ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

‘বিশ্ববিদ্যালয়টা এখন আর আগের মত নাই। মানুষ মানুষের প্রতি আগের মত সম্মানও করে না। লজ্জা শরমও বিদায় হইছে । সব মিলায়ে আগের জাহাঙ্গীরনগরই ভালো ছিল।’

কথা বলছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনন্য এক বাবুর সাথে। এই বাবু আসলে কোন জমিদার বড়বাবু-ছোট বাবুদের কেউ না। নাবালক শিশু হিসেবেও বাবু নয় সে। তার পুরো নাম শরিফুল ইসলাম। ডাক নাম বাবু। সবাই ডাকে বাবু ভাই বলে। জন্ম সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর। পেশায় একজন বাবুর্চি। রান্নার দায়িত্ব জাবির মীর মশাররফ হোসেন হলের মেসে।তার মেসের নাম দিয়েছেন‍‍‍ ‍‍”সৌখিন মেস”। রয়েছে অসাধারণ সৌখিনতার ছোঁয়া। বাবুর রান্নার সুনাম করে না এমন লোক পাওয়া যায় না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রান্নার জন্য ডাক আসে বাবু ভাইয়ের। শুনছিলাম সদা হাস্যোজ্জল এই বাবুর বড় হবার গল্প।

babu_vai

‘সেই ছোটবেলা যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করি তখন বাবা মারা যান। চার ভাইবোনের পরিবার নিয়ে হত দরিদ্র মা পড়েন চরম বিপাকে। গ্রামের লোকজন বেশির ভাগই ছিল গরিব। পাশে দাড়াবার কেউ নেই।’ বাধ্য হয়ে গ্রামের এক চাচার সাথে ঢাকা আসেন তিনি। তখন বয়স ছিল আনুমানিক আট-নয়। কাজ শুরু করেন মান্নান স্যারের বাসায়। জাহাঙ্গীরনগরে চাকরির সুবাদে ক্যাম্পাসে চাকরির আশ্বাস দেন তিনি। নিয়ে আসেন ক্যাম্পাসে। বয়স তখন তের- চৌদ্দ। এর পর থেকে শুরু হয় ক্যাম্পাস জীবন। চলে সুখ-দুঃখের এই ক্যাম্পাসে বিচিত্র জীবনযাপন। তখন থেকে ২০ টি বছর ধরে জড়িয়ে আছেন এই ক্যাম্পাসের সাথে। তবুও স্থায়ী চাকরিটা হয়নি তার।

কখনও খারাপ লাগেনি? জানতে চাইলে বিচলিত হন তিনি। তার কথায়, ‘না, তেমন খারাপ লাগেনি কখনও। তবে ছোট সময় আসছি তো, বাড়ির জন্য মন খুব খারাপ হত।’

তারপর হঠাৎ মা’কে হারিয়ে পড়েন অথৈ জলে। ভাইদের মধ্যে বড় হওয়ায় চিন্তাটাও বেশি। বোনের বিয়ে দেয়া, ভাইদের মানুষ করা আর নিজের স্বপ্ন। দুশ্চিন্তা আর ঝুঁকি কখনও কাবু করতে পারেনি বাবুকে। ত্রিশ বছরের বেশি বয়স হলেও রয়েছেন চির তরুণ। সবসময় হাসি মুখে থেকে পার করেছেন সব বিপদ আর দুরাবস্থাকে। হটিয়ে দিয়েছেন দারিদ্রকে। বোনের বিয়ে দিয়ে তিন ভাই থাকেন জাবি ক্যাম্পাসে। বাবু এখন আর বাবুটি নেই; এখন সে দুই সন্তানের বাবা। কুড়ি বছর ক্যাম্পাসে থাকায় তার রয়েছে বিচিত্র অভিজ্ঞতা। বলছিলেন সেসবের কথা। যখন ক্যাম্পাসে আসি তখন এমন খারাপ অবস্থা ছিল না।

কিসের খারপ অবস্থা? নির্ধিধায় জানায়, আগের মত সম্মানবোধ, লজ্জাবোধ কোনটাই নাই এখন। আগে মেয়েদের সাথে জোড়া বেধে ঘুরে বেড়ানো ছিলনা এতটা। ছিলনা অবাধে সিগারেট খাওয়া। এখন হরেক রকমেরর নেশা চলে হরদম। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক অবস্থার উন্নতির কথা বলেন তিনি। আগের মত প্রতিনিয়ত মারামারি, ভাংচুর হয় না এখন। তবে নৈতিক অবক্ষয় বেশি হয়েছে মনে করেন বাবু। ক্যাম্পাসে ভালো লাগার মধ্যে বাবুর কাছে শিক্ষার্থীদের সফলতা।

তার কথায় ‘আমার মেসের কেউ বিসিএস ক্যাডার হলে অথবা ভালো চাকরি পেলে মনে হয় আমিই তা পেয়েছি।’ সত্যিই বাবুর এ আনন্দের তুলনা হয় না। নিজের বড় স্বপ্নটা আজ বলতে নারাজ সে। স্বপ্ন রয়েছে সৎ ভাবে বেঁচে থাকার আর সন্তানদের মানুষ করার। ছেলেদের নিয়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবার  স্বপ্ন দেখেন না তিনি। তবে মানুষের সাথে মিশে সম্মানের সাথে বাঁচতে পারে এমন আদর্শ মানুষ বানাতে চান তিনি।

প্রকৃতপক্ষে, আমাদের সমাজে রয়েছে এমন হাজারো বাবু ভাই। সমাজের প্রতি তাদের রয়েছে সুচিন্তা আর অন্যের সফলতায় গর্বিত হওয়ার মন। শিশু শ্রমিক হিসেবে জীবন শুরু করে স্বপ্ন দেখার সাহসই করে না অনেকে। অনেকে আবার ঝড়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সমাজ থেকে। প্রকাশ হয় না হাজারো বাবুর জীবনের গল্প। তাদের চাই একটু ভালবাসা, একটু  স্বপ্ন দেখানো। জাতির ভবিষ্যৎ গঠনে বাবুদের অবদান অস্বীকার করতে পারবে না কেউ। জয় হোক বাবুদের।