ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

child-labour

শিশুশ্রম’ শব্দটি সবারই কম বেশি পরিচিত। এর অর্থ ‘শিশুদের জন্য শ্রম’। যেমন বিদ্যার জন্য আলয়, বিদ্যালয়; গুণ প্রচারের জন্য গান, গুনগান; অন্ন খাওয়ার পাপ , অন্নপাপ; অ‌ন্যের জন্য উপকার প‌রোপকার ইত্যা‌দি। কিন্তু ‘শিশুশ্রম’ হল শিশুদের মাধ্য‌মে শ্রম। অর্থাৎ শিশু‌দের দ্বারা কাজ করা‌নো। হয়তো শিশুরা অবুঝ আর আ‌ন্দোল‌নে অনুপ‌যোগী হওয়া‌তেই হয়ত ব্যাকরণ‌বিদ‌দের কারশা‌জি। কথাটা এমনও হ‌তে পারত শিশু‌দের জন্য শিশু‌দের মাধ্য‌মে শিশু‌দের শ্রমই শিশুশ্রম। তাতে শ্রম থাকলেও তা হত শুধুমাত্র শিশু‌দের সা‌র্বিক উন্নয়‌নের জন্য তা‌দের দ্বারা নানা রকম প্রশিক্ষণ বা কাজ করা‌নো। কিন্তু বর্তমান শিশুশ্রমের মর্মবাণী হ‌চ্ছে অ‌ন্যের জন্য শিশু‌দের শ্রম।
সর্বজনীন স্বীকৃত মতে, শিশুদেরকে আর্থিক লেনদেনসহ অথবা আর্থিক লেনদেন ছাড়াই কোন কাজের জন্য নিয়োগ করা করা হলে তা শিশুশ্রমের আওতায় পরে। শোষণমূলক বিবেচনয় অইেশ দেশই অবৈধ ঘোষণা করেছে একে। বর্তমান বিশ্বে ১৫ বছরের নিচে প্রায় এক-দশমাংশ শিশু বিভিন্ন নিযুক্ত আছে বিভিন্ন পেশায়। যা মোটের উপড়ে ১৫০মিলিয়নের অধিক। যাদেও বেড়ে ওঠা আর বেঁচে থাকা দুই’ই হয়  চরম দারিদ্রতা আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। উন্নত জীবনের জন্য শিক্ষা গ্রহণ ও দক্ষতা উন্নয়নের কোন সুযোগ পায়না তারা। তা হয়তো স্বপ্নেই থেকে যায় অনেকের ।
শিশু শ্রমের শুরুর কথা: ১৮শতকের শেষভাগে গ্রেট ব্রিটেনে  শিল্প-কারখানা চালু হলে সর্বপ্রথম শিশুশ্রম চিহ্নিত হয় একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল ও মধ্য পশ্চিমাঞ্চলে গৃহযুদ্ধের পর এবং দক্ষিণে ১৯১০ সালের পর শিশুশ্রম দেখা দেয় একটি স্বীকৃত সমস্যা হিসেবে। তখন শিশুরা কাজ করত কারখানায় শিক্ষনবিশ অথবা গৃহ পরিচারক হিসেবে । কিন্তু তা ক্রমেই শোষণের ভয়ানক রুপ ধারণ করে। শুরু হয় দাস প্রথার ভিন্ন আরেক রুপ। ব্রিটেনে ১৮০২ সালে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে সংসদে গৃহীত আইনকওে বন্ধ করা হয় এ শিশুশ্রম। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও অনুসরণ করা হয় এমন আইন । ১৯৪০ সালে বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশে শিশুশ্রম বন্ধের আইন প্রণীত হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উৎপাদন বৃদ্ধির আবশ্যকতা আবার পেছন ফেরায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১৮ এবং ১৯২২ সালে সুপ্রীম কোর্ট নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক প্রণীত শিশুশ্রম আইন। ১৯২৪ সালে কংগ্রেসে একটি সংবিধান সংশোধনী পাশ করা হলেও অনুমোদন পায়নি অনেক অঙ্গরাজ্যে। ১৯৩৮ সালে প্রণীত প্রথম লেবার স্ট্যান্ডার্ড অ্যাক্টস ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পেশার জন্য বয়স ধার্য করে ন্যূনতম ১৮ বছর এবং সাধারণ নিয়োগের জন্য ১৬ বছর।

