? আমার তো ভাড়া লাগবে ১০০ টাকা। তাহলে? আগের কিছু চিনি ছিল। তাই বিক্রি করেছি কষ্ট করে এবং বেশি দাম দিয়ে। বেশি দাম দিয়ে কিনে কি কম দাম দিয়ে বিক্রি করবো? হ এখন যদি আমি পাই আগের মতো সরবরাহ। তাহলে অবশ্যই আমি ৬৫ টাকা দরেই চিনি বিক্রি করবো।
-আপনি ওদের ফোন করলেই তো পারেন।
– ওরা আসছে না। বলছে চিনি নেই!
– আচ্ছা!
এই বলে আমি আর কথা না বাড়িয়ে অন্য সদাই ক্রয় করে বাড়িতে ফিরে আসলাম।

প্রাচীন কালের গল্পটির সাথে কেমন জানি মিলে যায়! প্রজাদের হাতে চাদর উঠে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যদি এতদিন লাগে। প্রকৃত প্রজাদের কাছে সে জামানার বেকুব অথবা অতি চালাকের ভারি মন্ত্রী-পাইক-পেয়াদাদের প্রত্যক্ষ এবং সঠিক উপস্থিতি যদি না হয়। সঠিক পরিসংখ্যান গত বাস্তবিক প্রমাণ যদি না পাওয়া যায়। তাহলে বর্তমানেও যে সে রাজার কালের প্রকৃত প্রজা গন এর মতোই কষ্ট লাঘব হবে না! তা বুঝতে এত দেরি!!!

মজুদ আছে, আমদানি আসছে, উৎপাদন হচ্ছে। ভোক্তাদের হাতে সহজভাবে পৌঁছুচ্ছে না!

এই সরবরাহ নিশ্চিত করবে কে? ভোক্তা না সরকার না পরিবেশক না উৎপাদক? কে হতে পারে বলে মনে হয়। এই বেকুব আমজনতা তো বলি- সরকার+উৎপাদক+আমদানিকারক+পরিবেশক সহ সবাই নিশ্চিত করবেন। তা কি হচ্ছে আসলেই সব জায়গায়? মনে হয় না।

অন্য পণ্যের বেলায়ও এখুনি ভোক্তা পর্যন্ত দেখভালের ব্যবস্থা করেন মাননীয় সরকার। না হয়- অর্জন যে হয়ে যাবে আসন্ন রমজানে তা বিসর্জন!

সাধু সাবধান!

***
ফিচার ছবি: আন্তর্জাল