বর্তমান বিশ্বে শিশুশ্রম: আইএলও’র সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী,বর্তমান বিশ্বের প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে বিক্রি করছে তাদেও শ্রম। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত প্রায় সাড়ে ৮ কোটি শিশু । বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত ‘জাতীয় শিশু জরিপ ২০১৩’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত আছে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু। শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে দেশের ১৩ লাখ শিশু। ২০০৬ সালের শিশু সনদে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের সার্বিক শ্রম এবং ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে কারখানায় ১৮ বছরের কম বয়সের শ্রমিক নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ‘সরকারী শিশু জরিপ ২০০৩’ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫  থেকে ১৪ বছর বয়সের ৩.২ মিলিয়ন শিশু  কাজ করে। যারা প্রতিনিয়তই হচ্ছে অধিকার বঞ্চিত। বেতন বৈষম্য থেকে শুরু করে তারা হয় নানা রকম শারিরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার।
%e0%a6%b6%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%81-%e0%a6%b6%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%ae
শিশুশ্রম নিরসনে পদক্ষেপ: কয়েকটি আইন লক্ষ্য করলে বিষয়টি আমাদের কাছে আরেকটু স্পষ্ট হয়। ন্যূনতম মজুরি অধ্যাদেশ  ১৯৬১ অনুযায়ী কিশোরসহ সকল শ্রমিকের জন্য ন্যূনতম মজুরি প্রদানের নির্দেশ এবং নিয়োগকারী কর্তৃক ১৮ বছরের কম বয়সী শ্রমিককেও বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণের কম মজুরি প্রদান বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়েছে। দোকান ও স্থাপনা আইন  ১৯৬৫ অনুসারে দোকানে বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ১২ বছরের কমবয়সী শিশুনিয়োগ নিষিদ্ধ। এই আইন ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে শ্রমঘণ্টা । কারখানা আইন ১৯৬৫ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগগদান নিষিদ্ধ করেছে ১৪ বছরের কম বয়সী কাউকে। কারখানার নারী শ্রমিকদের ৬ বছরের নিচে সন্তানদের লালন-পালনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির নির্দেশ দিয়েছে এই আইন। ‘শিশু আইন ১৯৭৪’এবং ‘শিশু বিধি ১৯৭৬’ এ সকল ধরনের আইনগত প্রক্রিয়াকালে শিশুর স্বর্থ রক্ষা করবে। এই আইনে বলা হয়েছে আলাদা কিশোর আদালত গঠনের কথা। ‘খনি আইন ১৯২৩’ অনুযায়ী খনিতে নিয়োগদান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ১৫ বছরের কম বয়সীদের।
রেলওয়ের কয়েকটি কাজে শিশুদের নিয়োগ এবং রেলওয়ে যানবাহনে অথবা কোন বন্দরের অধীন এলাকায় শিশুদের ভাসমান ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছে ‘শিশু নিয়োগগ আইন ১৯৩৮’।
২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি বাস্তবায়নের জন্য ২০১২ সালে গৃহীত হয় পাঁচ বছরমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১২-২০১৬) । তাতে অঙ্গীকার করা হয় ২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্র নিরসন করা হবে। এখন পর্যন্ত আশানুরুপ পরিবর্তন না আসায় রয়েছে নতুন পদক্ষেপ। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮টি পেশাকে। আর ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে সরকার।

sisu-srom
শিশুশ্রম নিরসনে রয়েছে এমন অনেক পদক্ষেপ। সরকারি-বেসরকারি নানান পদক্ষেপ থাকতেও  অবস্থার পরিবর্তন নেই। অনেকের মতে দারিদ্রই আসল সমস্যা। তবে অশিক্ষা, অনিশ্চয়তা আর সচেতনতার অভাব নজর কাড়ার মত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম লক্ষ্য সবার আজীবন শিক্ষা নিশ্চিত করা। আর এর মাধ্যমে দেশের বিশেষ বিশেষ সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে উঠতে পারে। তবে শিক্ষিত জাতি গঠন করে শিশুশ্রম বন্ধ করা ততটা সহজ না। কারণ, আগে শিশুশ্রম বন্ধ করতে হবে ,পরে শিক্ষিত জাতি গঠন সম্ভব হয়ে উঠবে। আর এজন্য চাই সচেতনতা বৃদ্ধি। যেখানে শিক্ষিত সমাজ যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত সহ সর্বত্র শিশুশ্রমের প্রসার সেখানে সচেতনতার অভাব যে সর্বোচ্চ পর্যায় আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্টানের আবাসিক হর থেকে শুরু করে ক্যন্টিন, ডাইনিং, চায়ের দোকান, রিক্সা চালকসহ প্রতিটি পেশায় শিশুদের ব্যবহার। কারণ, সবাই অর্থনীতি বোঝে। তাই কম বেতনে অধিক শ্রম খরিদ করে। অবুঝ শিশু আর অসচেতন অবিভাবকও বোঝে না। তারা মনে করে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তাই ‘নগদ যা পাাও হাত পেতে নাও, বাকির খাতায় শূন্য থাক।’ সব মিলিয়ে দেখা যায় , জনা সত্বেও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে একমত হয়ে কাজ করেন না অনেকেই। এখানেও স্পষ্ট হয় শিক্ষা আর সচেতনতা এক নয়। আর তখনই সুন্দর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ হবে, যখন শ্রমশক্তি টেকসই ও মানসম্মত হবে। আর তা সম্ভব শিশুশ্রম রোধ করে সচেতন নাগরিক ও কর্মঠ জনশক্তি  তৈরির মাধ্যমে।